চিকিৎসক, প্যারামেডিক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ওয়ার্ড বয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, আয়া, অ্যাম্বুলেন্সের চালক, নিরাপত্তা প্রহরীসহ হাসপাতালের সব কর্মী করোনাযুদ্ধের প্রথম সারির সৈনিক। করোনার মতো ভয়াবহ ছোঁয়াচে মহামারীর বিরুদ্ধে টানা দুই মাস যুদ্ধ করতে গিয়ে তারা অনেকেই আজ পরিশ্রান্ত, ক্লান্ত এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অবস্থা আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এই যুদ্ধ কবে নাগাদ শেষ হবে তার সঠিক আন্দাজ এ মুহূর্তে করা সম্ভব নয়। ধারণা করা হচ্ছে, কার্যকরী ভ্যাকসিন ও প্রতিষেধক উদ্ভাবন না হওয়া পর্যন্ত হয়তো করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। এ যুদ্ধে যেমন আছে মহামারীতে আক্রান্ত হওয়ার ভয়, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়, তেমনি আছে মৃত্যুর ভয়ও। এ সময়ে দরকার তাদের পাশে থাকা। আমাদের একটুখানি সহযোগিতা তাদের মনোবল বহুলাংশে চাঙ্গা করতে পারে। আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের জন্য এটার গুরুত্ব অপরিসীম।
কোনো যুদ্ধজয় শুধু সম্মুখ সমরের সৈনিকদের ওপর নির্ভর করে না। তার জন্য দরকার দেশের সব মানুষের একীভূত অবস্থান, ব্যাপক সমর্থন এবং সার্বিক সহযোগিতা। যেমনটা হয়েছিল আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে। মুষ্টিমেয় রাজাকার ব্যতীত আপামর জনসাধারণ কেউ আশ্রয় দিয়ে, কেউ খাবার দিয়ে, কেউ সাহিত্য রচনা করে, কেউবা গান গেয়ে তাদের সাহস জুগিয়েছিল। ফলে একেকজন মুক্তিযোদ্ধা সাত কোটি মানুষের শক্তি নিয়ে বিপুল বিক্রমে যুদ্ধ করে মাত্র নয় মাসে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে আমরা যেমন সামরিক-বেসামরিক, ধনী-গরিব, কৃষক-শ্রমিক, কামার-কুমার, তাঁতি-জেলে, ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যার হাতে যা ছিল তাই নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পেরেছিলাম, করোনাযুদ্ধে জয় হওয়ার জন্যও তেমন প্রয়োজন সর্বমহলের সার্বিক সহযোগিতা।
আমরা বিভিন্নভাবে করোনাযুদ্ধের সাহসী সৈনিকদের পাশে থাকতে পারি। আমরা প্রত্যেকে যদি নিজের, আত্মীয়স্বজনের ও বন্ধুবান্ধবদের পরিবারের সদস্যদের করোনাসংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক শিষ্টাচার (যেমন বিনা প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে না যাওয়া, জরুরি প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বের হলে সর্বক্ষণ মাস্ক ব্যবহার করা এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, কর্মক্ষেত্রে সারাক্ষণ মাস্ক ব্যবহার করা এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, সাবান পানি দিয়ে বারবার হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলা, বাইরে থেকে বাড়িতে আসার সঙ্গে সঙ্গে অন্য কিছু স্পর্শ করার আগে সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়া এবং প্রয়োজনে গোসল করা, বাড়িতে কোনো কভিড-১৯ রোগী থাকলে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারসহ শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে তার সার্বিক পরিচর্যা করা এবং হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশী কেউ কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হলে তাকে সার্বিক সাহায্য-সহযোগিতা করা, কেউ মারা গেলে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারসহ শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় নিয়ম মেনে দাফন-কাফনে বা সত্কারে তার পরিবারকে সার্বিক সহযোগিতা করা, কভিড-১৯-এ আক্রান্ত রোগী বা তার পরিবারের সদস্যের সঙ্গে কোনোভাবেই দুর্ব্যবহার না করা এবং যেসব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন, তাদেরকে কোনোক্রমেই বাসা থেকে তাড়িয়ে না দেয়া) মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করতে পারি, তাহলে করোনা মহামারীর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব। ফলে হাসপাতালে কভিড-১৯ রোগীর প্রবাহ কমে যাবে। আর সেটাই হবে করোনাযুদ্ধের সৈনিকদের জন্য বড় স্বস্তির ব্যাপার।
গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর, বিশেষ করে ২৬ মার্চ (অর্থাৎ সরকার কর্তৃক সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর) থেকে অনেক ব্যক্তি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যারা চিকিৎসক ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম বিতরণে এগিয়ে এসেছে, তাদের প্রচেষ্টা চলমান রাখা প্রয়োজন। তবে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ ও বিতরণের আগে সেগুলোর মান সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করা অত্যাবশ্যক। উল্লেখ্য, বাজারে বর্তমানে নিম্নমানের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম পাওয়া যাচ্ছে। ভুলক্রমে এগুলো সংগ্রহ ও বিতরণ করলে আমাদের চিকিৎসক এবং অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে আক্রান্তের হার বাড়বে।
যারা শিল্পকলা ও সংগীত সাধনা করেন, তারা করোনা সৈনিকদের সাহসিকতার ছবি এঁকে এবং গান গেয়ে তাদের পাশে থাকতে পারেন। উল্লেখ্য, মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীরা গান পরিবেশনের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জোগাতে এবং মনোবল বাড়াতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। গণমাধ্যমকর্মীরা করোনার ভয়কে জয় করে অবিরাম বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখতে পারেন।
আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বল অবকাঠামোর (যেমন ব্যাঙের ছাতার মতো মানহীন লাভজনক হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের উত্থান, স্বাস্থ্য বীমার পরিবর্তে ডাক্তারদের সরাসরি ফি দেয়ার রীতি, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কমিশন বাণিজ্য, ঢাকাকেন্দ্রিক বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের আধিক্য, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর অপ্রতুলতা এবং রোগ নির্ণয় পরীক্ষার সুযোগ-সুবিধার অভাব, বেশির ভাগ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় জরুরি সেবার অপ্রতুলতা এবং কার্যকরী রেফারেল সিস্টেমের অভাবে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিশেষায়িত হাসপাতালে উপচে পড়া ভিড় এবং রোগীর সেবা-শুশ্রূষায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে নার্সদের চরম অমনোযোগিতা) জন্য দেশের জনসাধারণ দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। ফলে চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর অনেকেরই ক্ষোভ রয়েছে, যদিও তারা এজন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দায়ী নন। বরং দায়ী হচ্ছে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বল অবকাঠামো। তাই সমাজে আজ রোগীর সঙ্গে চিকিৎসকের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় এর একটি করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। অনেক রোগীরই আজ চিকিৎসকের ওপর আস্থা নেই। আবার অনেক চিকিৎসকও রোগীকে পুরাপুরি আস্থায় আনতে পারছেন না ।
এই আস্থা-অনাস্থার দোলাচলে লাখ লাখ সাধারণ রোগী দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে। ফলে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাইরে চলে যাচ্ছে। আস্থা-অনাস্থার এ ধারা অব্যাহত থাকলে এর পরিণতি দেশের জন্য মোটেই কল্যাণকর নয়। একটা দেশের জনগণের স্বাস্থ্যসেবা অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল হলে সে দেশের অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়ে। তাই এখনই সময় করোনাযুদ্ধের সৈনিকদের পাশে দাঁড়িয়ে অনাস্থার দেয়াল ভেঙে ফেলা।
আমরা জানি, যুদ্ধের ময়দানে সেনাপতি যদি সামনে থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেন তাহলে সৈন্যদের মনোবলের কোনো ঘাটতি থাকে না। আবার যদি প্রধান সেনাপতি বা ফিল্ড মার্শাল যুদ্ধের ময়দানে আচমকা উপস্থিত হন তাহলে সৈনিকদের মনোবল তুঙ্গে উঠে যায়, যা তাদের যুদ্ধজয়ে বাড়তি রসদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হলেন করোনাযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বা ফিল্ড মার্শাল। আর মন্ত্রীসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা করোনাযুদ্ধের একেকজন সেনাপতি। এই সেনাপতিরা মাঝেমধ্যে সরজমিনে হাসপাতাল ভিজিট করে করোনাযুদ্ধের সৈনিকদের সঙ্গে অধিক বন্ধুত্বসুলভ আচরণ ও পিঠ চাপড়ে সাহস জোগাতে পারেন। গুণগত মানের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবসহ বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের মাধ্যমেও তাদের মনোবল বাড়াতে পারেন। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তাদের সমস্যাগুলো জানা ও সমাধানের একটা ভালো মাধ্যম হলেও বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেটা কতটুকু কার্যকরী, তা অজানা নয়। ভিডিও কনফারেন্সিংয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তদের সঙ্গে নিরেট সত্য কথা বলার সাহস যে খুব বেশি মানুষের নেই, তাও আমাদের অজানা নয়।
করোনা সৈনিকদের পাশে থাকতে সরকার এরই মধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন চিকিৎসাসেবা প্রদানকালে সরকারি হাসপাতালের কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে গ্রেড অনুযায়ী ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং মৃত্যু হলে ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা তার পরিবারকে প্রদান করার বিধান জারি করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে অধিক কার্যকর করার জন্য এ উদ্যোগটিতে কিছু সংশোধনী আনা প্রয়োজন। লক্ষণ প্রকাশের আগে একজন করোনা রোগী অন্যকে আক্রান্ত করতে পারে। আবার লক্ষণবিহীন করোনা রোগীর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। তাই সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী সবাই করোনার ঝুঁকিতে রয়েছেন। ফলে তারা সবাই এ প্রণোদনা প্যাকেজের সমান দাবিদার। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে বীর সৈনিকদের অবদানের স্বীকৃতির জন্য সামরিক না বেসামরিক তা দেখা হয়নি, দেখা হয়েছে কেবল তার অবদান। যেমন তারামন বিবি বেসামরিক ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও তার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাকে বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। করোনাযুদ্ধের সৈনিকদের প্রণোদনা প্রদানের ক্ষেত্রেও ঠিক একইভাবে তারা সরকারি না বেসরকারি লোক, তা ভেদাভেদ না করে চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন কিনা, সেটাই বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত।
কর্তব্যরত অবস্থায় কোনো চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হলে এবং জীবনহানি না ঘটলে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা চিকিৎসা ভাতা প্রদানের যে বিধান জারি করা হয়েছে, তাও পর্যালোচনা করা দরকার। কভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসা এখন পর্যন্ত যেহেতু শুধু সরকারি হাসপাতালে দেয়া হচ্ছে, তাই স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের জন্য রোগী বা তার পরিবারকে ব্যক্তিগতভাবে খরচ মেটানোর তেমন প্রয়োজন নেই। এক্ষেত্রে তাই চিকিৎসা ভাতার পরিবর্তে আক্রান্ত চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য সর্বোচ্চ চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে তার সুস্থতার ওপর বেশি জোর দেয়া দরকার। উল্লেখ্য, বেঁচে থাকলে এর থেকে ঢের অর্থ আয়ের সুযোগ তাদের রয়েছে। তাছাড়া যেহেতু লক্ষণবিহীন করোনা রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, তাই এক্ষেত্রে কারো কারোর দুর্নীতিতে জড়িত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। অসুস্থকালীন ভাতার পরিবর্তে তাই সব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য করোনা ভাতা দেয়া যেতে পারে।
যেসব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী কভিড-১৯ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত, তাদেরকে মাসে মূল বেতনের দ্বিগুণের সমান এবং যারা সাধারণ রোগীর চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত, তাদেরকে মাসে মূল বেতনের সমপরিমাণ করোনা ভাতা দেয়া যেতে পারে। এ ভাতা কার্যকর করা হলে সরকারি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য মাসে মোট খরচ হতে পারে ২০০ কোটি টাকার মতো। তবে যেসব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী জাতির এই দুঃসময়ে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না, তদেরকে এ ভাতার আওতায় না আনলে এর পরিমাণ আরো অনেক কমে আসবে। উল্লেখ্য, চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী বর্তমান হারে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হতে থাকলে মে মাসের শেষে এ সংখ্যা পাঁচ হাজারে দাঁড়াতে পারে। তাই গ্রেড অনুযায়ী করোনা চিকিৎসা ভাতা বাবদ ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার যে বিধান জারি করা হয়েছে, তার জন্য শুধু মে মাসের মধ্যেই প্রায় ৪০০ কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে।
কর্তব্যরত অবস্থায় সরকারি চিকিৎসক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে পরিবারকে ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা প্রদানের যে বিধান জারি করা হয়েছে, তারও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট কর্তৃক চিকিৎসকদের ওপর পরিচালিত একটা ত্বরিত জরিপ থেকে এ তথ্য পাওয়া যায় যে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ চিকিৎসক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী সবার জন্য সমান হওয়া প্রয়োজন। কারণ এটা জাতির কল্যাণে তাদের সাহসী আত্মদানের প্রতিদান। চিকিৎসক থেকে শুরু করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী পর্যন্ত প্রত্যেকেই হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু রাখার জন্য প্রত্যেকেরই সুনির্দিষ্ট অবদান থাকে। এদের কোনো একজনের অনুপস্থিতিতে হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা কার্যকরীভাবে চালু রাখা সম্ভব নয়। তাই হাসপাতালে কর্তব্যরত অবস্থায় কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে সবার মর্যাদা একই রকম হওয়া উচিত। তাছাড়া এ ক্ষতিপূরণ করোনাযুদ্ধের অন্য সৈনিকদের, যেমন সেনাবাহিনীর সদস্য, পুলিশ বাহিনীর সদস্য, গণমাধ্যমকর্মী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জন্যও একইভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
করোনাযুদ্ধের সৈনিকদের সাহসী আত্মদানের ক্ষতিপূরণ বাবদ সর্বোচ্চ যে ৫০ লাখ টাকা ধার্য করা হয়েছে, তা তার পরিবারের বাসস্থান, সন্তানের লেখাপড়া ও জীবনধারণের জন্য মোটেই যথেষ্ট নয়। উল্লেখ্য, বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় ৫০ লাখ টাকা ব্যাংকে আমানত রাখলে মাসপ্রতি গড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার বেশি মুনাফা পাওয়া সম্ভব নয়। অসুস্থ হলে যেখানে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার চিকিৎসা ভাতা প্রদানের কথা বলা হয়েছে, সেখানে জীবনহানি হলে মাত্র ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের জরিপের তথ্যমতে, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কমপক্ষে ২ কোটি টাকা হওয়া উচিত। মনে রাখা প্রয়োজন, ক্ষতিপূরণের টাকার অংকটা পরিমিত হলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনাযুদ্ধে সাহসিকতা দেখাতে অধিক উৎসাহী হতে পারেন। কেননা এক্ষেত্রে তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা কমতে পারে।
বাংলাদেশে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত কভিড-১৯-এ আক্রান্তের সংখ্যা ৭ হাজার ৬৬৭ জন। এর মধ্যে চিকিৎসক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা ৮০০ জনের অধিক। অর্থাৎ তাদের আক্রান্তের হার ১০ শতাংশের অধিক, যা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের গড় হারের তুলনায় অনেক বেশি। তবে এ পর্যন্ত একজন চিকিৎসক, একজন স্বাস্থ্যকর্মী, তিনজন পুলিশ সদস্য এবং একজন গণমাধ্যমকর্মী কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাই এই ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকারের বাড়তি বরাদ্দের প্রয়োজন নাও হতে পারে।
করোনাযুদ্ধের সৈনিকদের বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমেও সরকার তাদের পাশে থাকতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষ আর্থিক ক্ষতিপূরণের তুলনায় অবদানের স্বীকৃতি অনেক বেশি কার্যকরী। তাই আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি করোনাযুদ্ধের সৈনিকদের মনোবল বাড়াতে তাদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি প্রদান করার বিষয়েও সরকার চিন্তাভাবনা করতে পারে। এক্ষেত্রে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যেসব মুক্তিযোদ্ধা অসামান্য অবদান রেখেছিলেন, তাদেরকে যেমন বিভিন্ন উপাধিতে (বীরশ্রেষ্ঠ, বীরবিক্রম, বীরউত্তম ও বীরপ্রতীক) ভূষিত করা হয়েছে, করোনাসহ সব ধরনের সংক্রামক মহামারী মোকাবেলার জন্য যারা অসামান্য অবদান রাখবেন, তাদেরকেও বিভিন্ন উপাধিতে (যেমন বীর সর্বোত্তম, বীর মৃত্যুঞ্জয়ী, বীর চিরঞ্জীব, বীর দুর্জয়) ভূষিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়া যেতে পারে ।
চিকিৎসক ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে এবং তাদের পরিবারকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়ে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির সেবা করে যাচ্ছেন। গত বছর ডেঙ্গুর সময়ও তারা একইভাবে মাতৃভূমির সেবা করেছেন। তাদের এমন মহান আত্মত্যাগকে আমরা যদি যথাসময়ে স্বীকৃতি না দিই, তাহলে হয়তোবা অদূরভবিষ্যতে এমন সময় আসবে যখন সচেতন পরিবারের কোনো সন্তান চিকিৎসা পেশায় আসবেন না। তাহলে আমাদের স্বাস্থ্য খাতের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে পড়বে। করোনা মহামারী আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কতগুলো শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। যেমন যেকোনো মহামারী মোকাবেলায় প্রথম থেকেই সর্বোচ্চ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সরকারি খাতের ওপর জোর দেয়া এবং দেশীয় স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বিদেশনির্ভরতা কমানো। অতএব, জাতির কল্যাণে এসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
দেশকে চরম বিপর্যয় থেকে রক্ষার জন্য তাই আসুন আমরা সবাই যার যার অবস্থান থেকে স্ব-স্ব দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে করোনাযুদ্ধের সৈনিকদের পাশে দাঁড়াই এবং তাদের বীরত্বের স্বীকৃতি দিই।
ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়