আর নতুন নয়, বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মানোন্নয়নে জোর দেয়া হোক

দেশে নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বৈষম্য বা ভৌগোলিক চাহিদা পূরণ না হলে প্রতিষ্ঠান স্থানান্তর করা যেতে পারে। কারণ অনেক নতুন বিশ্ববিদ্যালয় এখন সরকারি বিদ্যালয়ের ভবন ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠায় ধিরগতির কারণে শিক্ষার্থীরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে

আমার গৃহকর্মীর ছেলেটি নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় স্থানীয় এক ওয়ার্কশপে কারিগরি প্রশিক্ষণ নেয়। তারপর কিছু জমিজিরাত বিক্রি করে আর কিছু টাকা ঋণ করে বিদেশে যায়। বিদেশে কাজ করে কয়েক বছরের মধ্যে ঋণ শোধ করতে সক্ষম হয়। কারিগরি প্রশিক্ষণ নেয়ায় তার বেতন-ভাতা অন্য সাধারণ শ্রমিকের তুলনায় বেশি। সরকারের নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তোড়জোড় দেখে গৃহকর্মীর ছেলের কথা মনে পড়ে গেল। বর্তমানে আমাদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৮টি (নতুন অনুমোদিত ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়সহ) এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১১৬টি। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার নীতিমালা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিম্নগামী করেছে। একই সঙ্গে দলীয় বিবেচনায় ভিসি-শিক্ষক নিয়োগ ও দুর্নীতি উসকে দিয়েছে। নষ্ট হয়েছে প্রয়োজনীয় কৃষিজমি। প্রত্যাশা ছিল নতুন সরকার এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়াবে না। বরং সদ্য প্রতিষ্ঠিত এবং স্থায়ী ক্যাম্পাসের অভাবে ভুগতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একত্রিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কমিয়ে আনবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অনিয়মের বিচারও হবে এমনটি প্রত্যাশিতই ছিল। তবে সরকার সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দিকেই এগোচ্ছে।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হলেও এগুলোর অর্জন কী এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান ও গবেষণা অর্জনের সূচক নির্ধারণকারী কোনো তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান ভালো নয়। ক্ষেত্রবিশেষে তালিকাতেও নেই। সম্প্রতি টাইমস হায়ার এডুকেশন র‍্যাংকিং এ বিশ্বের সেরা ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কোনো বাংলাদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম মেলেনি। অথচ ভারত ও পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ও এ তালিকায় আছে। বণিক বার্তার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলতি অর্থবছরে ১ হাজার ৩৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকার মোট বাজেটে গবেষণার জন্য রাখা হয়েছে কেবল ২১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। তার আগের অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২০ কোটি ৭ লাখ টাকা। এত অল্প বরাদ্দ দিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৩টি বিভাগ ও ১৩টি ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা কীভাবে গবেষণা করবে?

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কোচিং সেন্টারের সঙ্গে তুলনা করে মন্তব্য করেছেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। এ মন্তব্যের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এমনকি শিক্ষার্থীরাও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এ ধরনের মন্তব্যে ক্ষুব্ধ না হয়ে তারা যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দুর্নীতি ও দলীয়করণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতেন তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো আরো ভালো করতে পারত। এরশাদের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নেটওয়ার্কের ক্ষমতার কথা অনেকের মনে থাকার কথা। তবে গত ১৭ বছর এ নেটওয়ার্ক পুরোপুরি স্থবির ছিল। শিক্ষকরা নিজেদের পেশা ও প্রতিষ্ঠানের সম্মান রক্ষার্থে এ নেটওয়ার্ক আবার পুনরুজ্জীবিত করবেন এমনটিই প্রত্যাশিত।

দেশে নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বৈষম্য বা ভৌগোলিক চাহিদা পূরণ না হলে প্রতিষ্ঠান স্থানান্তর করা যেতে পারে। কারণ অনেক নতুন বিশ্ববিদ্যালয় এখন সরকারি বিদ্যালয়ের ভবন ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠায় ধিরগতির কারণে শিক্ষার্থীরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ভবন ভাড়া নিয়ে এবং মাত্র ১৩০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে পাঠক্রম শুরু করেছে। হাওরাঞ্চলে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে এমনিতেও পরিবেশবিদদের আপত্তি আছে।

আগামীতে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমলে চল্লিশ/পঞ্চাশ বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী সংকটে ভুগবে। এজন্য এখন থেকেই তরুণ প্রজন্মকে কর্মমুখী করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সরকার নির্বাচনী ইশতাহারে আগামী পাঁচ বছরে দুই কোটি কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি সফল করার জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জরুরি। কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। প্রতি উপজেলায় একটি করে কারিগরি স্কুল এবং জেলা পর্যায়ে একটি নার্সিং স্কুল স্থাপন করা যেতে পারে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বদলে কয়েকটি কারিগরি ও নার্সিং স্কুল প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এসব কারিগরি প্রতিষ্ঠানে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করলে অনেকে শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থান গড়ে নিতে পারবে। বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি লোক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। তারাই আমাদের রেমিট্যান্স আয়ের উৎস। এসব কর্মীদের সিংহভাগই অদক্ষ শ্রমিক। আমরা সস্তা শ্রম রফতানি করি। ২০২৫ সালে আমাদের রেমিট্যান্স এসেছে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। আমরা যদি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে শ্রমশক্তি পাঠাতাম তাহলে তার কয়েকগুণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কা ৩০ লাখ দক্ষ শ্রমিক রপ্তানি করে বছরে ৫০-৫৫ বিলিয়ন ডলার আয় করছে। এসব সম্ভব হচ্ছে জনতুষ্টিমূলক নীতিমালার বদলে আর্থিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর নীতিকে গুরুত্ব দেয়ায়।

এজন্য সরকারকে ব্যাপক জনগণ কল্যাণ ভিন্ন নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া যাবে না। বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকার ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এজন্য নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ভাবনা থেকে সরে আসতে হবে। বরং বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মানোন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ানো হোক।

নুরুল আমিন: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; সদস্য, বনানী সোসাইটি

আরও