সুশাসনের অভাবে সরকার ও শাসনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা হারিয়েছিল নেপালের তরুণরা

ড. রাম নারায়ণ শ্রেষ্ঠ, নেপালের কাঠমান্ডু ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের ফাইন্যান্স, ইকোনমিকস এবং অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তিনি ভারতের নয়াদিল্লির সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, নেপালের রাজনৈতিক পালাবদল, তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা এবং বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

দক্ষিণ এশিয়ায় গত কয়েক বছরে বিশেষ করে বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, নেপাল ও পাকিস্তানে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ক্ষমতার রদবদল দেখা গেছে। মুদ্রাস্ফীতি, ঋণের বোঝা এবং বেকারত্বের মতো অর্থনৈতিক কারণগুলোই এখানে প্রভাব হিসেবে কাজ করেছে? নাকি ভিন্ন কারণ ছিল?

এটা ঠিক, এ গোটা অঞ্চলে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো ভয়াবহ। আমাদের সামনে অনেক অর্থনৈতিক সংকট এসেছে আর এগুলো রাজনৈতিক পালাবদলে ভূমিকা রেখেছে। তবে আমার মত হলো, অর্থনৈতিক সংকটই এ অঞ্চলের মানুষের অসন্তোষের একমাত্র কারণ নয়। বরং রাষ্ট্র পরিচালনা কিংবা শাসনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাবের মতো মৌলিক বিষয় থেকে এমনটি হয়েছে। সাধারণ মানুষ, বিশেষত নেপালের তরুণ প্রজন্ম ধীরে ধীরে এ দেশের শাসনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। এটা নেপালের ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই বলে ফেলতে পারি। তবে এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও তো স্বীকার করতে হবে। এর ব্যবহার, অপব্যবহার যেটাই হোক না কেন, এটি মানুষকে তথ্য পাওয়ার অভূতপূর্ব সুযোগ দিয়েছে। এই যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তার জন্যই আমরা ব্যাপক পরিবর্তনটা দেখে ফেলছি। তাই তথ্যপ্রাপ্তি এক ধরনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। অর্থনৈতিক সংকট অবশ্যই অবস্থা একটা চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে নেপালে তরুণদের রাজনৈতিক দলগুলোর সাফল্য ও উত্থান দেখেছি। নেপালের বিগত সরকারের কর্মক্ষমতা ও দুর্নীতির প্রতি তাদের যে ক্ষোভ, তা বিবেচনায় নিয়ে বর্তমানে নেপালি তরুণদের মূল অর্থনৈতিক ও সামাজিক আকাঙ্ক্ষাগুলো কী কী?

প্রশ্নটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ শপথ নিয়েছেন। বিগত সময়ের শাসন ব্যবস্থা দেখে তরুণদের মনে এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে সরকার তাদের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে ব্যর্থ। এমনিতে ভৌত অবকাঠামোতে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। কিন্তু এসব উন্নয়ন বা অগ্রগতির প্রকৃত প্রতিফলন অর্থাৎ তরুণরা যেভাবে সুশাসনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়ার কথা, সেটা তো অর্জিত হয়নি। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। এত ভালো প্রযুক্তি হওয়ার পরও নেপালে ড্রাইভিং লাইন্সেন্স পাওয়ার জন্য অনেকদিন সময় লেগে যায়। অথচ কয়েক ঘণ্টা কিংবা মিনিটের মধ্যেই সেবাটা নিশ্চিত করা উচিত। সেবার ক্ষেত্রে এ ধরনের দীর্ঘসূত্রতা ও অদক্ষতা গভীর অসন্তোষের জন্ম দেয়। এখনকার তরুণরা আশাবাদী। তারা এমন পরিবেশ চায় যেখানে অর্থনীতি ও সমাজ দুটো ক্ষেত্রেই সুশাসন থাকবে। এখানে সবার চূড়ান্ত লক্ষ্য অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যা সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।

নেপালে নতুন সরকার আসার প্রেক্ষাপটে এ উদ্বেগগুলো দূর করার জন্য স্বল্প থেকে মধ্যমেয়াদি অগ্রাধিকারগুলো কী হওয়া উচিত?

প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। সরকারকে আশার আলো দেখাতে হবে এবং দৃশ্যমান কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে তারা সঠিক পথে এগোচ্ছে। স্বল্পমেয়াদে সুশাসন প্রদর্শনের জন্য তাৎক্ষণিক এবং বাস্তবসম্মত ফলাফলের ওপর জোর দিতে হবে। মধ্যমেয়াদি লক্ষ্য হওয়া উচিত সেবা প্রদান ব্যবস্থার উন্নতি এবং শাসনের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান করা। পরিশেষে, নবগঠিত সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ফোকাস অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের ওপর থাকতে হবে।

নেপাল ও বাংলাদেশের মানুষের সুসম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশীরা হিমালয় ভ্রমণে যায় এবং দুই দেশের গভীর সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে। এ সম্পর্ককে আমরা কীভাবে আরো শক্তিশালী বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক সম্পর্কে রূপ দিতে পারি?

এটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক যে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে এত কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছতে পারেনি। এক্ষেত্রে পর্যটন দুই দেশের সম্পর্কের বড় সংযোগকারী হলেও অন্যান্য বাণিজ্য কিছুটা অন্তরালে। তবে বাণিজ্যিক গতি বাড়াতে হলে দুই দেশের মধ্যে সংযোগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে জেনেরিক ওষুধের মতো খাতগুলোতে। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের এ খাতগুলোকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে একটি ভালো ভিত্তি রয়েছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো কানেক্টিভিটি বৃদ্ধি করা, বিশেষ করে স্থলপথে। আমরা নতুন বাণিজ্য পথ নিয়ে কাজ করতে পারি। তবে এ ধরনের দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা সফল হওয়ার জন্য ভারতের আস্থা অর্জন করা অপরিহার্য। একটি ইতিবাচক দিক হলো, নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বাণিজ্য এরই মধ্যে শুরু হয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি চমৎকার সূচনা।

আর কোন কোন খাতে—যেমন জলবিদ্যুৎ, ওষুধ শিল্প বা কৃষি—আমাদের দুই দেশ পারস্পরিকভাবে উপকৃত হতে পারে?

জলবিদ্যুৎ নিশ্চিতভাবে পারস্পরিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের জন্য সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক খাত। বাংলাদেশের জন্য নেপালের জলবিদ্যুৎ একটি বিশাল সম্ভাবনাময় বাজার। কৃষিজ্ঞান আদান-প্রদানের মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগও অনেক। তবে আন্তঃদেশীয় যোগাযোগের বাধার কারণে এটি অর্জন করা কিছুটা জটিল। আমরা যদি এ লজিস্টিক বা যোগাযোগসংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারি, তবে তা অবশ্যই দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

সার্ক একসময় দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্ম ছিল, কিন্তু গত এক দশকে এর প্রভাব সীমিত হয়ে পড়েছে। সার্ক কীভাবে আবারো অর্থনৈতিক সংহতির জন্য একটি অর্থবহ প্লাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে?

সার্ক মূলত সংস্কৃতি, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত, সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো এর স্বাভাবিক কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার বাসিন্দা হিসেবে আমাদের অবশ্যই আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য চাপ অব্যাহত রাখতে হবে এবং সংলাপ বাড়াতে হবে। বাণিজ্যিক সম্পর্কের জন্য এটি অপরিহার্য। দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি তো আছে। কিন্তু লজিস্টিক এবং কাগজপত্রের সীমাবদ্ধতার কারণে এটি কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেনি। এটা কার্যকর করার জন্যই আমাদের সার্কের এজেন্ডাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। পাশাপাশি অংশীজন রাষ্ট্রগুলোর সরকারকে সচেতন করতে হবে। এ সহযোগিতামূলক সম্পর্ক আমাদের সবার জন্যই কল্যাণকর হবে তা বুঝতে হবে।

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্য সংকট বিশ্ববাণিজ্যে প্রভাব ফেলেছে। নেপাল ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো রেমিট্যান্স ও জ্বালানি আমদানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। এ অবস্থায় দেশ দুটির ঝুঁকি বেশি। নেপাল বর্তমানে ঠিক কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে?

আসলে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপক হারে বাড়ায় নেপালে এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে। কয়েক দিনে জ্বালানি তেলের দাম অন্তত ২০ শতাংশ বেড়েছে। গৃহস্থালি প্রয়োজন থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি বিতরণটা সহজ করার জন্য সরকার অর্ধেক পূর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার বিতরণ শুরু করেছে। তাছাড়া নেপালও কৃষিপ্রধান দেশ। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের প্রবাহ ব্যাহত হবেই। সম্ভবত সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, উপসাগরীয় অঞ্চলে লাখ লাখ নেপালি নাগরিক কাজ করেন। এ সংঘাতের কারণে তাদের কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা এবং জীবন ঝুঁকির মুখে। প্রভাবের মাত্রা এখনো পুরোপুরি অনুমান করতে না পারলেও নেপালের অর্থনীতির জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই অনেক বড় ধাক্কা হতে যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্ববাজারে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর চ্যালেঞ্জ নেপাল কীভাবে মোকাবেলা করছে? সরকার শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ এবং সুরক্ষার জন্য কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?

নেপাল থেকে শ্রম অভিবাসনের বেশির ভাগই বর্তমানে নিম্ন-দক্ষ খাতে। আমাদের জনসম্পদকে দক্ষ, চৌকস ও বৈশ্বিক বাজারের দক্ষতা চাহিদার ভিত্তিতে দক্ষ করার বিষয়টা নিয়ে উদ্যোগ নেয়া সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তবে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে মিলে আমরা বেশকিছু প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করছি, যাতে শ্রমিকরা বিদেশ যাওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। এছাড়া আমরা সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও জোর দিচ্ছি, যাতে শ্রমিকরা শ্রমবাজারে প্রতারিত না হন। সরকার সর্বনিম্ন নিয়োগ ফি চালু করেছে এবং বিদেশগামীদের জন্য লেবার পারমিট বাধ্যতামূলক করেছে। লেবার পারমিটধারীদের নেপালের সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে নিবন্ধিত হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা তাদের একটি নিরাপত্তাবেষ্টনী প্রদান করে। মজার ব্যাপার হলো, সরকার অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য পুঁজিবাজারে কোটা তৈরি করেছে, যাতে তারা বিদেশে থেকেও আইপিওতে আবেদন করতে পারেন।

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে নেপাল কীভাবে আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে? কোন খাতগুলো বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে করেন?

নেপাল এখন বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সক্রিয়ভাবে বিনিয়োগ খুঁজছে। পর্যটন একটি প্রধান খাত। এখানে উল্লেখযোগ্য হারে বিনিয়োগ হচ্ছে। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগের জন্য একটি প্রধান ক্ষেত্র। এ দুটো বাদে আমরা আইটি সেক্টর ও ডিজিটাল অর্থনীতির দিকেও নজর দিচ্ছি। এ খাতটায় আমাদের বড় ধরনের সহযোগিতা পাওয়া এবং নিজস্ব বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ আছে। কিন্তু সবশেষে কৃষিই আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রয়ে গেছে। কৃষি উন্নয়নে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) নেয়ার বিষয়েই নেপাল এখন অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: আমিরুল আবেদিন

আরও