বিশ্বকাপে উড়তে থাকা ভিনদেশী পতাকা উন্মাদনার প্রতীক নয়; আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন বাস্তবতাও

বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রীড়াকে কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭১ সালের যুক্তরাষ্ট্র-চীন পিং-পং কূটনীতি দুই দেশের সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে কাতার বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের বৈশ্বিক পরিচিতি পুনর্নির্মাণ করেছে, দক্ষিণ কোরিয়া কে-পপ ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিকে সফট পাওয়ারের কার্যকর উৎসে পরিণত করেছে এবং সৌদি আরব ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রচলিত বিশ্লেষণে রাষ্ট্রের সক্ষমতা সাধারণত সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক অবস্থা, প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা কিংবা কৌশলগত জোটের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক রাজনীতির প্রকৃতি এমনভাবে পরিবর্তিত হয়েছে যে রাষ্ট্রের প্রভাব ক্রমে নির্ভর করছে এমন এক সম্পদের ওপর যা দৃশ্যমান নয়। সংস্কৃতি, শিক্ষা, ক্রীড়া, মূল্যবোধ এবং জনগণের আবেগ আজ রাষ্ট্রের সফট পাওয়ারের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ নাই যে ধারণা প্রবর্তন করেছিলেন, তার কেন্দ্রীয় যুক্তি ছিল অন্যকে বলপ্রয়োগ বা অর্থনৈতিক প্রলোভনের মাধ্যমে নয়, বরং আকর্ষণ, গ্রহণযোগ্যতা এবং বিশ্বাসের মাধ্যমে প্রভাবিত করার সক্ষমতাই আধুনিক রাষ্ট্রক্ষমতার একটি অপরিহার্য উপাদান। এ প্রেক্ষাপটে ফুটবল বিশ্বকাপ কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি জনকূটনীতি (পাবলিক ডিপ্লোমেসি), জাতীয় ভাবমূর্তি নির্মাণ (নেশন ব্র্যান্ডিং) এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের এক অনন্য বৈশ্বিক প্লাটফর্ম।

বাংলাদেশের সঙ্গে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সম্পর্ক এ পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতার একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। প্রচলিত ভূরাজনৈতিক মানদণ্ডে বিচার করলে এ দেশগুলোর মধ্যে গভীর সম্পর্কের সম্ভাবনা সীমিত। ভৌগোলিক দূরত্ব বিপুল, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য তুলনামূলকভাবে সীমিত, নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রায় অনুপস্থিত এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতেও তারা একে অন্যের প্রত্যক্ষ অংশীদার নয়। কিন্তু প্রতি চার বছর পর বিশ্বকাপ ফুটবল এমন এক সামাজিক বাস্তবতা সৃষ্টি করে, যেখানে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের সঙ্গে এক ধরনের আবেগগত সম্পর্ক নির্মাণ করেন। বাংলাদেশের শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত বিদেশী পতাকায় সজ্জিত হয়ে ওঠে, রাতভর খেলা দেখা হয়, বিজয় মিছিল বের হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ দেখা যায়। বিশ্বের খুব কম দেশেই অন্য একটি দেশের জাতীয় দলকে ঘিরে এমন স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক উচ্ছ্বাস দেখা যায়।

এ সমর্থনকে নিছক ফুটবল উন্মাদনা হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। বরং এটি একটি ট্রান্সন্যাশনাল ইমোশনাল কমিউনিটি অর্থাৎ এমন একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় আবেগগত সম্প্রদায়, যেখানে ভৌগোলিক সীমান্তের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক সংযোগ এবং ক্রীড়াজনিত আবেগ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নির্মাণবাদী (কনস্ট্রাকশনিস্ট) দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রের পরিচয় ও সম্পর্ক কেবল বস্তুগত স্বার্থ দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং সামাজিক ধারণা, প্রতীক এবং জনগণের পারস্পরিক উপলব্ধিও সেই সম্পর্ক নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থন এ তাত্ত্বিক যুক্তির একটি বাস্তব উদাহরণ।

এ জনসমর্থনের কূটনৈতিক তাৎপর্য আর্জেন্টিনা খুব দ্রুত উপলব্ধি করেছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা সমর্থন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা আর্জেন্টিনার দূতাবাস পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বিবেচনার ফল; তবে এটিও অস্বীকার করা যায় না যে বাংলাদেশের জনগণের অসাধারণ ফুটবলপ্রেম দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন রাজনৈতিক গুরুত্ব দিয়েছে। রাষ্ট্রগুলো ক্রমেই উপলব্ধি করছে যে ইতিবাচক জনমত নিজেই একটি কৌশলগত সম্পদ। যে দেশে জনগণের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত গ্রহণযোগ্যতা বিদ্যমান, সেখানে কূটনৈতিক উপস্থিতি সম্প্রসারণ দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গভীর করার সুযোগ সৃষ্টি করে।

আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূতের বাংলাদেশী সমর্থকদের সঙ্গে বসে বিশ্বকাপের খেলা দেখা এ পরিবর্তিত কূটনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতীকী উদাহরণ। ঐতিহ্যগত কূটনীতিতে রাষ্ট্রদূতের প্রধান দায়িত্ব ছিল সরকার-সরকার সম্পর্ক পরিচালনা করা। কিন্তু সমকালীন জনকূটনীতিতে রাষ্ট্রদূত একই সঙ্গে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলারও প্রতিনিধি। একইভাবে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য, বাংলাদেশী সাংবাদিকদের প্রতি আন্তরিক আচরণ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশী সমর্থকদের ধন্যবাদ জানানো কেবল সৌজন্যমূলক আচরণ নয়; এগুলো স্পোর্টস ডিপ্লোমেসির কার্যকর রূপ। ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশী সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ একই বাস্তবতার প্রতিফলন। এ ধরনের প্রতীকী যোগাযোগ রাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক জনধারণা (ফেভারেবল পাবলিক পারসেপশন) গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি পরবর্তীকালে পর্যটন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সহযোগিতার জন্যও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে।

এখানেই আধুনিক বৈদেশিক নীতির একটি মৌলিক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। একসময় পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের একচ্ছত্র অধিকার ছিল রাষ্ট্র ও কূটনীতিকদের হাতে। কিন্তু ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বৈশ্বিক গণমাধ্যম এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতি সেই একচেটিয়া কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে। আজ সাধারণ নাগরিক, ক্রীড়াবিদ, শিল্পী কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালীরাও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অনানুষ্ঠানিক অংশীজন। অর্থাৎ বৈদেশিক সম্পর্ক আর কেবল রাষ্ট্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয় না; এটি ক্রমবর্ধমানভাবে জনগণের অংশগ্রহণ ও সামাজিক সংযোগ দ্বারা প্রভাবিত হয়। বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থন এ নতুন বাস্তবতারই প্রতিফলন, যেখানে জনগণের আবেগ আনুষ্ঠানিক কূটনীতির জন্য একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেছে।

বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রীড়াকে কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭১ সালের যুক্তরাষ্ট্র-চীন পিং-পং কূটনীতি দুই দেশের সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে কাতার বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের বৈশ্বিক পরিচিতি পুনর্নির্মাণ করেছে, দক্ষিণ কোরিয়া কে-পপ ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিকে সফট পাওয়ারের কার্যকর উৎসে পরিণত করেছে এবং সৌদি আরব ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। এসব উদাহরণ দেখায় যে ক্রীড়া এখন আর কেবল বিনোদনের ক্ষেত্র নয়; এটি আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তার, জাতীয় ব্র্যান্ডিং এবং কৌশলগত যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত শিক্ষা নিহিত রয়েছে। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের প্রতি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনকে যদি কেবল বিশ্বকাপের আবেগে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে একটি মূল্যবান কূটনৈতিক সম্পদের অপচয় হবে। বরং এ ইতিবাচক জনধারণাকে কাজে লাগিয়ে ক্রীড়া সহযোগিতা, ফুটবল একাডেমি, যুব বিনিময় কর্মসূচি, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষণা সহযোগিতা, পর্যটন প্রচারণা, সাংস্কৃতিক উৎসব এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। বিশেষত দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার (সাউথ-সাউথ কো-অপারেশন) প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ, আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিলের মধ্যে নতুন অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ জনসম্পর্ক একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক সম্পর্ক কেবল চুক্তি, সামরিক সহযোগিতা বা অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং পারস্পরিক বিশ্বাস, ইতিবাচক জনমত এবং সাংস্কৃতিক সংযোগও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের কোটি মানুষের ফুটবলপ্রেম এরই মধ্যে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সঙ্গে এমন একটি সামাজিক সেতুবন্ধ তৈরি করেছে যা আনুষ্ঠানিক কূটনীতির জন্য একটি অনন্য ভিত্তি প্রদান করে। এখন প্রয়োজন সেই সামাজিক পুঁজিকে সুপরিকল্পিত বৈদেশিক নীতির সঙ্গে যুক্ত করার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা।

বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের রাস্তায় উড়তে থাকা আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের পতাকা তাই কেবল ফুটবল উন্মাদনার প্রতীক নয়; এগুলো সমকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক নতুন বাস্তবতারও প্রতীক। এমন এক বাস্তবতা, যেখানে জনগণের আবেগ রাষ্ট্রের সফট পাওয়ারে রূপান্তরিত হয়, খেলাধুলা কৌশলগত কূটনীতির ভাষায় কথা বলে, এবং একটি বিশ্বকাপ কখনো কখনো এমন কূটনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে, যা বহু আনুষ্ঠানিক বৈঠক বা দ্বিপক্ষীয় চুক্তিও সৃষ্টি করতে পারে না। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম শক্তিশালী সম্পদ কেবল রাষ্ট্রের হাতে নয়; তা অনেকাংশেই নিহিত রয়েছে জনগণের হৃদয়ে।

মো. আল-আমিন: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব কেন্টাকি, যুক্তরাষ্ট্র

আরও