সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দল রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর গণতান্ত্রিক নজরদারির একটি প্রতিষ্ঠান। ওয়েস্টমিনস্টার ধারার রাজনীতিতে বিরোধী দলকে তাই প্রায় ‘অপেক্ষমাণ সরকার’ বলা হয়। অর্থাৎ তার রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয় সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার পাশাপাশি বিকল্প সরকার হিসেবে প্রস্তুতি নেয়ার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের বর্তমান বিরোধী জোটকে মূল্যায়নের সময় এ মানদণ্ড জরুরি।
বিরোধী দলের শক্তি পরিমাপ করা যায় সরকারের বিরুদ্ধে কতটি কর্মসূচি দিয়েছে তা দিয়ে নয়; কতটি জনসমস্যাকে রাজনৈতিক এজেন্ডায় পরিণত করেছে তা দিয়ে
২০২৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ৭৭টি আসন পেয়েছে। এর মধ্যে জামায়াতের ৬৮টি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির ছয়টি আসন। সরকার গঠনের পর প্রথম ১৮০ দিনে জামায়াত ও এনসিপি সংসদে সমালোচনা, ওয়াকআউট এবং বিভিন্ন জনস্বার্থের ইস্যুতে বিবৃতি দিয়েছে। একটি জাতীয় গণমাধ্যমে এ সময় বিরোধী রাজনীতিকে ‘সফট অপজিশন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এখানে ইতিহাসের তুলনাটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে বসে খুব দ্রুতই রাজপথের আন্দোলনকে প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। মাগুরা উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং ১৯৯৩ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ক্রমে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সময়কালে আওয়ামী লীগ ১৭৩ দিন হরতাল করেছিল বলে রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যালোচনায় উল্লেখ রয়েছে।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি বিরোধী দলে যায়। পাঁচ বছরের সংসদে বিএনপি ৩৮২ কার্যদিবসের মধ্যে ১৬৩ দিন সংসদ বর্জন করেছিল। একই ধারায় ২০০১ সালের পর আওয়ামী লীগের বিরোধী রাজনীতি আবারো দ্রুত রাজপথকেন্দ্রিক হয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আন্দোলনে হরতাল ছিল নিয়মিত রাজনৈতিক হাতিয়ার। গবেষণা ও সমকালীন রাজনৈতিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ক্ষমতার পালাবদলের প্রতিটি পর্যায়েই বিরোধী দল সংসদীয় রাজনীতির পাশাপাশি হরতাল, অবরোধ, সংসদ বর্জন ও রাজপথের চাপকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল।
এ ইতিহাসের পাশে ২০২৬ সালের বিরোধী জোটকে রাখলে পার্থক্যটি স্পষ্ট হবে। সরকার গঠনের প্রথম ১৮০ দিনে জামায়াত ও এনসিপি অতীতের আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মতো ধারাবাহিক হরতাল বা দেশব্যাপী অবরোধে যায়নি। তারা চারবার ওয়াকআউট করেছে এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে।
এটি গণতান্ত্রিক রাজনীতির দৃষ্টিতে ইতিবাচক পরিবর্তন হতে পারে। তবে এখানে বর্তমান বিরোধী জোটের দুর্বলতাও দেখা যাচ্ছে।
হরতাল না করা যেমন বিরোধী দলের সাফল্যের প্রমাণ নয়। তেমনি সংসদে নিয়মিত উপস্থিত থাকাও কার্যকর বিরোধিতার পূর্ণ মানদণ্ড নয়।
বিরোধী দল সরকারের প্রতিটি কাজ আটকে দেয়ার প্রতিষ্ঠান নয়; নির্বাহী ক্ষমতা যেন জবাবদিহির বাইরে যেতে না পারে, তার রাজনৈতিক প্রহরী
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রথম ১০০ দিনের সংসদ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিরোধী এমপিরা ওয়াকআউট করলেও সংসদ বর্জন করেননি। এটি অতীতের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কিন্তু একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, হাম রোগের মতো জনস্বার্থের বিষয় সংসদে উঠলেও সেগুলোর ওপর যথেষ্ট আলোচনা হয়নি। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে বিরোধী দল আসলে কী করছে?
বিরোধী দলের শক্তি পরিমাপ করা যায় সরকারের বিরুদ্ধে কতটি কর্মসূচি দিয়েছে তা দিয়ে নয়; কতটি জনসমস্যাকে রাজনৈতিক এজেন্ডায় পরিণত করেছে তা দিয়ে। বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়লে বিরোধী দলের মাঠে থাকা দরকার। তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট থাকলে তাদের তথ্য ও বিকল্প কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কথা বলা দরকার। বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, ব্যাংকিং, স্থানীয় সরকার এবং আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে সংসদে ধারাবাহিক নজরদারি দরকার।
বিশেষ করে এনসিপির সামনে প্রত্যাশাটি আরো বেশি। দলটির নেতৃত্বের একটি বড় অংশ উঠে এসেছে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ভেতর থেকে। নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও এনসিপিকে সেই আন্দোলন থেকে উঠে আসা একটি তরুণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফলে তাদের কাছ থেকে প্রচলিত বিরোধী রাজনীতির পুনরাবৃত্তি প্রত্যাশিত নয়। তরুণ নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদ, নতুন রাজনৈতিক ভাষা ও নতুন কর্মপদ্ধতি তৈরি করার সুযোগ।
এ জায়গায় এনসিপিকে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। সংসদে ভালো বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি পোস্ট এবং সরকারের সমালোচনা দিয়ে নতুন রাজনীতির দাবি প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রতিটি বড় জনসমস্যাকে গবেষণার আওতায় এনে নীতিগত প্রস্তাব তৈরি করা, সংসদীয় কমিটিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখা, নির্বাচনী এলাকার মানুষের সমস্যা নিয়ে নিয়মিত কাজ করা এবং সরকারের নীতির প্রভাব বিশ্লেষণ করে বিকল্প হাজির করা প্রয়োজন।
তবে এনসিপির মধ্যে এ চর্চার কিছু সূচনা এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে। ছায়া বাজেট প্রণয়ন, সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়ন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় বিকল্প নীতি প্রস্তাব তৈরির উদ্যোগ তাদের প্রচলিত বিরোধী রাজনীতির বাইরে একটি নীতিনির্ভর পথ খোঁজার ইঙ্গিত দেয়। এ উদ্যোগগুলোকে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে রেখে দিলে তার রাজনৈতিক মূল্য সীমিত থাকবে। এগুলোকে নিয়মিত গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ, বিশেষজ্ঞ মতামত, সংসদীয় হস্তক্ষেপ এবং মাঠপর্যায়ের জনসম্পৃক্ততার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
কারণ জনগণ একসময় জানতে চাইবে, ‘আপনারা সরকারকে কেন ভুল বলছেন?’ তার পরের প্রশ্নটি হবে, ‘আপনারা ক্ষমতায় গেলে কী করবেন?’ সেই প্রশ্নের তথ্যভিত্তিক উত্তর দিতে পারাটাই হবে বিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
রাজনীতিবিদ এডমন্ড বার্ক বিরোধী দলকে রাষ্ট্রের ভেতরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ভারসাম্য হিসেবে দেখেছিলেন। আধুনিক গণতন্ত্রে সেই ধারণা আরো বিস্তৃত হয়েছে। বিরোধী দল সরকারের প্রতিটি কাজ আটকে দেয়ার প্রতিষ্ঠান নয়; নির্বাহী ক্ষমতা যেন জবাবদিহির বাইরে যেতে না পারে, তার রাজনৈতিক প্রহরী।
তবে সাম্প্রতিক ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চ বিরোধী জোটের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। সংসদে বিরোধিতা, ওয়াকআউট এবং বিবৃতিনির্ভর বিরোধী রাজনীতির বাইরে এবার রাজপথে বড় কর্মসূচি নিয়ে হাজির হয়েছে ১১ দলীয় জোট। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্য, আইন-শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনের দলীয়করণ বন্ধের মতো ছয়টি বিষয়কে তারা একই রাজনৈতিক দাবির কাঠামোয় এনেছে। দাবিগুলোর বড় অংশই জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তবে লংমার্চের প্রকৃত রাজনৈতিক মূল্য নির্ভর করবে এর পরের পদক্ষেপের ওপর। জনগণ শেষ পর্যন্ত জানতে চাইবে—সমস্যার সমাধানে বিরোধী জোটের পরিকল্পনা কী। বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে আন্দোলন হলে বিদ্যুৎ খাতের জন্য তাদের নীতি কী, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে তাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কী, প্রশাসনের দলীয়করণ বন্ধে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কীভাবে হবে—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। রাজপথে মানুষের সমর্থন পাওয়া রাজনৈতিক শক্তির প্রমাণ হতে পারে, কিন্তু বিকল্প রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা প্রমাণ করতে হলে প্রয়োজন তথ্য, গবেষণা, নীতি এবং ধারাবাহিকতা।
বাংলাদেশের পুরনো বিরোধী রাজনীতি থেকে বর্তমান জোটের শিক্ষা নেয়া দরকার। হরতাল, অবরোধ ও সংসদ বর্জন দ্রুত রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি করে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে নাগরিক আস্থা তৈরি করে কিনা সেটি আলাদা প্রশ্ন। আবার বর্তমানের অতিরিক্ত নরম অবস্থানও জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না।
তাই বর্তমান বিরোধী জোটের সামনে ভারসাম্যের রাজনীতি জরুরি। সংসদে উপস্থিতি, রাজপথে জনসম্পৃক্ততা, নীতিতে বিকল্প এবং সরকারের ওপর ধারাবাহিক নজরদারি।
প্রথম ১৮০ দিনের হিসাব বলছে, তারা পুরনো বিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ অংশে এখনো যায়নি। এটি স্বস্তির কারণ হতে পারে। কিন্তু একই সময়ে জনমুখী রাজনৈতিক কর্মসূচির ঘাটতি তাদের রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত করছে।
শেষ পর্যন্ত বিরোধী জোটের সামনে প্রশ্ন হলো, জনগণের অসন্তোষকে তারা কতটা সংগঠিত রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করতে পারছে, সরকারের ভুলের কতটা কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারছে এবং নিজেদের কতটা বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প সরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারছে। কারণ সংসদে বিরোধী আসন পাওয়া নির্বাচনের ফল। বিরোধী দল হয়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক অর্জন।
সাজ্জাদ সাব্বির: এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক