ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে বিলিয়নেয়ার গৌতম আদানিকে একজন গুজরাটি ব্যবসায়ী থেকে এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিতে পরিণত করেছে। রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার জেরেই আদানির হঠাৎ এ উত্থান। সবকিছুই পরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছিল। কিন্তু বাধ সাধে কিছু খবর। জালিয়াতি ও শেয়ারবাজার কারসাজির অভিযোগ সামনে এলে আদানির বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের পতন ঘটতে থাকে। কয়েক দিনের ব্যবধানে আদানি গ্রুপ ১১০ বিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য হারায়। আদানির সাম্রাজ্যের ধস ভারতের মোদি সরকারের ক্রোনিক্যাপিটালিজমের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে হাজির হয়েছে।
আদানি ও মোদির সম্পর্কের সূত্রপাত ২০০২ সালে, যখন মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হন। তৎকালে গুজরাটে এক হাজারের বেশি মুসলিম নাগরিককে হত্যায় সহায়তার অভিযোগে মোদি ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হন। গণহত্যার ঘটনায় নরেন্দ্র মোদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয়েছিল এবং ভারতের ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশের নেতারা তার সঙ্গ এড়িয়ে চলছিল। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ী আদানি ছিলেন ব্যতিক্রম। আদানি মোদি ও তার দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে সমর্থন জুগিয়ে গেছেন। এ আনুগত্যের কারণেই পরবর্তী সময়ে তাকে ব্যাপকভাবে পুরস্কৃত করেছেন মোদি। পরবর্তী এক দশকে আদানি গ্রুপের গল্প শুধু দ্রুতগতিতে বিস্তৃত হওয়ার। এ সময়ে খাদ্য আমদানি-রফতানি, কয়লা খনি উন্নয়ন ও কয়লা ব্যবসা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও অবকাঠামো উন্নয়নে একাধিক রাজ্য সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় আদানি গ্রুপ।
বছরের পর বছর আদানি ও মোদির সম্পর্ক আরো দৃঢ় ও শক্তিশালী হয়েছে। ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে মোদি আদানির ব্যক্তিগত বিমানে দিল্লি যান। এ থেকে বোঝা যায় মোদির সঙ্গে আদানির ঘনিষ্ঠতা ছিল অনেক গভীর। মোদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে আদানি লোভনীয় সব সরকারি চুক্তি ও দেশী-বিদেশী, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অর্থ পেতে থাকে, যার কিছু আবার ব্যাপক বিতর্কও তৈরি করে। সরকার অনেক আইন-কানুন শিথিল অথবা বিধি পরিবর্তন করে আদানিকে ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। একটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। ২০১৭ সালে গোড্ডার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে আদানির একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের জন্য সব নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ৬০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ছাড় দেয়া হয়। ২০১৯ সালে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও আদানিকে ছয়টি নতুন বেসরকারি বিমানবন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিল মোদি সরকার।
শেয়ারবাজারে কারসাজির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ও ঋণনির্ভর বিনিয়োগ কার্যক্রম আদানি গ্রুপকে দ্রুত প্রবৃদ্ধি এনে দিয়েছিল। সরকারের মূলধন বিনিয়োগ, ডাটা শিল্পের সম্প্রসারণ ও নিট জিরো ট্রানজিশন পরিকল্পনাও আদানি গ্রুপ বড় হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। এক দশকেরও কম সময়ে আদানি গ্রুপ ৭ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি থেকে ১২০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠানে রূপ লাভ করে, যা আদানিকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ ধনী ব্যক্তিতে পরিণত করে (চলতি বছরের জানুয়ারিতে আদানির শেয়ারমূল্য পতনের আগ পর্যন্ত, বর্তমানে তার কোম্পানির মূল্য অর্ধেকে নেমে এসেছে)।
আর্থিক শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আদানি আরো বেশি আগ্রাসী হয়ে উঠতে থাকে। মোদি সরকারের সমালোচনা ও আদানির ব্যবসার বিভিন্ন অনিয়ম-জালিয়াতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় একাধিক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হতে তিনি পিছপা হননি। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলাও করেন আদানি। গত বছর আদানি ভারতীয় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রচার মাধ্যম এনডিটিভিকে কিনে নেয়। এটি নিয়ে সে সময়ে বেশ হইচইও হয়েছিল। যে কয়েকটি গণমাধ্যম মোদি সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করে আসছিল তার মধ্যে এনডিটিভি ছিল প্রথম সারিতে। বর্তমানে এনডি টিভি সরকারের মুখপাত্রের ভূমিকাই পালন করছে।
কিছু সময়ের জন্য হলেও মনে হয়েছিল আদানি কোনো ভুল করতে পারে না। তার ঋণনির্ভর উত্থান, কোম্পানির অবাস্তব শেয়ারমূল্য বৃদ্ধি, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও মিডিয়ার শক্তি, সর্বোপরি আদানি গ্রুপের সর্বব্যাপী বিস্তৃতি বিশ্বে ভারতের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সাফল্যকে তুলে ধরছিল। এ শক্তির কারণেই আদানিকে এক সময়ে অপ্রতিরোধ্য বলে মনে হয়েছে।
২৪ জানুয়ারিতে সব বিভ্রান্তি ভেঙে যায়, যখন শর্ট সেলিং ফার্ম হিনডেনবার্গ রিসার্চ আদানি গ্রুপকে নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে যেখানে ‘করপোরেট ইতিহাসের সর্ববৃহৎ প্রতারক’ হিসেবে আদানিকে অভিযুক্ত করা হয়। দুই বছরের দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর হিন্ডেনবার্গ অভিযোগ করে, কয়েক দশক ধরে ব্যবসায়িক এ প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে শেয়ারের মূল্য কারসাজি ও অ্যাকাউন্টিং জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত। প্রতিবেদনটিতে মরিশাসভিত্তিক ৩৮টি শেল কোম্পানির কথা বলা হয় যারা আদানির শেয়ারমূল্যের কারসাজি এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আদানি গ্রুপের কোম্পানিগুলো থেকে অর্থ পাচারে ব্যবহৃত হয়েছিল।
যদিও আদানি গ্রুপ হিন্ডেনবার্গের প্রতিবেদনকে ভারতের স্বাধীনতা, প্রতিষ্ঠান ও তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর এক ‘পরিকল্পিত আক্রমণ’ হিসেবে অভিহিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু ততক্ষণে বাজারের প্রতিক্রিয়া খুব দ্রুত ও মর্মান্তিক হয়েছিল। ফেব্রুয়ারির শুরুতেই রেটিং এজেন্সি মুডি’স আদানি গ্রুপের বেশ কয়েকটি কোম্পানির রেটিং কমিয়ে দেয়। এমএসসিআই আদানি গ্রুপের অধীনে থাকা চারটি কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। এটি আদানি কনগ্লোমারেটের সমস্যা আরো বাড়িয়ে তোলে। আস্থা অর্জনের জন্য আদানি গ্রুপ কর্তৃক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা সত্ত্বেও তাদের পতন থামানো যায়নি। পদক্ষেপগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নির্ধারিত সময়ের আগেই ১ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ পরিশোধ, আয় অর্জনের লক্ষ্য অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং পরিকল্পিত মূলধন ব্যয় স্থগিত রাখা।
বিরোধী দলগুলো সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমাগত ক্রোনিজমের অভিযোগ তুললেও মোদি সবসময়ই নীরবই থেকেছেন। ভারতের সরকার সবসময় দাবি করেছে ভারতের ‘শক্তিশালী’ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এ কেলেঙ্কারির বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে, যদিও এখন পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম হতাশাজনক। একাধিক আইনপ্রণেতা সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে ‘নীরব দর্শক’-এর ভূমিকায় থাকার অভিযোগ এনেছেন। বোর্ড অভিযোগের তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জারি এবং আদানি গ্রুপকে অভিযোগের উত্তর দিতে ছয় মাস সময় বেঁধে দেয়া ছাড়া আর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তবে সংস্থাটি অবশ্য আদানি গ্রুপের শেয়ার ও করপোরেট বন্ডের পতনের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং দেশের বাইরে ‘শর্ট সেলিং’ (এক জটিল ব্যবসায়িক কৌশল যেখানে নিজের মালিকানাধীনে না থাকা শেয়ার বিক্রি করা হয় এবং পরে দাম কমলে সেটি কিনে নেয়া হয়)-এর কিছু প্রমাণও পাওয়া গেছে।
আদানি গ্রুপ এ বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়াক বা না দাঁড়াক, বর্তমান এ সমস্যার পেছনে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ভারতের হাতে গোনা কয়েকটি গোষ্ঠীর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতাকেই দায়ী করতে হবে। এ কৌশল বিস্তৃতভাবে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে ভারতকে হতাশাজনক হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ভোগ নিম্নমুখী, বিনিয়োগের হার কমে যাওয়া এবং পরিবেশগত ধ্বংসের সম্মুখীন হতে হয়েছে। বৃহৎ শিল্প কনগ্লোমারেট রিলায়েন্স, টাটা ও আদিত্য বিড়লার মতো কোম্পানির ওপর নির্ভর না করে সরকারের উচিত এ সময়কে গতিপথ পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে উৎসাহিত এবং সামাজিক সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করা।
যদিও আদানি গ্রুপের কেলেঙ্কারিতে মোদির জনপ্রিয়তায় তেমন একটা প্রভাব ফেলেনি বলে আপাতত মনে হচ্ছে। তবে মোদির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের মূল্যায়ন এখনই করার সময় আসেনি। মোদি ও তার দল বিজেপি বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য দুর্নীতির কেলেঙ্কারির মুখোমুখি হলেও মিডিয়ার ওপর তাদের অভাবনীয় প্রভাবের জন্য তারা সেসব এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। তবে আদানির পতন ব্যাপারটি ভিন্ন রকম হতে পারে। কারণ এটি মোদির অর্থনৈতিক দর্শনের মূলনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এখন দেখা যাচ্ছে, কেবল একক অলিগার্কির ওপর নির্ভরতা ও সীমাহীন আর্থিক সুবিধা প্রদান এবং নিয়ন্ত্রণ শিথিলতা নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন কৌশল নয়।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
জয়তী ঘোষ: ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্টের অর্থনীতির অধ্যাপক ও জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের আর্থিক ও সামাজিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য