ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ

গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও রাষ্ট্রের পথচলার পরীক্ষা

চব্বিশের জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।

এ আন্দোলন কেবল একটি সরকারের পতন ঘটায়নি; বরং রাষ্ট্র ব্যবস্থার গভীরে জমে থাকা অসন্তোষ, অবিচার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে এক বিস্ফোরিত সামাজিক শক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে গঠন করা অন্তর্বর্তী সরকার। এ সরকারের অধীনে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর এক মাসের ব্যবধানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটেই শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা। এ সংসদ তাই শুধু একটি নতুন আইনসভা নয়—বরং গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

গণ-অভ্যুত্থান দেশের মানুষের মধ্যে বিশাল প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল। মানুষ আশা করেছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন হবে, জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং রাজনৈতিক সংস্কারের একটি স্পষ্ট রূপরেখা সামনে আসবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনে সেই প্রত্যাশার সামান্যই পূরণ হয়েছে। বরং দেশে ভয় ও অনিশ্চয়তার এক নতুন পরিবেশ তৈরি হয়েছিল—মব সহিংসতার বিস্তার, উগ্র-ডানপন্থী রক্ষণশীল রাজনীতির উত্থান এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার সংকোচন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল। এর পাশাপাশি আরো উদ্বেগজনক একটি প্রবণতা হলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে খাটো বা অস্বীকার করার কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগের উত্থান।

মুক্তিযুদ্ধ এ রাষ্ট্রের নৈতিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি। সেই ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা কেবল অতীতকে বিকৃত করে না; বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও বিপজ্জনক বার্তা বহন করে।

এ প্রেক্ষাপটে একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু হলো। এ যাত্রার শুরুতেই, প্রথম দিনের ঘটনার মধ্যে একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সংসদে গৃহীত শোকপ্রস্তাবে এমন কয়েকজন ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত ছিলেন। আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তিদের এভাবে স্মরণ করা বাংলাদেশের ন্যায়বিচার ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি রাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়।

এ জটিল বাস্তবতার মধ্যেই ত্রয়োদশ সংসদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বৈত দায়িত্ব রয়েছে।

প্রথমত, একটি কার্যকর আইনসভা হিসেবে জনগণের প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং নীতিনির্ধারণ করা। দ্বিতীয়ত, গণ-অভ্যুত্থানের পর যে সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন এবং প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

এবারের সংসদের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর নেতৃত্বের নবীনতা। ২০ জনের বেশি তরুণ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এছাড়া সব মিলিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যই প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়ে সংসদে পা রেখেছেন। এমনকি সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতাও এবারই প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। যদিও এবারের সংসদে নতুন নেতৃত্বের সংখ্যা অধিক হলেও নির্বাচিত নারী প্রতিনিধির সংখ্যা তুলনামূলক কম। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট সাতজন নারী নির্বাচিত হয়েছেন। এ সংখ্যা ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে এবারেরটিসহ সর্বশেষ পাঁচটি নির্বাচনের তুলনায় সর্বনিম্ন। বিশেষ করে বিরোধী দলে কোনো নারী প্রতিনিধি নেই। এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সংসদ গঠনের অন্তরায়। এ প্রেক্ষাপটে সংরক্ষিত আসনে নারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।

সর্বোপরি নবীন-প্রবীণ নেতৃত্বের জন্য সংসদীয় রীতি, প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক শালীনতার চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রে সংসদ কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিসর যেখানে মতপার্থক্যকে নীতি ও যুক্তির মাধ্যমে সমাধান করতে হয়।

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় এক ধরনের উত্তেজনা দেখা গেছে। এটি হয়তো নতুন সংসদের অনভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা স্পষ্ট—সংসদ যেন কেবল বাগাড়ম্বরের মঞ্চ না হয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে।

এটি নিশ্চিত করতে হলে সংসদীয় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। দ্রুত মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গঠন করতে হবে, যাতে নির্বাহী বিভাগের ওপর সংসদের কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা যায়। পাশাপাশি বহু পুরনো সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধির সংস্কারও সময়ের দাবি। বর্তমান কাঠামোতে সাধারণ সংসদ সদস্যদের সক্রিয় ও অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত। সংসদকে যদি সত্যিকার অর্থে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র বানাতে হয়, তবে এ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা জরুরি।

সবশেষে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন—বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ওপর। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক শক্তি ও জনআকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে, তা যদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে বাস্তব রূপ না পায়, তবে হতাশা আরো গভীর হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, বিগত কয়েকটি সংসদ গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে; বরং কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠায় অধিক ভূমিকা রেখেছিল। এর পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ত্রয়োদশ সংসদের সামনে তাই শুধু আইন প্রণয়নের কাজ নয়; বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা পুনর্নির্ধারণের একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রতি দায়বদ্ধ থেকে যদি সংসদ তার ভূমিকা পালন করতে পারে, তবেই নতুন বাংলাদেশের পথচলা সত্যিকার অর্থে শুরু হবে।

কাজী মারুফুল ইসলাম: অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও