দুর্যোগ

বজ্রপাত ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি ও সমন্বিত উদ্যোগ

সম্প্রতি একদিনের ব্যবধানে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় (চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, মুন্সিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, রংপুর, ঝিনাইদহ, নেত্রকোনা) বজ্রপাতে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।

প্রতি বছর লক্ষ করা যায়, মার্চের শেষার্ধ থেকে জুন পর্যন্ত বজ্রপাতে হতাহত একটি নৈমিত্তিক দুর্ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবে বাংলাদেশের একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে বজ্রপাত। পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৯০-৯৯ পর্যন্ত বজ্রপাতে মৃত্যু হয় ৩০ জনের, পরবর্তী দশকে (২০০০-০৯) ১০৬ ও গত দশকে (২০১০-২০) ৩ হাজার ১৬২ জনের। এছাড়া দেশে বজ্রপাতে ২০২৫ সালে ৬৭ জন এবং ২০২৪ সালে ৮০ জনের মৃত্যু হয়। বাংলাদেশে বজ্রপাতজনিত ঝুঁকি বৃদ্ধি ও মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান ধারা অব্যাহত থাকার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ২০১৬ সালে এটিকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে। বিশ্বে বজ্রপাতের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে ব্রাজিল ও ভেনিজুয়েলায়, কিন্তু এ দেশগুলোর তুলনায় দেশে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। বজ্রপাতে প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে ২৫০-২৬০ জনের মৃত্যু ঘটে। তাই এ দুর্যোগ নিয়ে এখন থেকে ভাবনা ও পর্যবেক্ষণ আলোচনা জরুরি।

বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান, এর পরেই ভারত মহাসাগর। সেখান েথকে মার্চ-এপ্রিলে ক্রমাগত গরম ও আর্দ্র বাতাস বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আবার দেশের উত্তর-পূর্বে পাহাড় এবং কিছু দূরের হিমালয় পর্বত থেকে প্রবেশ করছে শীতল বাতাস। এ দুই ধরনের বাতাসের সংমিশ্রণে বজ্রপাতের জন্য অনূকুল পরিবেশ সৃষ্টি করছে এবং দুই ধরনের বাতাসের ঘর্ষণে উচ্চ ভোল্টের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ যখন মাটিতে নেমে আসে, তখন কাছাকাছি যা পায় তাতেই আঘাত করে। দেশের অধিকাংশ মানুষের বজ্রপাত সম্পর্কিত জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। জাতীয় থেকে স্থানীয় পর্যায়ে অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার লক্ষণীয়। এছাড়া পুকুর-জলাশয়-খাল ভরাটের ফলে বাতাসে আর্দ্রতা সরবরাহে প্রভাব পড়ছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এপ্রিলে সূর্য থেকে বাংলাদেশের অবস্থান অন্য সময়ের তুলনায় সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে। মার্চ-মে মাসে সূর্য বাংলাদেশের ওপর লম্বভাবে কিরণ দেয়ায় তাপ থাকে প্রখর। দেশের বিশাল এলাকা সমভূমি হওয়ায় এখানে তাপ প্রবাহিত হয় পরিবহন পদ্ধতিতে। এভাবে সরাসরি তাপ লাগায় বিশাল এলাকাজুড়ে তাপমাত্রা বেশি হয়।

২০২৪ সালে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ‘স্টেট অব দ্য ক্লাইমেট ইন এশিয়া’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী গড় উষ্ণতার চেয়ে দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে এশিয়ার দেশগুলো। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ১৯৬১-৯০ সালের গড় তাপমাত্রার চেয়ে শুধু ২০২৩ সালেই এশিয়ার উষ্ণতা বেড়েছে প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়েছে ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশে। অন্যদিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে দেশে তাপমাত্রা ও বাতাসে জলীয় বাস্পের পরিমাণ বেড়েছে। এতে এপ্রিল-মে মাসে বেশি পরিমাণে বজ্রগর্ভ মেঘ বা ‘কিউমুলোনিম্বাস’ মেঘের সৃষ্টি হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলে বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়ে প্রায় ১২ শতাংশ।

ভিন্ন এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৫-২০ সাল পর্যন্ত সংগঠিত বজ্রপাত তিন ধরনের। এগুলো হলো এক মেঘ থেকে অন্য আরেকটি মেঘে বা আন্তর্মেঘ, একই মেঘের এক স্থান থেকে অন্য আরেকটি স্থানে বা আন্তর্মেঘ এবং মেঘ থেকে ভূমিতে। বাংলাদেশের মোট বজ্রপাতের ৭০ শতাংশ হয় এপ্রিল-জুনে। মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের ফলে ক্রমাগত গাছের পরিমাণ কমায় বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ও জলীয় বাষ্প কমে তাপমাত্রা বাড়ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০১-২৩ সাল পর্যন্ত দেশে বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ কমেছে ৬ লাখ ৭ হাজার ৬২০ একর। জনসংখ্যাবহুল দেশ হওয়ায় বাসস্থানের চাহিদা মেটাতেই বনভূমি উজাড় হচ্ছে। এছাড়া অবৈধ দখল, সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ফার্ম হাউজ, দোকান, রিসোর্ট নির্মাণ ইত্যাদি কাজে বন উজাড় করছে। গ্রামাঞ্চলে আগে যেসব উঁচু গাছ ছিল, যেমন তাল, খেজুর, সুপারি, নারকেল, পাম ইত্যাদি প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করত। কিন্তু নির্বিচারে এসব গাছ কাটায় গ্রামীণ অঞ্চল বজ্রপাতের কাছে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। বিশেষত বজ্রপাতে নিহতদের মধ্যে ৭২-৮৩ শতাংশ কৃষক। এছাড়া বাড়ি ফেরার পথে বজ্রপাতে মারা যায় ১০-১৪ এবং গোসল ও মাছ ধরার সময় ১২-১৩ শতাংশ।

বজ্রপাত ও বজ্রপাতকালীন আশ্রয় কেন্দ্র সম্পর্কে কৃষকদের মধ্যে সচেতনতার ব্যাপক অভাব থাকায় মৃত্যুহার বাড়ছে। যথাযথ সতর্কসংকেত না পাওয়া বা উপেক্ষা করায় বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছেন গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকরা। যদিও সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করার লক্ষ্যে দেশবাসীকে বজ্রপাতের আগাম সতর্কবার্তা দিতে দেশের বজ্রপাতপ্রবণ আটটি জেলায় (ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, ময়মনসিংহ, নওগাঁ, পটুয়াখালী ও পঞ্চগড়) পরীক্ষামূলকভাবে বজ্রপাত চিহ্নিত যন্ত্র বা লাইটনিং ডিটেকটিভ সেন্সর স্থাপন করেছে। বজ্রপাত যদি সরাসরি বৈদ্যুতিক সরবরাহ লাইনে পড়ে বা পাশের বৈদ্যুতিক ফিল্ডের কারণে সৃষ্ট উচ্চ ভোল্টেজ বৈদ্যুতিক ডিভাইস, টিভি, ফ্রিজ ও ট্রান্সফরমার সস্পূর্ণ নষ্ট করে দিতে পারে। বজ্রপাতের এ ধ্বংসাত্মক প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে লাইটনিং অ্যারেস্টার বা বজ্রনিরোধক দণ্ড অপরিহার্য। লাইটনিং অ্যারেস্টার হলো বজ্রপাতের সময় তৈরি হওয়া উচ্চ ভোল্টেজ বা চার্জ থেকে বৈদ্যুতিক লাইন, যন্ত্রপাতি ও বিল্ডিংকে রক্ষা করার একটি বিশেষ নিরাপত্তা ডিভাইস। এটি সাধারণত উঁচু ভবনের শীর্ষে বা বৈদ্যুতিক লাইনের সঙ্গে স্থাপন করা হয়, যা ক্ষতিকর বিদ্যুৎ প্রবাহকে সরাসরি মাটিতে নামিয়ে দেয়। উন্নত দেশে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা একটি বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হলেও বাংলাদেশে এটি এখনো সীমিত পরিসরে ব্যবহার হচ্ছে। তবে এখানে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা স্থাপনের কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। মাঠ পর্যায়ে বিশেষ করে হাওর এলাকায় নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে পর্যাপ্তসংখ্যক লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা কঠিন। অনেক সময় সঠিক পদ্ধতিতে আর্থিং স্থাপন না করায় যন্ত্রগুলো দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়ে। আবার স্থাপনের পর অনেক স্থানে এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। অন্যদিকে যেসব স্থানে লাইটনিং অ্যারেস্টার রয়েছে, সেখানে মূল্যবান ধাতু রয়েছে গুজব ছড়িয়ে বজ্রনিরোধক পিলার বা ধাতব কাঠামো চুরি হয়ে যাচ্ছে।

দেশে ব্যাপক হারে গাছপালা কেটে ফেলা বিশেষ করে উঁচু গাছগুলো কেটে খোলা মাঠ করে ফেলা, যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা এবং অসেচতনতার কারণে বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এজন্য বজ্রপাতের ক্ষতি কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। বজ্রপাতের হতাহত থেকে বাঁচাতে হলে উন্মুক্ত মাঠ বা ফসলি জমিতে থাকা কৃষকদের মৌসুমে মজবুত ছাউনিতে আশ্রয় নিতে হবে। কালো মেঘ বা মেঘের গর্জন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। পায়ে রাবারের জুতা পরিধান করে উঁচু স্থান থেকে দূরে থাকতে হবে। লোহা, ধাতব যন্ত্র, লোহার হাতলযুক্ত ছাতা পরিহার করতে হবে। উঁচু গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা টাওয়ার থেকে কমপক্ষে চার মিটার দূরে থাকতে হবে। সরকারের আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পদক্ষেপে পর্যাপ্ত পরিমাণে তাল, খেজুর, সুপারি, নারকেল, পাম ইত্যাদি গাছ লাগানোর উদ্যোগও জরুরি। পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। আঞ্চলিক ভাষায় যথাসময়ে বজ্রপাতের সতর্কসংকেত দিতে ব্যাপক আকারে কমিউনিটি রেডিওকে ব্যবহার করা যেতে পারে। বজ্রপাতের বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর বিষয়টিকেও দিতে হবে বাড়তি গুরুত্ব।

ড. মো. ইকবাল সরোয়ার: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও