বাংলাদেশের উন্নয়ন চিন্তায় অবকাঠামো এখন অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়েছে। উন্নয়নের সমর্থক হয়ে গিয়েছে অবকাঠামো। কিন্তু উন্নয়নের পরের পাঠ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাদের এর গভীরে যেতে হবে। সেখান থেকেই আজকের এ নিবন্ধের অবতারণা।
ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর কাছে এবং এক অর্থে তাদের মধ্যে অনেকটা সফল ধারণাগত বিস্তার ঘটেছে—অবকাঠামো সমান উন্নয়ন। তারা এ সমীকরণটাকে অনেকটা প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। কিন্তু অবকাঠামো শব্দটা যখন আমরা ব্যবহার করছি, তখন এর পরের পাঠের জন্য অবকাঠামোকে কয়েকটি স্তরে বিশ্লেষণ করা দরকার। একটা হচ্ছে অবকাঠামোর ভৌত রূপ যেমন সেতু, ভবন, রাস্তা ইত্যাদি।
অবকাঠামো ‘ফিজিক্যাল রিয়েলিটি’ বটে, কিন্তু এর ব্যবহারিক জগত্টাও আরেকটা অবকাঠামো। সেটাও অবকাঠামোর ধারণার মধ্যে আনতে হবে। এটা হচ্ছে দ্বিতীয় স্তর। যেমন একটা বিশ্বমানের সেতু বা ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হলো কিন্তু অবকাঠামোর ব্যবহারিক প্রটোকলগুলো উন্নত করা হলো না, তাহলে ওই ফিজিক্যাল অবকাঠামোর সব সুবিধা প্রতিষ্ঠিত হবে না অর্থাৎ অবকাঠামোর সুফল জনগণ পুরোপুরি পাবে না।
সেতুর গোড়ায় যদি আগের মতো বাস দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করে, তাহলে একই সমস্যাই থেকে যাবে—গাড়ির জট তৈরি হয়ে সময় লাগবে বেশি। আমাদের দেশে অবকাঠামো নিয়ে যখন চিন্তা করা হয় তখন উন্নয়নের পরের পাঠের অন্যতম বিষয় ব্যবস্থাপনার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়। অবকাঠামো যেহেতু উন্নয়নের একটা জোরালো ধারণা হিসেবে জনমানুষের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, সেহেতু অবকাঠামোর ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে বৃহত্তর আলোচনারও সূচনা করা দরকার। ফিজিক্যাল বাস্তবতা প্রথম বোঝার বিষয় আর দ্বিতীয় হচ্ছে অবকাঠামোর ব্যবহারিক জগৎ। বাংলাদেশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে কিন্তু যাতায়াতের সময় কমানো যায়নি। আগে সরু একটা রাস্তা ছিল এখন চার লেন; ফিজিক্যাল অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এর ব্যবহারিক জগতে পরিবর্তন আসেনি। আগের মতোই মোড়ে মোড়ে গাড়ির জটলা বেঁধেই থাকছে। উচ্চগতিতে গাড়ি চলতে পারছে না, নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটছে। এসবই ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা। ফলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, এর ব্যবহারগত পরিবর্তনও আনতে হবে।
মানুষ যেকোনো জায়গা দিয়েই মহাসড়কে ঢুকছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে জটলা তৈরি হচ্ছে। রাস্তার পাশে বাজার গড়ে উঠছে। এর অর্থ অবকাঠামো সংশ্লিষ্ট ব্যবহারিক জগৎ পরিবর্তনের বিষয়টি আমাদের মনোযোগে নিয়ে আসা জরুরি। মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের প্রবেশাধিকার সীমিত করা একটি বিষয়। অবকাঠামো ব্যবহারে আরো অনেক দিক আছে, কোথায় গাড়ি থামানো যাবে, অবকাঠামোর পাশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার কতটুকু হবে ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে।
অবকাঠামোর সার্বিক সুফল পেতে হলে অবকাঠামোভিত্তিক সুশাসনও নিশ্চিত করতে হবে। এটি হচ্ছে, অবকাঠামো ব্যবহারের নিয়মগুলো সুনির্দিষ্টভাবে তৈরি করা। যেমন—বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে চলাচলকারী মৈত্রী ট্রেন বেশ কয়েকবার চালু হয়েছে। কিন্তু এটা সে হিসেবে গতি পায়নি। কারণ সরকার অবকাঠামো নির্মাণ করেছে, ট্রেন আছে, লাইন আছে, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক নিয়মের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে মানুষ সেটি সেভাবে ব্যবহার করছে না।
অবকাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। রূপক অর্থে যদি বলি, আগে একটা শব্দ ছিল বাইপাস। কুমিল্লা বাইপাস, ফেনী বাইপাস। কিছুদিন পর দেখা গেল শহরটা গিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়েছে। তখন সেটি আর বাইপাস থাকছে না, শহরের ভেতরে একটা রাস্তা হয়ে যাচ্ছে। অবকাঠামোর পার্শ্ববর্তী অর্থনৈতিক কার্যক্রমের লোকেশন নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে। পরিকল্পনার অনুপস্থিতির কারণে অবকাঠামো থেকে যথাযথ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে অবকাঠামোর ব্যবহারিক জগৎ নিয়ে বড় ধরনের আলোচনা বাংলাদেশে শুরু করা দরকার।
অবকাঠামো শব্দটাকে তিনটা ভাগে ভাগ করতে হবে। ফিজিক্যাল রিয়েলিটি, ব্যবহারিক নিয়মাবলির বিষয়াদি এবং অবকাঠামোর সম্পূরক পদক্ষেপ। অবকাঠামো বাংলাদেশে প্রচুর তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেভাবে ফল আসছে না। এক্ষেত্রে সংকট ব্যবহারিক। মানসিকতার উত্তরণ ঘটাতে হবে। একটা বিশ্বমানের অবকাঠামোর সঙ্গে তৃতীয় বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ মানসিকতা দিয়ে হবে না। পুলিশ থেকে শুরু করে সব সংস্থার মানসিকতার উন্নতি গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো ব্যবহারের নিয়মগুলো উন্নয়ন করতে না পারলে সুফল মিলবে না।
তৃতীয় বিষয়টি হলো অবকাঠামোর সুফল নিশ্চিতে সম্পূরক পদক্ষেপ। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই একটি অঞ্চল উন্নত হয়ে যাবে না, তার জন্য সম্পূরক অন্য পদক্ষেপগুলোও নিতে হবে। এক্ষেত্রে যমুনা নদীর ওপর নির্মিত বঙ্গবন্ধু সেতুর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। সেতুটি উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা ও দারিদ্র্য দূরীকরণে ভূমিকা রেখেছে সত্য, তবে সেটি আশানুরূপ নয়। দারিদ্র্যের পকেটগুলো যেমন—কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুরে এ সংখ্যা এখনো বেশি। বঙ্গবন্ধু সেতুর কারণে উত্তরাঞ্চলে প্রযুক্তি পৌঁছেছে, উন্নত জাতের ধানের আবাদ হচ্ছে। এতে ওই অঞ্চলের যতটা না লাভ হয়েছে, তার চেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে ঢাকা। উত্তরাঞ্চলের সম্পদ ঢাকায় সঞ্চালন হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার মতো সম্পূরক পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। গ্যাস-বিদ্যুৎ ও অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়নি। ফলে বঙ্গবন্ধু সেতুর যে সুফল উত্তরাঞ্চলে পড়ার কথা ছিল, সেটি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত হয়নি।
বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের ২৪ বছর হয়ে গেছে, কিন্তু উত্তরবঙ্গে সে অর্থে উন্নয়নের বড় গতি এখনো তৈরি হয়নি। যমুনা সেতুর একটা ভূমিকা আছে বটে, তবে ট্রিগারিং ভূমিকা নেই। পদ্মা সেতু আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। কিন্তু ট্রিগারিং ইম্প্যাক্ট এবং সময়কালটাও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী এক দশকে দক্ষিণবঙ্গে একটা পরিবর্তন আসা দরকার। কিন্তু তার জন্য সম্পূরক পদক্ষেপ গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণবঙ্গ নিয়ে একটা বৃহৎ পরিকল্পনা করা দরকার। দক্ষিণবঙ্গ জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।
আমাদের কৃষির বিবর্তন বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সবুজ বিপ্লব প্রথমে হয়েছে পূর্ববঙ্গে, দ্বিতীয় রাউন্ডটা হয়েছে উত্তরবঙ্গে, এখন হচ্ছে দক্ষিণবঙ্গে। ফলে দক্ষিণবঙ্গকে কৃষির নতুন ফ্রন্টিয়ার হিসেবে চিন্তা করছে সবাই। আবার জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে এ অঞ্চল। সেদিক থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম যুদ্ধক্ষেত্র দক্ষিণবঙ্গ। একে তৃতীয় বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। শুধু কৃষি নয়, এখানে শিল্প এবং নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। পদ্মা সেতুর ট্রিগারিং ইম্প্যাক্ট ওই অঞ্চলে পড়তে হবে। কৃষির নতুন দিগন্ত, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি হ্রাস এবং বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড—এ তিনটি বিষয়ে দৃষ্টি দিয়ে দক্ষিণবঙ্গের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। দক্ষিণবঙ্গে অর্থনৈতিক বহুমাত্রিকতার ঘাটতি রয়েছে। সব মিলিয়ে দক্ষিণবঙ্গের জন্য অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের মহাপরিকল্পনাকে সম্পূরক পদক্ষেপ হিসেবে নিতে হবে। তাহলে ট্রিগারিং ইম্প্যাক্ট পড়বে। বঙ্গবন্ধু সেতুর ক্ষেত্রে আমরা যেটা দেখেছি, ২৪ বছর পর উত্তরবঙ্গে কিছু কিছু উন্নতি হয়েছে। কিন্তু পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে আমরা চাই, আগামী এক দশকে দক্ষিণবঙ্গে অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের দৃশ্যমান একটা পরিবর্তন আনুক। এ কথা সত্য, পদ্মা সেতু আন্তঃদেশীয় ট্রানজিট হিসেবে গুরুত্ব পাবে। কিন্তু আমরা চাই, পদ্মা সেতু রিজিওনাল কানেক্টিভিটিকেই জোরদার করবে না, একই সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আরেকটা বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত আর তা হলো সমুদ্র অর্থনীতি। আমরা এক দশকের বেশি সময় ধরে একে আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছি। ওই অর্থে কিছুই বেগবান হয়নি। এটাও দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের একটা দিক। আইলা আঘাত হানা এলাকাগুলো এখনো যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকার মতো পড়ে আছে। সেখানে নজর দেয়া হয়নি।
‘অবকাঠামো সমান উন্নয়ন’—এ ধরনের একটা দর্শন ক্ষমতাসীনদের মধ্যে গেড়ে বসেছে। এটা প্রতিষ্ঠাও পেয়েছে। হয়তো মানুষের মধ্যে এর আংশিক সমর্থনও আছে। কিন্তু উন্নয়নের পরের ধাপে যেতে হলে আমাদের তিনটি দিক চিন্তা করতে হবে। অবকাঠামোর ফিজিক্যাল রিয়েলিটি, অবকাঠামোর ব্যবহারিক জগৎ এবং সম্পূরক পদক্ষেপ।
পদ্মা সেতু ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের জন্য অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের একটা মহাপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। সেটা শুধু আমলাতান্ত্রিক হবে না, এলাকার যুবসমাজ, বিজনেস চেম্বার, নারী উদ্যোক্তা, বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে সম্পূরক পদক্ষেপ নিতে হবে। ধীরে ধীরে উন্নয়ন হবে—এটা ভাবলে হবে না। বঙ্গবন্ধু সেতুর ক্ষেত্রে যেটা আমরা দেখি, ২৪ বছরেও উত্তরবঙ্গ অর্থনৈতিক পাওয়ার হাউজ হিসেবে তৈরি হয়নি। সেখানে সম্পূরক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। পদ্মা সেতু বা দক্ষিণবঙ্গের ক্ষেত্রে এমন যেন না হয়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা; নির্বাহী চেয়ারম্যান, পলিসি পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)