অভিমত

পরিবেশ রক্ষায় চাই সমন্বিত উদ্যোগ

পরিবেশে পরিবর্তন আসছে। পরিবেশবাদীরা সজাগ হয়ে উঠছেন। গত কয়েক মাসে পরিবেশের বিরূপ প্রভাব থেকে কিছুটা মুক্তির সুবাতাস পাচ্ছে সারা বিশ্বের মানুষ। যান চলাচল সীমিত থাকার কারণে, শিল্প-কারখানা নিয়ন্ত্রিত রূপে চলার কারণে, সর্বোপরি মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রতিযোগিতায় ঘরবন্দি থাকার কারণে শব্দদূষণ কমেছে, পানিদূষণ কমেছে। জীবাশ্ম জ্বালানি দহন কমায় কার্বন নিঃসরণ কমেছে। পৃথিবীতে সর্বত্র প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তারকে প্রকৃতি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করে নিয়েছে। পৃথিবীর আবহাওয়ায় মানুষের জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা যে

পরিবেশে পরিবর্তন আসছে। পরিবেশবাদীরা সজাগ হয়ে উঠছেন। গত কয়েক মাসে পরিবেশের বিরূপ প্রভাব থেকে কিছুটা মুক্তির সুবাতাস পাচ্ছে সারা বিশ্বের মানুষ। যান চলাচল সীমিত থাকার কারণে, শিল্প-কারখানা নিয়ন্ত্রিত রূপে চলার কারণে, সর্বোপরি মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রতিযোগিতায় ঘরবন্দি থাকার কারণে শব্দদূষণ কমেছে, পানিদূষণ কমেছে। জীবাশ্ম জ্বালানি দহন কমায় কার্বন নিঃসরণ কমেছে। পৃথিবীতে সর্বত্র প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তারকে প্রকৃতি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করে নিয়েছে। পৃথিবীর আবহাওয়ায় মানুষের জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা যে সীমাহীন উষ্ণতায় বদলে যাচ্ছিল, তাতে কিছুটা হলেও ভারসাম্য আসছে। পরিবর্তন বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ সমস্যার বাস্তবতা অনুধাবনে মানুষকে আরো বেশি সচেতন করে তুলতে সহায়ক হবে বলে বিশ্বাস। পরিবেশ আন্দোলন গতি পাবে, আন্দোলনকারীরা শক্তিশালী হবে, বিশ্ববিবেক জাগ্রত হবে। পরিবেশ আন্দোলন সফল করতে বিশ্ববিবেক জাগ্রত হওয়া খুবই প্রয়োজন। পরিবেশ সুরক্ষায় আজ পর্যন্ত যত উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে, সেগুলো কিছু সংখ্যক ক্ষমতাবান মানুষের জন্য পূর্ণতা পায়নি। দশকের পর দশক ধরে আবেদন-নিবেদনের জাঁতাকলে আটকে আছে। নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে কোনো প্রকার কমতি স্বীকার করে পরিবেশ বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণে কেউ রাজি হতে চায় না। অনেকেই আর্থিক সামর্থ্য প্রদর্শন করে কিন্তু কৃত অঙ্গীকারও যথাযথভাবে রাখে না। তার পরও বিশ্বকে বাসযোগ্য রাখতে হবে যেকোনো মূল্যে। মানবজাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।

বিশ্ব পরিবেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয়ও দিনে দিনে মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এমন কোনো ক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেটাকে সমস্যামুক্ত বলার সুযোগ আছে। মানুষের জীবনে প্রগতি যত গতি পেয়েছে, সমস্যা তত গভীর হয়েছে। প্রগতিকে অস্বীকার করার অবস্থায় মানবজাতি আছে বলে মনে হয় না। একসময় বিশ্বে ১০০ কোটি জনসংখ্যা থেকে ১০০ বছর অপেক্ষা করতে হতো আর এখন প্রতি ১০-১২ বছরেই ১০০ কোটি মানুষ বাড়ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই বর্ধিত হারের সঙ্গে সংগতি রেখে মানুষের মৌলিক অধিকার পূরণ শুধু নয়, কিছু মানুষের বিলাসবহুল অভিজাত জীবনযাপনের সামগ্রী জোগানেরও প্রয়োজন পড়ে। সামর্থ্য বিবেচনায় নয়, সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও মানুষ জীবনকে সহজ করার সামগ্রী সংগ্রহে নিবেদিত হয়। একসময় মানুষ গরু পালন করত, এই গরু পরিবহনের মাধ্যম ছিল, চাষে ব্যবহার করত, জমিতে সার ব্যবহারে ভূমিকা রাখত। বাজারে মোটরসাইকেল এলে পরিবহন দ্রুত হলো, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কম সহজ হওয়ায় খুব তাড়াতাড়ি নতুন বাহন গরুর বদলে জায়গা করে নেয়। এতে গরু পালন কমতে থাকে আর চাষে জৈব সারের সরবরাহে ঘাটতি দেখা যায়। ঘাটতি পূরণে রাসায়নিক সারের আমদানি হয়, কীটনাশক ব্যবহার শুরু হয়। এভাবে মানুষ জীবনে গতি পেলেও হারিয়ে ফেলেছে অনেক কিছু। জীবনে গতি আনতে গিয়ে মানুষ ভুলে গেছে প্রকৃতিকে, পরিবেশকে।

প্রকৃতিকে বিরূপ করে তোলার ক্ষেত্রে প্রধানত দায়ী বর্ধিত জনসংখ্যা এবং তাদের নিরন্তর চাহিদা। বিশ্বে মানুষ যে হারে বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জ্যামিতিক হারে চাহিদা বেড়ে চলেছে। মানুষ চোখের সামনে যা যা দেখে, সব তার চাই। ৫০ বছর আগে একজন মানুষ বাজারে গিয়ে যদি ১০০ রকমের সামগ্রী দেখত, তাহলে এখন সে দেখে প্রায় হাজার রকমের সামগ্রী। মানুষ এত সামগ্রী দেখে তা পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে। প্রতিযোগিতার প্রেষণে পরিবেশ দিনে দিনে তার সুদিন হারিয়ে ফেলছে। পরিবেশ ফিটেস্ট হতে পারছে না, তাই সারভাইভ করতে পারছে না। বিপরীতে মানুষ নিজের অন্তহীন চাহিদার কথা মাথায় রেখে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সামগ্রী হাজির করে জীবনকে সহজ করার প্রচেষ্টায় রত। এতে মাটিদূষণ, পানিদূষণ, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ বিপন্ন করে তুলছে পৃথিবীর গতিধারা। পৃথিবীজুড়ে চলছে প্রকৃতির ধ্বংসলীলা। পরিবেশ বিপর্যয়ে মানুষ শঙ্কা নিয়ে বসবাস করছে। মানবসৃষ্ট সমস্যায় মানুষ জড়িয়ে পড়ছে।

প্রতি বছর জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয়। সারা পৃথিবীর মানুষকে সচেতন করতে আরোপিত প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতাকে কেন্দ্র করে গৃহীত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে পরিবেশ বিপর্যয় রোধের জন্য দিবসটি পালিত হয়। আমাদের পৃথিবীকে আমাদেরই বাঁচাতে হবে ধারণায় বর্তমানে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন গতি পাচ্ছে। পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রতিটি সেক্টরে পৃথক পৃথকভাবে আবার সম্মিলিতভাবে কাজ চলছে। দিনে দিনে কাজে গভীরতা আসছে। এখন সারা পৃথিবীর মানুষ জানে পরিবেশ বিপর্যয় কোনো ধারণা নয়, পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব মানে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অবসর সময় কাটানো নয়। পরিবেশবাদীদের সঙ্গে সঙ্গে যেমন সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশবিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে, ঠিক তার পাশাপাশি আন্দোলনে রাষ্ট্রপ্রধান সরকারপ্রধানরা সম্পৃক্ত হচ্ছেন। সবাই যে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে এসেছেন, এমন দাবি করার সময় এখনো আসেনি; বরং পরিবেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী প্রধান প্রধান দেশ এখনো নীরবতা পালন করছে, যা বিশ্ববাসীকে ভাবিত করে। মানুষকে এখনো শঙ্কার মধ্যে বাস করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয় দিনে দিনে মারাত্মক আকার ধারণ করছে। পরিবেশ ধারণা এখন আর ছোট চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। বিশ্বের যেকোনো জায়গায় যেকোনো কারণে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটলে তার দায় পুরো বিশ্ববাসীকে বহন করতে হয়। বিশ্ব পরিবেশ বিপর্যয়ে বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য হিসেবে স্বীকৃত হলেও ক্ষয়ক্ষতির বিবেচনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় ওপরের দিকেই তার অবস্থান। ধনী শিল্পোন্নত দেশগুলোর দায় অনুন্নত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বহন করতে হচ্ছে। অথচ প্রশ্ন তোলাই যায়, পরিবেশ বিপর্যয়ের দায় বাংলাদেশের মতো দেশগুলো কেন বহন করবে? বিশ্বায়নের আশীর্বাদ হিসেবে বিশ্বের অনুন্নত উন্নয়নশীল দেশগুলো দায় বহন করতে বাধ্য হচ্ছে। সামগ্রিক বিবেচনায় পরিবেশ বিপর্যয়ে এদেশগুলোর ভূমিকা নগণ্য হলেও সমস্যাগুলোকে একেবারে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। মানুষ আজ নিজেদের জায়গা থেকে নিজেরা পরিষ্কার থাকতে পারছে না। পরিবেশের প্রতিটা সেক্টরে সৃষ্ট সমস্যা তৈরিতে আমরা পিছিয়ে আছিএমন দাবি করা যাবে না।

বাংলাদেশে পরিবেশ রক্ষায় আইনের কোনো অভাব নেই। পরিকল্পনার কোনো অভাব নেই। অভাব আছে আইনের যথাযথ প্রয়োগে, অভাব আছে পরিকল্পনার আন্তরিক বাস্তবায়নে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেল হলে সাময়িকভাবে শ্রবণশক্তি নষ্ট করে দেয় এবং মাত্রা ১০০ ডেসিবেল হলে চিরতরে শ্রবণশক্তি নষ্ট হতে পারে। এক গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে সচিবালয় এর চারপাশের এলাকায় শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেলের নিচে একবারও নামেনি এবং কখনো কখনো তা ১২৯ ডেসিবেলের বেশি উঠেছে। ২০০৬ সালের শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালায় শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব তার হাত থেকে সুরক্ষার জন্য প্রতিটি স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের কর্মক্ষেত্রে নীরব এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা, আবাসিক এলাকা, শিল্প এলাকা, মিশ্র এলাকা প্রভৃতি শনাক্ত করে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছিল। ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকার পাঁচটি স্থানকে নীরব এলাকা (নো হর্ন জোন) হিসেবে ঘোষণা করা হলেও তার বাস্তবায়ন গবেষণা প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয়েছে। যানবাহনের অহেতুক হর্ন, ইঞ্জিন ব্রেকের শব্দ, মাইক সাউন্ডবক্স ব্যবহার করে উচ্চশব্দ সৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগই নেই। আগের ধারাবাহিকতাই চলমান। আইন মানা বা মানানোর কারো দায় নেই। ফলে রাজধানীর বাসিন্দাদের শ্রবণশক্তি কমে যাচ্ছে, রক্তচাপ-হূদরোগ-শ্বাসকষ্ট-মাথাধরা-বমি বমিভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে, মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যাওয়ায় রোগ বাড়ছে এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে। অল্প কিছু মানুষের দায় সব জনগণের ওপর এসে পড়ছে।

পরিবেশ রক্ষায় দূষণ নিয়ন্ত্রণে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক অনেক সহজ। শব্দ নিয়ন্ত্রণের যেসব বিধিমালা আমাদের আছে, তা আন্তরিকতার সঙ্গে প্রয়োগ করা হলে মুক্তি পাওয়া কঠিন হতো না। আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্তরা দেশ জাতির উন্নয়নে ব্যস্ত সময় পার করার কারণে অনেক ছোট ছোট বিষয় বিবেচনায় আসে না। পরিবেশ রক্ষাও সে তালিকায় পড়ে গৌণ হয়ে গেছে। কত সময় ব্যয় করে, কত শ্রম দিয়ে বিধিমালা তৈরি করা হলো। আবার বহু শ্রম আর সময় ব্যয় করে বিধিমালা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলো। হয়তো বাস্তবায়নের কাজ করতেও এক যুগ অপেক্ষা করতে হবে। এতে পরিবেশ বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য হলেও শব্দদূষণে আমাদের রাজধানী বিশ্বের ওপরের সারির শহর। বায়ুদূষণেও রাজধানী পিছিয়ে নেই। মাটিদূষণ আর পানিদূষণে আমাদের ভূমিকাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত কমিটি রাজধানীতে সরবরাহকৃত পানিতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মলের জীবাণুর অস্তিত্ব পাওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানপ্রধান সরাসরি ট্যাপের পানি পান করেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। অন্যদিকে জনগণের অবস্থা বেগতিক। রাজধানীতে এমন একজন মানুষও পাওয়া যাবে না, যারা সরাসরি ট্যাপের পানি পান করে।

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস পরিবেশে প্রভাব বিস্তার করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ করোনা জয় করে ফেলেছে। রাস্তাঘাট, হাটবাজার, বিপণিবিতান-মল, পর্যটন কেন্দ্র-বিনোদন কেন্দ্র, সভা-সমিতি, রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সর্বত্র মানুষের ভিড়। সাধারণ জনগণ জীবিকার সন্ধানে ছুটছে। শাসকশ্রেণী উন্নয়ন অগ্রগতি রক্ষায় ছুটছে। এতে পরিবেশবাদীরা যে আশার আলো দেখেছিলেন, তা পূর্ণতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রকৃতিও আমাদের কোনো উপকার করতে পারছে না। কারণ আমরা নিজেরা নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে চাই না। অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চাই। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিন্দুমাত্র বিসর্জন দিতে চাই না। পরিবেশ রক্ষায় এমন মানসিকতার পরিবর্তন হোক। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মুক্তি আসুক। 

 

এম আর খায়রুল উমাম: প্রাবন্ধিক

সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি)

আরও