শিল্প খাতে আর প্রণোদনা দেয়া হবে না

ব্যবসায়ীদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে

শিল্প খাতের বিকাশে সরকারের ভর্তুকি বা প্রণোদনা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু টেকসই শিল্প খাত গড়ে তুলতে প্রয়োজন ব্যবসায়ীদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। নয়তো একদিকে সরকারের প্রণোদনা দেয়ার

শিল্প খাতের বিকাশে সরকারের ভর্তুকি বা প্রণোদনা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু টেকসই শিল্প খাত গড়ে তুলতে প্রয়োজন ব্যবসায়ীদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। নয়তো একদিকে সরকারের প্রণোদনা দেয়ার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়, অন্যদিকে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা প্রণোদনা কাঠামোর বাইরে আসতে পারেন না। এর প্রমাণ পাওয়া যায় দেশের শিল্প খাতের দিকে তাকালেই। যেমন রফতানিকে উৎসাহিত করার জন্য সরকার ৪৩ খাতে নগদ প্রণোদনা দিয়ে আসছে। ২০০৯-১০ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর—এ ১৪ বছরে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে মোট ৬২ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা। এত বিপুল অংকের প্রণোদনা পাওয়ার পরও কেবল পোশাক খাত ছাড়া রফতানির অন্য খাতগুলো সেভাবে এগোতে পারেনি। বরং বাস্তবতা হলোর, তৈরি পোশাকসহ কিছু পণ্য রফতানি খাত প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেও প্রণোদনা কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। অথচ প্রয়োজন ছিল প্রণোদনা কাজে লাগিয়ে শিল্প খাতের সম্প্রসারণ, বহুমুখীকরণ ও গুণগত মানোন্নয়নের মাধ্যমে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো।

এ বাস্তবতায় সরকারের ভবিষ্যতে প্রণোদনা দেয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসাই সংগত। তাছাড়া উন্নত অর্থনীতির স্থায়ী বৈশিষ্ট্যও নয় এটি। তবে সব খাত থেকে প্রণোদনা সরানো সমীচীন হবে বলে মনে হয় না। বিশেষ পরিস্থিতি, নতুন উদ্যোগ ও বাজার চাহিদা এসব বিবেচনায় রেখে কিছু খাতে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা সুবিধা অব্যাহত রাখতে হবে। যেমন পরিবেশগত বিপর্যয়, নানামুখী আর্থিক সংকট ইত্যাদি। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত বা অতিরিক্ত সক্ষমতার খাতগুলো থেকে এ সুবিধা প্রত্যাহার করাই শ্রেয়। এর উদাহরণ হিসেবে পোশাক খাত, বিদ্যুৎ খাতের কথা বলা যায়। প্রতিষ্ঠিত খাতগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত প্রণোদনা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগসহ প্রযুক্তি খাতে দেয়া যেতে পারে। অর্থাৎ সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা সাপেক্ষে প্রণোদনা নির্ধারণ করতে হবে। তবে শিল্প খাতের বিকাশে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ। তাই সরকারের প্রয়োজন ব্যবসা সহজে দীর্ঘমেয়াদি নীতিসহায়তার উদ্যোগ নেয়া। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের (এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন) কথা রয়েছে ২০২৬ সালে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধান অনুসারে এমনিতেও তখন আর কোনো ধরনের রফতানি প্রণোদনা বা নগদ সহায়তা দেয়ার সুযোগ থাকবে না।

বিগত কয়েক দশকে বিভিন্ন খাতে সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনার মাধ্যমে ব্যবসায় পরিবেশ উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সুফল মেলেনি। উল্টো এসব সুবিধার সিংহভাগের সুযোগ নিয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে রফতানি প্রণোদনার অর্থ বিতরণে বিভিন্ন সময়ে নানা অনিয়ম ঘটেছে। এসব অনিয়মের মধ্যে রয়েছে শতভাগ রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠান না হওয়া সত্ত্বেও নগদ প্রণোদনা গ্রহণ, আবেদনের নির্ধারিত সময়সীমা অতিবাহিত হওয়ার পরও প্রণোদনা নেয়া, এলসির মাধ্যমে আমদানি করা সুতার মূল্য বাদ না দিয়ে নগদ সহায়তা গ্রহণ, ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে কেনা সুতা রফতানি হওয়া তৈরি পোশাকে ব্যবহার না করে প্রণোদনা নেয়া, ইএক্সপি ইস্যু, পণ্য জাহাজীকরণ ও রফতানি মূল্য প্রত্যাবাসনের আগেই আবেদনের বিপরীতে নগদ সহায়তা প্রদান ইত্যাদি। এমনকি নিরীক্ষকের জাল সনদের মতো গুরুতর অপরাধের মাধ্যমেও প্রণোদনার অর্থ তছরুপের নজির রয়েছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের করা একটি কমপ্লায়েন্স অডিটে এসব অনিয়ম উঠে এসেছে।

টানা কয়েক বছর ধরে দেশে যে অর্থনৈতিক সংকট রয়েছে, সেগুলো প্রশমনের ব্যবস্থা হিসেবে প্রণোদনা ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তিদায়ক হিসেবে কাজ করেছে। সেখানে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে প্রণোদনা হাতিয়ে নেয়ার এসব ঘটনা হতাশাব্যঞ্জকও বটে। বলা বাহুল্য, ব্যাংক খাত লুট থেকে শুরু করে প্রণোদনার অর্থ আত্মসাৎ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চালান জালিয়াতির মতো আর্থিক অপরাধ ব্যবসা সম্প্রসারণের অন্তরায়। যে কারণে দীর্ঘকাল ধরেই ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিতে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে পিছিয়ে। চলতি বছরেও এর খুব একটা উন্নতি হয়নি। এ বছর ব্যবসা পরিবেশের এমন ভঙ্গুর দশার জন্য প্রধানতম দায়ী দুর্নীতি বলে মনে করেন দেশের ১৭ শতাংশ ব্যবসায়ী। সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। জরিপে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্নীতির পাশাপাশি আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা, মূল্যস্ফীতি, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো প্রভৃতিও ব্যবসার প্রধান অন্তরায়। এদিকে দেশের তীব্র জ্বালানি সংকটে এরই মধ্যে অনেক কারখানার উৎপাদনের গতি শ্লথ হয়ে এসেছে। উপরন্তু বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকটে ব্যবসা খরচ বেড়েছে। এ বাস্তবতায় প্রণোদনার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারের দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা। ব্যবসায়ীদের এটি অনুধাবন করতে হবে যে নগদ প্রণোদনা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।

বরং ব্যবসায়ীদের জোর দেয়া প্রয়োজন প্রণোদনা পেতে ও দিতে যারা অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন, সবাইকে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে। আর সরকারের উচিত অসৎ ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করে সৎ উদ্যোক্তাদের সহযোগিতায় মনোযোগী হওয়া। মোটা দাগে প্রণোদনার পরিবর্তে ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো উত্তরণের জন্য কাঠামোগত সংস্কার ও সঠিক পদক্ষেপ নেয়া অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা দূর করা অপরিহার্য। এছাড়া ঋণপ্রাপ্তি সহজ ও সুদহার সহনীয় করার উদ্যোগ নিতে হবে। জমি, অবকাঠামো ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়ায় হয়রানি দূর করতে হবে। আর যেসব খাতে প্রণোদনা দেয়া হবে, সরকারের দিক থেকে সেগুলোর তদারকি জোরদার করতে হবে।

সরকারের এসব নীতি-সহায়তার পাশাপাশি সবচেয়ে জরুরি হলো, ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, যাতে উৎপাদন বাড়ে। এর জন্য প্রথমত, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা মাথায় রেখে প্রযুক্তিগত দক্ষতার উন্নয়নে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদন প্রক্রিয়া আধুনিক করা, মেশিনারি ও প্রযুক্তির ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন এবং প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মী গড়ে তুলতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। একই সঙ্গে গবেষণার মাধ্যমে পণ্যের গুণগত মান উন্নত করা এবং নতুন পণ্য উদ্ভাবন করাও গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল মার্কেটিং, ই-কমার্স এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় আধুনিক পদ্ধতির ব্যবহার ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে আরো কার্যকর ও লাভজনক করে তুলতে পারে।

দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা সম্প্রসারণে মনোযোগ দিতে হবে। মুক্ত অর্থনীতি ও বিশ্বায়নের যুগে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করাটা জরুরি। আর বিশ্ববাজারে প্রবেশের জন্য বৈশ্বিক মান বজায় রাখা অপরিহার্য। মোট কথা, প্রণোদনার বিষয়ে সরকারের সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিতে হবে। আর প্রণোদনা পাওয়া ব্যবসায়ীদের তা কাজে লাগিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোয় জোর দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে প্রণোদনানির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসা যায়।

আরও