আলোকপাত

ফরেনসিক অডিট জবাবদিহির নতুন উপায়

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, সন্দেহ নেই। প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, এমনকি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দিক থেকেও আমরা বহির্বিশ্বে আলোচিত হয়েছি।

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, সন্দেহ নেই। প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, এমনকি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দিক থেকেও আমরা বহির্বিশ্বে আলোচিত হয়েছি। কিন্তু এ উন্নয়নযাত্রার পাশাপাশি আমাদের অর্থনীতির ভেতরে জমে উঠেছে নানা ধরনের দুর্বলতা, যেগুলোকে উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংক খাত, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং বৃহৎ সরকারি প্রকল্পগুলোয় অনিয়ম ও দুর্নীতির যে অভিযোগ প্রায় নিয়মিত শোনা যায়, তা আমাদের অর্থনীতির টেকসই গতিপথকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্রচলিত নিরীক্ষা বা অডিট ব্যবস্থা এ অনিয়মের কেবল ওপরের স্তরটুকু উন্মোচন করতে পারে, কিন্তু জটিল আর্থিক প্রতারণা, সুপরিকল্পিত দুর্নীতি বা তথ্য গোপনের কৌশলকে ধরতে ব্যর্থ হয়। এখানেই ফরেনসিক অডিটের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে।

ফরেনসিক অডিট আসলে কেবল সংখ্যা মিলিয়ে দেখা নয়। এটি এক ধরনের অনুসন্ধান, যেখানে লক্ষ্য থাকে কেবল ব্যালান্স শিটের সঠিকতা যাচাই নয়, বরং লেনদেনের ভেতরে লুকানো প্রতারণা, দুর্নীতি, জালিয়াতি কিংবা অপব্যবহার চিহ্নিত করা। প্রচলিত অডিট অনেকটা নিয়মমাফিক কার্যক্রমের মতো, যেখানে দেখা হয় কোনো প্রতিষ্ঠান আইন ও মানদণ্ড মেনে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করেছে কিনা। কিন্তু ফরেনসিক অডিট অনেক গভীরে গিয়ে প্রশ্ন তোলে, কেন একটি সংখ্যা এমনভাবে উপস্থাপিত হলো, কার স্বার্থে তথ্য লুকানো হলো কিংবা কারা এ আর্থিক অনিয়ম থেকে সুবিধাভোগী হলো। এ কারণে অনেকে ফরেনসিক অডিটকে আর্থিক গোয়েন্দাগিরির সঙ্গে তুলনা করেন।

এটি বোঝাতে একটি সহজ উদাহরণ নেয়া যায়। ধরুন একটি ব্যাংক হঠাৎ করে আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ মুনাফা দেখাল। প্রচলিত অডিট হয়তো বলবে, কাগজে-কলমে সব ঠিক আছে, হিসাব মেলানো হয়েছে নিয়ম অনুযায়ী। কিন্তু ফরেনসিক অডিট এখানেই থেমে থাকবে না। এটি খুঁজবে কেন হঠাৎ এত মুনাফা বেড়ে গেল, কোন উৎস থেকে টাকা এল, ঋণ বিতরণ বা আদায়ে কোনো অস্বাভাবিক প্রবণতা আছে কিনা। হয়তো বের হয়ে আসবে, ভুয়া ঋণ দেখিয়ে টাকা বাইরে পাচার করা হয়েছে অথবা মুনাফার সংখ্যা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে শেয়ারহোল্ডার কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বিভ্রান্ত করার জন্য।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দুই দশক ধরে অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির কারণে আস্থার সংকটে রয়েছে। হলমার্ক গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ কিংবা অনুরূপ অনেক ঋণ কেলেঙ্কারি প্রমাণ করেছে প্রচলিত অডিট প্রক্রিয়ায় প্রকৃত অপরাধী ধরা পড়ে না, বরং তারা আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এখানে ফরেনসিক অডিট একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। এটি কেবল দুর্নীতির প্রমাণ বের করবে না, বরং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও করপোরেট গভর্ন্যান্সকেও শক্তিশালী করবে।

সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ব্যাংক খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৯৪ শতাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, প্রতিটি ব্যাংকে আলাদা ফরেনসিক অডিট টিম থাকা জরুরি। এ ধরনের টিম থাকলে যেমন নিয়মিত কার্যক্রমের ভেতরে প্রতারণার সুযোগ কমে আসবে, তেমনি অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতিতেও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে গ্রাহক ও আমানতকারীদের আস্থা ফিরে আসবে, যা বর্তমানে ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু হয়ে উঠছে।

শুধু ব্যাংক খাতেই নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রকল্পেও ফরেনসিক অডিট অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, কমিশন বাণিজ্য কিংবা অযৌক্তিকভাবে বেসরকারি খাতে মুনাফা স্থানান্তরের যে অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো প্রচলিত অডিটে ধরা পড়ে না। অথচ ফরেনসিক অডিট করলে বোঝা যেত, কীভাবে প্রকল্পের বাজেট ক্রমে ফুলেফেঁপে উঠছে, কোথায় অর্থের অপচয় হচ্ছে, আর কোন প্রক্রিয়ায় সরকারি অর্থ বেসরকারি স্বার্থে স্থানান্তর হচ্ছে। একইভাবে যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে অনেক প্রকল্পে অস্বাভাবিক বাজেট বৃদ্ধি, অযৌক্তিক বিলম্ব বা মানহীন কাজের উদাহরণ পাওয়া যায়, যেগুলো দুর্নীতি ও অদক্ষতার সরাসরি প্রমাণ বহন করে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থা আরো করুণ। একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটলেও আজ পর্যন্ত তার প্রকৃত অংক নিরূপণ বা অর্থ ফেরত আনার কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ দেখা যায়নি। বেশির ভাগ সময় দায় চাপানো হয় পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিংবা চেয়ারম্যান পরিবর্তনের মাধ্যমে। কিন্তু এতে সমস্যার মূলে হাত দেয়া হয় না। অথচ প্রতিটি বড় কেলেঙ্কারির পুঙ্খানুপুঙ্খ ফরেনসিক অডিট হলে আসল অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হতো এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তিও অনেকাংশে কমে যেত। আরো যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে তাহলো সব অপরাধের পেছনে ব্যক্তি দায়ী না-ও হতে পারে। ফরেনসিক অডিটের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটি কেবল অতীতের অনিয়ম খুঁজে বের করে না, বরং ভবিষ্যতের জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও নির্দেশ করে। কারণ এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায় একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কতটা দুর্বল, কোথায় স্বচ্ছতার অভাব, কোন প্রক্রিয়ায় প্রতারণার ঝুঁকি রয়েছে। সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হলে ফরেনসিক অডিট একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে।

এখানে মনে রাখতে হবে, ফরেনসিক অডিট কেবল হিসাববিজ্ঞানের ওপর নির্ভর করে না। এতে প্রয়োজন হয় মনোবিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, এমনকি অপরাধতত্ত্বের জ্ঞান। কারণ প্রতারণা সবসময় সংখ্যার ভেতরে লুকিয়ে থাকে না; অনেক সময় তা মানুষের আচরণ, প্রবণতা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভেতরেও লুকানো থাকে। দায়ী হতে পারে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা কিংবা পরিচালনা পদ্ধতিও। তাই একজন ফরেনসিক অডিটরকে একই সঙ্গে বিশ্লেষক, গবেষক ও গোয়েন্দার মতো কাজ করতে হয়। এ বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে প্রচলিত অডিটরের চেয়ে আলাদা করে তোলে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফরেনসিক অডিট আর বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য একটি হাতিয়ার। ব্যাংক খাত, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত কিংবা অবকাঠামো প্রকল্প, যেখানেই দুর্নীতির ঝুঁকি বেশি, সেখানেই নিয়মিত ফরেনসিক অডিট চালু করা জরুরি। শুধু ভবিষ্যতের প্রকল্প নয়, অতীতের বড় কেলেঙ্কারিগুলোও ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা উচিত। এতে যেমন প্রকৃত অপরাধীরা চিহ্নিত হবে, তেমনি জনগণের করের টাকায় গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থাও ফিরে আসবে।

ফরেনসিক অডিটকে অনেকে ভয়ের চোখে দেখেন, মনে করেন এটি হয়তো কঠোর শাস্তির হাতিয়ার। বাস্তবে এটি একটি নীরব অনুসন্ধান, যা প্রতিষ্ঠানের আসল চেহারা সামনে নিয়ে আসে। এতে বোঝা যায় কোথায় দায়িত্বে গাফিলতি হয়েছে, কোথায় প্রতারণার জাল বোনা হয়েছে, আর কোথায় দুর্নীতির চক্র সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। বাংলাদেশ যদি সত্যিই টেকসই অর্থনীতি গড়তে চায়, আইনের শাসনকে শক্তিশালী করতে চায় এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে ফরেনসিক অডিটকে মূলধারার একটি হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। স্বচ্ছতা ছাড়া কোনো উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না, আর আস্থাহীনতায় ভরা অর্থনীতি কখনই বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে পারে না। তাই এখনই সময়, আমরা যদি সত্যিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অর্থনীতি উপহার দিতে চাই, তবে ফরেনসিক অডিটকে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফাইন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান

আরও