ভূমিকম্প

নির্মাণই ঝুঁকি, ভূতত্ত্ব নয়

ঢাকা পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনবহুল নগরী। বিকেন্দ্রীভূত উন্নয়নের অভাব, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, উচ্চ জনঘনত্ব, দুর্বল পরিকল্পনা ও নির্মাণ, অব্যবস্থাপনা ও শাসন ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে ঢাকা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।

ঢাকা পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনবহুল নগরী। বিকেন্দ্রীভূত উন্নয়নের অভাব, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, উচ্চ জনঘনত্ব, দুর্বল পরিকল্পনা ও নির্মাণ, অব্যবস্থাপনা ও শাসন ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে ঢাকা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। গণমাধ্যমে প্রায়ই নাটকীয় ও ভীতিকর শিরোনাম দেখা যায় ‘‌৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প যেকোনো মুহূর্তে ঢাকায় আঘাত করবে।’ ভয়ের খবর ক্লিক আনে, আর ক্লিক আনে আয়—ফলে আতঙ্ক ও ভ্রান্ত তথ্য দ্রুত ছড়ায়। এতে আমরা ভাবি ভূমিকম্প হঠাৎ ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবে ভয়ের বড় অংশটি হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা।

২০১৬ সালের একটি গবেষণায় বাংলাদেশের নিচে একটি ‘‌প্লেট বাউন্ডারি’ লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা দেখিয়ে বিরল মহাভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। তবে অনেক বিশেষজ্ঞই বলেন, এ ধরনের প্লেটের কোনো সর্বসঠিক ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র নেই; বাংলাদেশের টেকটোনিক সাবডাকশন (অধিকাংশ ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের কারণ) না হয়ে মূলত অনুভূমিক স্লিপ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আর ওই গবেষণায় ব্যবহৃত তথ্য একাই ভবিষ্যৎ ভূমিকম্পের মাত্রা বা অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে না।

বাংলাদেশে ভূমিকম্প বিষয়টি বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আওতাধীন, যেখানে ভূতাত্ত্বিক বা ভূকম্পবিদ নেই। অন্যদিকে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর তথ্যসমৃদ্ধ হলেও এ দায়িত্ব তাদের নয়। ফলাফল—গুজব, ইউটিউব বিশেষজ্ঞ, ফেসবুক পোস্ট এবং ভুল তথ্য আফটারশকের চেয়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়া। বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি), বাপেক্স, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিডব্লিউডিবি) ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হাতে প্রয়োজনীয় ডাটা ও কিছু প্রশিক্ষিত ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ থাকলেও এগুলো বিচ্ছিন্ন। সংস্থাগুলো জনসাধারণের সঙ্গে কথা বলার সময় ওনারা থাকেন না। বাস্তবসম্মত মূল্যায়নের জন্য গুজবের পরিবর্তে বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ পেতে হলে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের নিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় টাস্কফোর্স।

কেন ঢাকা ঝুঁকিতে?

দেশের বড় অংশ কোনো প্লেট বাউন্ডারিতে না থাকলেও ভেতর দিয়ে সক্রিয় ফল্ট চলে গেছে এবং দেশে স্থানীয় অগভীর ভূমিকম্প ও দূরবর্তী বড় ভূমিকম্প দুটোর ঝুঁকিই রয়েছে। গত মাসে ঢাকার উত্তর-পূর্বে ২০-৩০ কিলোমিটার দূরে ৫ দশমিক ৪ থেকে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প প্রাণহানি, আহত, আতঙ্ক এবং আশা করি সচেতনতা সৃষ্টি করেছে। দেখিয়েছে যে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও ঘনবসতিপূর্ণ নগরে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

ঢাকার ঝুঁকি প্রধানত কয়েকটি কারণে:

এক. জনঘনত্ব ও ভবনগুলোর অবস্থা: মহানগরের প্রায় ২০ লাখ ভবনের এক-তৃতীয়াংশ ছয়তলা কিংবা ততোধিক উঁচু। রাজউকের হিসেবে দুই-তৃতীয়াংশ ভবন নিয়ম বা কোড মেনে নির্মাণ হয়নি, যা ভূমিকম্পে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায় ৪০ শতাংশ ভবন জরাজীর্ণ; অনেকগুলো বিধিমালা প্রণয়নের আগেই নির্মিত। মধুপুরে ৬ দশমিক ৯ বা ডাউকিতে ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকায় ৫০ হাজার থেকে এক লাখ ভবন ধসে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক কম্পনের পর অনেক ভবনে নকশা বা নির্মাণে ত্রুটি পাওয়া গেছে এবং ব্যাপক পরিদর্শন ও সংস্কারের দাবি উঠেছে।

দুই. ভূতত্ত্ব ও সাইট প্রভাব: ঢাকার বড় অংশ নরম, জলপ্লাবিত, পাললিক ও ভরাট মাটির ওপর বেড়েছে। নরম মাটি ভূকম্পন প্রবলভাবে বাড়িয়ে দেয় এবং বহু ভরাট অঞ্চলে তরলীকরণ ও অসমভাবে বসে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, যা কাঠামোগতভাবে ভালো ভবনকেও কাত বা ধসিয়ে ফেলতে পারে। ঢাকার বহু ভরাট এলাকায় তরলীকরণের সম্ভাবনার প্রমাণ আছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নামছে, যা এমনিতেই ভবনকে নাজুক করে তুলছে।

তিন. জরুরি সেবার দুর্বলতা: রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ এসবের অনেকাংশই ভূমিকম্প সহনশীল নয়; এগুলো নষ্ট হলে উদ্ধার কার্যক্রম জটিল হয়ে পড়বে। ভবন ধসলে উপরিভাগ ও ভূগর্ভস্থ লাইন (গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি) ছিন্ন হয়ে প্রাণহানি বাড়াতে পারে। অগোছালো নগর পরিবেশ (ঘিঞ্জি রাস্তা, ভুল বা অননুমদিত ভূমি ব্যবহার, খোলা জায়গার অভাব) উদ্ধারকাজকে বিপর্যস্ত করবে।

ভূমিকম্প থেকে শিক্ষা

সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে মৃত্যু, আহত, ভবন হেলে পড়া, অগ্নিকাণ্ড ও ব্যাপক টালমাটাল পরিস্থিতি দেখা গেছে। বেশির ভাগ মৃত্যু উচ্চ অবকাঠামো ধসে নয়—বরং ভবনের বিভিন্ন অংশ খুলে পড়া ও হুলস্থূলিতে হয়েছে, যা দুর্বল নন-স্ট্রাকচারাল উপাদান ও অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনারই ফল। স্পেকট্রাম গার্মেন্টস (২০০৫) এবং রানা প্লাজা (২০১৩) ধস আমাদের উদ্ধার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা দেখিয়েছে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্প একটি সতর্কবার্তা। ঢাকার নিচে অগভীর বা সক্রিয় ফল্টে ৬-৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ব্যাপক বিপর্যয় হবে। মডেলিংয়ে দেখা যায় লক্ষাধিক কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন। ত্রুটিপূর্ণ রডের ব্যবহার, দুর্বল কলাম, নিম্নমানের কংক্রিট, অপর্যাপ্ত রেইনফোর্সমেন্ট, সফট-স্টোরি, অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণ, নন-স্ট্রাকচারাল প্যারাপেট এসবই প্রধান ঝুঁকি। নরম মাটিও উদ্বেগের একটি কারণ।

কর্তৃপক্ষের করণীয়

রÅvপিড ভিজুয়াল স্ক্রিনিং ও অগ্রাধিকারভিত্তিক পরিদর্শন: প্রশিক্ষিত প্রকৌশলী বা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ভবন লাল/কমলা/সবুজ শ্রেণীতে ভাগ করা; বিপজ্জনক ভবন খালি বা সংস্কার করে শক্তিশালী করা; হাসপাতাল, স্কুল, ভবন, পুরনো ইটের গাঁথুনি ও নরম মাটিস্থ ভবনগুলোকে অগ্রাধিকার।

কোড হালনাগাদ ও কঠোর প্রয়োগ: মাঠ পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের সহযোগিতায়, সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের উপাত্ত ব্যবহার করে কোড হালনাগাদ করা। তা মেনে অনুমোদন, ডিজাইন রিভিউ ও নির্মাণ তদারকি নিশ্চিত করা; পরিদর্শকের সংখ্যা ও দায়িত্ববোধ বাড়ান, দরকার হলে বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে নিয়োজিত করা। যেখানে কোডে উল্লেখ নেই, সেখানে পিডব্লিউডি/জাইকার রেট্রোফিট নির্দেশিকা গ্রহণ।

ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রেট্রোফিটিং: সরকারি হাসপাতাল, স্কুলকে অগ্রাধিকার; ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবন সংস্কারে প্রণোদনা (ভর্তুকি, ঋণ, করছাড়); স্থানীয়ভাবে উপযোগী কৌশলের (জ্যাকেটিং, শিয়ার ওয়াল, টাই স্ট্রেংদেনিং) ব্যবহার। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, মসজিদ ইত্যাদি উচ্চমাত্রার কম্পন প্রতিরোধক হিসেবে তৈরি করে এগুলোকে ভূমিকম্প আশ্রয়স্থল হিসেবে গণ্য করতে হবে।

ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্বাসন: অর্থনৈতিক/প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ; ভরাট বা তরলীকরণ-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উঁচু ঘন নির্মাণ নিরুৎসাহিত; জরুরি সড়ক, খোলা জায়গা, পুনর্বাসন পরিকল্পনায় সামাজিক সুরক্ষা।

নগর পরিকল্পনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং বিল্ডিং কোড মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা; পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান, দুর্ঘটনা থেকে বহির্গমন পথ সুগম রাখা ও জরুরি অবস্থা মোকাবেলায় ওয়ার্ডভিত্তিক দল গঠন করা। জল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ চলমান ও রাস্তাঘাটকেও সচল রাখা; গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ সংযোগ কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং নিরাপদ করা; ভূমিকম্পের সংস্কারের মাধ্যমে উপযুক্ত স্থানে হাসপাতাল এবং জরুরি পরিষেবা নির্মাণ করা; ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা এবং ভূগর্ভস্থ জল সংরক্ষণ করা ইত্যাদি।

বৈজ্ঞানিক ও কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বৃদ্ধি: একীভূত টাস্কফোর্স গঠন, উপাত্তসমূহ সমন্বয়, ভূবিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান, কোড প্রয়োগ, গবেষণাগার ও ভবিষ্যৎ সক্ষমতা বৃদ্ধি। সঠিক তথ্য থাকলে জনগণও দায়িত্বশীল ব্যবহারে অনুপ্রাণিত হবে। ভবনের নকশা ও নির্মাণ অনুমোদনের দায়িত্ব রাজউকের হাতে রেখে তদানুযায়ী ভবন নির্মাণ হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করবে বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি। তাতে কাজের চাপ ও নিশ্চয়তা বাড়বে।

প্রকৌশলী ও ডেভেলপারদের করণীয়

রেট্রোফিটিং: বিদ্যমান ভবন পুনঃনিরীক্ষা (ডেভেলপাররা উদ্যোগ নিতে পারে); জ্যাকেটিং, শিয়ার ওয়াল, ভিত্তি গ্রাউটিং, বেজ আইসোলেশন (প্রয়োজনে), দুর্বল ভরাট মাটি উন্নয়ন।

মানসম্পন্ন উপকরণ ও তদারকি: ম্যাটেরিয়াল টেস্টিং বাধ্যতামূলক; তৃতীয় পক্ষ দ্বারা পরিদর্শন; প্রশিক্ষণ দিয়ে রাজমিস্ত্রি ও প্রকৌশলীর দায়িত্ববোধ, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি।

নন-স্ট্রাকচারাল সুরক্ষা: প্যারাপেট, পানির হিটার, বৈদ্যুতিক প্যানেল, আলমারি সবকিছু মজবুতভাবে বসানো; সিঁড়ি সুরক্ষিত রাখা; বিশেষ করে হাসপাতাল, স্কুল ও কারখানায় যন্ত্রপাতি ভালোভাবে আটকে রেখে দুর্ঘটনা এড়ানো এবং বের হয়ে যাওয়ার পথ কণ্টকমুক্ত রাখা।

সাইট প্রতিকার: দুর্বল ভরাট মাটি যথাসম্ভব অপসারণ বা উন্নয়ন; অনুপযুক্ত ভরাট জমিতে ভারী ভবন এড়ানো; সঠিক পাইলিং।

জবাবদিহিতা: ভবনের মালিক, নকশাকারী ও নির্মাণ তদারককারীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে; বিধিবিধান মানার অনীহা বা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রাপ্য শাস্তির প্রয়োগ করতে হবে।

নতুন প্রযুক্তি: ভূমিকম্পের কারণে ভবনের যাতে প্রাণঘাতী ক্ষতি না হয় বিশেষজ্ঞরা সে চেষ্টা করেন। তারা বেজ আইসোলেশন, সিসমিক ডেম্পার, রাবার বিয়ারিং ইত্যাদির কথা বলছেন।

প্রাণহানি কমাবেন কীভাবে

জনসচেতনতা ও মহড়া: গবেষণায় দেখা গেছে সচেতনতা অসম; ব্যাপক জনপ্রচারণা আতঙ্ক কমাতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কারখানা, হাসপাতাল ও কারাগারগুলোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ এবং বহুল অধ্যুষিত স্থাপনাগুলোয় নিয়মিত শহরব্যাপী ভূমিকম্প মহড়া; ড্রপ-কভার-হোল্ড এবং নিরাপদ স্থানান্তর সম্পর্কে সহজ বার্তা; বাড়িওয়ালাদের জন্য সহজ নির্দেশিকা বিতরণ।

ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার বিষয়টি কেবল পেশাজীবীদের ওপর ছেড়ে না দিয়ে সাধারণ মানুষকেও যথাযথ তথ্য ও প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত রাখতে হবে। ভূমিকম্পের সময় ভবন থেকে দ্রুত নির্গম পথ এবং ভবনের বাইরে নিরাপদ অবস্থান স্থলের ব্যাপারে সীমিত চলৎশক্তির লোকদের কথাও আগে থেকেই ভবনবাসীদের জানা ও মহড়া থাকবে। তারা নিজ উদ্যোগেই নিরাপত্তামূলক নির্দেশনা পালন নিশ্চিত করবেন। বাংলাদেশে প্রায়ই জরুরি নির্গম পথ বন্ধ বা অননুমোদিত ব্যবহারে থাকে; দরজা খুলে দেয়ার মতো লোকও পাওয়া যায় না। ভূমিকম্পের সময় ভবনে আগুন ধরে যাওয়ারও সম্ভাবনা মনে রেখে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী/পরিদর্শক থাকলেও তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন না; এ রকম দায়িত্বে ভবনবাসীদের প্রতিনিধিও থাকতে পারে।

আগাম সতর্কতা: এসএমএস, রেডিও, সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত সতর্কতা; আফটারশক পরামর্শ। এমনকি মৌলিক সতর্কতাগুলোও মানুষকে দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামো থেকে দূরে সরে যেতে সাহায্য করে।

জরুরি সাড়া সক্ষমতা: উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোয় অনুসন্ধান ও উদ্ধার দল, অ্যাম্বুলেন্স এবং চিকিৎসা সরঞ্জামাদি আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা; স্বেচ্ছাসেবক ও অনুসন্ধান দলগুলোকে প্রশিক্ষণ দেয়া; হাসপাতালগুলোয় ভূমিকম্পের সম্ভাব্য পরিকল্পনা (বিদ্যুৎ, জল, ট্রাইএজ) নিশ্চিত করা।

ব্যবসা ও শিল্পের ধারাবাহিকতা: ভূমিকম্প থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা, কাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাইকরণ এবং কারখানা ও কারখানায় কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।

প্রস্তুতির অর্থায়ন

সরকারি অর্থায়ন: বাজেটে সরকারি ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর রেট্রোফিটে অগ্রাধিকার ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা।

বেসরকারি রেট্রোফিটে সহায়তা: কম সুদের ঋণ, করছাড়, কারিগরি মূল্যায়নে ভর্তুকি, নিয়ম মেনে চলাচলকারীদের দ্রুত অনুমোদন।

বীমা প্রণোদনা: যাচাইকৃত সংস্কার এবং সুরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রিমিয়াম রেয়াতসহ ভবন ও ব্যবসায়িক বীমাকে উৎসাহিত করুন।

আন্তর্জাতিক সহায়তা: জাইকা, বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপির সহায়তায় দক্ষতা ও অর্থায়ন। নগর সংস্কার ও ঝুঁকি অর্থায়নে অভিজ্ঞ সংস্থাগুলোর (যেমন জাইকা, বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি) সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে জ্ঞান হস্তান্তর এবং পাইলট প্রকল্পগুলোয় সহ-অর্থায়ন করা।

ত্রিভুজ অগ্রাধিকার

অগ্রাধিকার ক (তাৎক্ষণিক): তাৎক্ষণিক খালি বা শোরিং (হাসপাতাল, বহুল অধ্যুষিত স্থাপনা, বাজার, পরিবহন কেন্দ্র, কাত হওয়া বা ফাটলযুক্ত ভবন)

অগ্রাধিকার খ (স্বল্পমেয়াদি, ৬-১২ মাস): রেট্রোফিট বা সাময়িক শক্তিবৃদ্ধি (উঁচু আবাসিক ভবন, কারখানা, পুরনো গাঁথুনি)

অগ্রাধিকার গ (মধ্যমেয়াদি): প্রয়োজনীয় আপগ্রেড (একতলা ঘর, দুর্বল ডিটেইলিংযুক্ত ভবন, পরিষেবা)

মনিটরিং, ডাটা ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা

আরো ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক (স্টেশন, রিয়েল টাইম পাবলিক ফিড); ইউএসজিএস ও জাতীয় নেটওয়ার্কগুলো প্রতিক্রিয়া এবং বিল্ডিং কোডের প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ

পুরো শহরের ভূপ্রযুক্তি মানচিত্র (তরলীকরণ, মাটির গতি, ভরাট জমির অবস্থান)

ভবন তালিকা (বয়স, নির্মাণপ্রণালি, উচ্চতা, অনুবর্তিতা)

জীবনরক্ষাকারী সহজ পদক্ষেপ

‘‌ড্রপ–কভার–হোল্ড’ অভ্যাস করা

ঘরে নিরাপদ জায়গা চিহ্নিত করা (মজবুত টেবিলের নিচে, জানালা এবং ভারী তাক থেকে দূরে)

বুকশেলফ ও ভারী জিনিস আটকে রাখা, ওপর থেকে ভারী জিনিস সরিয়ে রাখা

বাসা/কর্মস্থল থেকে দুটি নিরাপদ বেরোনোর পথ, আর পরিবার কোথায় একত্রিত হবে তা জেনে রাখা

জরুরি কিট প্রস্তুত রাখা (পানি, ফার্স্ট-এইড, টর্চ, বাঁশি, পরিচয়পত্র)

পুরনো ভবনে পেশাদার পরিদর্শন; ঝুঁকিপূর্ণ হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া

সতর্কতাকে প্রতিরোধে রূপান্তর

২০২৫ সালের ঘটনা দেখিয়েছে যে ভূকম্পনের ঝুঁকি আর অবজ্ঞা করা যাবে না। ভূস্তরের গভীর তলদেশে মাটির কোথায় কী অবস্থা তা নির্ভুলভাবে জানা বা গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তবে ভবন নির্মাণে প্রযুক্তি জ্ঞানের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ভূমিকম্পে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি প্রশমিত করা যায়। দুর্বল প্রয়োগ, অনিরাপদ ভবন, অপ্রস্তুতি ও দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রচারণা বন্ধ করে আমরা ঝুঁকি কমাতে পারি। প্রকৌশলভিত্তিক সমাধান, নগর পরিকল্পনা, কোড প্রয়োগ, জনসচেতনতা ও আর্থিক সহায়তা সব মিলিয়ে হতাহতের ঘটনা এবং ভৌত ও অর্থনৈতিক ক্ষতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। প্রযুক্তিগত জ্ঞান কিন্তু বিদ্যমান; সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঢাকাকে নিরাপদ করা যেতে পারে। এখন যা প্রয়োজন তা হলো রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি, কর্মসূচিগত অগ্রাধিকার ও টেকসই বিনিয়োগ।

আমাদের দেশে অনেক শিক্ষিত মানুষও অভিজ্ঞ রাজমিস্ত্রি আর প্রকৌশলীতে তফাত খুঁজে পান না বা আর্কিটেক্ট আর প্রকৌশলীর কাজের পার্থক্য বোঝেন না। তাদের নিয়োগকে অযথা বাড়তি খরচ মনে করেন তারা। মালিকরা ভবনের চারপাশে নিয়মানুযায়ী ছেড়ে না রেখে অবৈধ দখল করে ফেলেন; কদাচিৎ ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে বানান আটতলা। এহেন নৈরাজ্যকর ও হতাশাব্যঞ্জক পরিবেশে সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সচেতনতা বাড়ানো আবশ্যিক।

তবে হাসির ব্যাপার হলো, যে সর্বনাশের গল্প প্রচার করা হচ্ছে, বাস্তব ঝুঁকি তা নয়। আসল হুমকি হলো একটি মাঝারি শক্তির ভূমিকম্প, যা যথেষ্ট সময় ধরে শহরকে কাঁপাবে। এটি বিপজ্জনক হবে ভূতত্ত্বের কারণে নয়, বরং ভবনগুলোর কারণে। দশকের পর দশক ধরে বহু ভবন নির্মাণ হয়েছে মাটি পরীক্ষা ছাড়া, কোড লঙ্ঘন করে, নিম্নমানের উপকরণে এবং জলসিক্ত তরলীকরণ প্রবণ নরম বা ভরাট জমিতে। ভূমিকম্প ঠেকানো যায় না। কিন্তু আতঙ্ক ঠেকানো যায়। বিজ্ঞানকে গুরুত্ব দিলে এবং প্রস্তুতিকে ভয়ের ওপরে স্থান দিলে জীবনও বাঁচবে, জনসাধারণের আস্থাও বজায় থাকবে।

ড. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান: স্থপতি ও নগরবিশারদ

আরও