দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেভাবে দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং এসবের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ যেভাবে ক্রমশ শিথিল হয়ে পড়ছে, তাতে দেশের সাধারণ মানুষ খুবই উদ্বিগ্ন। তন্মধ্যে আবার অধিক উদ্বিগ্ন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া নানা কোন্দল, হানাহানি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে পড়ার কারণে। তদুপরি সে উদ্বেগকে বাড়তি মাত্রা দিচ্ছে এ ঘটনা যে, উল্লিখিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো আবার একে অপরকে দোষারোপ করছে এবং তারা এসব ঘটনার দায় একে অপরের ওপর চাপাতে চেষ্টা করছে। তাতে অবশ্য একটি বিষয় পরিষ্কার হচ্ছে যে, ঘটনাগুলো যিনি বা যারাই ঘটিয়ে থাকুন না কেন, সেটি কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরাই ঘটাচ্ছেন।
উপরোক্ত এই ছোট্ট প্রারম্ভিকার তথ্যসমূহ বিশ্লেষণ করলে তার সার-সংক্ষেপ দাঁড়ায় এই যে: এক. সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এখন সারাদেশেই ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে; দুই. এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে মূলত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা; তিন. কোনো রাজনৈতিক দলই এসব সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটার কথা অস্বীকার করছে না—শুধু এর দায় একে অপরের ওপর চাপাতে চাচ্ছে; চার. রাজনৈতিক দলের ব্যাপক সম্পৃক্ততার কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে এসব ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না; পাঁচ. আইন-শৃঙ্খলার এরূপ অবনতিশীল পরিস্থিতিতে মানুষ প্রচণ্ডভাবে ভীত ও উদ্বিগ্ন; এবং ছয়. আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এ অবনতিশীল অবস্থা অব্যাহত থাকলে খুব দ্রুতই দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের বিপদের মধ্যে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, যার কিছু কিছু লক্ষণ এরই মধ্যে দেখা দিতে শুরু করেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, উল্লিখিত এই ছয় পর্যবেক্ষণে বিধৃত অবস্থা থেকে বেরুনোর উপায় কি অথবা তা আদৌ বেরুনো সম্ভব কিনা কিংবা বেরুতে পারলেও তা কতটুকু বেরুনো সম্ভব হবে? বস্তুত সংক্ষেপে এ প্রশ্নগুলোর জবাব খোঁজার জন্যই এ নিবন্ধের অবতারণা।
প্রথম কথা হচ্ছে, কোনো কর্মকাণ্ড যখন একযোগে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন বুঝতে হবে: হয় এটি পরম জনপ্রিয়, নয়তো চরম ঘৃণার। পরম জনপ্রিয় ছিল ১৯৬৯-এর গণ-আন্দোলন, আর চরম ঘৃণার ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ১৯৭১-এর বর্বর গণহত্যা। এখন সারাদেশে যে দেশে সন্ত্রাস চলছে, তা একাত্তরের বর্বরতার সঙ্গে তুলনীয় না হলেও মিটফোর্ডের গত ৯ জুলাইর হত্যাকাণ্ডটি অবশ্যই সে আঙ্গিকের। তার মানে, সীমিত পরিসরে হলেও একাত্তরের পাকিস্তানি বর্বরতার কিছু কিছু মাঝে মাঝে এই স্বাধীন ভূখণ্ডেও চোখে পড়ছে। একে অবিলম্বে রুখে দাঁড়ানো প্রয়োজন। নইলে এর পরিণতি কোথায় যেয়ে দাঁড়াবে তা কারোট পক্ষেই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। আর তাই দেশব্যাপী আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এ অবনতির বিষয়টিকে একটি জাতীয় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে এ ব্যাপারে সার্বিক ঐকমত্য গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে মনে করি, যাতে এ ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্যোগ ফলপ্রসূ হয়। আর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ ধরনের ঐকমত্য গড়ে না ওঠলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যত চেষ্টাই করুক না কেন, তাদের একক আইনি প্রচেষ্টায় এ ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ সাফল্য অর্জন করা কিছুতেই সম্ভব হবে না। অতএব রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের প্রতি আহ্বান, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এ ক্ষেত্রে এই মর্মে সহমতে আসুন যে, চাঁদাবাজি, মস্তানি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, খুনখারাপি ইত্যাদির মতো ঘটনায় আপনারা আপনাদের নেতাকর্মীদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন।
উপরোক্ত বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কর্তৃক তাদের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যকার একটি স্ববিরোধী আচরণও এরই মধ্যে সাধারণ মানুষকে প্রচণ্ডভাবে হতাশ করেছে এবং গণমাধ্যমের আলোচনায়ও এটি ওঠে এসেছে। বিষয়টি হচ্ছে: এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য একদিকে দলগুলো তাদের নেতাকর্মীদের দল থেকে বহিষ্কার করাসহ নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, আবার অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদেরকে ধরতে বা গ্রেফতার করতে গেলে দলীয় নেতাকর্মীরাই তাতে বাধা দিচ্ছেন বা সেখানে প্রভাব খাটাচ্ছেন। তাহলে সুনির্দিষ্ট অপরাধের জন্য দল থেকে বহিষ্কারের ঐ সিদ্ধান্ত পুরোপুরোই লোকদেখানো ও প্রতারণামূলক হয়ে গেল না কি? আর এ ধরনের তথাকথিত বহিষ্কার বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থাদি মূল অপরাধ সংগঠনের প্রবণতা কমাতে বিন্দুমাত্র সহায়ক হবে কি? হবে না। কারণ ঐ অপরাধীদের জানাই থাকছে যে, এসব বহিষ্কার সাধারণের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার এক ধরনের কৌশলী অপচেষ্টা মাত্র।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর সাথে যুক্ত উল্লিখিত অপরাধগুলোর মাত্রা এত বেশি ব্যাপক ও সেসব এতোটাই দৃশ্যমান যে, রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে কিছুতেই সেগুলো অস্বীকার করা সম্ভব হচ্ছে না। এমতাবস্থায় সব রাজনৈতিক দলই এখন এসব ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে নিচ্ছে বটে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, তাদের কেউই এসব অপরাধের দায় স্বীকার করতে চাচ্ছে না। এসব ঘটনায় তারা প্রত্যেকেই দায় চাপাচ্ছে একে অপরের ওপর এবং নিজেদের দাবি করছে নির্দোষ বলে, যা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে। আর সে লক্ষ্যে তারা গণমাধ্যমে, জনসমক্ষে ও অন্যত্র বাকসর্বস্বতাপূর্ণ প্রচারণাও চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে এসব অপরাধমূলক ঘটনার কোনোটিতে সরকার সমর্থক মহলের পরোক্ষ প্রশ্রয় থাকার বিষয়টিও আলোচনায় ওঠে আসছে। তবে এ ধরনের পারস্পরিক দোষারোপের চক্রে পড়ে চরম বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। আর রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক নির্বিশেষে সবাই একটি বিষয়ে একমত যে, এরূপ পারস্পরিক দোষারোপের ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে ঘটনার সাথে জড়িত মূল অপরাধীরা এবং বহুক্ষেত্রে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরেও থেকে যাচ্ছে।
উপরোক্ত পরিস্থিতিতে নিজেদের জীবন-জীবিকা এবং সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার কথা ভেবে দেশের সাধারণ এখন মানুষ প্রচণ্ডভাবে হতাশ। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এরূপ অবনতিতে দেশের অর্থনীতি এখন এতটাই ঝুঁকির মুখে যে, এ অবস্থাকে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। কারণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা পরিসংখ্যানের মাত্রা ও পরিধির চেয়েও অনেক বেশি হতাশাব্যঞ্জক। উদাহরণস্বরূপ গ্রামের কৃষক ও সেখানকার ছোট ব্যবসায়ীর কথাই ধরা যাক। অনেকেই হয়তো জানেন না যে, শহরের তুলনায় বর্তমানে গ্রামগুলোর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন অনেক বেশি খারাপ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা মিটফোর্ডের ঘটনার মতোই বা তারচেয়েও অধিক বীভৎস। কিন্তু রাজধানীকেন্দ্রিক গণমাধ্যমে সেগুলো স্থান পায় না বলে আলোচনার মূলধারায় গ্রামের প্রকৃত অবস্থার কোনো প্রতিফলন নেই। এমতাবস্থায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যদি আরো অবনতি ঘটে তাহলে ওই গ্রামীণ কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ীকে যে কী পরিমাণে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির মুখোমুখি হতে হবে, তা পরিসংখ্যান দিয়ে বুঝানো কঠিন। ফলে কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ীসহ গ্রামের মানুষ এখন শহরের মানুষের তুলনায় অনেক বেশি আতঙ্কগ্রস্ত এবং অবধারিতভাবেই এর নেতিবাচক প্রভাব দেশের কৃষি খাত ও গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর পড়তে বাধ্য। উল্লেখ্য, সদ্যসমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার কমতে কমতে ১ দশমিক ৭৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত থাকলে শেষ পর্যন্ত তা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা ভাবতেও শরীর শিহরে ওঠে। কিন্তু দেশের নীতিনির্ধারকরা, বিশেষত কৃষি উপদেষ্টা মহোদয় কি বিষয়টি নিয়ে এতটুকু দুশ্চিন্তাবোধ করছেন? এ ক্ষেত্রে মুশকিল হলো যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের পর তাঁর পক্ষে কৃষির প্রতি কতটাই-বা মনোযোগ দেয়া সম্ভব? বিষয়টির প্রতি এর আগেও একাধিকবার মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব ফলাফল কিছুই ঘটেনি।
শিল্প ও ব্যবসায় খাতে নতুন বিনিয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ এটিই এখন কর্মসংস্থানের মূল ক্ষেত্র। কিন্তু গত অর্থবছরে দেশে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি যেভাবে ব্যাপক হারে কমে গেছে এবং একইসঙ্গে ব্যাংকঋণের প্রবাহও যেভাবে স্থবির হয়ে আছে, তাতে করে ধারণা করা চলে যে, চলতি অর্থবছরেও বিনিয়োগ না বাড়ার আশঙ্কাই সর্বাধিক। এর মধ্যে যদি মিটফোর্ড, মুরাদনগর, চট্টগ্রামের মতো সন্ত্রাসী ঘটনার সংখ্যা বাড়তেই থাকে তাহলে বিনিয়োগ যে আরো কমে যাবে, সেটি প্রায় অবধারিত। উল্লেখ্য, বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষির ন্যায় শিল্প খাতেও প্রবৃদ্ধির হার ব্যাপকভাবে কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, যা গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এবং মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি হ্রাস পাওয়া ও ব্যাকঋণের নিম্নমুখী প্রবণতা দেখে এটাই বাস্তব আশঙ্কা যে, চলতি অর্থবছরে তা আরো কমে যেতে পারে। আর এ সময়ে মব ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলতি ধারায় বাড়তে থাকলে সেটিতো আরো বেশি হারে কমবে। আরো উল্লেখ্য, অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও প্রবৃদ্ধি ধারা নিম্নমুখী। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কমে যেয়ে দাঁড়াতে পারে মাত্র ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিশীল ধারা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সংক্রান্ত সর্বশেষ পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিলে অর্থবছর শেষে এ প্রাক্কলনও টিকবে কিনা, সে ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। এবং আশঙ্কা করা যায় যে, সে ক্ষেত্রে তা সাড়ে ৪ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে। উল্লেখ্য, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
সব মিলিয়ে বলা চলে যে, দেশের বর্তমান নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির যদি উন্নতি ঘটাতে হয় বা নিদেনপক্ষে বর্তমান অবস্থা টিকিয়ে রাখতে হয়, তাহলে সর্বাগ্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি ঘটাতে হবে। কিন্তু সেটি কতটা সম্ভব হবে, সে ব্যাপারে যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। এমতাবস্থায়, বাংলাদেশ যদি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার চলমান ধারার কারণে নিকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকটের মধ্যে নিপতিত হয়, তাহলে তাতে মোটেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কিন্তু সেটি যাতে কিছুতেই এবং কোনোভাবেই না ঘটে, সেটাই সবার কাম্য। আর তাই দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির বৃহত্তর স্বার্থে শুধু অর্থ উপদেষ্টার কর্মকাণ্ডের দিকে তাকিয়ে না থেকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সাধন এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন আয়োজনের দিকেই অধিক মনোযোগী হওয়া জরুরি বলে মনে করি।
আবু তাহের খান: অ্যাজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি; সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়।