ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও তৎপরবর্তী সহিংসতায় দেশে সৃষ্ট চলমান অচলাবস্থার আর্থসামাজিক প্রভাব নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম
কয়েক দিন ধরে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ, যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল, সরবরাহ চেইন কাজ করছে না, ব্যাংক খাতও অচল। অর্থনীতিতে এর কেমন অভিঘাত দেখছেন?
সাম্প্রতিক ইতিহাসে বাংলাদেশে এ রকম ভয়াবহ অবস্থা হয়নি। স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম একেবারে থমকে দাঁড়িয়েছে। ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ থাকার কারণে সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, দোকানপাট এমনকি বিমান থেকে শুরু করে অনেক কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার জন্য সর্বস্তরের মানুষ অপেক্ষা করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক তার নতুন মুদ্রানীতিতে বছর শেষে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। এখন যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো, সহিংসতা ও অনিশ্চয়তা বাড়ল এতে জিনিসপত্রের দাম আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে, সরবরাহ চেইন মারাত্মক বিঘ্নিত হচ্ছে। নতুন করে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট অর্থনৈতিক ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। এখন নতুন মুদ্রানীতি কীভাবে কাজ করবে তা সংকট কেটে গেলে হয়তো বোঝা যাবে। এর আগে দুই বছরেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি তেমনভাবে কার্যকর হয়নি। এক্ষেত্রে যে কো-অর্ডিনেশনের দরকার ছিল তা অনুপস্থিত ছিল। পাশাপাশি নতুন করে যে ঝুঁকি সৃষ্টি হলো, তাও কিন্তু আমাদের মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেবে।
প্রায় সব ধরনের শাকসবজির দাম বাড়ছে। সরবরাহ চেইনে এ বিশৃঙ্খলা থাকলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে? আপনি কী মনে করেন?
অনেক বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় শাকসবজি পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পণ্য সরবরাহ তো স্থবির হয়ে পড়েছে। সাপ্লাই চেইন ঠিকমতো কাজ না করলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। সেদিক থেকে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। আশা করব, এ পরিস্থিতির একটা যৌক্তিক সমাধান হবে এবং অর্থনীতি একটা স্বাভাবিক জায়গায় আসবে। তা না হলে আমরা যতই মুদ্রানীতির কথা বলি, রাজস্বনীতির কথা বলি—এসব কিছুই কাজ করবে না।
দুই বছর ধরে সরকারের নেয়া কোনো নীতিই তো মনে হয় কার্যকর ফল দিতে পারেনি। কেন পারেনি?
গত দুই বছরে আসলে সরকার সত্যিকার অর্থে সমন্বিত কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি। খাদ্য মূল্যস্ফীতি দুই অংকের ঘরে অবস্থান করছে দীর্ঘদিন। এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য যে সমন্বিত প্রচেষ্টার দরকার ছিল, নীতির ক্ষেত্রে, প্রয়োগের ক্ষেত্রে, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার, কৃষি মন্ত্রণালয়, এনবিআর—এসবের মাঝে যে সমন্বয় দরকার তা কিন্তু আমরা দেখিনি।
আরেকটি বিষয় তেমন কাজে আসেনি—দীর্ঘদিন সুদের হার নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ যে সময় সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করা দরকার ছিল, সে সময় কিন্তু সুদের হারকে ব্যবহার করা হয়নি। পাশাপাশি সরকার ব্যাংক খাত থেকে প্রচুর পরিমাণে ঋণ নিয়েছে, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপিয়েছে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা দেখেছি, দীর্ঘসময় মুদ্রা বিনিময় হার কৃত্রিমভাবে ধরে রেখে হঠাৎ করে বাড়িয়ে দেয়ার ফলেও কিন্তু মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।
সবক্ষেত্রে বলব, নীতির ক্ষেত্রে সঠিক নীতি নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা, সময়মতো নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা। অথবা যে নীতিগুলো নেয়া হয়েছে সেগুলোর মধ্যে সমন্বয় না করা। পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় যে বড় ধরনের অনিয়ম আছে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারিনি। বিভিন্ন সময়ে সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীরা নানা কারণে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়েছে। সেগুলোর বিরুদ্ধে আমরা সে রকম কোনো ব্যবস্থা নিইনি।
দুই বছরেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারা যায়নি এবং এমন কোনো উদ্যোগ দেখছি না যে আমাদের আশাবাদী করবে।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ বাড়ছে না। যার ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হতে চাই, কিন্তু নির্ভরতা অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর। এ বিষয়গুলো আপনি কীভাবে দেখছেন?
এবারের বাজেট ঘোষণার সময় খুবই অবাস্তবভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়েও যা বলা হয়েছিল তা কোনোভাবেই বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। আবার বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমানোর জন্য মনিটরিংয়ের কথা বলা হয়েছে। কীভাবে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে তা নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ছিল না। মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য সুদের হার বাড়ানো হয়। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমানো হলে কিন্তু কর্মসংস্থান কমবে।
সাম্প্রতিক অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা ছিল মূল্যস্ফীতি। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অবশ্যই চালিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি রাজস্বনীতিতে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে আমদানীকৃত যেসব পণ্যের ওপর ছাড় দেয়ার সুযোগ রয়েছে মূল্যস্ফীতি কমাতে তা দিতে হবে। আমাদের মূল্যস্ফীতির বড় একটি কারণ সরবরাহজনিত। এজন্য আমদানি করে বা উৎপাদন বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাতে হবে। সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে আমরা অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারব না।
ছাত্রদের যে অসন্তোষ তার পেছনে কর্মসংস্থানের অভাবের ভূমিকা রয়েছে। আমাদের উচ্চ শিক্ষিত অধিকাংশ তরুণ এখন বেকার। ফলে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন ব্যাহত হচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?
আন্দোলনটা শুরু হয়েছে সরকারি চাকরিতে সমসুযোগ এবং কোটাবৈষম্য কমানোর দাবিতে। কিন্তু দেশে তরুণ জনশক্তির তুলনায় সরকারি চাকরির সুযোগ কম। সিংহভাগ কর্মসংস্থান বেসরকারি খাতে। কিন্তু এ খাতে কর্মসংস্থানের অবস্থা বেশ শোচনীয়। আমি মনে করি, তরুণদের সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির দাবি তোলা দরকার ছিল। চলমান আন্দোলন একটি সংকীর্ণ দাবিতে সীমাবদ্ধ। যতক্ষণ পর্যন্ত বেসরকারি খাতে বৃহত্তরভাবে শোভন কর্মক্ষেত্র অর্থাৎ ন্যায্য মজুরি ও মানসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে না ততদিন পর্যন্ত চাকরির সংকট দূর করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে বিশাল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীকে আমরা উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করতে পারব না। ফলে কর্মক্ষম জনশক্তি থাকার পরও জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন হবে না।
এ আন্দোলনে ছাত্রদের বাইরে যারা অংশগ্রহণ করেছে তারা কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত নয়। তাদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারের উচিত, তাদের প্রতি মনোযোগ দেয়া যাতে আমরা তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে পারি। তাদের জন্য কর্মসংস্থান ও শিক্ষার পরিসর বাড়াতে হবে; ব্যক্তি খাতে তাদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এজন্য ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
এক সপ্তাহ ধরে দেশে আন্দোলনের কারণে অস্থিরতা বিরাজমান। এটি যদি আরো এক সপ্তাহ দীর্ঘায়িত হয় তাহলে অর্থনীতিতে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে?
এরই মধ্যে যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। এছাড়া নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে যদি আমরা দ্রুত উত্তরণ করতে না পারি তাহলে দেশের অর্থনীতি আরো বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এ দিক বিবেচনায় বিরাজমান অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা অতিসত্বর দূর করা প্রয়োজন। সরকারের উচিত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসা এবং আলোচনার মাধ্যমে সবার ঐকমত্যে পৌঁছানো। পাশাপাশি যারা এ অস্থির পরিস্থিতির অন্যায় সুযোগ নিয়ে সহিংসতা করেছে তাদের শাস্তির আওতায় আনা। আর আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি উন্নত করা। যোগাযোগ ও সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক করতে হবে। নয়তো অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়বে।