দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশ ও নেপালের গণ-অভ্যুত্থান দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দুই দেশেই তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জি, পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভকে রাজপথে নিয়ে আসে। তবে দুই আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল ভিন্ন। বাংলাদেশের আন্দোলনের সূত্রপাত সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে, আর নেপালের আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু দুই আন্দোলনের গভীরে ছিল প্রায় একই ধরনের প্রশ্ন রাষ্ট্র কি তরুণদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি জবাবদিহিমূলক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল কি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে?
অভ্যুত্থানের পর দুই দেশেই রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোয় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তন অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা বদলাতে পেরেছে সেখানেই দুই দেশের অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। দুটি দেশের অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি বড় মিল রয়েছে তরুণরা উভয় দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দুটি দেশের পথ ভিন্ন হয়েছে।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান দীর্ঘ রাজনৈতিক শাসনের শেষ ঘটিয়েছিল। এটি প্রথমে অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরে নির্বাচিত সরকার গঠনের পথ খুলেছিল। কিন্তু এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, দারিদ্র্য, বিনিয়োগের অভাব এবং কর্মসংস্থানের সমস্যা রয়েছে। নেপালে রাজনৈতিক পরিবর্তন জেন-জি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় এসেছে। অর্থনৈতিক দিকে নেপাল এখনো স্থিতিশীল রয়েছে, তবে কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগের অভাব রয়েছে। তাই দুটি দেশের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: গণ-অভ্যুত্থানের সাফল্য কেবল সরকার পতন দিয়ে মাপা যায় না। একটি আন্দোলন তখনই সফল হয় যখন রাজনৈতিক শক্তি সংস্কার, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রার উন্নতির দিকে রূপান্তর হয়।
বাংলাদেশ ও নেপাল এখন উভয়ই সেই পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে। তরুণরা রাজপথে পরিবর্তনের দরজা খুলেছে। কিন্তু সেই দরজার ভেতর রাষ্ট্র কতটা বদলাবে তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষমতার ওপর। অভ্যুত্থান ক্ষমতা বদলাতে পারে, কিন্তু একটি ন্যায়সংগত ও কার্যকর রাষ্ট্র তৈরি করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে অর্থনীতির পরিবর্তনগুলোর মধ্যে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। প্রবাসী আয় বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যায়, গণ-অভ্যুত্থানের পরে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মেজর ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবাসী আয় ছিল প্রায় ২৩ দশমিক ৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে। এক অর্থবছরে প্রবাসী আয় প্রায় ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের শিল্প ও জ্বালানি খাতে বর্তমানে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। এর ফলে মোট গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে ২ হাজার ১৭০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে, যেখানে দৈনিক চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ তখন দেশের চাহিদার মাত্র প্রায় ৫৭ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছিল।
এ সংকট শুধু বাসাবাড়ির রান্নার গ্যাস বা সিএনজি সরবরাহে সীমাবদ্ধ থাকেনি; শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। সেপ্টেম্বরেও পরিস্থিতির প্রভাব অব্যাহত ছিল। শিল্প-কারখানাগুলোকে বিকল্প হিসেবে ডিজেল বা অন্যান্য জ্বালানি ব্যবহার করতে হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। পোশাক, খাদ্য, সিরামিক ও ওষুধ শিল্পসহ বিভিন্ন খাত উৎপাদন কমানো, কাজের সময় পরিবর্তন কিংবা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে বাধ্য হয়েছে। নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য থেকে বাংলাদশ এগিয়ে যাচ্ছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের জেন-জি আন্দোলনের পর নেপালের অর্থনীতিতে প্রথমদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিঘ্ন ঘটে। আন্দোলনের সময় বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তবে পরবর্তী সময়ে দেশটির অর্থনীতিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা যায়। নেপাল রাষ্ট্র ব্যাংকের ২০২৬ সালের আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাসে নেপালের রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় প্রায় ১ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। প্রবাসী আয়ের এ প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৬ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে নেপালের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ২৫ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ রিজার্ভ দিয়ে দেশটি প্রায় ১৮ দশমিক ৮ মাসের পণ্য ও সেবা আমদানির ব্যয় মেটাতে সক্ষম। একই সময়ে নেপালের রফতানিও ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। তবে আমদানি আরো বেশি হওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। অর্থাৎ বৈদেশিক খাতে কিছু শক্তিশালী সূচক দেখা গেলেও নেপাল এখনো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির চাপের মধ্যে রয়েছে।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো মূল্যস্ফীতির বৃদ্ধি। ২০২৬ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে নেপালের ভোক্তা মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৫ দশমিক ৯৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যেখানে এক বছর আগে একই সময়ে তা ছিল মাত্র ১ দশমিক ৬৮ শতাংশ। খাদ্য ও পানীয়ের মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। বিশেষ করে ঘি ও তেল, ফল এবং পরিবহন ব্যয়ের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মতো সূচকে উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চাপ বেড়েছে।
সব মিলিয়ে, জেন-জি আন্দোলনের পর নেপালের অর্থনীতিতে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি বৈদেশিক খাতে পুনরুদ্ধার দেখা যাচ্ছে। রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের শক্তিশালী অবস্থান অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে। তবে মূল্যস্ফীতি ও বাণিজ্য ঘাটতি দেখাচ্ছে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ এবং জেন-জি আন্দোলন-পরবর্তী নেপালের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে কিছু মিল থাকলেও তাদের চ্যালেঞ্জের ধরন ভিন্ন। দুই দেশেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং জনগণের মধ্যে দ্রুত অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে বৈদেশিক খাতে উভয় দেশই প্রবাসী আয়ের ওপর গুরুত্বপূর্ণভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আন্দোলন-পরবর্তী অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, শিল্প উৎপাদনে বাধা এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা শিল্প ও পরিবহন খাতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। অন্যদিকে নেপালের ক্ষেত্রে আন্দোলনের পর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, আমদানিনির্ভরতা ও বাণিজ্য ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান শিল্প ও জ্বালানি খাতে, আর নেপালের ক্ষেত্রে বৈদেশিক বাণিজ্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ও নেপাল দুই দেশেই তরুণদের নেতৃত্বে বড় ধরনের গণ-আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। তবে আন্দোলন-পরবর্তী সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধরন এক নয়। বাংলাদেশে মূল পরিবর্তনের কেন্দ্র ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার, আর নেপালে আন্দোলনের পর পুরনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি তরুণ প্রজন্মের অনাস্থা এবং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা, আইন-শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুনভাবে সাজানোর দাবি সামনে আসে। ফলে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় জবাবদিহি, ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক অধিকার, মানবাধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে আন্দোলনের পর পুরনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তরুণদের অংশগ্রহণ নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব তাই শুধু সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়েও বিস্তৃত হয়েছে।
অন্যদিকে নেপালের জেন-জি আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তিতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, পুরনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের আধিপত্য, কর্মসংস্থানের সংকট এবং তরুণদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আন্দোলনের পর নেপালে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়। অর্থাৎ নেপালের ক্ষেত্রে আন্দোলনটি পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তরুণদের একটি শক্তিশালী সামাজিক অবস্থানকে সামনে নিয়ে আসে।
জুঁই খান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী