সামাজিক মানদণ্ডে দক্ষিণ এশিয়ায় আমরা প্রায় শীর্ষে। কিন্তু কোনো কারণে স্বাস্থ্য খাতে এর প্রতিফলন ঘটতে দেখিনি। স্বাস্থ্যে আমাদের জনগণের ব্যয় আফগানিস্তানের চেয়েও বেশি। এ ব্যর্থতার পেছনে অন্যতম কারণ হলো, আমরা প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারিনি। এগুলো সরকারের দায়িত্ব ছিল। সরকারিভাবে এক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং সমাধানের জন্য সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এটা সত্য যে বাজেটের ১ শতাংশের কম বরাদ্দের স্বাস্থ্য খাত থেকে বেশি কিছু প্রত্যাশাও করা যায় না। আবার এই ১ শতাংশ ব্যয়েও কী পরিমাণ দুর্নীতি ও অপচয় হয় সেটিও আমরা জানি।
দেশ ও জাতি হিসেবে সর্বপ্রথম আমাদের স্বাস্থ্যসেবার বরাদ্দ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা জনমিতির সুবিধার কথা বলছি, কিন্তু স্বাস্থ্যসেবায় ১ শতাংশ বরাদ্দ দিচ্ছি, এটি হতে পারে না। শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এ দুই জায়গায় বিনিয়োগ না হলে জনমিতিক লভ্যাংশের কথা শুধু বক্তৃতায়ই বলা হবে, কাজে আসবে না। এজন্য বিএনপি দলগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হবে। মানুষকে বিনামূল্যে প্রাথমিক ও প্রতিষেধক সেবা দিতে পারলে সামাজিক সুরক্ষায় খরচ কমে যাবে। একজন মানুষ যদি তার পরিবারের খরচ কমাতে পারে তাহলে তার জীবন ব্যবস্থা, জীবন নির্বাহ সহজ হবে। আমরা হিসাব করেই সে নীতিতে এগোচ্ছি। তাছাড়া কেবল তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে জনমিতিক লভ্যাংশ নয়, কর্মক্ষম বয়োজ্যেষ্ঠের মাধ্যমেও এটি (লনজিটিভিটি ডিভিডেন্ড) অর্জন সম্ভব। যারা অবসরে গেছেন তাদেরও আর্থসামাজিক খাতে অবদান থাকতে পারে। এক্ষেত্রেও আমাদের বিনিয়োগ করতে হবে। বিএনপি এ বিনিয়োগ করবে। এগুলো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। অনেক হিসাবনিকাশ করেই বিএনপি স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে বেসরকারি খাতের অবদান রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ও সংস্কারে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোকে সেলফ রেগুলেশনের (স্বনিয়ন্ত্রণ) সুযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সরকারি নিয়ন্ত্রণ। বেসরকারি খাতের হাসপাতাল ও ফার্মাসিউটিক্যালসকে সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে হবে। আমরা কখনো দায়িত্বে এলে এগুলোকে স্বনিয়ন্ত্রিত করে দেব। সারা দুনিয়া এভাবেই চলে। সরকার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে না। শুধু বাংলাদেশেই এমনটি হয়। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশে যেখানে যত বেশি নিয়ন্ত্রণ, সেখানে তত বেশি দুর্নীতি। এ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয় দুর্নীতির জন্য।
পোশাক শিল্প মালিকদের রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) থেকে ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি) সার্টিফিকেট নিতে হতো। ফলে দুর্নীতি ও সময়ক্ষেপণ হতো। আমি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালীন ইউডি সার্টিফিকেট প্রদানের ক্ষমতা ইপিবি থেকে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতিকে (বিজিএমইএ) দেয়া হয়। অর্থাৎ স্বনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়ে দেয়া হয়। আজ পর্যন্ত এটি নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। ইউডি সার্টিফিকেট প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারের আমলাতন্ত্রও নেই, দুর্নীতি কিংবা সময়ক্ষেপণ নেই। এ কারণেই আমাদের স্বনিয়ন্ত্রণে যেতে হবে। বিএনপি এ সুযোগ যাচ্ছে।
তবে স্বনিয়ন্ত্রণের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি নিতে হবে। তৈরি করতে হবে আমাদের সক্ষমতা। প্রচলিত বিনিয়োগ নীতি থেকে বেরিয়ে স্বাস্থ্য খাতের জন্য ভিন্নভাবে ভাবতে হবে। বিএনপি সে পরিকল্পনার দিকে এগোচ্ছে। আমরা স্বাস্থ্য খাতের জন্য নীতিমালা তৈরি করছি। স্বাস্থ্যের সব অংশীজনের সঙ্গে কথা বলে আমরা সে নীতিমালা তৈরি করছি। কিছুদিন পরই তা প্রকাশ করা হবে। প্রাইভেট মেডিকেল সেক্টরের সুদহার নিয়ে অনেকেই কথা বলেছেন। আসলে ১৩-১৬ শতাংশ ইন্টারেস্ট দিয়ে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব না। এক্ষেত্রে আমরা (বিএনপি) সুযোগ পেলে বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে এ ইন্টারেস্ট কমিয়ে সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনব।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী; স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি
[বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম ‘বাংলাদেশ হেলথ কনক্লেভ ২০২৫’-এ বিশেষ অতিথির বক্তৃতায়]