দেশীয় এগ্রোকেমিক্যাল প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের উদ্যোগ অনেকাংশে নেই। মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। তাছাড়া এগ্রোকেমিক্যাল পণ্যের ক্ষেত্রে বিদেশী সরবরাহকারীদের আধিপত্য বেশি থাকায় স্থানীয় কারখানাগুলো সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারছে না। এজন্য কৃষকদের অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে। কৃষি উৎপাদন ঝুঁকি কমাতে চাইলে এ পরিস্থিতির মধ্যে পরিবর্তন আনতে হবে।
এগ্রোকেমিক্যাল খাতের উপাত্তগুলো আশঙ্কাজনক। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ সালফারসহ প্রায় এক লাখ টন বালাইনাশক আমদানি করেছে, যার মোট মূল্য ছিল প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার। দেশীয় বাজারের আকার আনুমানিক ১৫ হাজার কোটি টাকা। দেশে প্রায় ১২ হাজার নিবন্ধিত বালাইনাশক ব্র্যান্ড রয়েছে এবং এক হাজারেরও বেশি আমদানিকারক এ খাতে সক্রিয়। অথচ স্থানীয় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মাত্র ২২। প্রতিষ্ঠানের এ ভারসাম্যহীনতা আমাদের কাঠামোগত দুর্বলতাকে প্রকাশ করে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) কাঠামোর অধীনে ট্রিপস চুক্তি স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে (এলডিসি) বিশেষ কিছু সুবিধা প্রদান করেছে। আমাদের ওষুধ শিল্প সে সুবিধাগুলোকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করেছে—তারা বিনিয়োগ করেছে, সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ ও রফতানি বাজার দখল করেছে।
কিন্তু কৃষি-রাসায়নিক শিল্পে এমন নীতিগত সামঞ্জস্য দেখা যায়নি। কোনো দীর্ঘমেয়াদি শিল্প রোডম্যাপ ছিল না; স্থানীয় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোনো সুপরিকল্পিত শুল্ক সুরক্ষা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও উৎপাদনকারীদের মধ্যে কোনো সমন্বিত গবেষণা সংযোগ বা রফতানি উদ্যোগ ছিল না। উল্টো তৈরি পণ্য সহজে এবং কম শুল্কে দেশে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে, যেখানে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা উচ্চ উপকরণ খরচ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছে। এ ধারাই আমদানিনির্ভরতাকে গেড়ে বসিয়েছে। স্থানীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে শুল্ক বাধাগুলো এখনো স্ববিরোধী। তৈরি বালাইনাশকগুলো প্রায়ই সুবিধাজনক শুল্ক কাঠামো উপভোগ করে। কিন্তু দেশীয় ফর্মুলেশনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও ইন্টারমিডিয়েট আমদানিতে পুঞ্জীভূত খরচ বহন করতে হয়। ফলে উৎপাদন শুরু করার আগেই স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক হয়ে পড়ে। এছাড়া উৎসের সীমাবদ্ধতা সমস্যাটিকে আরো ঘনীভূত করে। নির্দিষ্ট কিছু কাঁচামাল আমদানির জন্য মাত্র দুটি অনুমোদিত উৎসের অনুমতি রয়েছে, যা প্রতিযোগিতা কমায় এবং বৈশ্বিক সংকটের সময় আমাদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
পদ্ধতিগত জটিলতা এ চাপকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। বন্দর থেকে কাঁচামাল খালাসের জন্য অনাপত্তি পত্র (এনওসি) পেতে আমদানিকারকদের দীর্ঘ বিলম্বের সম্মুখীন হতে হয়। এ বিলম্ব সরাসরি ডেমারেজ চার্জ, উচ্চ খরচ ও উৎপাদন অনিশ্চয়তায় রূপ নেয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ এখনো এলডিসি মর্যাদা উপভোগ করলেও পেটেন্ট অধিকার এমনভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে একচেটিয়া বাজার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। খাদ্যনিরাপত্তা এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশের স্বার্থে এলডিসি দেশগুলোর জন্য প্রাপ্য নীতিগত সুযোগগুলো পুরোপুরি ব্যবহার করা হচ্ছে না। প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যহীনতাও বিদ্যমান। সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদনকারীদের প্রতিনিধিত্ব করা সত্ত্বেও ‘পিট্যাক’ (পিটিএসি) কমিটিতে বামার (বিএএমএ) কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। মাঠ পর্যায়ে কারখানা পরিচালনাকারী উৎপাদকদের কোনো সুসংগঠিত মতামত ছাড়াই অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এসব দিক বিবেচনা করেই আমাদের এগ্রোকেমিক্যাল কাঠামোটি দৃঢ়ভাবে সংশোধন করতে হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের আগে বাংলাদেশ যদি অতিরিক্ত সময় পায়, তবে সে সময়টিকে শেষ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একবার আমরা উত্তরণ করে ফেললে মেধাস্বত্ব আইন আরো কঠোর হবে, নীতিগত নমনীয়তা কমে যাবে এবং প্রতিযোগিতার চাপ তীব্র হবে। শক্তিশালী দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা ছাড়া সে পর্যায়ে প্রবেশ করা মানে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরাধীনতায় আটকে পড়া। এটি হবে একটি কৌশলগত ব্যর্থতা। কৃষি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার মূল ভিত্তি। জলবায়ু পরিবর্তন বাড়ছে, পোকামাকড়ের প্রতিরোধ ক্ষমতাও বিবর্তিত হচ্ছে। কৃষকদের সময়মতো, সাশ্রয়ী ও মানসম্পন্ন ফসল সুরক্ষা সমাধান প্রয়োজন। আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আমাদের বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার বিনিময় হারের ধাক্কা এবং সরবরাহ চেইনের বিঘ্নের মুখে ফেলে দেয়।
স্বনির্ভরতা মানে বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং সক্ষমতা। প্রথমত, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বালাইনাশক উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য ৩২টি সহায়ক উপকরণের ওপর শূন্য আমদানি শুল্ক সুবিধা দিতে হবে। এটি কোনো ভর্তুকি নয়; বরং প্রতিযোগিতামূলক স্থানীয় উৎপাদন নিশ্চিত করার একটি যৌক্তিক শুল্ক সংশোধন। দ্বিতীয়ত, কাঁচামাল সংগ্রহের উৎসগুলোকে উন্মুক্ত করতে হবে। আইন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী কাঁচামাল আমদানির জন্য একাধিক আন্তর্জাতিক উৎস অনুমোদন করা উচিত। উৎসের বৈচিত্র্য প্রতিযোগিতা বাড়াবে এবং সরবরাহ স্থিতিশীল করবে। তৃতীয়ত, তৈরি বালাইনাশকের নামে আমদানীকৃত কাঁচামাল বন্দর থেকে খালাসের সময় বাধ্যতামূলক এনওসির প্রয়োজনীয়তা তুলে দিতে হবে। খালাস-পরবর্তী তদারকি ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সম্ভব, কিন্তু বন্দর পর্যায়ের জটিলতা যেন শিল্পকে স্থবির না করে। চতুর্থত, এলডিসি উত্তরণের আগে জনস্বার্থ এবং খাদ্যনিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশকে অবশ্যই ‘কমপালসারি লাইসেন্সিং’ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এটি আন্তর্জাতিক নিয়মের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং কৃষি-রাসায়নিক খাতে একচেটিয়া আধিপত্য রোধে অপরিহার্য। পঞ্চমত, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কারিগরি ও পরামর্শক কমিটিতে বামার প্রতিনিধিসহ উৎপাদনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ষষ্ঠত, স্থানীয় মূল্য সংযোজনকে সহায়তার তৈরি পণ্য ও কাঁচামালের শুল্কের মধ্যে যৌক্তিক সামঞ্জস্য আনতে হবে। এ সুরক্ষা হতে হবে সুনির্দিষ্ট ও সাময়িক, যার লক্ষ্য হবে সক্ষমতা বাড়ানো। সপ্তমত, টেকনিক্যাল গ্রেড উৎপাদন ও উন্নত ফর্মুলেশন প্লান্টের প্রসারে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। প্রতিযোগিতামূলক হারে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ব্যাকওয়ার্ড ইন্টিগ্রেশনে বিনিয়োগ সক্ষম করবে। অষ্টমত, গবেষণা সহযোগিতা আরো গভীর করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতকে যৌথভাবে স্থানীয় উপযোগী ফর্মুলেশন তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের কৃষি-জলবায়ু স্বতন্ত্র, তাই স্থানীয় উদ্ভাবন কার্যকারিতা বাড়াবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করবে। নবমত, শুরু থেকেই রফতানি কৌশলকে সমন্বিত করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার বাজারগুলোর ফসলের ধরন ও পোকামাকড়ের সমস্যা একই রকম। মানের নিশ্চয়তা থাকলে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক সরবরাহকারী হয়ে উঠতে পারে।
এ সংস্কারগুলোর কোনোটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটবে না। বেসরকারি খাত বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত। আধুনিক ফর্মুলেশন প্লান্ট দেশে এরই মধ্যে সচল আছে। কিন্তু বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নির্ভর করে নীতিগত ধারাবাহিকতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার ওপর। যদি আমদানির পথই বেশি লাভজনক থাকে, তবে পুঁজি বিনিয়োগে দ্বিধা আসবে। আমাদের জনমানসকেও নতুনভাবে গড়তে হবে। কৃষি-রাসায়নিক পণ্যকে প্রায়ই কেবল ঝুঁকির মাপকাঠিতে দেখা হয়। দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং পরিবেশগত পরিপালন নিয়ে কোনো আপস নেই। তবে একটি শক্তিশালী দেশীয় উৎপাদন ভিত্তি থাকলে পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ (ট্রেসেবিলিটি) এবং মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা অনেক সহজ হয়।
নির্ভরতা দায়িত্বকে ছড়িয়ে দেয়, কিন্তু দেশীয় সক্ষমতা তাকে সংহত করে। ন্যাকে (এনএসি) গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বামার সভাপতি হিসেবে আমি স্পষ্টভাবে বলছি: সামান্য পরিবর্তন আর যথেষ্ট নয়। অবিলম্বে সক্রিয় নীতি বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। ১৫ হাজার কোটি টাকার অভ্যন্তরীণ বাজার একটি বিশাল চাহিদা। এক হাজার আমদানিকারককে এ বাজারে আধিপত্য করার সুযোগ না দিয়ে মাত্র ২২ জন প্রস্তুতকারককে সঙ্গে নিয়ে আমাদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিল্প সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশ আগেও বিভিন্ন খাতকে রূপান্তর করেছে। সমন্বিত নীতি ও উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টায় তৈরি পোশাক শিল্প বড় হয়েছে। ট্রিপস সুবিধা কাজে লাগিয়ে ওষুধ শিল্প বৈশ্বিক সক্ষমতা অর্জন করেছে। কৃষি-রাসায়নিক খাতও একই পথ অনুসরণ করতে পারে—এজন্য নীতি ও শিল্পের মধ্যে একটি সিদ্ধান্তমূলক সমন্বয় প্রয়োজন।
এলডিসি সুবিধার সময়সীমা বাড়ানো হলে তাকে কৌশলগত সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। শুল্ক বৈষম্য দূর করুন। কাঁচামালের উৎস উন্মুক্ত করুন। পদ্ধতিগত বাধা দূর করুন। প্রয়োজনে কমপালসারি লাইসেন্সিং নিশ্চিত করুন। উৎপাদনকারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করুন। গবেষণা ও অর্থায়ন জোরদার করুন। এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হন।
অন্যথায় যখন নীতিগত সুযোগগুলো সংকুচিত হবে, আমরা অরক্ষিত হয়ে পড়ব। খাদ্যনিরাপত্তা মানেই জাতীয় নিরাপত্তা। শিল্প সক্ষমতা মানেই অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব। কৃষি-রাসায়নিক শিল্প এ দুটির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। পছন্দ আমাদের—আমদানি অব্যাহত রেখে ঝুঁকি বাড়ানো, অথবা দেশীয় শক্তি বাড়িয়ে আমাদের কৃষির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা। আমাদের এ সংকল্পের বিচার করবে ইতিহাস।
কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান: ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যালস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বামা) সভাপতি