ডেঙ্গুতে চলতি বছর মৃতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক রোগী মারা গেছে কেবল চলতি মাসেই। পাশাপাশি বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা। তবে এসব সংখ্যায় হতবাক হওয়ার কিছু নেই। কেননা এ পরিস্থিতি আগে থেকেই অনুমেয় ছিল। একটি দেশে যখন কোনো সরকারের শাসন আমলে ডেঙ্গুর মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় না, তখন পরিস্থিতি অনুমান করা কোনো কঠিন কাজ নয়।
একসময় ডেঙ্গুকে ঢাকা ও বর্ষাকালের রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সর্বোচ্চ সংক্রমণ হতো আগস্টে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে রোগটি সারা দেশে ছড়িয়েছে এবং ২০২১ সাল থেকে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরেই সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হতে দেখা গেছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। একই সময়ে প্রায় দুই হাজার জন মারা যায় বলে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্যে উল্লেখ পাওয়া যায়। এদিকে চলতি বছর আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও এতে মৃতের সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী হওয়া শুরু হলে সেপ্টেম্বরে তা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। বাস্তবে সেটিই ঘটছে। অথচ প্রতি বছর বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে আগাম সতর্কবার্তা দেয়া হয়। প্রাক-বর্ষা জরিপের তথ্য ধরে কীটতত্ত্ববিদরা আগেই পূর্বাভাস দেন কোথায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি।
গত বছর জানুয়ারি থেকেই বিভিন্ন জেলায় এডিসের লার্ভার অস্বাভাবিক ঘনত্ব ধরা পড়েছিল, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১৩টি ওয়ার্ড চিহ্নিত হয়েছিল উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে। সংশ্লিষ্ট এক জরিপে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রজননস্থল হিসেবে সিমেন্টের পানির ট্যাংক, মেঝেতে জমা পানি, বহুতল ভবনের নাম উঠে আসে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা বারবার ডেঙ্গুর হটস্পট তথা এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে মনোযোগ দেয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। কিন্তু তৎকালীন সরকারকে এর পরও পর্যাপ্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
গত তিন বছরে দেশে নতুন করে দুটি সরকার গঠন হয়েছে। তার আগে দেড় দশক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সরকার ছিল। অর্থাৎ সরকার বদলাচ্ছে, কিন্তু ডেঙ্গুর চিত্র পরিবর্তন হচ্ছে না, ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।
বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তিন মাসের বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা অভিযানের উদ্বোধন করেছেন চলতি মাসে। অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু উদ্যোগ ইতিবাচক হওয়ার চেয়ে ফলপ্রসূ হওয়াটা জরুরি। যেখানে ডেঙ্গুর মৌসুম বর্ষাকাল শুরু হয়ে গেল এবং গত জুলাইয়ে ৩৬ ও আগস্টে ৪৩ জনের মৃত্যু হলো। তারপর বিশেষ অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। সবচেয়ে বড় কথা প্রাকৃতিকভাবে, ঋতু পরিবর্তনজনিত কারণে নভেম্বরের শেষ দিক থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমতে থাকে। তবু যদি তিন মাসের অভিযানে বিগত বছরের তুলনায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কমে তাহলে সরকার অবশ্যই সাধুবাদ পেতে পারে। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ নয়, প্রতিরোধে কাজ করা প্রয়োজন ছিল। তিন মাসের অভিযানের মাধ্যমে এটি সম্ভব নয়। রোগটির পরিবর্তিত ধরন অনুযায়ী বছরব্যাপী এটি প্রতিরোধের উদ্যোগ থাকা চাই। ডেঙ্গু রোগ ও রোগী ব্যবস্থাপনা হতে হবে বিজ্ঞানসম্মতভাবে।
ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়লে ঘোষণা আসে, অভিযান শুরু হয়, ফগিং মেশিনের ব্যবহার বাড়ানো হয়। অথচ সংক্রমণ বাড়ার পর বা কেবল ফগিং মেশিনের মাধ্যমে কীটনাশক ছিটিয়ে এডিস মশা বা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। উপরন্তু যথাসময়ে নিয়মিতভাবে কীটনাশক প্রয়োগ না করারও অভিযোগ রয়েছে। এদিকে কীটতত্ত্ববিদরা বহুদিন ধরে বলছেন, প্রাপ্তবয়স্ক মশার চেয়ে লার্ভা নির্মূল করাই প্রতিরোধের সহজ পথ। অথচ প্রতি বছর ডেঙ্গুর মৌসুম আসে, আর রোগীর চাপ বাড়ে, মৃতের সংখ্যা বাড়ে। দীর্ঘকাল ধরে এমন চিত্র দেখার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়া দায়িত্বে অবহেলারই প্রতিফলন। সব সরকারের পক্ষ থেকে ‘সর্বাত্মক চেষ্টার’ দাবি করা হয়, কিন্তু ফল না এলে জবাবদিহির নজির মেলে না।
অথচ বর্তমানে বিভিন্ন দেশ ডেঙ্গু প্রতিরোধে সফল। সিঙ্গাপুরে কোনো এলাকায় দুজন বা তার বেশি রোগী পাওয়া গেলেই সেটিকে ক্লাস্টার ধরে দ্রুত প্রজননস্থল ধ্বংস করা হয়, স্থানীয়দের সতর্ক করা হয়। নির্মাণকাজে ঠিকাদারদের পেস্ট কন্ট্রোল অফিসার ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে। অথচ দেশে বহুতল ভবন ও নির্মাণস্থলে এমন কার্যকর তদারকির ব্যবস্থা একেবারেই অপ্রতুল। সপ্তাহে একদিনের অভিযানের চেয়ে দেশেও এ ধরনের নিয়মিত, আইনি বাধ্যবাধকতাযুক্ত ব্যবস্থা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
ডেঙ্গু কেবল স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা নয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি নিষ্কাশনের দুর্বলতা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনার অবহেলা ও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা, সবকিছুরই ফল এটি। তাই সরকারের বিশেষ অভিযানকে সারা বছরের কর্মসূচিতে পরিণত করাই সমীচীন। প্রাক-বর্ষা জরিপের তথ্য ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, ট্যাংক ও নির্মাণস্থলে নিয়মিত পরিদর্শন এবং দায় নির্ধারণ করতে হবে। জরিপের ফল ওয়ার্ডভিত্তিক প্রকাশ্যে আনলে নাগরিকরাও নিজ এলাকার ঝুঁকি জানতে ও প্রশ্ন তুলতে পারবেন। ক্লাস্টারভিত্তিক দ্রুত সাড়া দেয়া দল গঠন, ভাইরাসের ধরনের প্রতি মনোযোগ এবং হাসপাতালের বাইরের মৃত্যুর হিসাব রাখার ব্যবস্থাও চাই। প্রতিরোধমূলক কাজের জন্য সারা বছরের বরাদ্দ নিশ্চিত করে তার ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করাও জরুরি। সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বও স্পষ্ট করে দিতে হবে, যাতে সংকটের সময় কেউ কারো দিকে আঙুল তুলতে না পারে। জনসচেতনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা রাষ্ট্রের দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না। সরকার ডেঙ্গু প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার না দিলে বর্তমান চিত্র পাল্টাবে না।