সময়ের ভাবনা

চা শ্রমিকদের বঞ্চনার শেষ কোথায়?

দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে ১৩ আগস্ট থেকে ধর্মঘট করছেন সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের ১৬৭টি চা বাগানের প্রায় দেড় লাখ চা শ্রমিক। তাদের বর্তমান সর্বোচ্চ মজুরি দৈনিক ১২০ টাকা, যা বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন ও চা বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) মধ্যকার চুক্তির ওপর ভিত্তি করে ২০১৯-২০ সালের

দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে ১৩ আগস্ট থেকে ধর্মঘট করছেন সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের ১৬৭টি চা বাগানের প্রায় দেড় লাখ চা শ্রমিক। তাদের বর্তমান সর্বোচ্চ মজুরি দৈনিক ১২০ টাকা, যা বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন ও চা বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) মধ্যকার চুক্তির ওপর ভিত্তি করে ২০১৯-২০ সালের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০। প্রথা অনুযায়ী ২০২১-এর জন্য নতুন করে চুক্তি হওয়ার কথা ছিল, যার মাধ্যমে ১ জানুয়ারি, ২০২১ থেকে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ার কথা। কিন্তু ১৯ মাস পার হয়ে গেলেও সেই মজুরি বৃদ্ধির চুক্তি আজও হয়নি, এখন আন্দোলনের কারণে মালিক পক্ষ ও সরকার মাত্র ২৫ টাকা মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাব দিচ্ছে, যা শ্রমিকদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় বলেই তারা ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছেন।

বর্তমান বাজারে একজন শ্রমিকের পরিবারসহ বেঁচে থাকার জন্য দৈনিক মাত্র ১২০ টাকা মজুরি যে কোনোভাবেই যথেষ্ট না, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। এমনকি সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্ধারণ করা মজুরির হারও চা শ্রমিকদের দাবি করা ৩০০ টাকার চেয়ে বেশি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অক্টোবর ২০২০-এর সার্কুলার অনুসারে দেশের জেলা-উপজেলায় দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করা একজন দক্ষ শ্রমিকের মজুরি হবে সর্বনিম্ন ৫৫০ টাকা। অথচ চা শ্রমিকদের মজুরি ১২০ টাকা থাকবে না, ১৪৫ টাকা হবে—তা নিয়ে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে দরকষাকষি করছে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর এবং চা বাগানের মালিক পক্ষ। চা শ্রমিকরা ৩০০ টাকার বদলে দৈনিক মজুরি সরকার ঘোষিত রেটের সমপরিমাণ ৫৫০ টাকা নির্ধারণের দাবি তুললেও তা অন্যায্য হতো না।

চা শ্রমিকদের অতিনিম্ন মজুরির প্রসঙ্গ উঠলেই চা বাগান মালিকরা দাবি করেন টাকার হিসেবে চা শ্রমিকরা দৈনিক ১২০ টাকা মজুরি পেলেও অন্য আরো যেসব সুবিধা তারা ভোগ করেন, সেগুলোর আর্থিক মূল্য আরো বেশি, প্রায় ৪০৩ টাকা। চলুন দেখা যাক, বাগান মালিকরা কোন কোন ‘সুবিধাকে’ মজুরি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে চান এবং বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুসারে সেগুলোকে আসলেই মজুরি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা। চা বাগান মালিকরা যেসব সুবিধাকে মজুরি হিসেবে দেখাতে চান তার মধ্যে রয়েছে রেশন, বাসস্থান, চিকিৎসা সুবিধা, পেনশন, শ্রমিক সন্তানের শিক্ষা, শ্রমিক কল্যাণ কর্মসূচি (যেমন—পানি সরবরাহ, মশার ওষুধ স্প্রে, পয়োনিষ্কাশন, গামছা সরবরাহ ইত্যাদি), শ্রমিকদের বসতির আশপাশে উৎপাদিত ফলমূল, শাকসবজির মূল্য, বাড়তি উত্তোলনের বোনাস, ভবিষ্যৎ তহবিলের চাঁদা ইত্যাদি, কিন্তু শ্রম আইন ২০০৬ অনুসারে একমাত্র রেশন ছাড়া আর কোনোটিকেই মজুরি হিসেবে ধরা যায় না। শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ২(৪৫) অনুসারে যেসব সুবিধাকে মজুরি হিসেবে গণ্য করা যাবে না, তার মধ্যে রয়েছে: বাসস্থান, আলো, পানি, চিকিৎসা সুবিধা বা অন্য কোনো সুবিধাদানের মূল্য, অবসর ভাতা তহবিল বা ভবিষ্য তহবিলে মালিক কর্তৃক দেয়া কোনো চাঁদা ইত্যাদি। অর্থাৎ চা বাগান মালিকরা বাগান পরিচালনা ও শ্রমিক নিয়োগ করার অত্যাবশ্যকীয় কতগুলো খরচের খাত যেমন: পানি সরবরাহ, মশার ওষুধ স্প্রে, পয়োনিষ্কাশন, গামছা সরবরাহ ইত্যাদিকে ব্যক্তি শ্রমিকের মজুরি হিসেবে চালিয়ে দিতে চাচ্ছেন, যা শুধু শ্রম আইন নয়, যেকোনো বিবেচনায়ই অগ্রহণযোগ্য। 

তাছাড়া চা বাগানের যে জমিতে চা শ্রমিকদের থাকতে দেয়া হয়, সে জমি বাগান মালিকের নিজস্ব জমি নয়, এগুলো সরকারি অর্থাৎ জনগণের জমি। যদিও কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাস করার কারণে এসব জমি চা শ্রমিকদের নিজস্ব জমি হিসেবে স্বীকৃত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সিএস কিংবা আরএস জরিপ করার সময় এসব জমিকে স্রেফ খাসজমি হিসেবে দেখানো হয়েছে যেন এসব জমিতে স্রেফ থাকতে দেয়ার বিনিময়ে চা জনগোষ্ঠীকে যুগ যুগ নিম্ন মজুরির জীবনের মধ্যে আটকে রাখা যায়। এ জমিগুলোয় চা জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক অধিকার রয়েছে কারণ ১৫০ বছর আগে তাদেরকে যখন মধ্যপ্রদেশ, ছোট নাগপুর, যুক্ত প্রদেশ কিংবা মাদ্রাজ থেকে এ দেশে নিয়ে আসা হয়, তখন এখানে বসবাস করবার অধিকার দেয়ার কথা বলেই তাদের আনা হয়েছিল।

কেউ কেউ বলছেন, মজুরি যখন এত কম, তাহলে চা শ্রমিকরা কাজ ছেড়ে দিলেই পারে! সমস্যা হলো, চা বাগানের কাজ ছেড়ে দিলে চা শ্রমিকদের তাদের কয়েক প্রজন্মের বসতবাড়িও ছেড়ে দিতে হবে, যে বসতবাড়ি ছাড়া চা শ্রমিকদের আর কোনো ঠিকানা নেই! যে জমিতে তারা ১৫০ বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বসবাস করে আসছেন, সে জমির ওপর যেহেতু তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক অধিকার বা মালিকানা নেই, তাই সে জমিটুকু ধরে রাখতে হলে পরিবারের অন্তত একজনকে বাগানে কাজ করতেই হয়! 

সপ্তাহে শ্রমিক পরিবারপ্রতি যে সাত-আট কেজি রেশনের চাল বা আটা দেয়া হয়, সরকার থেকে সস্তায় লিজ নেয়া বাগানের জমিতে যে ছোট্ট কুঁড়েঘরের অমানবিক পরিবেশে তাদের থাকতে দেয়া হয়, এবং বাগানে যে সামান্য স্বাস্থ্য সেবাটুকু তাদের মেলে, তার মূল্য যোগ করলেও মজুরি দৈনিক ২০০ টাকার বেশি হবে না, যা বাংলাদেশের যেকোনো খাতের ন্যূনতম মজুরি থেকে কম এবং মানবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতিসংঘের যৌথ জরিপ অনুযায়ী, সিলেটের চা বাগানের প্রায় ৭৪ শতাংশ শ্রমিক এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, অপুষ্টির কারণে চা বাগানের ৪৫ শতাংশ শিশুই খর্বকায়, ২৭ শতাংশ শীর্ণকায় এবং স্বল্প ওজনের শিশু ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ। 

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অনেকটা এ রকম, বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের যে চা খেয়ে আমরা প্রতিদিন তাজা হই, সেই চা উৎপাদন করতে গিয়ে চা শ্রমিকরা প্রতিদিন আরো নির্জীব হয়। ভালো ফলনের জন্য চা গাছ ছেঁটে ছেঁটে ২৬ ইঞ্চির বেশি বাড়তে দেয়। হয় না। চা শ্রমিকের জীবনটাও ছেঁটে দেয়া চা গাছের মতোই, লেবার লাইনের একটা কুঁড়েঘরে বন্দি। মধ্যযুগের ভূমিদাসের মতোই মালিকের বাগানের সঙ্গে বাঁধা তার নিয়তি।

এ অতিনিম্ন মজুরির একেকজন চা শ্রমিক সকালে লবণ দিয়ে এক মগ চা আর সঙ্গে দুই মুঠো চাল ভাজা খেয়ে বাগানে যান, তার উৎপাদিত চা ও দুধ চিনি দিয়ে খাওয়ার সামর্থ্য তার নেই। সারা দিন এক পায়ে দাঁড়িয়ে, মাইলের পর মাইল হেঁটে কঠোর পরিশ্রম। যারা পাতা তোলেন, ২৩ কেজি পাতা তুললেই কেবল দিনের লক্ষ্যমাত্রা বা নিরিখ পূরণ হয়, হাজিরা হিসেবে গণ্য হয়। গাছ ছাঁটাকালে অন্তত ২৫০টা গাছ ছাঁটতে হয় দিনে। কীটনাশক ছিটালে অন্তত এক একর জমিতে কীটনাশক ছিটালেই তবে নিরিখ পূরণ। দুপুরে এক ফাঁকে মরিচ আর চা পাতার চাটনি, সঙ্গে মাঝে মাঝে মুড়ি-চানাচুর।

একেকদিন হাত ফুলে যায়, পা ফুলে যায়, ঝোপালো চা গাছের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে হাত-পা কোমর ছিলে যায়। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, সাপ-বিছার কামড় খেয়ে তারা বাগানে কাজ করেন। সন্তানের শিক্ষা মেলে না, চিকিৎসা মেলে না, যে ঘরটিতে প্রজন্মান্তরে তার বসবাস, সে ঘরটিও তার হয় না, ঘরটি ধরে রাখতে হলে পরিবারের একজনকে অন্তত চা শ্রমিক হতেই হয়।

অথচ বাগান মালিকের জমি সরকারেরই খাসজমি, সামান্য অর্থে লিজ নিয়ে সস্তায় চা বাগান করে বিভিন্ন ব্রিটিশ স্টারলিং কোম্পানি, দেশীয় সরকারি এবং বেসরকারি করপোরেট কোম্পানি, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইস্পাহানী, ব্র্যাক, এইচআরসি, আকিজ, ফিনলে, ডানকান, সিটি গ্রুপ, হামদর্দ, ট্রান্সকম, স্কয়ার, ওরিয়ন ইত্যাদি। প্রশ্ন হলো, ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের চা বাগান মালিকরা যদি চা শ্রমিকদের ২৩২ রুপি (বাংলাদেশী ২৭৭ টাকা) মজুরি দিয়ে ব্যবসা করতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের চা বাগানের করপোরেট মালিকরা কেন তা করতে পারবেন না! ভর্তুকিমূল্যে সার পান তারা, সহজ শর্তে স্বল্প সুদে কৃষি ঋণও বরাদ্দ বাগান মালিকদের জন্য। অথচ চা শ্রমিকদের দাবি সামান্যই—দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকা, পরিবার নিয়ে বসবাস করার জন্য ৭৫০ বর্গফুটের পাকা ঘর, বাগানে ভূমির অধিকার, সন্তানের শিক্ষা, যথাযথ স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন সুবিধা, চাকরি স্থায়ীকরণ ইত্যাদি। যেকোনো বিবেচনায়ই চা শ্রমিকদের এসব ন্যূনতম দাবি বাস্তবায়ন জরুরি।

শ্রম আইন ২০০৬ অনুসারে, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে জীবনযাপন ব্যয়, উৎপাদন খরচ, উৎপাদনশীলতা, ব্যবসার সামর্থ্য, মূল্যস্ফীতি, কাজের ধরন, ঝুঁকি ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করার কথা বলা হলেও তার জন্য কোনো স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা দাঁড় করানো হয়নি, বরাবরই বিভিন্ন সংঘবদ্ধ শক্তির ক্ষমতার জোর ও অস্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সেক্টরের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ বা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। আর সামান্য কিছু মজুরি বৃদ্ধির জন্য শ্রমিকদের দিনের পর দিন রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে হয়, মালিক গোষ্ঠী ও পুলিশের নিপীড়নের শিকার হতে হয়। বাংলাদেশে অর্থনীতির উচ্চপ্রবৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির ভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের ভাগে জুটছে না। দেশের অর্থনীতির সুষম বিকাশে অবিলম্বে দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাপন ব্যয়ের সঙ্গে মিল রেখে মানবিক জীবনযাপনে সব খাতের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের মেকানিজম দাঁড় এবং প্রতি বছর সে অনুযায়ী মজুরি সমন্বয় করতে হবে।


কল্লোল মোস্তফা: লেখক ও প্রকৌশলী

নির্বাহী সম্পাদক, সর্বজনকথা

আরও