চলতি বছরের জুলাই থেকে সর্বজনীন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার বাধ্যতামূলক হয়েছে। তবে বিশালসংখ্যক মারচেন্ট এমনকি গ্রাহকদের মধ্যেও এ নিয়ে আগ্রহের অভাব দেখা যাচ্ছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট সর্বপ্রথম ‘বাংলা কিউআর’ এর নির্দেশিকা প্রকাশের পর ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এর যাত্রা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে ‘বাংলা কিউআর’ চালু করার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দৈনন্দিন লেনদেনে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে লেনদেনকে সহজ ও দ্রুততর করা। পাশাপাশি লেনদেনকে স্বচ্ছ ও নিরাপদ রাখা।
সম্প্রতি এ পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে আরো কিছু উদ্দেশ্য যুক্ত হয়েছে। নগদ টাকা ছাপানোর খরচ কমানো, সব ধরনের লেনদেনকে ব্যাংকিং ও আর্থিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা, ট্রানজেকশন ট্র্যাকিংয়ের মধ্য দিয়ে পর্যায়ক্রমে সবাইকে করের আওতায় নিয়ে আসা।
সারা বিশ্ব এখন একটি ডিজিটাল রুপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকবে কেন? সর্বস্তরে ‘বাংলা কিউআর’ চালু করার প্রধান পূর্বশর্ত হলো মুদ্রা বাজারে নগদ টাকার সরবরাহ কমিয়ে আনা। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এটি বেশ চ্যালেঞ্জিং হলেও অসম্ভব কিছু নয়। লেনদেন ডিজিটালাইজেশন নিয়ে প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে মুদ্রা বাজার থেকে নগদ টাকা উঠিয়ে নিয়ে বিনিময়ে ডিজিটাল ফরম্যাটে (ই-মানি/ডিজিটাল কারেন্সি) বাজারে সরবরাহ করা।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার জারি করলে যারা ব্যাংকিং সেবার বাইরে আছে তারা ব্যাংক ও এমএফএস হিসাব খুলে নগদ টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে জমা দিতে বাধ্য হবে। এভাবে মুদ্রা বাজারে নগদ টাকার সরবরাহ কমানো সম্ভব হবে। নগদ টাকা ছাপানো একেবারেই সীমিত পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, চীনের মতো দেশগুলোতে নগদ টাকার ব্যবহার খুবই কম। এসব দেশে ৭০-৮০ শতাংশ লেনদেনই হয়ে থাকে ডিজিটাল মাধ্যমে এবং এসব দেশের ব্যাংকগুলোতেও নগদ লেনদেন হয় না বললেই চলে।
‘বাংলা কিউআর’-এর জনপ্রিয়তার আরেকটি প্রতিবন্ধকতা হলো মার্চেন্ট পয়েন্টে এর চার্জ অনেক বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-২-এর জারি করা সার্কুলার মোতাবেক ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করে সংঘটিত প্রতিটি লেনদেনে মার্চেন্ট পয়েন্ট চার্জ সর্বনিম্ন ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্যই মারচেন্টরা এ পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহারে বেশি আগ্রহ দেখাতে পারছেন না। এ সিদ্ধান্ত বাংলা কিউআরের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ চার্জ সর্বোচ্চ ১ শতাংশ হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের ঘোষণা অনুযায়ী মোবাইল ডেটা ছাড়াই ব্যাংক ও এমএফএসের অ্যাপ ব্যবহার করে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে পেটেন্ট করার যে সুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। পাশাপাশি যারা স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না তাদের জন্য ইউএসএসডি (আনস্ট্রাকচারড সাপ্লিমেন্টারি সার্ভিস ডেটা) কোড ব্যবহার করে পয়েন্ট টু পয়েন্ট (পিটুপি) ও পয়েন্ট টু বিজনেস (পিটুবি) লেনদেন করার বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। মার্কেটিং পলিসি হিসেবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো (একোয়ারিং ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান) নিজ নিজ মার্চেন্ট হিসাবধারীদের প্রণোদনা দিতে পারে, যা এ নতুন ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
সর্বোপরি, বাংলা কিউআরকে দেশের মুদ্রা বাজারের একটি সর্বজনীন প্লাটফর্ম হিসেবে জায়গা করে নিতে একটি বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে।
সাজ্জাদ হোসেন রিজু: ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলাম লেখক