অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি যুগের সমাপ্তি ঘটল। উদারপন্থী বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার আমৃত্যু সক্রিয় একজন চিন্তককে আমরা হারালাম। বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হককে দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়— সার্বক্ষণিক উদারবাদী চিন্তাবিদ।
তার লেখকসত্তার উন্মেষ ষাটের দশকে, ছাত্রজীবন থেকেই। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পরেই ‘মুক্তিসংগ্রাম’ প্রকাশিত হয়। ১৯৭২ সালে রচিত বইটির বিষয় বাংলাদেশের অভ্যুদয়; তার লেখা প্রথম গ্রন্থ। সে হিসেবে গ্রন্থকার আবুল কাসেম ফজলুল হক স্বাধীন রাষ্ট্র-বাংলাদেশের সমান বয়সী। এরপর তিনি রাষ্ট্র, সমাজ, ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে লিখেছেন ও সম্পাদনা করেছেন শতাধিক বই এবং প্রদান করেছেন অসংখ্য বক্তৃতা।
১৯৮২ সাল থেকে তার সম্পাদনায় নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে সমাজ-রাষ্ট্র ও সাহিত্য বিষয়ক পত্রিকা ‘লোকায়ত’। সুদীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে লেখা, সম্পাদনা ও বক্তৃতা মিলিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে তার যে অবস্থানটিকে চিহ্নিত করা যায়, তা একজন কর্মী-লেখকের অবস্থান।
আন্তর্জাতিকতা, বহুত্ববাদ, উদার মানবতাবাদ এমন বিভিন্ন সদর্থক উপাদান তার লেখকসত্তায় বিরাজমান থাকলেও আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রধানত জাতীয়তাবাদী ধারার লেখক এবং এই জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ, উদারনৈতিক জাতীয়তাবাদ।
কেন লিখেছেন তিনি? এমন প্রশ্নের উত্তর তার প্রায় সব লেখাতেই পাওয়া যায়; আর তা হলো—‘জাতির উন্নততর নতুন ভবিষ্যৎ সৃষ্টির গরজে’। এই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে নিয়েই তার লেখকসত্তার অভিযাত্রা। আবুল কাসেম ফজলুল হক যেমন শিল্পনির্মাণ বা ভাষার অলংকার নির্মাণের জন্য লেখালেখি করেন না, একইভাবে সাহিত্যবিষয়ক আলোচনার ক্ষেত্রেও ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ জাতীয় সাহিত্যকে সযত্নে এড়িয়ে যান; কখনো সমালোচনাও করেন।
বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরে রাজনীতির নানা ধরনের পরিবর্তন, উত্থান-পতন, সম্মুখ-পশ্চাৎ ঘটেছে। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ হবার আগেও এর রাজনৈতিক ঘটনা ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পরম্পরা আছে। লেখক ও চিন্তক হিসেবে আবুল কাসেম ফজলুল হক সেসবের প্রত্যক্ষ ভাষ্যকার। সময়ও সবসময় লেখকের অনুকূলে ছিল না। কিন্তু লেখার উদ্দেশ্য থেকে আবুল কাসেম ফজলুল হক বিচ্যুত হননি। তার প্রায় ষাট বছরের গ্রন্থ-প্রবন্ধ-বক্তৃতা সেই সাক্ষ্য দেয়।
আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রধান দায়বদ্ধতা তার চারপাশের মানুষের প্রতি, যে মানুষগুলোকে নিয়েই তার অস্তিত্বের সমগ্রতা। এই মানুষগুলো কালের পরম্পরায় শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত। এই শোষিত জনতার পক্ষে বলার মধ্য দিয়ে তাদের উন্নততর জীবন প্রত্যাশা, সমস্যার অনুসন্ধান ও সম্ভাবনার পথ নির্দেশ করার মাধ্যমে লেখক ফজলুল হক তার লেখনি জারি রেখেছেন। এই কাজটি করতে গিয়ে স্বভাবতই শাসকশ্রেণির শোষক রূপটি তিনি উন্মোচন করেছেন।
একজন লেখক হিসেবে তিনি শাসকশ্রেণির জন্য হুমকির কারণ হননি ঠিক, কিন্তু কোনো শাসকশ্রেণির আনুকূল্যও পাননি; বরং অকালে হারিয়েছেন একমাত্র পুত্রকে। সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়ে নিহত পুত্রশোককে ধারণ করেও তিনি বলেছিলেন—এই রাষ্ট্রের কাছে তিনি বিচার চান না। তিনি ওইক্ষণেও প্রত্যাশা করেছেন শুভ বোধের উদয়। রাষ্ট্রীয় ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণের ফাঁদগুলো তিনি সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করতে পেরেছিলেন কোনো উগ্রতা না ছড়িয়ে। বাংলাদেশের প্রতি ও বাঙালি জাতির প্রতি সহজাত দায়বদ্ধতাই এর কারণ।
তার নীতি ছিল— ‘আগুন দিয়ে আগুন নেভানো যায় না’। তিনি নিজ সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আত্তীকরণের মাধ্যমে সেই সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করেন। বহিরারোপিত তত্ত্ব বা মতবাদের ভিত্তিতে নয় বরং জীবন্ত বাস্তবতার ভিত্তিতেই অধিকতর একটি কল্যাণমূলক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা তার আরাধ্য। আবুল কাসেম ফজলুল হকের রচনায় থাকে প্রশ্ন, প্রশ্ন এবং প্রশ্ন। তিনি প্রচলিত বয়ানের বিপরীতে প্রশ্ন করেন, নতুন সম্ভাবনা তৈরির জন্য প্রশ্ন করেন। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রয়াণক্ষণে তার উদারনৈতিক জীবনদর্শনকে স্মরণ করি।
রাফাত আলম মিশু: লেখক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক