নিজেদের নিরাপত্তাবলয়েও আক্রান্ত হচ্ছে পুলিশ

এখনো দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ মব সংস্কৃতি

সরকার দায়িত্ব নেয়ার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নয়ন ঘটেনি। গত মে মাসে পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও পুলিশের প্রতি জনআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে সরকারের অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করেছিলেন।

কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। নিজেদের নিরাপত্তাবলয়েই এখন হামলার শিকার পুলিশ বাহিনী। সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনসে পুলিশ বাহিনী আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংঘবদ্ধভাবে হামলার ঘটনা ঘটেছে। অতীতে পুলিশের বড় অভিযানে হামলার ঘটনা ঘটলেও বর্তমানে আসামি ধরে নেয়া বা ছোটখাটো অভিযানেও প্রকাশ্যে সংঘবদ্ধ হামলা ঘটছে। অনেক সময় সামাজিক, নৈতিক এমনকি ধর্মীয় অনুভূতির নামে হামলা হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দায়ের হওয়া সাত শ্রেণীর মামলার মধ্যে পুলিশের ওপর হামলা তৃতীয় সর্বোচ্চ। ফেব্রুয়ারি-জুলাইয়ে পুলিশের ওপর হামলায় মামলা হয়েছে ৩১৭টি। আগের ছয় মাসে হামলা হয়েছিল ২৭৫টি। এসব তথ্য মূলত দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুকতাকেই তুলে ধরছে। বিশেষ করে এখনো এক্ষেত্রে ‘মব’ সংস্কৃতি যে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে তা বলাই বাহুল্য। যেখানে মবের মতো সংঘবদ্ধ হামলা থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি বড় অংশ রেহাই পাচ্ছে না, সেখানে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে সেই প্রশ্ন থেকে যায়। মব সহিংসতায় শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই আহত হচ্ছেন তা নয়। মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) দাবি, সারা দেশে চোর সন্দেহ, ছিনতাইয়ের অভিযোগ, গুজব কিংবা ভুল-বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলায় প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে ৭৭ শতাংশ মানুষ নানাভাবে আহত হচ্ছে।

জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে; আস্থার সংকট বেড়েছে। তবে এগুলো পুনরুদ্ধারে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশ বাহিনীর নিয়মিত পোশাকের রঙ পরিবর্তন করার পাশাপাশি নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি, বরং তারা দফায় দফায় নানা স্থানে সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের ওপর হামলার দোহাই হিসেবে ধর্মীয় ও নৈতিক অনুভূতির প্রসঙ্গ উঠেছে। বাস্তবে এটি মব সংস্কৃতির আরো উগ্র রূপ। এর পেছনে পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা যেমন দায়ী, সামাজিক পর্যায়ে অস্থিতিশীলতাও সমানভাবে দায়ী। তবে পুলিশ সমাজের সঙ্গে যথাযথ সংযোগ বজায় রাখতে পারছে না বলে সামান্য উদ্যোগেও অসংযত জনপ্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। পুলিশের দৃশ্যমানতা কমে যাচ্ছে ও নিরাপত্তার নিশ্চিয়তা ক্ষীণ হয়ে আসছে। অপরাধীরা এটিকে বড় সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে একের পর এক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এসব অপরাধে শুধু আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়, স্বাভাবিক জনজীবনও বিঘ্নিত হচ্ছে। অন্যদিকে আইনি প্রক্রিয়া ও পুলিশের দ্রুত কাজ করতে না পারার ব্যর্থতা মব সংস্কৃতি বাড়াচ্ছে। এর পেছনে কিছু কাঠামোগত কারণও দায়ী।

গত দেড় দশকে পুলিশ সদস্যের সংখ্যা দ্বিগুণ হলেও জনসংখ্যাবহুল বাংলাদেশে পরিপূর্ণভাবে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। পুলিশের সংখ্যা বাড়লেও আসেনি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ও জবাবদিহি কাঠামো। বিশেষত বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে পুলিশ বাহিনীর বড় একটি অংশ স্বেচ্ছা বা অনিচ্ছায় ক্ষমতাসীনদের ‘পেটোয়া বাহিনী’তে পরিণত হয়। জড়িয়ে পড়ে নানা ধরনের অপরাধে। ফলে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা এখনো কম। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষ সে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। অভ্যুত্থানকালীন এটিকে অনেকেই স্বাভাবিক মনে করলেও অভ্যুত্থান-পরবর্তী স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সংঘবদ্ধ অপরাধ ও হামলা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হওয়াটা আরো উদ্বেগের।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে সামাজিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি অবকাঠামোগত সংকটও সামলাতে হচ্ছে। বণিক বার্তারই এক প্রতিবেদনে জানা যায়, পুলিশ বাহিনীর টহল দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত যানবাহন নেই। যানবাহন সংকটের কারণে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে পুলিশ গুরুতরভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ঘটনাস্থলে সময়মতো হাজির হতে না পারায় অপরাধীরা অবাধে অপরাধ করে পালিয়ে যেতে পারছে। বণিক বার্তারই ভিন্ন এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, আড়াই লাখ পুলিশ সদস্যের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ আবাসন সুবিধা পান। বড় একটি অংশকে আর্থিক চাপের কারণে নির্ধারিত ব্যারাকে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। দীর্ঘ ডিউটির পর যথাযথ বিশ্রাম না পাওয়ায় কর্মক্ষমতা কমছে, বাড়ছে মানসিক চাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। সম্প্রতি পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যাপ্রবণতার সংবাদও সংশ্লিষ্ট মহলের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। কিন্তু এখনো সংকট সমাধানে কাঙ্ক্ষিত উদ্যোগ নেয়া হয়েছে কিনা এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।

মব সহিংসতা সাধারণ মানুষের জন্যও এক বড় উদ্বেগ। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় নির্বাচনের আগে জানুয়ারিতে মব সহিংসতায় মৃত্যু আগের মাসের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছিল। প্রতিবেদনে সংস্থাটি দেশের মব সহিংসতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহভাবে সহিংস ও জটিল’ বলেছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার কথা বললেও ছয় মাস পর পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। জননিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এ প্রেক্ষাপটে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করতে না পারলে আইন প্রয়োগে বাধা দূর করার চ্যালেঞ্জ আরো জটিল রূপ নেবে।

প্রাথমিকভাবে মব সহিংসতা কমানোর জন্য কমিউনিটি পুলিশিং বাড়াতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও পেশাদারত্বের মান বাড়াতে হবে। অবকাঠামো সুবিধা দিতে হবে যাতে নির্বিঘ্নে আইন প্রয়োগ করা যায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে নিয়মিত সংযোগ থাকলে পারস্পরিক সুবোধ বাড়বে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গেও সহযোগিতা বাড়ানো উচিত। এতেও সামাজিক দূরত্ব কমে আসে। মানুষ বুঝতে পারবে পুলিশ সেবার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এছাড়া পুলিশি মামলা প্রক্রিয়া ও নানা ধরনের হয়রানির যে অভিযোগ সেগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য জবাবদিহি বাড়ানোর বিকল্প নেই। একই সঙ্গে যেকোনো মব সহিংসতার দ্রুত অনুসন্ধান ও বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য পুলিশের জবাবদিহি ও তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিদ্যমান জটিলতায় আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে একদিকে সামাজিক পর্যায়ে সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সময়ে জনআস্থা ফেরাতে পুলিশকে সামাজিক পর্যায়ে আরো সক্রিয় হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে।

আরও