আলোকপাত

শিক্ষানীতি ও সাধারণের শিক্ষা ব্যবস্থা

স্বাধীন বাংলাদেশে শিক্ষার উদ্দেশ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়ে গেছে। দেশ, কাল, সময় বিবেচনায় শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরিবর্তন হয়। এটাই স্বাভাবিক। একসময় মাদ্রাসা ও টোলে এক রকম শিক্ষা ছিল। তারও আগে গুরুগৃহে থেকে বা গুরুর নির্জন পরিবেশের আস্তানায় থেকে গুরুসেবা করেই শিক্ষা গ্রহণ করতে হতো। তবে সে সময় রাজা, জমিদার, মহাজনরা গৃহশিক্ষক রেখে সন্তানদের

স্বাধীন বাংলাদেশে শিক্ষার উদ্দেশ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়ে গেছে। দেশ, কাল, সময় বিবেচনায় শিক্ষার লক্ষ্য উদ্দেশ্য পরিবর্তন হয়। এটাই স্বাভাবিক। একসময় মাদ্রাসা টোলে এক রকম শিক্ষা ছিল। তারও আগে গুরুগৃহে থেকে বা গুরুর নির্জন পরিবেশের আস্তানায় থেকে গুরুসেবা করেই শিক্ষা গ্রহণ করতে হতো। তবে সে সময় রাজা, জমিদার, মহাজনরা গৃহশিক্ষক রেখে সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতেন। এখানে জীবনকালে যেসব গুণ ব্যক্তির কাজ মনে উত্কর্ষ আনে, তা চর্চা করা হতো। মাদ্রাসা টোলে অক্ষরজ্ঞান দেয়ার পাশাপাশি শাস্ত্রজ্ঞান লাভের জন্য ধর্মীয় বই পড়া নকল করার মতো বিদ্যাচর্চা হতো। শিক্ষার্থীরা নিজেদের জীবনাচরণের আদর্শ তৈরিতে উদ্বুদ্ধ হতো ধর্মীয় মহানায়কদের জীবনাচরণ পাঠ করে। ব্রিটিশ আমলে আবার অন্য রকম। সময় থেকে শাসন করার খ্রিস্ট মতবাদ প্রচারের উপযোগী শিক্ষা প্রবর্তন করা হয়। নীতি বিচারবোধ জাগ্রত করে চারিত্রিক উন্নতি সাধন শিক্ষার লক্ষ্য হলেও সময়ে সরকারি উদ্যোগকে সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করে নেয়ার মতো নৈতিক সামর্থ্য অর্জনই শিক্ষার প্রধান অন্তর্নিহিত লক্ষ্য ছিল। পাকিস্তান আমলেও শিক্ষার অন্তর্নিহিত লক্ষ্য এর বাইরে এসেছে বলে মনে হয় না। আশা করা হয়েছিল, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন পথে হাঁটবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমাদের শিক্ষা জীবনযাত্রার যোগাযোগ তৈরি হলো না। ব্যক্তিগত জীবনের উন্নতি সাধনের মাধ্যমে জাতীয় জীবনের উন্নতি সাধনের পথটি বিকশিত হলো না। মানুষকে সঞ্চিত জ্ঞানের উত্তরাধিকারী করবে যে শিক্ষা, সে শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আত্মশক্তি বাড়ানোর পথে চলা হলো না। বিজ্ঞানশিক্ষার পথ ধরে হাতে-কলমের শিল্পী তৈরি করা গেল না। অতীতের ধারাবাহিকতায় স্বপ্নের পথে শিক্ষা বাংলাদেশে চলমান।

শিক্ষানীতি: ২০০ বছরের ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে প্রায় প্রতিটা সরকারই শিক্ষার উন্নয়নে উদ্যোগী হয়েছে। ১৮৩৫ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিং প্রণীত শিক্ষানীতি ভারতবর্ষের প্রধান সরকারি শিক্ষানীতি হিসেবে স্বীকৃত। ব্রিটিশ আমলে অ্যাডাম, মেকলে, হান্টার, নাথান কমিটির প্রতিবেদন উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশও একই পথের পথিক। প্রায় সব সরকারই এক বা একাধিক শিক্ষা কমিশন, সংস্কার কমিটি সুপারিশ তৈরি করেছেন। এসব প্রতিবেদন প্রবল আন্দোলনের মুখে বৈধতা পায়নি এটা যেমন সত্য, অন্যদিকে এসব প্রতিবেদন বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতার অভাব ছিল এটাও সত্য। বাংলাদেশে . কুদরাত--খুদা কমিশন প্রথম যে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছিল, সেখানে জাতীয় উন্নয়নের মূলমন্ত্র হিসেবে জাতির প্রত্যাশা প্রতিফলিত হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। সরকারকে সাংবিধানিক দায়িত্ব হিসেবেই শিক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়, তবে তা যে মানতে হবে, বাস্তবায়ন করতে হবে এমন বোধ তাদের মধ্যে কাজ করে না। তার পরও সময় কাল বিবেচনায় শিক্ষানীতিতে নানা সংস্কার সুপারিশমালা এসেছে কিন্তু তা দেশ জাতির জন্য সুখকর না হওয়ায় সামাজিক প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর অপেক্ষার পর জাতি শিক্ষানীতি-২০১০ পেয়েছে। শিক্ষানীতি যে দেশ জাতির প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম এমন দাবি করা যাবে না। আবার গত ১০ বছরে শিক্ষানীতির আলোকে শিক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমানএমন দাবিও করা যাবে না।

তবে সরকার শিক্ষানীতির অংশবিশেষ বাস্তবায়নে ব্যস্ত। পাশাপাশি তাদের নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ চলছে জোর কদমে। শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটি কাজ শুরু করাকালীন সরকার দেশে ১১টি বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা করে। শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি কী সুপারিশ করবে তা দেখার অপেক্ষা করা হয়নি। পেশাজীবীদের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্তি চরম আকার ধারণ করার ফলে এদের কাছে দেশ জাতির মঙ্গল-অমঙ্গল সবই গৌণ হয়ে পড়েছে। শিক্ষানীতি-২০১০- আমাদের সংবিধানের চেতনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের ক্ষেত্রেও ব্যত্যয় ঘটেছে। সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার কনসেপ্টকে পাশ কাটিয়ে নৈতিক শিক্ষার নামে ধর্মশিক্ষাকে পাঠ্যবইয়ে সংযোজন করা হয়েছে। এমন বৈপরীত্য সত্ত্বেও ব্যাপক পরিসরে প্রতিবাদ আসেনি। আশার কথা, সম্প্রতি দেশে একটা জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশনের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে নিজেদের ভাবনার সঙ্গে সমন্বয় করে শিক্ষানীতিকে সংবিধান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যুগোপযোগী করে তুলতে পারব। শিক্ষাতত্ত্ব দর্শন বিবেচনা পাবে, যা একটা মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন, সামাজিক ন্যায়বিচারসম্পন্ন সাম্যভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

শিক্ষার নানা রকমের অভাব, ত্রুটি-বিচ্যুতি, জাতি গঠন, শিক্ষার মাধ্যম, আধুনিক জ্ঞান কর্মশক্তিতে বলীয়ান করা ইত্যাদি বহু উদ্দেশ্য সামনে রেখে সরকার শিক্ষার উন্নয়নে কমিটি গঠন করে। স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষা সংস্কারের নামে একের পর এক কমিশন জাতির সামনে এসেছে। ১৯৭৪ সালে শিক্ষা কমিশন, ১৯৭৯ সালে অন্তর্বর্তী শিক্ষানীতি, ১৯৮৩ সালে শিক্ষানীতি ব্যবস্থাপনা কমিশন, ১৯৯৩ সালে প্রাথমিক গণশিক্ষাবিষয়ক টাস্কফোর্স, ১৯৯৭ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি, ২০০০ সালে জাতীয় শিক্ষা কমিটি, ২০০২ সালে শিক্ষা সংস্কার বিশেষজ্ঞ কমিটি, ২০০৩ সালে জাতীয় শিক্ষা কমিশন, ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি কমিশন গঠন করা হয়েছে। অতীতের কমিটিগুলোর সুপারিশের কথা বাদ দিয়েও শিক্ষানীতি হিসেবে গৃহীত ২০১০-এর শিক্ষানীতি ২০১৮-এর মধ্যে বাস্তবায়ন করার এবং শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত :৩০ নিয়মে করার প্রতিশ্রুতি সরকারের ছিল, কিন্তু তা আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পিত আর্থিক অনুমোদন এখনো দেয়া হয়নি। দীর্ঘদিনের শোষণ জর্জরিত সমাজে দ্রুত সামাজিক রূপান্তর অগ্রগতির জন্য শিক্ষাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের জন্য শিক্ষাসংক্রান্ত কমিটির সুপারিশসহ দেশের সিংহভাগ জনগণের দাবি অনুযায়ী জাতীয় আয়ের ন্যূনতম শতাংশ এবং ইউনেস্কোসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী জাতীয় আয়ের ন্যূনতম শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে বরাদ্দ টাকার অংকে বাড়লেও শতাংশ হিসেবে প্রতিবারই কমতে কমতে বর্তমানে শতাংশের নিচে চলে এসেছে। পৃথিবীতে আমাদের  চেয়ে অনেক দরিদ্র দেশও শিক্ষা খাতে আমাদের দ্বিগুণ বা তার বেশি অর্থ বরাদ্দ করে। আমাদের শিক্ষা খাতে বরাদ্দই প্রমাণ করে শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতা। সরকার শিক্ষা সংস্কারের কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন তৈরি তা অনুমোদন করে, প্রচার-প্রচারণা করে, গর্ব করে, শুধু প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করতে রাজি নয়। শিক্ষা সংস্কারের কিছু নেতিবাচক বিষয় নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে সত্য, তাই বলে আন্দোলনই বাস্তবায়নের প্রধান বাধা ছিল না। প্রতিটা কমিটির জন্য আর্থিক বরাদ্দই প্রধান বাধা। শিক্ষানীতি-২০১০ বাস্তবায়নে প্রধান বাধা আর্থিক অননুমোদন আন্তরিকতার অভাব।

সাধারণ শিক্ষা: মানবজাতির যুগ-যুগান্তরের সঞ্চিত জ্ঞানে মানুষের অধিকার সর্বজনস্বীকৃত। প্রতিটি মানুষকে সেই জ্ঞানের অংশীদার করতে বিশ্বব্যাপী প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশেও সিংহভাগ জনগণকে জ্ঞানের অধিকারী করতে প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সংবিধানে আছে যে একই পদ্ধতির গণমুখী সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের জন্য নির্ধারণী স্তর পর্যন্ত সব বালক-বালিকাকে বৈজ্ঞানিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রদান এবং শিক্ষানীতি-২০১০ আছে, প্রাথমিক শিক্ষা হবে সর্বজনীন, বাধ্যতামূলক, অবৈতনিক এবং সকলের জন্য একই মানের। প্রাথমিক শিক্ষা হবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় দেখা যাবে ১৩-১৪ বছর বয়সের পর সিংহভাগ শিক্ষার্থী জ্ঞান অর্জনের পথ থেকে সরে আসে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটামুটি ছয় বছর বয়সী সব শিশুর মধ্যে মাত্র ৪৫ জন অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবারের দারিদ্র্য বিবেচনায় এসব শিশুর জীবিকা অর্জনের প্রয়োজন দেখা দেয়। আবার কিছু শিশু জ্ঞান অর্জনের আগ্রহও হারিয়ে ফেলে। ফলে বিশ্বব্যাপী এমন বয়সী শিশুরা জীবিকার সন্ধানে কাজের খোঁজে বের হয়ে যায়। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার সুপারিশের এটা অন্যতম কারণ। তবে শিক্ষানীতি গৃহীত হওয়ার পরও বিষয়ে অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। প্রাথমিক শিক্ষার জন্য সরকার কর্তৃক বহু কার্যক্রম গৃহীত হলেও মানোন্নয়নের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে মানসম্মত করতে প্রাথমিক শিক্ষাকে যে রকম গুরুত্ব দেয়ার কথা, সে বিষয়ে পদক্ষেপ খুবই দুর্বল। দুর্বল প্রাথমিক শিক্ষার কারণে পরবর্তী সব শিক্ষাই দুর্বল হয়ে মানহীন থেকে যাচ্ছে। সংবিধান শিক্ষানীতিতে সবার জন্য একই মানের প্রাথমিক শিক্ষার কথা বলা হলেও দেশের ১১ রকমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল ব্যবস্থাপনায় আছে সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে সাধারণ জনগণ শিক্ষা গ্রহণ করে। এখানে শিক্ষার্থীপ্রতি বরাদ্দ এত কম, যা দিয়ে ভালো কিছু করা সম্ভব কিনা তা বিবেচনার দাবি রাখে। আমাদের সমাজে মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য যেভাবে দিনে দিনে বাড়ছে, শিক্ষার বৈষম্য ঠিক তেমনভাবে বেড়ে চলেছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক সময়, শিক্ষক সংকট, শিক্ষক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা উপকরণ, ভাষা শিক্ষা ইত্যাদি বিষয় গুরুত্বহীন হিসেবে প্রতিশ্রুতির আস্ফাালনে আটকা পড়ে আছে। আর শিক্ষার উন্নয়নে অবাস্তব ব্যবস্থাপনা চলমান। প্রাথমিক শিক্ষাকে স্থানীয় সরকারের সম্পৃক্ততায় আনা, এলাকাভিত্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এলাকাভিত্তিক ক্লাস শুরুর সময়, ফসল বিবেচনায় ছুটির ব্যবস্থাপনা, মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ্য নির্ধারণ ইত্যাদি সাধারণ বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। আরো শঙ্কার কথা, দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী তো বাংলাদেশের হিসাবের মধ্যেই নেই।

ভারতবর্ষে ইংরেজরা শিক্ষা সম্প্রসারণে উদ্যোগী হওয়ার সময়ে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণী স্বাধীনতা সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ায় ব্রিটিশরা তাদের হাত গুটিয়ে নেয়। ফলে সাধারণ মানুষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসে। আমাদের দেশের সিংহভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাধারণের শ্রম অর্থে গড়া। একসময়ে সরকার একটি মাত্র নির্বাহী আদেশে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সরকারি করে নিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র আজ পর্যন্ত দেশ জাতির প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সমর্থ হয়নি। শিক্ষানীতি-২০১০- প্রাথমিক শিক্ষার ভার বেসরকারি এনজিওগুলোর কাছে না দেয়ার সুপারিশ করার ফলে দেশে প্রয়োজনীয়সংখ্যক প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে উঠছে না। রাষ্ট্র যদি ঘোষণা দেয়, এক বিঘা জমিতে নির্দিষ্ট সরকারি মডেলে ভবন নির্মাণ করে দিলে সে প্রতিষ্ঠান বাবা-দাদা বা অন্য কারো নামে পরিচালনা করা হবে, তবে দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো অভাব থাকবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। সরকার সাধারণ মানুষের নির্মিত এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রের আন্তরিকতার অভাবেই সাম্প্রতিক সময়ে যতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে, তার সমসংখ্যক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।

আমাদের দেশে প্রাথমিক শেষ করা অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করে। বিশ্বব্যাপী সিংহভাগ শিক্ষার্থী মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে জীবিকার সন্ধানে কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত হয়। কারণ বিত্তবানরা ছাড়া উচ্চশিক্ষার জন্য অর্থ ব্যয় কষ্টসাধ্য। মধ্যবিত্ত দরিদ্র পরিবারের অধিক সন্তান পরিবারের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াবে না, বরং পরিবার থেকে অর্থ নিয়ে উচ্চশিক্ষা নেবে তা সাধারণভাবে সম্ভব হয় না। উচ্চশিক্ষা বিষয়ে শিক্ষানীতিতে আছে যে চার বছরের সম্মান স্নাতক ডিগ্রিকে সমাপনী ডিগ্রি হিসেবে এবং উচ্চশিক্ষায় শিক্ষকতা ব্যতীত অন্য সকল কর্মক্ষেত্রে যোগদানের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। উচ্চশিক্ষা বিষয়ে বিশ্বের ভাবনা বা শিক্ষানীতি দেশে, সমাজে কোনো প্রভাব ফেলে না। পরিচিত একজনকে জানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছেন। সে সময় তিনি পুলিশ বিভাগে কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পান। কিন্তু গ্রামের ব্যবসায়ী বাবা তাকে বাধ্য করেন পড়াশোনা শেষ করতে। মাস্টার্স শেষ না করে চাকরি করলে গ্রামে তার সম্মান থাকবে না। বাবার নির্দেশ মানতে গিয়ে শিক্ষা শেষে চাকরিতে স্রোত বন্ধ হয়ে গেল। ভদ্রলোক শিক্ষা শেষ করে একটা সরকারি ইন্টারমিডিয়েট কলেজে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং জীবনসায়াহ্নে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে একটা পদোন্নতি পান। ভদ্রলোকের যে বন্ধুরা পুলিশে যোগদান করেছিলেন, তাদের সামাজিক অবস্থান আর তার সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য তাকে নিরাশার অন্ধকারে তলিয়ে দিতে লাগল। বিতর্কের জন্য অনেকে শিক্ষকতাকে মহান পেশা হিসেবে বলতে পারেন কিন্তু আমাদের মর্যাদাভিত্তিক সমাজে পদমর্যাদাকে মূল্যহীন ভাবার কোনো কারণ নেই। দেশে শিক্ষকদের সামাজিক অর্থনৈতিক দুরবস্থা এমনই।

মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাকে মূল কাঠামো হিসেবে গ্রহণ করে যথেষ্ট সুশিক্ষিত হওয়া যায়, তা উন্নত বিশ্বে প্রমাণিত হলেও আমরা শিক্ষায় যত্নবান হতে পারিনি। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, উচ্চশিক্ষা গ্রহণে ধনীদের চেয়ে দরিদ্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে বেশি আগ্রহী। ধনিকশ্রেণী তাদের ব্যবসায়িক মানসিকতায় অপ্রয়োজনীয় উচ্চশিক্ষার দুয়ার খুলে দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পর বিশ্ববিদ্যালয় খুলে চলেছে এবং বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাকে পাশ কাটিয়ে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় জনগণকে উপহার দিচ্ছে। উচ্চবিত্তকে সন্তুষ্ট করতে শিক্ষানীতিতে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে পারার সুযোগ রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রকৌশল, কৃষি, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়ে গেছে। আগামীতে শিল্প, আইন, চামড়া, কারিগরি ইত্যাদি বিশ্ববিদ্যালয় আসবে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অন্ধকার দূর করতে না পারলেও সরকার ধরনের বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বেশি আগ্রহী। বিশ্ববিদ্যালয়ের পেশাজীবীরা দেশ জাতির জন্য এখন পর্যন্ত কোনো সুখকর পরিবেশ সৃষ্টিতে ব্যর্থতার পরিচয় রেখে চলেছেন। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ট্যাক্সের টাকা ব্যয় করার সার্থকতা এখনো প্রমাণিত নয়, তাই বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যুক্তির যথার্থতাও পাওয়া কঠিন। পাশাপাশি আছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে ন্যূনতম এক বিঘা জমির প্রয়োজন হলেও একটা ফ্ল্যাটে একটা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে দেখা যায়। এগুলোকে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভাবার কোনো কারণ নেই, এগুলো নিশ্চিতরূপেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

মধ্যম স্তরের জনশক্তি: শিক্ষার সঙ্গে মানবসম্পদ পরিকল্পনার প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে। মানবসম্পদ পরিকল্পনার অভাবেই দেশে কোন পেশাজীবী কতজন প্রয়োজন, তার হিসাব আজ পর্যন্ত কেউ করা জরুরি বলে মনে করল না। দেশ জাতির প্রয়োজন বিবেচনা না করে সামাজিক স্বার্থে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে। মাঝেমধ্যে - জন বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেরানি তৈরির কারখানা বলে মন্তব্য করলেও মুক্তির পথ খোঁজ করেনি। দেশের কল্যাণ চিন্তায় মধ্যম স্তরের কারিগরি জনশক্তি ভাবনার মধ্যে থাকলেও শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি কেউ যত্নবান নয়। অতীতে যতগুলো শিক্ষা কমিশন বা কমিটি হয়েছে, প্রতিটিতে কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে পৃথক অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। শিক্ষানীতি-২০১০- প্রথম বৃত্তিমূলক কারিগরি শিক্ষাকে একই অধ্যায়ে রাখা হয়েছে। এটা কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্বহীন করে রাখার প্রথম পদক্ষেপ। বিপরীতে সরকার মধ্যম স্তরের কারিগরি জনশক্তি ২০২০ সালে ২০ শতাংশ, ২০৩০ সালে ৩০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালে ৪০ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে। ২০২০ সাল পার হয়ে  গেছে। অংক শতাংশ থেকে ১২-১৩ শতাংশ বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে মাত্র। আবার বৃদ্ধিও যে মানসম্মত, তা দাবি করার কোনো সুযোগ নেই। ঢাল-তলোয়ারবিহীন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন দিয়ে মধ্যম স্তরের জনশক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে তা যেমন ঠিক, তেমনি মানহীন শিক্ষার ফলে এসব শিক্ষার্থী দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। এমন জনশক্তি দিয়ে আর যাই হোক চোখের পলকে বিশ্বের শিল্প-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলা কোনোভাবেই সম্ভব হতে পারে না। হাতে-কলমে শিক্ষা সম্পূর্ণ করার জন্য এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় কোনো ধরনের সুব্যবস্থা নেই, আবার কারখানায় গিয়ে শেখারও সুযোগ নেই। শিক্ষার সঙ্গে শিল্প-কারখানার সমন্বয়ের অভাবে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না। অথচ সমন্বয় কঠোরভাবে প্রয়োজন। পরিসংখ্যান দিয়ে সরকার হয়তো বিশ্বের মডেল হয়ে যেতে পারে কিন্তু দেশ জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন হবে না। প্রয়োজনীয় নার্স চিকিৎসা সহকারী তৈরি হচ্ছে না বলে দেশের স্বাস্থ্যসেবা হুমকির মুখে। কারোর সামান্য ঠান্ডা লাগলে বিদেশে দৌড়াচ্ছে, সাধারণ মানুষও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে বিদেশে ছুটছে। পাইলট দিয়ে গরুগাড়ি চালানোর মতো উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবী দিয়ে সেবা খাত পরিচালনার নীতির ফলেই মধ্যম স্তরের জনশক্তি আজও অবহেলিত। [চলবে]

 

এম আর খায়রুল উমাম: প্রাবন্ধিক; সাবেক সভাপতি

ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি)

আরও