পাল্টা শুল্ক কার্যকরের সময়সীমা বাড়ছে: যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের চুক্তি হওয়া নিয়ে উদ্বেগ ও সংশয়

নতুন পাল্টা শুল্কে ঝুঁকির মুখে পড়বে রফতানি খাত

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর গত ২ এপ্রিল উচ্চ হারে পারস্পরিক বা পাল্টা শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) আরোপ করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে তা তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন তিনি।

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর গত ২ এপ্রিল উচ্চ হারে পারস্পরিক বা পাল্টা শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) আরোপ করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে তা তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন তিনি। সে সময়সীমা শেষ হবে আজ বুধবার। এ সময়ের মধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দরকষাকষি শুরু হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকেও পাল্টা শুল্ক বিষয়ক বাণিজ্য চুক্তির খসড়া পাঠিয়েছে দেশটি। চুক্তির খসড়ার ওপর এরই মধ্যে মতামত পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। এ মতামত যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো চুক্তির খসড়ার বিপরীতে লিখিতভাবেই জানানো হয়েছে। এর ভিত্তিতে একটি সভা হয়েছে। আরেক দফা সভা হবে আজ। উভয় পক্ষ সব বিষয়ে একমত হলে দ্রুতই চুক্তি সম্পন্ন হবে। তবে চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক বিষয়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। কিন্তু এ আলোচনার মধ্যেই সোমবার নতুন শুল্কহার ঘোষণা করে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশকে চিঠি দিয়েছেন ট্রাম্প। চিঠিতে বাংলাদেশী পণ্যে ৩৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়া হয়। এতদিন বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ। কিন্তু ৩৫ শতাংশের সঙ্গে যদি ১৫ শতাংশ যোগ হয় তাহলে তা দাঁড়াবে ৫০ শতাংশে। যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানিতে এ বড় অংকের শুল্কহারে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক খাত, কারণ যুক্তরাষ্ট্রই বাংলাদেশী পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। তবে নতুন শুল্কহার ঘোষণা দেয়া হলেও তা কার্যকর হবে আগামী ১ আগস্ট থেকে। এ পর্যন্ত আলোচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ উচ্চশুল্ক আলোচনার মাধ্যমে কমাতে না পারলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রফতানি খাত।

বর্তমানে শুল্কহার ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের শুল্ক চুক্তির বিভিন্ন শর্ত বা দিক নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। এ চুক্তির অনেক শর্ত কোনো সার্বভৌম দেশের পক্ষে মানা কঠিন বলে মনে করছেন অনেকেই। ক্ষেত্রবিশেষে এ বিষয়গুলো ট্যারিফ হারের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, সেটা বাংলাদেশকেও অনুসরণ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো একটি দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, সেটাও বাংলাদেশকে অনুসরণ করতে হবে। কোনো দেশের ওপর যদি তারা অতিরিক্ত কোনো শুল্ক আরোপ করে, তাহলে বাংলাদেশকেও তা করতে হবে। এছাড়া নির্দিষ্ট একটি দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও সমরাস্ত্রবিষয়ক কোনো ইস্যুতে বাংলাদেশ জড়াতে পারবে না—এমন শর্তও দেয়া হয়েছে।

এ ধরনের বিষয় নিয়ে অতীতেও তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বাংলাদেশকে। মার্কিন পিএল-৪৮০ খাদ্যসহায়তা কার্যক্রমের একটি শর্ত হলো, কোনো দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ আরোপ করলে সে দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনকারী দেশ এ কার্যক্রমের আওতায় সহায়তা পাবে না। তবে অকৌশলগত কৃষিপণ্য ও কৃষি উপকরণ এবং চিকিৎসাপণ্য সরবরাহের কিছু ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাবলে ছাড় দেয়ার সুযোগ ছিল এতে।

এদিকে সেসময় কিউবার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল বাংলাদেশ। ১৯৭৪ সালে কয়েক মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ মূল্যে ৪০ লাখ পাটের থলে বিক্রির জন্য কিউবার সঙ্গে এক চুক্তি করে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি)। সমাজতান্ত্রিক কিউবার ওপর সে সময় বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সঙ্গে এ বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়াসের বিষয়টিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত সে সময় তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে সাক্ষাৎ করেন। এ চুক্তির বিষয়টিকে পিএল-৪৮০ খাদ্যসহায়তা প্রতিশ্রুতির লঙ্ঘন বলে দাবি করেন ডেভিড বোস্টার। সমাজতান্ত্রিক কিউবার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্কের অজুহাতে তখন আমেরিকার পিএল ৪৮০-এর গমভর্তি জাহাজ ফিরিয়ে নেয় হয়। এতে খাদ্য সংকটে থাকা বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ ত্বরান্বিত হয়ে ওঠে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত বা আলোচনাধীন শুল্ক চুক্তিতে থাকা দেশটির পররাষ্ট্রনীতিকে নিঃশর্তভাবে অনুসরণের শর্তগুলো শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকেও গভীর উদ্বেগের বিষয়। এটি বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ। যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং বাংলাদেশ তা অনুসরণ করে, তাহলে বাংলাদেশকে সেই দেশের বাজার হারাতে হতে পারে। সে দেশের সঙ্গে যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা গার্মেন্ট কোম্পানির চুক্তি ছিল, সেগুলো বাতিল বা ঝুঁকির মুখে পড়বে। এছাড়া ওইসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক স্বাধীনতা ও কৌশলগত সহযোগিতা বাধাগ্রস্ত হবে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হওয়া বাংলাদেশের প্রধান পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক। এছাড়া অন্য পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে হেডগিয়ার, জুতা, অন্যান্য বস্ত্রপণ্য, পালক ও পালক দ্বারা তৈরি সামগ্রী, চামড়াজাত পণ্য, মাছ, শস্যদানা, আসবাব প্রভৃতি।

একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশী রফতানি পণ্যের প্রধান গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক পণ্য রফতানিতে গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। এ হারে শুল্ক নিয়েও ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ৭৩৪ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে, যা ছিল ২০২৩ সালের তুলনায় বেশি। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থমূল্য বিবেচনায় দেশটিতে মোট রফতানির ৮৭ শতাংশই তৈরি পোশাক। নতুন ৩৫ শতাংশ শুল্ক বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পণ্যের মূল্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের জন্য ব্যয়বহুল হবে এবং অন্যান্য শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কের দেশ থেকে পণ্য কেনার প্রবণতা বাড়াতে পারে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে বাংলাদেশের রফতানি আদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা সরাসরি তৈরি পোশাক কারখানার উৎপাদন হ্রাস এবং শ্রমিক ছাঁটাইয়ের কারণ হতে পারে। তৈরি পোশাক খাতে ৫০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করছে, যাদের অধিকাংশই নারী। তাই এ শুল্কের প্রভাব বাংলাদেশের কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রফতানি আয়ে পতন ঘটলে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়বে। এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সরকারের পক্ষ থেকে গত তিন মাসে যে আলাপ-আলোচনার কথা বলা হয়েছে, তাতে তেমন কোনো অর্জন নেই, তা ট্রাম্পের চিঠিতে স্পষ্ট। সরকার এখনো আলাপ-আলোচনার কথা বলছে। কিন্তু এর জন্য সময় খুবই কম।৷ এ বিষয়ে ইতিবাচক কোনো সমাধানে আসতে হলে সরকারকে দ্রুত অগ্রসর হতে হবে। তা না হলে দেশের রফতানি খাতের জন্য বিপর্যয়কর হবে। তৈরি পোশাকে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম এগিয়ে গেছে,৷তার জন্য মাত্র ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের চেয়ে অর্ধেক।৷ ভারতের সঙ্গে সমঝোতা হচ্ছে। ৷চীনের সঙ্গে চুক্তি হয়ে গেছে।৷ অর্থাৎ বাংলাদেশের সঙ্গে যারা প্রতিযোগিতা করছে, তাদের থেকে পিছিয়ে পড়ছি আমরা।৷ এখন বাংলাদেশ যদি ভালো কোনো চুক্তি না করতে পারে তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকসহ দেশের সব পণ্যই হুমকির মুখে পড়বে। আবার এ চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বাধীন পরাষ্ট্রনীতির অনুসরণ তথা সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

আমাদের রফতানিমুখী পণ্য এমনিতেই কম, তার মধ্যে আবার সিংহভাগ নিয়ে রেখেছে তৈরি পোশাক। এ খাতের সিংহভাগ পণ্য আবার রফতানি হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে। ভবিষ্যতে যাতে এখনকার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয় সেজন্য রফতানি পণ্য ও রফতানি গন্তব্যে বৈচিত্র্য আনার দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের রফতানির বাজার মাত্র দুই-তিনটি দেশের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা রয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে দেশকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে যাওয়া দরকার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকার উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করা উচিত। দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য খাতেও সংস্কার জরুরি। এর মধ্যে আছে শুল্ক কমানো, অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা হ্রাস ও আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ। এসব সংস্কার কেবল বাণিজ্য আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করবে না; বরং উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ ও খাতভিত্তিক বৈচিত্র্যকরণেও সহায়তা করবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতেও এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আমাদের শিল্প ও রফতানিমুখী খাতকে কীভাবে টেকসই করা যায় তার পথ অনুসন্ধান করতে হবে।

আরও