আসন্ন জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে দেশের ব্যবসায়ী সমাজ একটি বাস্তবসম্মত, বিনিয়োগবান্ধব ও রফতানিমুখী বাজেট প্রত্যাশা করছে।
নতুন সরকার এমন একসময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যখন দেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং চলমান ভূরাজনৈতিক সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতিও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিল্পোদ্যোক্তারা এখন এমন একটি নীতিগত পরিবেশ প্রত্যাশা করছেন, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব হবে এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আস্থা ফিরে আসবে।
বর্তমানে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ব্যবসা পরিচালনার সহজ পরিবেশ, সুশাসন ও নীতি ধারাবাহিকতার ওপর। প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস, দ্রুত সেবা প্রদান এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগের গতি আরো বাড়বে বলে আমরা বিশ্বাস করি। কারণ বিনিয়োগ বাড়লেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং অর্থনীতির ভিত আরো শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে কর ব্যবস্থাকে আরো স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য ও ব্যবসাবান্ধব করা জরুরি। হঠাৎ কর আরোপ, ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন কিংবা জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনো অর্থায়ন, জ্বালানি সরবরাহ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তাই বাজেটে এসব খাতের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও সহজ অর্থায়নের সুযোগ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের প্যাকেজিং শিল্প এরই মধ্যে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শিল্পে পরিণত হয়েছে। খাদ্যপণ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্য, এফএমসিজি থেকে শুরু করে রফতানিমুখী বিভিন্ন শিল্প—সব ক্ষেত্রেই প্যাকেজিং এখন উৎপাদন ও ভোগ ব্যবস্থার এক নীরব কিন্তু অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। এ শিল্প শুধু পণ্যের নিরাপত্তা ও মান নিশ্চিত করছে না; একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অপচয় হ্রাস, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। আধুনিক ও মানসম্পন্ন প্যাকেজিং এখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অন্যতম পূর্বশর্তে পরিণত হয়েছে। ফলে এ শিল্পের বিকাশ সরাসরি দেশের রফতানি সক্ষমতা ও শিল্পায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সরকার ‘পেপার অ্যান্ড প্যাকেজিং’ খাতকে ‘বর্ষপণ্য ২০২৬’ হিসেবে ঘোষণা করেছে—এটি অবশ্যই ইতিবাচক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে এ স্বীকৃতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা কার্যকর নীতিগত সহায়তায় রূপ নেবে। আসন্ন বাজেটে আমদানি ও সরবরাহ পর্যায়ে বিদ্যমান দ্বৈত অগ্রিম করের চাপ যৌক্তিকীকরণ, ডিউটি ড্র-ব্যাক প্রক্রিয়া সহজ করা, ডিমড এক্সপোর্ট সুবিধা প্রদান এবং পরিবেশবান্ধব একক উপাদানভিত্তিক (মনো-ম্যাটেরিয়াল) প্যাকেজিংয়ের জন্য বিশেষ সহায়তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অপ্রচলিত রফতানি খাতগুলোর জন্যও আরো কার্যকর নীতি সহায়তা জরুরি। বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সেই বাস্তবতায় সবুজ প্রযুক্তি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামাল ও পরিবেশসম্মত উৎপাদন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হলে বাংলাদেশের শিল্প খাত আন্তর্জাতিক বাজারে আরো প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে যেতে পারবে। বাংলাদেশের শিল্প খাতের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা ও উদ্ভাবনী শক্তির কোনো ঘাটতি নেই। প্রয়োজন শুধু দীর্ঘমেয়াদি, স্থিতিশীল ও ব্যবসাবান্ধব নীতিসহায়তা। সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দেশের উদ্যোক্তারাই আগামী দিনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রফতানি সম্প্রসারণের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবেন। একই সঙ্গে একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারে আরো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
সাফিউস সামি আলমগীর: সভাপতি, বাংলাদেশ ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিএফপিআইএ); ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টাম্পাকো গ্রুপ