মূল্যস্ফীতি বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি বহুল আলোচিত শব্দ। সাধারণত খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টিই মূল্যস্ফীতির আলোচনায় মুখ্য হয়ে ওঠে, কারণ এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। কিন্তু এ প্রসঙ্গে যে বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায় তা হলো স্থাবর সম্পদের মূল্যস্ফীতি অর্থাৎ জমি, ফ্ল্যাট কিংবা ভবন ইত্যাদির দাম অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যাওয়া। জমি, ফ্ল্যাট কিংবা অন্যান্য স্থাবর সম্পদের দাম অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে রয়েছে বৈষম্য, দুর্নীতি ও দুর্বল নীতিকাঠামো। এ প্রবণতা শুধু অর্থনৈতিক ভারসাম্যই নষ্ট করছে না, এটি সমাজে নৈতিক ও সামাজিক সংকটও তৈরি করছে।
বাংলাদেশে বহু মানুষ সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে একটি জমি বা ফ্ল্যাট কেনাকে অন্যতম অর্জন হিসেবে মনে করে। কিন্তু ধনীদের একটি ক্ষুদ্র অংশ যখন বৈধ-অবৈধ যেকোনো উপায়ে অগাধ অর্থ সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে, তখন তারা জমি ও ফ্ল্যাটের বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে। ফলে সাধারণ মানুষ তাদের সঞ্চয় দিয়েও বাসস্থান কেনার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষ দেশের মোট আয়ের ৪১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, আর সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ আয় করে মাত্র ১.৩১ শতাংশ। ২০২২-এর জরিপ অনুযায়ী বৈষম্যের নির্দেশক গিনি সহগ ০.৪৯৯, যা এক ধাপ বাড়লেই বাংলাদেশ ‘উচ্চ বৈষম্যপূর্ণ দেশ’-এর তালিকায় পড়বে।
বাংলাদেশের ভূখণ্ডের একটি বড় অংশ বনভূমি, নদী, সড়ক, খেলার মাঠ বা বিভিন্ন স্থাপনার আওতায় পড়ে, ফলে প্রকৃত বসবাসযোগ্য জমির পরিমাণ খুবই সীমিত। এই সীমিত জমি যখন কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের জন্য জমি বা ফ্ল্যাট কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। আবার ‘জমিতে লোকসান নেই’ এ প্রচলিত ধারণা জমিকে সবচেয়ে নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ফলে অল্প কিছু লোকের হাতে জমির একচেটিয়া মালিকানা জমি বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। এতে দাম বাড়ছে অতিরঞ্জিত হারে এবং স্থাবর সম্পদের মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হচ্ছে। অতিধনী শ্রেণীর অল্প কিছু মানুষের সম্পদপ্রীতির কারণে কোনো কোনো জমির মূল্য দুই-তিন বছরের মধ্যে দ্বিগুণ হয়েছে, যা অকল্পনীয় ও অনভিপ্রেত। সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের মাধ্যমে তারা সম্পদ গড়ছেন, আবার এসব সম্পদের মূল্য অনুযায়ী যথাযথ রাজস্ব প্রদানের ক্ষেত্রেও তারা সরকারকে ফাঁকি দিচ্ছেন বা উপযুক্ত বিধিবিধানের অভাবে সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বর্তমানে ‘ভূমি সংস্কার আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী একজন ব্যক্তি বা পরিবারের জন্য কৃষিজমি অর্জনের সীমা নির্ধারিত থাকলেও আবাসিক ফ্ল্যাট বা অকৃষি জমির ক্ষেত্রে এমন কোনো সীমা বা বিধিনিষেধ নেই। এতে অবৈধ উপায়ে উপার্জিত অর্থ দ্বারা কেউ কেউ অনিয়ন্ত্রিতভাবে শত শত ফ্ল্যাট বা জমি কিনে এ বাজারে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য নষ্ট করছেন, যা বাজারে মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে যাদের প্রকৃত বাসস্থান দরকার, তারা জমি ও ফ্ল্যাটের চরম মূল্যস্ফীতির কারণে তা কেনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অর্থাৎ এক শ্রেণীর মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই পাচ্ছে না, আরেক শ্রেণীর মানুষ দৃষ্টিসীমার অধিক জমি বা সম্পদের মালিক হয়ে গেছেন। এভাবেই স্থাবর সম্পদের মূল্যস্ফীতির মূল চালক হয়ে উঠেছে ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য এবং অবৈধ অর্থপ্রবাহ, যা সামাজিক বৈষম্যকে আরো গভীর করে তুলছে।
স্থাবর সম্পদের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের বিনিয়োগ বা সহজে প্লেসমেন্ট করার সুবিধা। দলিল নিবন্ধনের সময় সরকার নির্ধারিত ‘মৌজা মূল্য’ অনুযায়ী নিবন্ধন হয়, যা প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে চার-পাঁচ গুণ, ক্ষেত্রবিশেষে আরো কম। ফলে সরকার বিপুল রাজস্ব হারায়, আর দুর্নীতিবাজরা সহজেই ‘কালো টাকা’ বিনিয়োগ করে তা বৈধ করার পথ খুঁজে পায়। এ প্রক্রিয়া দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে এবং সম্পদের একচেটিয়ানের সুযোগ সৃষ্টি করে।
২০১৫ সালে নির্ধারিত ভূমি উন্নয়ন কর আজও অপরিবর্তিত রয়েছে, যদিও জমির মূল্য কয়েক গুণ বেড়েছে। এতে স্বল্প কর দিয়ে কোটি কোটি টাকার জমি অনুৎপাদনশীল অবস্থায় ফেলে রাখা হচ্ছে, যা সরবরাহ সংকট সৃষ্টি করে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তোলে। এটি ধনী-গরিব বৈষম্যকেও প্রকট করে তোলে।
অনেকে ব্যাংক থেকে ব্যবসার জন্য ঋণ নিয়ে তা জমি বা ফ্ল্যাটে বিনিয়োগ করছেন। কারণ জমির মূল্য স্বল্প সময়েই কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যা ব্যবসার ঝুঁকির তুলনায় অনেক বেশি লাভজনক। আবার ঋণের টাকায় ক্রয়কৃত জমি বন্ধক না থাকায় তারা লোকসান দেখিয়ে সুদ মওকুফের সুবিধাও নিচ্ছেন। অনেক সময় অসৎ ব্যাংকারদের যোগসাজশেও এ প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়। এতে একদিকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে, অন্যদিকে অর্থনীতিতে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ কমেছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণ দেশের মোট ঋণের ২০ শতাংশেরও বেশি। এসব খেলাপি গ্রাহকদের প্রায়ই বলতে শোনা যায়, তাদের ব্যবসায়ে লোকসানের কারণে তারা ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। ঢাকাসহ বড় বড় শহর এমনকি গ্রামগঞ্জের ভূমি জরিপে দেখা যাবে, এসব খেলাপি গ্রাহকের নামে-বেনামে হাজার হাজার একর জমি রয়েছে। দেশের বৃহৎ খেলাপির দু-চারজন গ্রাহকের ঋণ এবং দেশ-বিদেশে তাদের সম্পদের নিরপেক্ষ তদন্ত বা ভূমি জরিপ করলে দেখা যাবে নামে-বেনামে গৃহীত ঋণের একটি বৃহৎ অংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জমি বা ফ্ল্যাট ক্রয়ে ব্যবহৃত হয়েছে।
বিদ্যমান বিধিবিধান অনুযায়ী কেউ কোনো সম্পদ অর্জন করলে আয়কর নথিতে সেটির উৎস দেখাতে হয়। ব্যবসার জন্য নেয়া ঋণ দিয়ে কেউ যদি জমি বা ফ্ল্যাট কেনেন এবং ক্রয়কৃত সম্পদ ব্যবসা সম্পসারণের উদ্দেশ্যে ক্রয় দেখিয়ে ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণকে তার উৎস হিসেবে দেখানো হয়, তাহলে সেটি আয়কর আইনে অবৈধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ থাকে না। ফলে স্থাবর সম্পদের বাজার আরো অস্বচ্ছ হয়ে পড়ে এবং দুর্নীতিবাজরা কোনো রকম শাস্তি ও জবাবদিহিতা ছাড়াই ই খাতে অর্থ বিনিয়োগ করতে পারেন।
আবাসিক কাজে ব্যবহারযোগ্য জমিতে বিনিয়োগের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় এবং অল্প কিছু মানুষের হাতে প্রচুর জমি পুঞ্জীভূত হওয়ায় এগুলোর একটি বড় অংশ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে কিছু ব্যক্তি জমি কিনে বাড়ি না করে অধিক মুনাফার আশায় অব্যবহৃত অবস্থায় ফেলে রাখছে। এভাবে আবাসিক খাতে ব্যবহারযোগ্য জমি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় আবাসন সংকটও তীব্র হচ্ছে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় প্রয়োজনীয় ফ্ল্যাটের অভাবে ভাড়া বাড়ির ওপর চাপ বেড়ে গেছে। ফলে অযৌক্তিক হারে বাসা ভাড়া বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছে।
সম্পদ বিভিন্নভাবে অর্জিত হতে পারে, নিজের উপার্জিত অর্থ, উত্তরাধিকার বা দানের মাধ্যমে। যেভাবেই অর্জিত হোক না কেন, আয়কর নথিতে তা উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। নিজের উপার্জনের ক্ষেত্রে এর উৎস ও প্রমাণ দিতে হয়, দানের ক্ষেত্রেও দানকারীর আয়কর নথিতে ওই সম্পদের প্রমাণ থাকতে হয়। কিন্তু উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের জন্য মৃত ব্যক্তির আয়কর নথি যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত স্থাবর সম্পদ পরবর্তী সময়ে উত্তরাধিকারের মাধ্যমে বৈধ সম্পদে পরিণত হচ্ছে। এতে এক প্রজন্মের দুর্নীতি পরবর্তী প্রজন্মে বৈধতা পাচ্ছে। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের জন্য মৃত ব্যক্তির আয়কর নথি যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা না থাকায় অনেকে তার অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ দ্বারা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য জমি-ফ্ল্যাট কিনে রাখছে এবং আয়কর নথিতেও গোপন করছে বা আয়কর রিটার্নই দাখিল করছে না।
শুধু অবৈধ অর্থ নয়, বর্তমানে বৈধভাবে উপার্জিত অর্থও উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে জমি ও ফ্ল্যাটে বিনিয়োগ হচ্ছে। উদ্যোক্তারা ঝুঁকি না নিয়ে স্থাবর সম্পদে অর্থ ঢালছেন, যা কর্মসংস্থান বা নতুন শিল্পের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। এতে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে, প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, স্থাবর সম্পদের মূল্যস্ফীতি আজ একটি মাত্র অর্থনৈতিক ইস্যু নয়, বরং এটি সামাজিক ও নৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। বৈধ-অবৈধ অর্থের অনিয়ন্ত্রিত প্রবাহ, কর ফাঁকি, দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতিগত শৈথিল্য মিলিয়ে স্থাবর সম্পদের বাজারে একধরনের দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে। এটি আয়বৈষম্য বাড়াচ্ছে, অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতগুলোকে পিছিয়ে দিচ্ছে এবং সামাজিক ন্যায়ের পরিপন্থী এক বাস্তবতা সৃষ্টি করছে। সময় এসেছে এ চক্র ভাঙার, নইলে উন্নয়নের চেয়ে বৈষম্যই হয়ে উঠবে আমাদের ভবিষ্যতের নিয়তি।
সুপারিশ: স্থাবর সম্পদের লাগামহীন মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতা, সামাজিক বৈষম্য এবং নৈতিক অধঃপতনের দিকে আমাদের ঠেলে দিচ্ছে। এ সংকট সমাধানে শুধু নীতিগত নির্দেশনা নয়, প্রয়োজন সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ। নিচে কিছু সুপারিশ উপস্থাপন করা হলো, যা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে স্থাবর সম্পদের বাজার নিয়ন্ত্রণ, কর কাঠামোর স্বচ্ছতা, দুর্নীতি রোধ এবং টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিবেশ গঠনে সহায়ক হতে পারে।
ক. ব্যক্তি বা পরিবার যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাট ক্রয় করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা ইত্যাদি পর্যায়ে সম্পদ অর্জন/মালিকানায় রাখার সীমা নির্ধারণ করা জরুরি, বিশেষ করে ঢাকা শহরে;
খ. প্রকৃত বাজারমূল্য অনুযায়ী মৌজা মূল্য নির্ধারণ করতে হবে অথবা প্রকৃত মূল্যেই জমির নিবন্ধন করার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে বাস্তবতার নিরিখে জমির নিবন্ধন খরচ পুনর্নির্ধারণ করা যেতে পারে। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব আদায়ে সক্ষম হবে, অন্যদিকে নিবন্ধন খরচ কমিয়ে প্রকৃত মূল্য অনুযায়ী লেনদেনের প্রবণতা বাড়বে;
গ. মৃত ব্যক্তির অপ্রদর্শিত সম্পদ বাজেয়াপ্তের বিধান চালু করা প্রয়োজন। কেউ মারা গেলে তার আয়কর বিবরণীতে উল্লেখ না থাকা সম্পদ (অপ্রদর্শিত) বাজেয়াপ্ত করার বিধান চালু করা গেলে দুর্নীতি ও আয়কর ফাঁকি কমবে ও রাজস্ব আয় বাড়বে;
ঘ. দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ যাতে কোনোভাবেই নিরাপদ ও ঝুঁকিবিহীন প্লেসমেন্ট বা বিনিয়োগ হিসেবে স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়ে ব্যবহৃত না হয় সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অবৈধ অর্থের উৎস গোপন রেখে জমি বা ফ্ল্যাট কেনা রোধে আয়কর নথিতে অর্থের উৎসের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এটি দুর্নীতি রোধেও সহায়ক হবে;
ঙ. প্রাথমিকভাবে ঢাকা শহর এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশের জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিকদের বিস্তারিত তথ্যসহ একটি ডেটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, স্থাবর সম্পদের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুষম বণ্টন ও সরকারের রাজস্ব আদায়ে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে;
চ. ব্যক্তি বা পরিবারের মালিকানাধীন জমি বা ফ্ল্যাটের পরিমাণ অনুযায়ী স্তরভিত্তিক কর নির্ধারণ করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের প্রয়াস সীমিত করা যেতে পারে। এছাড়া ব্যক্তি বা পরিবারের ব্যবহারের অতিরিক্ত জমি-ফ্ল্যাটের বিপরীতে প্রাপ্ত ভাড়ার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কর হিসেবে আদায়ের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রয়োজন বা সীমার চেয়ে বেশি স্থাবর সম্পদের মালিকানার জন্য করের যে বোঝা তৈরি হবে সেটি এড়াতে মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনে নিরুৎসাহিত হতে পারে;
ছ. ভূমি সংস্কার আইন, ২০২৩ অনুযায়ী কৃষি জমিরমালিকানায় নির্ধারিত ৬০ বিঘার সীমা অতিক্রম করলে সরকার যেন তা বাজেয়াপ্ত করতে পারে, সেই বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া জনসংখ্যার সাঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই সীমা যৌক্তিকীকরণ প্রয়োজন। এছাড়া ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থারও সংস্কার প্রয়োজন।
জ. ৩-৫ বছর বা তদূর্ধ্ব সময় ধরে অব্যবহৃত থাকা জমির (বিশেষ করে ঢাকা শহরে) ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করলে জমি পতিত না রেখে তা ব্যবহারে মানুষ উৎসাহিত হবে। এতে আবাসন সংকটের সমাধানসহ বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণে থাকবে;
ঝ. ঢাকা শহরসহ পর্যায়ক্রমে সারা দেশের সিটি করপোরেশন ও বড় শহরের এলাকায় সব জমি ও ফ্ল্যাট মালিকদের আয়কর রিটার্ন ও কর প্রদানের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে হবে;
ঞ. ব্যবসার নামে নেয়া ঋণের টাকা জমি বা ফ্ল্যাটে বিনিয়োগ করলে দায়ী ব্যাংকারদের বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তির বিধান চালু করতে হবে;
ট. প্রাথমিকভাবে সরকারি আবাসন প্রকল্পসহ দেশের দুই-তিনটি বেসরকারি হাউজিং প্রকল্প ও ডেভেলপার কোম্পানি এবং পর্যায়ক্রমে সব হাউজিং প্রকল্প ও ডেভেলপার কোম্পানির জমি, প্লট ও ফ্ল্যাটের মালিকদের একটি ডেটাবেজ তৈরি করে যাদের নামে একাধিক জমি, প্লট ও ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়া যাবে সেগুলো ত্বরিত বাজেয়াপ্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে;
ঠ. উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে কর রেয়াত, সহজে ঋণ এবং প্রণোদনার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে হবে, যাতে জমি-ফ্ল্যাটনির্ভর অর্থনীতির বদলে কর্মসংস্থানমুখী প্রবৃদ্ধি গড়ে ওঠে।
স্থাবর সম্পদের মূল্যস্ফীতিকে আর শুধুই একটি অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি এখন একটি বহুমাত্রিক সংকট; যা সমাজে বৈষম্য বাড়াচ্ছে, নৈতিক মূল্যবোধকে দুর্বল করছে এবং অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা হ্রাস করছে। প্রস্তাবিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে কেবল সম্পদের মূল্যস্ফীতিই নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না, বরং একটি সুষম, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলাও সম্ভব হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্রের সাহসী, স্বচ্ছ ও নীতিনিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
মো. নুরুল আলম: ব্যাংকার