‘মেগা প্রকল্পে মেগা দুর্নীতি’ বিগত সরকারের আমলে বিরোধী নেতাদের মুখে এটি একটি ‘কমন ডায়ালগ’ ছিল। প্রায় পত্রিকায় খবর আসত ‘রাস্তা তৈরিতে বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটারে খরচ পৃথিবীতে সর্বোচ্চ’। ‘বালিশকাণ্ড’ তো সবার মুখে মুখে। প্রকল্পের নামে বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে আছে মুখরোচক গল্প—পুকুর কাটা দেখতে ১৬ কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণ, ব্যয় ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা। প্রায় ৯০ শতাংশ প্রকল্পই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না এবং প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি করতে হচ্ছে। রাস্তা কিংবা ফ্লাইওভার জাতীয় প্রকল্প চলাকালে বছরের পর বছর ধরে জনদুর্ভোগ হয়ে ওঠে অসহনীয়। বিভিন্ন সংস্থার মাঝে নেই সমন্বয়। একজন রাস্তা বানায় তো আরেকজন এসে তা কাটা শুরু করে।
উন্নয়ন জোয়ারের যুগে এ প্রকল্পপ্রীতি থেকে সরে সরকার আগামী অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার কমিয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে এ প্রকল্প ব্যয় মেটানো হয়। কিন্তু শুধু বাজেট কমালেই সমস্যার সমাধান হয়ে গেল না, যা দরকার তা হচ্ছে প্রকল্পে অপচয় রোধ ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা উন্নয়ন। অন্তত কয়েকটি ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব। বাংলাদেশের পরিকল্পনা কমিশনের একটি বিভাগের অধীন কিছু প্রকল্প মূল্যায়ন করতে গিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যা দেখেছি, তা হলো প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম ও অদক্ষতা বিরাজমান। জনগণের ট্যাক্সের টাকা কীভাবে অপচয় বা হরিলুট হচ্ছে তা আমাদের সবারই জানা উচিত।
এক. সঠিক প্রকল্প নির্বাচন: সেতু এমনকি টানেল নির্মাণ করা হয়েছে কিন্তু রাস্তা নেই, খিচুড়ির মতো অহেতুক প্রকল্প এবং পরবর্তী সময় খিচুড়ি রান্না দেখতে বিদেশ ভ্রমণ, বিল্ডিং বানানো হয়েছে কিন্তু লোকবল নিয়োগ না দেয়ায় বছরের পর বছর বিল্ডিং পরিত্যক্ত পড়ে থাকা, আরো কত কী! খোদ ঢাকার ভিআইপি রোডের সৌন্দর্যবর্ধনের নামে বিদেশ থেকে গাছ আনার মতো অপচয়ও চোখের সামনে হয়েছে। রাস্তার ডিভাইডার ভাঙা-গড়ার খেলা তো সেই পুরনো! এমন অনেক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প পরবর্তী সময় গণমানুষের কোনো কাজে আসেনি। এ প্রকল্পগুলোর প্রস্তাব আসে বিভিন্ন সংস্থা বা অধিদপ্তর থেকে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) আকারে। প্রকল্পের ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অনেক সময় সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে কয়েক গুণ বেশি বাজেট প্রস্তাব করতে দেখা যায়, যেটা হয়েছিল, বালিশকাণ্ডের ক্ষেত্রে। ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ এর জন্য পরিকল্পনা কমিশন তা যাচাই-বাছাই করার কথা। বড় প্রকল্প হলে ‘একনেক’ মিটিংয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। কিন্তু যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি তারা সঠিকভাবে অনেক সময় করেন না বলেই প্রকল্পে অর্থ অপচয় বাড়ছে।
দুই. প্রকল্পের ধীরগতি: সম্ভবত ৯০ শতাংশ প্রকল্পই প্রাথমিক ডিপিপি প্রস্তাবের সময় অনুযায়ী শেষ করতে পারে না। সময় বর্ধিতকরণের প্রয়োজন হয়। এসব ক্ষেত্রে আবার প্রকল্প ব্যয়ও বৃদ্ধি করতে হয়। মজার কথা হলো, এ সময় বৃদ্ধিও যে একটি অপচয়ের মাধ্যম, এটিকে আমরা বিবেচনায় নিচ্ছি না। এতে প্রকল্পের সুফল ভোগ করার মেয়াদ সীমিত হয়। জনদুর্ভোগ বাড়ে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পায়। সরকারি অফিসগুলোর এ ধীরগতিকে তাদের অদক্ষতা হিসেবে গণ্য করে, এ অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে শাস্তির দৃষ্টান্ত আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। সরকারের একটি বিভাগ আইএমইডি এগুলো দেখভালের দায়িত্বে থাকলেও দৃশ্যমান কোনো তদারকি কখনই নজরে আসেনি।
তিন. কাজের মান: সরকারি কাজের মান অনেক ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে হলেও কখনই ভালো বলা যাবে না। এতে জনগণের অর্থের অপচয় হচ্ছে। অজস্র উদাহরণ আছে যে রাস্তা নির্মাণের কিছুদিনের মধ্যে ভেঙে গেছে। নির্মাণসামগ্রীর মান নির্ণয়ে ‘টেস্ট’ বা পরীক্ষা করার বিধান থাকলেও তা অনেকটাই প্রহসনে পরিণত হয়েছে। পরীক্ষার ফল একরকম আর বাস্তবে আরেক রকম। নির্মাণকাজে ঠিকাদারদের পর্যাপ্তসংখ্যক কারিগরি লোকবল নিয়োগ দেয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে অনুপস্থিত। ফলে কাজ করানো হচ্ছে শুধু অদক্ষ রাজমিস্ত্রি জাতীয় লোক দিয়ে, যাতে করে কাজের মান আর খারাপ হচ্ছে। বিএনবিসি অনুসরণ করে নির্মাণ কাজে সতর্কতার নিয়মও মেনে চলা হচ্ছে না। অন্তত সরকারি কাজে উচিত ছিল নির্মাণের এ নিয়মগুলো মেনে চলা। এছাড়া অন্য অনেক প্রকল্পে ক্রয়কৃত পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে।
চার. বিদেশ ভ্রমণ: অহেতুক বিদেশ ভ্রমণ প্রায় সব বড় প্রকল্পেরই অংশ। এ নিয়ে মুখরোচক অনেক গল্প পত্রিকার পাতায় প্রায়ই দেখা যায়। ঘাস চাষ, খাল খনন, পুকুর কাটা, খিচুড়ি রান্না, কাজু বাদাম চাষ এবং উঁচু ভবন দেখার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন আমাদের সরকারি কর্মকর্তারা। এক সরকারি কর্মকর্তার মুখ থেকে শোনা—ছাদকৃষির অভিজ্ঞতা নিতে থাইল্যান্ড গিয়েছিল একটি দল। পরে জানা গেল যে থাইল্যান্ডের লোকজন বরং বাংলাদেশ থেকে ছাদকৃষি শিখতে চাচ্ছে। মূলত থাইল্যান্ডের সমুদ্রসৈকতে ভ্রমণ করেই তারা সময় পার করেছেন। আরেকবার ‘ম্যানগ্রোভ’ বন দেখার জন্য ইন্দোনেশিয়ায় গিয়ে তোপের মুখে পড়েছিল এই বলে যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ‘ম্যানগ্রোভ’ বনাঞ্চল যেখানে বাংলাদেশে, সেখানে ইন্দোনেশিয়ায় কি দেখার আছে? আসলে পরিদর্শক দলের মূল ইচ্ছা হচ্ছে ‘বালি’ সৈকতে ভ্রমণ। অনেকদিন আগে আরেকবার পত্রিকায় দেখেছিলাম, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বছর শেষে ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ বাবদ বাজেট অব্যবহৃত থেকে যাওয়ায় পুরো মন্ত্রণালয়ের প্রায় সবাই মিলে স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে ইংল্যান্ড ভ্রমণ। পরিচিত সরকারি ডাক্তাররা জানান যে প্রশিক্ষণের এ টাকা ডাক্তাররা খুব কমই ব্যবহার করতে পারেন। একই অভিযোগ প্রকৌশলীদেরও। প্রায় সব ক্ষেত্রেই মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশন থেকে কিছু কর্মকর্তাকে এই ভ্রমণে রাখতে হবে, নতুবা আপনার প্রকল্পই পাস হবে না বা ভ্রমণের অনুমতি পাবেন না। অনেক ক্ষেত্রে পাঁচজন বিদেশগামীর মধ্যে দুইজন মন্ত্রণালয়ের, দুইজন পরিকল্পনা কমিশনের আর একজন সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর বা বিভাগের। সবচেয়ে বড় কথা এসব বিদেশ ভ্রমণের প্রায় ৯৯ শতাংশ অপ্রয়োজনীয়, জনগণের ট্যাক্সের টাকার অপচয়।
পাঁচ. গাড়ি বিলাস: সরকারের একটি দৃশ্যমান বড় অপচয়ের খাত এ গাড়ি বিলাস। প্রায় সব প্রকল্পেই গাড়ি কেনা একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। কর্মকর্তার বেতন ৮০ হাজার টাকা। অথচ অবচয় মূল্যসহ তার ব্যবহৃত গাড়ির পেছনে খরচ প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা। সর্বোপরি, এ গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণে ভুতুড়ে বিলের নামে লুটপাট করছে আরেক দল। অথচ গাড়ির নামে এ হরিলুটের বদলে কর্মকর্তাদের প্রতি মাসে যাতায়াতের খরচ বাবদ একটি ভাতা প্রদান করলে এর অনেকাংশে কম খরচ হতো। অনেক সৎ কর্মকর্তার জন্য এটি একটি প্রণোদনা হিসেবে কাজ করত। ব্যক্তিগত পর্যায়ে গাড়ির জন্য ঋণ আর মাসিক খরচ দেয়ার একটি বিধানের পর ঋণপ্রাপ্তদের সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করার কথা থাকলেও অনেকাংশে তা মানা হচ্ছে না। ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তাকে তার অধীনে থাকা প্রকল্পের একাধিক গাড়ি নিজে ব্যবহার করতেও শোনা যায়।
ছয়. হস্তান্তর ও প্রকল্প পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ :
অনেক প্রকল্প শেষ হওয়ার পর যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম পরবর্তী সময় মরিচা পড়ে নষ্ট হতে দেখা যায়। কখনোবা পরবর্তী সময় কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানই এর দায় নেয় না বা প্রকল্পের কার্যাবলি চালু রেখে এর সুফল দীর্ঘস্থায়ী করার কোনো চেষ্টা করা হয় না। প্রকল্প শেষ কাজও শেষ।
বর্তমানের অন্তর্বর্তী সরকার যদি সত্যিকার অর্থেই জনগণের ট্যাক্সের অর্থের অপচয় রোধে কিছু পদক্ষেপ নিতে চায়, তাহলে শুধু বাজেট কমিয়েই না, বরং সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এই ডিজিটাল যুগে, সরকারি প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয় পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র, ওয়েব বেইজড পোর্টালে উন্মুক্ত করে দেয়া প্রয়োজন, যাতে জনগণ এসব প্রকল্পের যৌক্তিকতা কিংবা ব্যয়ের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে তাদের মতামত প্রদান করতে পারে। প্রকল্প তদারকিতে স্থানীয় জনগণকেও সম্পৃক্ত করা যেতে পারে, কিংবা বিশেষজ্ঞ মতামত। মূল কথা, সার্বিকভাবে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়ন প্রয়োজন। জনগণের কষ্টর্জিত অর্থের নয়-ছয় বা অপচয় কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ড. মো. সিরাজুল ইসলাম: অধ্যাপক, সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও পরিচালক, সেন্টার ফর ইনফ্রাস্ট্রাকচার রিসার্চ অ্যান্ড সার্ভিসেস (সিআইআরএস), নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়