ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশে মোট ভোটারের সংখ্যা পৌনে ১৩ কোটি। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই তরুণ। দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে তারাই মূল নির্ণায়ক। এ তরুণ ভোটারদের ওপর নির্ভর করছে আগামীর সরকার। ছোটবেলা থেকে তার শুনে এসেছে ভোট গণতান্ত্রিক অধিকার। পত্রপত্রিকা বা টেলিভিশনের সংবাদে নির্বাচনের বিশেষণ হিসেবে শুনেছে, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ’ শব্দগুলো। অথচ সে অধিকার প্রয়োগ করার প্রশ্নে দেখেছে ভিন্ন চিত্র।
আমি সেই এক-তৃতীয়াংশ ভোটারের একজন। আমার শৈশবের সবচেয়ে উজ্জ্বল রাজনৈতিক স্মৃতি ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে বেড়া ওঠা আমার স্মৃতিতে নির্বাচনের একটা আবছায়া আছে। ভোট, সরকার, গণতন্ত্র—এসবের কিছু না বুঝলেও উৎসবের আমেজ ঠিকই টের পেতাম।
রাস্তাঘাট, বাড়ির দেয়াল ভরে যেত রঙিন পোস্টারে। নির্বাচনের আগের কয়েকদিন এলাকা থাকত সরগরম। প্রার্থীদের সঙ্গে নিয়ে জনসংযোগে আসতেন বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা। বাড়িতে মেহমান এলে যেমন গমগম শব্দ, পাড়াজুড়েই তেমন ছিল। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামত একটু দেরিতে। তারপর সেই কাঙ্ক্ষিত দিন।
সকাল সকাল গোসল সেরে তুলে রাখা নতুন জামা পরে ভোট দিতে যেতেন বাড়ির বড়রা। ঘরের বউ-ঝিরা যেতেন আরেকটু বেলা হলে। বছরে একবার বাপের বাড়ি ছাড়া যাদের বেড়াতে যাওয়ার জায়গা নেই কিংবা অবসর মেলে না। ভোটের দিন তাদের জন্য আক্ষরিক অর্থেই ঈদের আনন্দ নিয়ে আসত। নতুন শাড়ি পরে, ঘোমটা টেনে দলবেঁধে তারা ভোট কেন্দ্রে যেতেন। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েই বাড়ি ফিরতেন না। কেন্দ্রের অদূরে থাকা খাবার দোকানে বসে নাশতা করতেন। কেউ কেউ বাজারে গিয়ে সেরে নিতেন শখের কেনাকাটা। এবাড়ির নতুন বউ, ওবাড়ির সদ্য জন্মানো শিশুকে দেখে বেলা পড়ে এলে ঘরে ফিরতেন। দিনভর পরিপূর্ণ উৎসবের আমেজ!
সন্ধ্যার পর শুরু হতো ভোট গণনা। শুরু হতো চাঁদরাতের আমেজ। রাতভর ভোটগণনা ও ফলাফলের ফাঁকে একমাত্র গণমাধ্যম বিটিভিতে দেখানো হতো বাংলা চলচ্চিত্র। ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিল না তখন। অন্যের বাড়ি গিয়ে রাত জেগে ফলাফল শোনায় ছিল চাপা আনন্দ ও উত্তেজনা।
সময় বদলেছে, মিলিয়ে গেছে সে গণতান্ত্রিক উৎসব। বয়স বেড়েছে, বোঝাপড়া এসেছে। সে সময় যারা শিশু ছিলাম, বয়স ১৮ হওয়ার পর আমাদের ভোটার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমাদের সে সুযোগ দেয়নি। একের পর এক নির্বাচন এল, গেল—কিন্তু ভোট দেয়ার অধিকার কাগজে-কলমেই থেকে গেছে। বরাবরের মতো কেন্দ্র ছিল, কিন্তু উৎসব ছিল না। ছিল ভয়, অনিশ্চয়তা আর অনাগ্রহ। চোখের সামনে নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ সরকারের করায়ত্ত হতে দেখে হতাশ হয়েছি বারবার।
২৬-৩০ বয়সী তরুণরা ভোটার হওয়ার পরের তিনটি নির্বাচনই ছিল বির্তকিত। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপি ও সমমনা দলগুলো বর্জন করে। ফলে ১৫৩ জন এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ভোট পড়ে মাত্র ৪০ দশমিক ৪ শতাংশ।
২০১৮ সালের নির্বাচনে বিরোধী দল অংশ নিলেও ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরার অভিযোগ ওঠে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় ৫০টি আসনের মধ্যে ৩৩টিতেই এমন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। বিরোধী দলগুলো দাবি করে নির্বাচন শুরু হওয়ার আগের রাতেই ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ ভোট দেয়া হয়েছিল। ওই নির্বাচনে ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছিল বলে জানায় নির্বাচন কমিশন।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোট পড়ে ৪১ দশমিক ৮০ শতাংশ। বিরোধী দলগুলো বর্জন করায় আওয়ামী লীগ নিজেদের ‘ডামি প্রার্থী’ দাঁড় করিয়ে প্রতিযোগিতার আবহ তৈরির চেষ্টা করে। এসব নির্বাচনে অনেক তরুণ ভোটার ভোট দিতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো নাগরিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন তরুণরা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’-এর ওপর গণভোট হবে। গণভোটের ফলাফলেও তরুণদের ইচ্ছার বড় প্রভাব ফেলবে।
২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী দেশে মোট ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩। আর চলতি ৫ জানুয়ারি নাগাদ দেশে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৬, যা মোট ভোটারের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ভোটারদের এ বিশাল অংশটিই ফলাফল নির্ধারণের প্রধান ফ্যাক্টর।
তবে নির্বাচনকে ঘিরে শৈশবের সে চাঁদরাতের মতো উৎসবমুখর আমেজ আদৌ ফিরবে কিনা, তা নিয়ে গভীর সংশয় থেকে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দল আওয়ামী লীগ এবারের ব্যালটে না থাকায় সহিংসতার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই প্রত্যাশার জায়গা দখল করে নিচ্ছে আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠা। আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসছে সহিংসতার ঝুঁকি।
এছাড়া কোথায় নির্বাচনে অংশ নেয়া দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হতে পারে, কোন এলাকায় ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে সাহস পাবেন না, কারা কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করবে—এসব নিয়েও চলছে আগাম হিসাবনিকাশ। প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, শেষ মুহূর্তে ভোটারদের নিরুৎসাহিত করা, কিংবা ভোট শেষে নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেমন হবে প্রশ্নগুলো এখন নির্বাচন-পূর্ব আলোচনার স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠেছে। মানুষ ব্যালটের আগে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়।
এত সংশয়ের মধ্যে কি আবার ফিরে আসবে শৈশবের সেই চাঁদরাত, নাকি সেটি কেবল স্মৃতির পাতাতে বন্দি হয়ে থাকবে? ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ’ শব্দগুলো কি গালভরাই থেকে যাবে?
শামীমা ইসলাম: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা