অভিমত

ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতা হবে না কেন?

বৃষ্টির পানির সঙ্গে, পলি, কঠিন বর্জ্য, চিকিৎসা বর্জ্য, নানা দূষক পদার্থ এবং গৃহস্থালি বর্জ্য সব মিলেমিশে একাকার হয়ে ভাসছে নগরজুড়ে।

মাঝ রাত থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি। ঘুম থেকে জেগে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেই শঙ্কা জাগল রাস্তার অবস্থা নিয়ে। রাস্তা কি পানিতে নিমজ্জিত, যানবাহন চলাচলের উপযোগী আছে কি? রাস্তায় পা দিতে গিয়ে যেন শঙ্কাই বাস্তবে রূপ নিল। অনবরত ঝরঝর বৃষ্টির পানি পালাবার পথ না পেয়ে বাসার সামনের রাস্তায় এসে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। অল্প পানি উপেক্ষা করে মূল সড়কে উঠতে চোখ চড়ক গাছ। এখানে তো আগের দিন সন্ধ্যায়ও একটা কোলাহলপূর্ণ রাস্তা দেখেছিলাম, সেটি কীভাবে রাতের আঁধারে নাই হয়ে গিয়ে নদীতে পরিণত হলো? রূপকথাকে হার মানিয়ে আবার সে নদীতে গাড়ি চলছে ভেসে ভেসে। সেই নদীতে ভাসছে বাঁশ, কাঠ, পলিথিন ব্যাগ, বোতল, স্যান্ডেল, জুতা থেকে শুরু করে মানুষের অনবরত এখানে-সেখানে ফেলা নানা রুচিপূর্ণ কিংবা রুচিহীন দ্রব্য। গতদিন বাস থেকে যে চিপসের প্যাকেট, পানি ও জুসের বোতল যাত্রী অবলীলায় পথচারীর মাথার ওপর ছুড়ে ফেলেছিল সেটিও আজ পানিতে ভাসছে, আনন্দে দোল খাচ্ছে। আহা! এটিই আমাদের স্বপ্নের নগরী(!) প্রিয় শহর ঢাকা, যেখানে সড়ক হঠাৎ করেই নদী কিংবা খালে রূপান্তর হতে পারে।

এ স্বপ্নের শহরে ফুটপাত আছে, অনেক উন্নত দেশের তুলনায় প্রশস্ত রাস্তা আছে। সেই ফুটপাত আর রাস্তাকে ঘিরে স্বপ্ন নিয়ে সারা দেশের লোক পানির ঢলের মতো এ নগরে আসে। সে স্বপ্নের অধিকাংশটা জুড়ে থাকে ফুটপাত কিংবা রাস্তায় কিছু জিনিস নিয়ে দোকান খুলে বসা এবং এটিই জীবিকার মাধ্যম হিসেবে নেয়া। রাজনীতিকদের স্বপ্ন হলো এসব লোকজনকে ঘিরে তাদের উপার্জন বাড়ানো, এদের ব্যবহার করে রাজনীতির মাঠে শক্তি প্রদর্শন। অতএব দুই স্বপ্ন মিলে নতুন এক স্বপ্নের নগরীর গোড়াপত্তন হয় যেখানে ফুটপাত, রাস্তা বস্তুত দোকানপাটে পরিণত হয়। সকালে যে পথ দিয়ে গন্তব্যমুখী হচ্ছিলাম সেটি মিরপুর ১ নম্বর থেকে শ্যামলী অভিমুখ। সনি স্কয়ার থেকে টেকনিক্যাল অভিমুখী রাস্তার দুই পাশে ফুটপাতজুড়ে সারি সারি দোকান, পাইকপাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের সামনের ফুটপাত এবং রাস্তার অর্ধেকজুড়ে কাঁচাবাজার সারা দিন যানজট লাগিয়ে রাখে। এসব বাজার, দোকান থেকে বর্জ্য ফেলা হয় অবলীলায়, বর্জ্য কোথায় যাবে কিংবা যাচ্ছে এ নিয়ে ভ্রুক্ষেপ নাই কারো। যত্রতত্র ফেলা ময়লার একটা অংশ যানবাহনের চাকায় ভর করে ছড়িয়ে পড়ে নগরীর নানা অংশে, কিছু ছড়িয়ে থাকে রাস্তাজুড়ে আরেকটা অংশ জমা হয় রাস্তার পানি নিষ্কাশনের নালার মুখে। ভারি বৃষ্টি হলেই এ আবর্জনা পানি নিষ্কাশনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং রাস্তাকে নদী কিংবা খালের আকার দেয়। ঢাকা শহরের অধিকাংশ এলাকার চালচিত্র তো এ রকমই!

চারশ বছর অতিক্রম করে আজ ঢাকা নগরী যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানে কত লোক বসবাস করতে পারে? সংখ্যাটি যদি হয় তিন কোটির মতো, তাহলে তা আকাশ থেকে পড়ে অক্কা পাওয়ার অবস্থা ঘটাতে পারে, তার পরও এটাই সঠিক। এত লোকের ভার বইতে গিয়ে, তাদের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে ঢাকা তার ধমনী, শিরা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সক্ষমতা হারিয়ে নিশ্চল হয়ে পড়েছে। এ শহরের বুকজুড়ে যেসব খাল, জলাভূমি ছিল সেগুলো শিরা ও ধমনী যেমন শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে রক্ত প্রবাহের মাধ্যমে সচল রাখে তেমনি ঢাকাকে প্রাণবন্ত রেখেছে শত শত বছর ধরে। মানুষ তার জীবিকা ও আবাসনের নামে এ শহরের শিরা, উপশিরার মতো বিন্যস্ত খাল, নদী, জলাভূমিগুলো ভরাট করে নিজের আবাসন গড়েছে, নিশ্বাসে অক্সিজেন সরবরাহের কারখানা বনভূমি ধ্বংস করে সেখানে রাস্তাঘাট ও আবাসন নির্মাণ করেছে এবং গড়ে তুলেছে কংক্রিটের জঙ্গল যেখানে প্রাণের অস্তিত্ব বেমানান। এ কংক্রিটের জঙ্গলে এক ফোঁটা পানি এসে হাজির হলেও যে সরে যাওয়ার রাস্তা নাই, ভূগর্ভে চলে যাওয়ার পথও বন্ধ।

এ শহরে সারা দেশ থেকে ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য মানুষ ছুটে এসে শহরটির জন্য দুর্ভাগ্য বয়ে এনেছে। সবার চাহিদা মেটাতে গিয়ে দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ হয়েছে এখানে, ফলে ক্রমাগত জলাশয়, জলাভূমি ও জলপ্রবাহের পথ সংকুচিত ও বিলুপ্ত হয়েছে, যা বৃষ্টিজনিত বন্যা এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় অচলাবস্থার সৃষ্টি করছে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে বর্ষাকালে নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে এ সমস্যার প্রকোপ দিন দিন কেবলই বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলাবদ্ধতা যেন আরো বাড়ছে এবং নগরবাসীদের জন্য একটি বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে এবং কুফল ভোগ করছে সুখের আশায় মরিয়া হয়ে ছুটে আসা লোকজনই। পূরো নগরী যেন অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এ নগরীর বাতাস বিষাক্ত, পানি দূষিত মাটি দূষিত। এত দূষণ আর বিষের মাঝে যারা বসবাস করছেন তাদের সুস্থ থাকার কী কারণ থাকতে পারে?

বৃষ্টির পানির সঙ্গে, পলি, কঠিন বর্জ্য, চিকিৎসা বর্জ্য, নানা দূষক পদার্থ এবং গৃহস্থালি বর্জ্য সব মিলেমিশে একাকার হয়ে ভাসছে নগরজুড়ে। রাস্তার পাশে সিটি করপোরেশনের অপসারণ না করা বর্জ্যের স্তূপ জমে থাকে প্রায়ই, কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানি রাস্তা থেকে সেই আবর্জনা ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে, এর ফলে ভূমিক্ষয় ও পলি জমার সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত জলাবদ্ধতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির সব কর্মযজ্ঞও যেন শুরু হয় বর্ষাকালেই, ফলে জলাবদ্ধতার ভোগান্তি আরো বেড়ে যায়।

এ নগরীতে জলবদ্ধতা কেবল ভারি বৃষ্টিপাত ও চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনারই ফল নয়, বরং এর পাশাপাশি এলোমেলোভাবে গড়ে ওঠা অবকাঠামো ও শহুরে পরিবেশে সৃষ্ট পরিবর্তনেরও ফলাফল। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড খুব কি মানা হচ্ছে? এমনও দেখা যায় ড্রেন দখল করে ভবন হচ্ছে, রাস্তা হচ্ছে। এ কারণে বিশেষ করে বর্ষাকালে নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ার জলাবদ্ধতা সমস্যাটির প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। এভাবেই ঢাকার রাস্তা বর্ষাকালে খাল কিংবা নদীতে পরিণত হচ্ছে আর অদেখা ম্যানহোলগুলো সাগরের তলায় গভীর খাদের মতো কাকে কোথায় কখন ডুবিয়ে দিচ্ছে সেটি অনুমান করাও দুঃসাধ্য।

ঢাকার ফুটপাত এবং সড়ক দখল পুরনো বিষয় কিন্তু এর কোনো সুরাহাও লক্ষ করা যাচ্ছে না, বরং দিন দিন পরিধি যেন আরো বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, নগরীর প্রায় ৬০ শতাংশ ফুটপাতই অবৈধভাবে অস্থায়ী দোকানপাট, নির্মাণসামগ্রী এবং পার্ক করা যানবাহনের দখলে থাকে। এ নগরীতে জীবিকার জন্য লাখ লাখ প্রান্তিক মানুষ ফুটপাতে পণ্য বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। প্রায় তিন কোটি মানুষের এ বিশাল মহানগরে যেখানে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, সেখানে ফুটপাতের এ অস্থায়ী দোকানগুলোই তাদের টিকে থাকার অবলম্বন; এ কারণেই উচ্ছেদ অভিযানের পর পরই বিক্রেতারা আবার ফুটপাতে ফিরে আসেন। এর পেছনে আমাদের নগর পরিকল্পনা ও নীতির দুর্বলতা লক্ষণীয়। যুগ যুগ ধরে দেশের সবকিছুকে রাজধানীকেন্দ্রিক করে গড়ে তোলার কারণে সারা দেশের মানুষ সব সমস্যার সমাধান রাজধানীতে নিহিত বলে মনে করে আর সে কারণে বানের পানির মতো এখানেই ছুটে আসে।

পুরো ঢাকাকে যদি মাছের বাজার, কাঁচাবাজার কিংবা টং দোকানের শহর বলা হয় তাও অত্যুক্তি হবে না। যেখানে-সেখানে গড়ে তোলা এসব স্থাপনা স্বাভাবিকভাবে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করছে প্রতিনিয়ত। এই যে রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে নানা স্থাপনা তৈরি করে হচ্ছে, এগুলো যে কেবল শুধু গরিব-দুঃখী মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য করছে—তা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে রাজনীতি, চাঁদা-বাণিজ্য যে কথা শুরুতে বলেছিলাম। পত্রপত্রিকা খুললেই দেখি এসব দখলদারত্বের পেছনে দেখা যায় গভীর শেকড় গেড়ে থাকা চাঁদাবাজি চক্রের সক্রিয় কর্মকাণ্ড। স্থানীয় দুর্বৃত্ত, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তি হকারদের কাছ থেকে দৈনিক বা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে ঘুস আদায় করে থাকে; এর ফলে ফুটপাত দখল একটি লাভজনক, সুসংগঠিত ও অবৈধ ব্যবসায় পরিণত হচ্ছে এমন খবর প্রায়ই দেখা যায়। কোনো সরকারি বা সর্বজনীন স্থান কি বেসরকারি ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের দখলে থাকতে পারে? এসব অবৈধ স্থাপনাকে যে এত দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে তা সত্যিই বিস্ময়কর। এ নানা বিস্ময়কর কর্মকাণ্ড ঢাকার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।

পানিপ্রবাহের সব পথ দখল করে, দূষণের মাধ্যমে নিশ্বাস নেয়ার সব পথ চেপে ধরে একটি নগরীকে যখন মৃতপ্রায় করে তোলা হলো তখন সে আর নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার সক্ষমতা রাখে না। তাই ঢাকা শহর পানিতে ডুববে, এখানে জলাবদ্ধতা হবে, একটু বৃষ্টি হলে রাস্তা-খাল কিংবা নদীতে পরিণত হবে এটাই স্বাভাবিক।

ড. এএসএম সাইফুল্লাহ: অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও