আমলাতন্ত্র

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ জনপ্রশাসনে ক্ষোভ হতাশা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণ

এ কথা অনস্বীকার্য যে কোনো কার্যক্রমে সফলতার জন্য নবীন-প্রবীণ, শক্তি, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা, উদ্যমতা সবকিছুরই দরকার আছে। বিশ্বব্যাপী তাই তরুণদের সঙ্গে অভিজ্ঞদের সংমিশ্রণে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়।

এ কথা অনস্বীকার্য যে কোনো কার্যক্রমে সফলতার জন্য নবীন-প্রবীণ, শক্তি, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা, উদ্যমতা সবকিছুরই দরকার আছে। বিশ্বব্যাপী তাই তরুণদের সঙ্গে অভিজ্ঞদের সংমিশ্রণে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে অভিজ্ঞতা বাড়ে। তবে সবার অভিজ্ঞতা একই গতিতে একই দিকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় না। যাদের ইচ্ছাশক্তি, কর্মস্পৃহা প্রবল, চিন্তাশক্তি তীক্ষ্ণ, পর্যবেক্ষণ ইচ্ছা বেশি, গতিময়তা বেশি, ঝুঁকি গ্রহণ প্রবণতা বেশি তাদের অভিজ্ঞতা প্রখর বা বৈচিত্র্যময় হয়। দেখা গেছে, একই পরিবেশে বা একই কর্মে নিয়োজিত থাকলেও কারো অভিজ্ঞতা বেশি কারো বা কম। তবে সাধারণ্যে ধারণা এই যে যার বয়স বেশি তার অভিজ্ঞতা বেশি, যা সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

এ অভিজ্ঞদের তথা অভিজ্ঞতার যথাযথ ব্যবহার করা সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক। ক্রমপুঞ্জীভূত অভিজ্ঞতা একটি অক্ষয়িষ্ণু সম্পদ, উৎপাদনের উপকরণ, উৎকর্ষের ধারক। এর ব্যবহার যতই বাড়বে বা প্রয়োগ হবে এর ভাণ্ডার ততই সমৃদ্ধি লাভ করবে। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে রাষ্ট্রকে তার সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। অন্যদিকে অভিজ্ঞতার যথাযথ ব্যবহার করা অভিজ্ঞদের জন্য সুখকর। এতে তাদের সন্তুষ্টির কারণ হতে পারে, সামাজিক সম্মান অর্জিত হতে পারে এবং মেধা আর অভিজ্ঞতার সঠিক মূল্যায়ন হতে পারে।

নির্বাহী বিভাগ বা জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নানাবিধ কারণে বহুল সমালোচিত। এ বিষয়ে সবাই একমত হবেন যে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ যতই কম অনুশীলন করা হবে ততই মঙ্গল। একটি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বেশ কয়েকজনের কর্মজীবন পরিকল্পনায় (Career Planning) খড়্গ হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাছাড়া কর্মরত যোগ্যদের সেবা রাষ্ট্র বা সেবাপ্রত্যাশীরা পায় না। অন্যদিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ জনপ্রশাসনে ক্ষোভ-হতাশা বাড়ায়, কর্মরতদের দায়িত্ব পালনে আগ্রহ হ্রাস করে, সর্বোপরি জনপ্রশাসনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। তদুপরি ব্যতিক্রম হিসেবে ক্ষেত্রবিশেষে তার প্রয়োজন হতে পারে। প্রথমত, যখন কারিগরি বা বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন ও অভিজ্ঞ লোকজনের প্রয়োজন হয়, যাদের বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, যাদের স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেয়া সম্ভব নয় বা প্রকল্পভিত্তিক কাজের জন্য যোগ্য কর্মকর্তা ওই সময়ের জন্য পাওয়া না গেলে। তৃতীয়ত, জরুরি ভিত্তিতে বা বিশেষ পরিস্থিতিতে দ্রুত জনবল সংগ্রহের প্রয়োজন হলে যখন স্বল্পতার কারণে চাকরিরতদের পদায়ন সম্ভব নয়। এসব অনিবার্য ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়, দলীয় আনুগত্য বিবেচনায়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, চাকরিকালীন কর্মকর্তা থেকে প্রাপ্ত সুবিধা ও আনুকূল্যের প্রতিদান, তোষামোদির মাধ্যমে এবং কখনো কখনো ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ ফর্মূলায়। নির্বাহী বিভাগে বা জনপ্রশাসনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে চাকরিকালীন অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় নেয়া হয় না।

একটি উদাহরণ দেয়া যায়, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত কারণেই বলা যায় তারা জ্ঞান, বিজ্ঞান, সমসাময়িক বিষয়, আইন, বিধিবিধান ও কারিগরি উৎকর্ষ প্রভৃতি বিষয়ে অভিজ্ঞ। কিন্তু লক্ষণীয় যে জনপ্রশাসনের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকে অবসরপ্রাপ্তদের সাধারণত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয় না। জানামতে, স্বাধীনতার পর অদ্যাবধি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকে অবসরে যাওয়া কাউকে কোথাও, এমনকি পাবলিক সার্ভিস কমিশনেও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়নি।

সরকারি চাকরি আইন ২০১৮-এর ৪৯ ধারা অনুযায়ী, অবসরে যাওয়ার পর সরকার অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি জনস্বার্থে যেকোনো কর্মচারীকে সরকারি চাকরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে পারবেন। এক্ষেত্রে কোন পদে কোন যোগ্যতার প্রয়োজন, কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন করা হবে, কোনো সুপারিশের প্রয়োজন আছে কিনা, সার্চ কমিটির মাধ্যমে হবে কিনা সেসবের কোনো উল্লেখ নেই। বিধি দ্বারা বর্ণিত বিধানমতে করা হবে মর্মেও উল্লেখ নেই। ওই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে আইনের ৫৯ ধারামতে সরকারের বিধি প্রণয়ন করার এখতিয়ার থাকলেও অদ্যাবধি চুক্তিবিষয়ক তথা ৪৯ ধারা বিষয়ে কোনো বিধি প্রণয়ন করা হয়নি।

উল্লেখ্য, ক্ষেত্রবিশেষে সংশ্লিষ্ট আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কোনো কোনো কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সার্চ কমিটির মাধ্যমে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করার বিধান রয়েছে। সরকারি চাকরি আইনে অবসরপ্রাপ্তদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে কর্মকর্তা নির্বাচন করার পদ্ধতি কী? বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯(১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হবেন। ২০(১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে, যে ‘‌কর্ম হইতেছে কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের পক্ষে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয়’ কিংবা অনুচ্ছেদ ২৯(১) মতে ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে’। অর্থাৎ নিয়মিত, খণ্ডকালীন, স্থায়ী-অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক যেকোনো ধরনের পদে বা কর্মে যোগ্যতানুযায়ী নিয়োগের নিশ্চয়তা সংবিধানে সমুন্নত। সংবিধানের এসব বিধানকে কার্যকর করা অবশ্য কর্তব্য। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ যোগ্যতার মাপকাঠিতে সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন।

বর্ণিত ক্ষেত্রগুলোয় সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব বা যেকোনো পদমর্যাদার কর্মকর্তাই হোক অবসরের পর প্রয়োজনবোধে তাদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে বা পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করে রাষ্ট্র উপকৃত হতে পারে। এ বিষয়ে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা না হলে মেধা বা অভিজ্ঞতার অপচয় ও অপপ্রয়োগ হতে পারে। নিয়মিত চাকরিকালীন কর্মজীবন পরিকল্পনা যেমন সরকার বা কর্তৃপক্ষকে অধিকতর সুফল দিতে পারে তেমনি এক্ষেত্রেও অভিজ্ঞতা বা বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের পরিপূর্ণ প্রয়োগের নিশ্চয়তা বিধান করতে পারলে সমাজ কিংবা রাষ্ট্র উপকৃত হতে পারে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে সাধারণ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, হতাশা ও নৈরাজ্য নিরসনকল্পে এ ব্যাপারে দুটো প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে।

প্রথম প্রস্তাব: অবসরের নির্ধারিত সময়ের এক মাস আগে কর্মকর্তারা তাদের স্ব-স্ব কর্তৃপক্ষের কাছে অবসরের বিষয়ে যে আবেদনপত্র দেন তার সঙ্গে তার জীবনবৃত্তান্ত জমা দেবেন। এ জীবনবৃত্তান্তে তার চাকরিজীবনের বাইরের যাবতীয় অর্জন, প্রাপ্তি, অ্যাওয়ার্ড, কৃতিত্ব, বিশেষ আগ্রহ, পারদর্শিতা সবকিছুর বর্ণনা থাকবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পিএসসি থেকে সংগৃহীত পিডিএস এবং কর্মকর্তা কর্তৃক প্রদত্ত জীবনবৃত্তান্ত একীভূত করে আগেই ডিজাইন করা ফরমেট অনুযায়ী সম্পূর্ণ জীবনবৃত্তান্ত প্রস্তুত করবে। এ কাজ নিয়মিত করা হবে এবং তা করার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে নির্ধারিত একটি সেল থাকতে পারে।

অন্যদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, পিএসসির চেয়ারম্যান, সিএজি, জনপ্রশাসন সচিবকে (সদস্য সচিব) নিয়ে ‘‌চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুপারিশ কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে পদসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবকেও অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। যেমন প্রতিযোগিতা কমিশনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে বাণিজ্য সচিবকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকারের কার্যবিধিমালা ১৯৯৬ অনুসারে সব মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হতে পারে এবং সব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পদগুলোর তালিকা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংরক্ষণ করবে। পদগুলোর কর্মপরিধি ও পদসংশ্লিষ্ট বেতন-সম্মানী ও ভাতাদি স্ব-স্ব মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করে কমিটি তথা কমিটির সচিবালয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবে। যথাসময়ে নিয়োগ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে পদ বা পদগুলো শূন্য হওয়ার ন্যূনতম এক মাস আগে কমিটি কার্যক্রম শুরু করবে। কমিটি আবেদনপত্র, জীবনবৃত্তান্ত ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়াদি পর্যালোচনাপূর্বক প্রতিটি পদের বিপরীতে দুজনের নাম প্রস্তাব করবে যেখান থেকে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে একজনকে নিয়োগ দেয়া হবে। এ প্রক্রিয়া অনুসরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনবোধে সরকারের কার্যবিধিমালার তফসিল এক (Allocation of Business among the Different Ministries and Divisions)-এর সংশোধন করা যেতে পারে।

বিকল্প প্রস্তাব: চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে কর্মকর্তা বাছাইয়ের বিকল্প প্রস্তাবটি খুবই সাধারণ ধারণার, বহুল ব্যবহৃত, যৌক্তিক ও সংবিধানের ২৯(১) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নির্দিষ্ট পদ শূন্য হওয়ার যুক্তিসংগত পূর্বে প্রার্থীদের আগ্রহ আমন্ত্রণ করে পদসংশ্লিষ্ট যাবতীয় তথ্যাবলি উল্লেখপূর্বক ব্যাপক প্রচার করা হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমাকৃত আবেদনপত্রগুলো বাছাই করে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হবে। মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডের সদস্য থাকবেন উপরোল্লিখিত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুপারিশ কমিটির সদস্যরা। বোর্ডের সুপারিশক্রমে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে চূড়ান্তভাবে কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হবে। প্রথম প্রস্তাবের মতো এক্ষেত্রেও সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

এ দুটো একেবারে প্রাথমিক প্রস্তাব। এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চূড়ান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। এতে একদিকে মেধা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন হবে, ন্যায়ভিত্তিক নিয়োগ সম্পন্ন হবে, দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি হ্রাস পাবে, রাষ্ট্র ও সমাজ উপকৃত হবে, অধিকতর জনসেবা নিশ্চিত হবে; অন্যদিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে।

সিকদার আনোয়ার: অবসরপ্রাপ্ত সচিব ও সাবেক রেক্টর, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন একাডেমি

আরও