জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের জনগণ এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে, যেখানে বৈষম্য থাকবে না এবং সব নাগরিক সমান মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করবে। এ লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কারের উদ্দেশ্যে একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। এ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পর্যায়ের পরামর্শ, মতামত ও জনসম্পৃক্ততার কথা বলা হলেও বাস্তবে কারা এ আলোচনায় অংশ নিচ্ছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রীয় সংস্কার আলোচনায়, বিশেষ করে রাষ্ট্র পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এবং ক্ষমতা ও সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের আলোচনায় দেশের প্রায় ২১ শতাংশ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কি আদৌ গুরুত্ব পাচ্ছে? তারা কি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারছে নাকি এ আলোচনাও শুধু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে?
প্রান্তিক শব্দের আক্ষরিক অর্থ সীমান্ত বা কোনোকিছুর শেষ প্রান্তে অবস্থিত। ‘প্রান্তিকীকরণ’ বলতে বোঝায় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সমাজের মূল কেন্দ্র বা গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো ও ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়াকে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মূলধারার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ও গুরুত্বহীন হিসেবে বিবেচিত হয় এবং তাদেরকে প্রভাব বিস্তার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। এ প্রক্রিয়া প্রায় সমাজের কেন্দ্রে অবস্থান করা ক্ষমতাবান এবং প্রভাবশালী শ্রেণীর নেতিবাচক মানসিকতার ফল, যার মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ সম্মানজনক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ও পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হয়।
বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটি প্রান্তিক মানুষ বাস করে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আছে অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠী, নারীপ্রধান পরিবার, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, দুর্গম অঞ্চলের বাসিন্দা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, এইডসসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, অভিবাসী শ্রমিক, সহিংসতার শিকার, পথবাসী, ভিক্ষুক, যৌনকর্মী প্রভৃতি। তারা সমাজ থেকে নানাভাবে বর্জিত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাথমিক মানবাধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়। বিভিন্ন দুর্যোগ ও সংকটে তাদের জীবন ও জীবিকা সবচেয়ে বেশি হুমকির সম্মুখীন হয় এবং সমাজে তাদের পরিচিতি ও মর্যাদা সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে। একই সঙ্গে নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ ও নিশ্চিতকরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রায় এ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে। তাদের উন্নয়নের লক্ষ্যে নীতিমালা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের বিষয়টি রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক নেতাদের নজরের বাইরে থাকে। বর্তমানেও এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি গঠিত ছয়টি সংস্কার কমিশন একাধিক সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংবিধান সংস্কার কমিশন একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থার প্রস্তাব করেছে, যেখানে একটি জাতীয় পরিষদ ও একটি উচ্চকক্ষ থাকবে এবং উচ্চকক্ষে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে পাঁচজন প্রতিনিধি থাকবে। যদিও এ উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক, তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আসলেই কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন? তারা কি প্রকৃত অর্থে প্রান্তিক জনগণের ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন?
বাস্তবতা হচ্ছে, যেহেতু এ প্রতিনিধিদের মনোনয়ন রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে হবে, তাই তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বা সরকারের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কাজ করার সক্ষমতাকে প্রভাবিত ও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
এছাড়া বাকি পাঁচটি সংস্কার কমিশন বিভিন্ন খাতে শতাধিক সুপারিশ করেছে। যদিও এসব প্রতিবেদনে নাগরিক অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা হয়েছে, তবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিষয়গুলোকে প্রায়ই গৌণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব সুপারিশ প্রধানত রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণীকে কেন্দ্র করে তৈরি। কারণ সেগুলোর বাস্তবায়ন মূলত রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক অভিজাতদের ওপর নির্ভর করে। প্রতিবেদনে দেখা যায় সংসদের উচ্চকক্ষে এনজিও, বেসরকারি খাত এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে, তবে এখানেও প্রার্থী মনোনয়ন রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে হবে। ধরে নেয়া হয়েছে যে রাজনৈতিক অভিজাতরাই একটি বৈষম্যহীন ও স্বচ্ছ সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অভিজাতরা অধিকাংশ সময় নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছে, যার ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উপকৃত হয়নি। এ অভিজ্ঞতা নাগরিকদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর আস্থা কমিয়েছে। সুতরাং, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণের দায়িত্ব শুধু রাজনৈতিক অভিজাতদের হাতে ছেড়ে দিলে তা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি থাকে।
এছাড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হলো রাষ্ট্রের জবাবদিহির অভাব। এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত সমস্যা। বাংলাদেশের আইনি কাঠামোয় দেশের সব নাগরিকের সমতার স্বীকৃতি থাকলেও প্রান্তিক মানুষের জীবন অভিজ্ঞতার সঙ্গে এর বিস্তর ফারাক রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জাতীয় আবাসন নীতিতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও সেটি বাস্তবায়নের সময় বিষয়টি প্রায় উপেক্ষিত হয়। যেমন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রকল্পগুলোয় দলিত বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রান্তিক গোষ্ঠীর নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনে সেবার প্রাপ্যতায় প্রান্তিক জনগণ বৈষম্যের শিকার হয়।
অন্যদিকে প্রতিবন্ধিতা রয়েছে এমন ব্যক্তিরা অবকাঠামোগত নানা প্রতিবন্ধকতা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেক ক্ষেত্রে সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করার সুযোগই পায় না।
অতএব, বৈচিত্র্যময় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা কেবল আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার যেমন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনের জন্য নয়। বরং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় তাদের কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করার জন্যও জরুরি। এক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারে। পাশাপাশি তাদের ক্ষমতায়ন ও অধিকার নিশ্চিত করা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যেতে হবে।
সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশের পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চাহিদাগুলোকে রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক প্রতিটি খাতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। মানবিক অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এ গোষ্ঠীগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব ও সহায়তা দেয়া আবশ্যক। অর্থনৈতিক সংস্কারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রধান মাধ্যম। যদিও ধারণা করা হয় যে অর্থনৈতিক সংস্কার কেবল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাঠামো পুনর্গঠনের পরই কার্যকর হবে।
সর্বোপরি রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্কের ভিত শক্ত করতে নারী, আদিবাসী, শ্রমিক ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি স্থায়ী ও সাংবিধানিকভাবে বাধ্যতামূলক জাতীয় কমিশন গঠন করা জরুরি। এ কমিশন তাদের অধিকার রক্ষায় কাজ করবে। সমাজের যে অংশ এখনো প্রান্তিক মানুষদের পুরোপুরি মেনে নেয়নি, তাদের কথা মাথায় রেখে নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ এখন একটি অপরিহার্য দাবি।
তাসলিমা আক্তার: জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)