মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান। সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি)। এর আগে তিনি অর্থ সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিসটিংকশন নিয়ে ফাইন্যান্স ও অ্যাকাউন্টিংয়ে মাস্টার অব সায়েন্স (এমএসসি) ডিগ্রি অর্জন করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বাজেট বাস্তবায়নের বিদ্যমান সংকট, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) অফিসের নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম
গত এগারো মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৮ শতাংশ কম কর আহরণ করেছে। এনবিআর কেন কখনই তার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কর আহরণ করতে পারে না?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩৮ শতাংশ কম রাজস্ব আহরণ করেছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ক্রমাগতভাবে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং এনবিআরের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতারই প্রতিফলন। আমাদের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা প্রায়ই উচ্চাভিলাষীভাবে নির্ধারণ করা হয়, যা অনেক সময় রাজনৈতিক কৌশলের কারণে হয়। কিন্তু এনবিআরের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তিগত ঘাটতি, দক্ষ জনবলের অভাব এবং কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা রয়েছে—এসব মিলিয়ে তাদের বাস্তব সক্ষমতা সেই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়। এছাড়া এনবিআরের অভ্যন্তরীণ অদক্ষতা, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রাজস্ব আহরণে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
সরকার পরিকল্পিত ব্যয় নির্ধারণ করার পর এ উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাকে বিবেচনায় রেখে বাজেট ঘাটতির সীমা নির্ধারণ করে। এ ঘাটতি পূরণে স্বল্প সুদবাহী বৈদেশিক ঋণ সবসময় নিশ্চিত নয়—এগুলো উন্নয়ন সহযোগীদের বিভিন্ন শর্ত দ্বারা নির্ধারিত ও সীমিত। অন্যপক্ষে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ বেশি নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ হ্রাস পায় (ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট), যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ প্রেক্ষাপটে রাজস্ব আয় বৃদ্ধিই ঘাটতি মোকাবেলার প্রধানত টেকসই উপায়। রাজস্ব আয় বৃদ্ধিকে সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নীত করতে হলে কর ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার, প্রযুক্তির অধিকতর ব্যবহার, অপচয় কমানো, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করাই হতে পারে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) পুনর্গঠন করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি বিভাগ করার অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এটিকে কীভাবে দেখছেন?
সম্প্রতি সরকার এনবিআর পুনর্গঠন করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে পৃথক দুটি বিভাগে বিভক্ত করে অধ্যাদেশ জারি করেছে। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও এনবিআরকে মন্ত্রণালয়ের বিভাগে রূপান্তর করায় এর স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। রাজস্ব নীতি বিভাগে অর্থনীতিবিদ ও ট্যাক্স বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দেয়া না হলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসবে না। একই সঙ্গে অধ্যাদেশে উল্লেখিত উপদেষ্টা পরিষদের গঠন ও ক্ষমতা নিয়েও স্বচ্ছতা দরকার।
আগেও রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনাকে পৃথক করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, কিন্তু এনবিআরের অভ্যন্তরীণ অনীহার ফলে তা বাস্তবায়ন হয়নি। এবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ পৃথকীকরণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন, যা একটি ইতিবাচক দিক। তারা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছেন—এটিও প্রশংসনীয়।
তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে, বিভাজনটি কতটা ন্যায্য ও সুনির্দিষ্টভাবে করা হয়েছে? এনবিআরকে এখন একটি মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভাগ হিসেবে রূপান্তর করা হয়েছে, যা এনবিআরের সংবিধিবদ্ধ স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে। এটি একটি নীতিগত দিকচ্যুতির আশঙ্কাও তৈরি করে।
নীতিগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, রাজস্ব নীতি বিভাগে নিয়োগ কাদের করা হবে? এখানে নিয়োজিতদের রাজস্ব নীতি, কর কাঠামো এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব বিষয়ে বিশদ জ্ঞান থাকতে হবে। এ পেশাদারত্ব না থাকলে নীতিগত সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এছাড়া প্রস্তাবিত উপদেষ্টা পরিষদে কারা থাকবেন, নিয়োগ কীভাবে হবে এবং তাদের মতামত কতটা বাধ্যতামূলক হবে এসবও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ জরুরি।
আমার মত হচ্ছে, যদিও অধ্যাদেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা, এটি পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। রাজস্ব নীতি বিভাগকে অধ্যাদেশের মাধ্যমে সৃষ্টি না করে ‘রুলস অব বিজনেস’-এর অধীনে নিয়ে আসা যেতে পারে এবং এনবিআরকে সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে অধ্যাদেশের আওতায় বহাল রেখে এর চেয়ারম্যান এবং সদস্যদের পদমর্যাদা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। রাজস্ব নীতি বিভাগ ও এনবিআরে কর্মকর্তা পদায়নের ক্ষেত্রে বিসিএস ক্যাডার কম্পোজিশন রুলে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা যেতে পারে। তবে এনবিআরের এ বিভাজন একটি কার্যকর পদক্ষেপ হয়ে ওঠা ও এর সার্বিক সফলতা নির্ভর করছে দক্ষ নেতৃত্ব, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়ের ওপর।
বাজেট ব্যবহারের অদক্ষতা নিয়ে অনেকেই কথা বলেন। যে কারণে অনেক সময় বরাদ্দকৃত অর্থ অব্যবহৃত থেকে যায় বা বরাদ্দের অপচয় হয়। একটি দক্ষ বাজেট প্রণয়নের চ্যালেঞ্জগুলো কী?
বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমাদের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা রয়েছে, যার অন্যতম কারণ উপযুক্ত পরিকাঠামো ও সক্ষমতার অভাব। রাজস্ব বাজেটে মূলত স্থায়ী খরচ—যেমন বেতন, পেনশন, সুদ পরিশোধ, পরিচালন ব্যয়—প্রাধান্য পায়। কিন্তু রাজস্ব আয় বৃদ্ধির মতো প্রডাক্টিভ ইনভেস্টমেন্ট প্রকল্প (যেমন কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়ন ইত্যাদি) প্রায় অনুপস্থিত।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) গ্রহণের সময় প্রকল্পের অর্থনৈতিক উপযোগিতা, বাস্তবায়নযোগ্যতা, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিতে সম্ভাব্য প্রভাব পর্যালোচনা যথাযথভাবে করা হয় না। বরং প্রকল্প অনুমোদনে রাজনৈতিক বিবেচনা অনেক ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায়। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।
প্রকল্পের সময় ও বাজেটের মধ্যে সমন্বয় নেই। উদাহরণস্বরূপ, ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প যদি তিন বছর মেয়াদি হয়, তবে প্রথম বছরেই নামমাত্র বরাদ্দ দেয়া হলে সেটি মুখ থুবড়ে পড়ে। প্রকল্প পরিচালনায় দক্ষ জনবল নেই। রোটেশনাল সিভিল সার্ভিস থেকে কর্মকর্তাদের নিয়ে আসা হলেও তাদের প্রকল্প পরিচালনার উপযুক্ত দক্ষতা অনেক সময় থাকে না। এছাড়া প্রকল্প গ্রহণের আগে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, লাভজনকতা, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিতে অবদান পর্যালোচনা করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা উপেক্ষিত হয়।
এছাড়া মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে প্রকল্পের সামঞ্জস্য না থাকায় বরাবরই সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পায়। তাই এখন সময় এসেছে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবার। তবে এ সমস্যা সমাধানে সম্ভাব্য পন্থা হতে পারে স্বাধীন প্রকল্প মূল্যায়ন ইউনিটের মাধ্যমে স্ক্রুটিনি নিশ্চিত, প্রকল্প পরিচালকের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও পারফরম্যান্সভিত্তিক নিয়োগ, প্রকল্পের মেয়াদ বিবেচনায় রেখে সময়ভিত্তিক উপযুক্ত বরাদ্দ কাঠামো অনুসরণ।
আপনি সিএজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে জানতে চাই, সরকারি ব্যয় ও প্রশাসনে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে বড় চ্যালেঞ্জ কী রয়েছে?
কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) দপ্তর সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার প্রতিবেদনগুলো সংসদীয় তদারকি ছাড়া নির্বাহী বিভাগে তেমন প্রভাব ফেলে না। কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে শক্তিশালী সংসদীয় জবাবদিহি কাঠামো অপরিহার্য।
অতীতে অনেক সময় পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি গঠিত হয়নি অথবা গঠিত হলেও কমিটিতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত সদস্যদের নিয়োগ করা হয়নি। যেমন এ মুহূর্তে সংসদ না থাকায় নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনার কোনো ফোরাম নেই। তাই প্রথমেই প্রয়োজন সংসদীয় স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা। তাহলেই সিএজির রিপোর্টগুলো কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক ও আর্থিক খাতে অনেকগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্কার কি সঠিক পথে এগোচ্ছে?
অন্তর্বর্তী সরকার আর্থিক খাতে দৃশ্যমান সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে, যা প্রশংসনীয়। অর্থ পাচার অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে বিভিন্ন ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠিত হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্ষয় রোধ করা সম্ভব হয়েছে, বাজারভিত্তিক করা সত্ত্বেও বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার মূল্যমান মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে এবং ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বিভিন্ন দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা বেড়েছে।
বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে অনেক চেষ্টা-কসরত করছে সরকার। বিডা-বেপজার নেতৃত্বে বড় একটি বিনিয়োগ সম্মেলনও আয়োজন হলো। কিন্তু বৈদেশিক বিনিয়োগ তথৈবচ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বড় বিনিয়োগ প্রত্যাশা করেন?
বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহ এখনো উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি। বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতি ধারাবাহিকতার নিশ্চয়তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সবাই জানে এ মুহূর্তের সরকার অন্তর্বর্তী, তাই অনেক বিদেশী ও দেশীয় বিনিয়োগকারী অপেক্ষা করছেন।
সম্প্রতি আয়োজিত বিনিয়োগ সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্বের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা গেলেও কেবল সম্মেলনের মাধ্যমে বিনিয়োগ আসবে—এমনটি আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। এছাড়া অবকাঠামোগত সংকট যেমন জ্বালানি ঘাটতি, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জটিলতা, একক জানালা (ওয়ান-স্টপ সার্ভিস) যথাযথভাবে না চলা বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে।
আমাদের শিল্পনীতি ও কর কাঠামোকে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের পথে বড় বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমাদের শিল্পনীতি ও কর কাঠামোকে ঢেলে সাজাতে কোন সংস্কারগুলো অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত?
দেশীয় শিল্পনীতি ও কর কাঠামোও বিদেশী বিনিয়োগের প্রতিবন্ধক। কর রেয়াত প্রক্রিয়ায় কিছু সংস্কার আনা হলেও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা এখনো রয়ে গেছে। এসব সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নিলেই বিনিয়োগ পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে। এছাড়া রাজস্ব আহরণ, বাজেট বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও বিনিয়োগ পরিবেশ—এ চারটি ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। এনবিআর পুনর্গঠন একটি আশাব্যঞ্জক সূচনা হলেও তার বাস্তবায়নে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্ব নিশ্চিত করাই হবে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ।
বাজেট বাস্তবায়নে কাজ করে আমলাতন্ত্র। আমরা দেখছি এখনো আমলাতন্ত্র পুরনো পথেই চলছে। বাজেট বাস্তবায়নে দক্ষতা ও কার্যকারিতা এবং দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে জটিলতা নিরসনে আমলাতন্ত্রে কোন সংস্কারগুলো জরুরি বলে মনে করেন?
বর্তমানে ‘টপ-ডাউন’ পদ্ধতিতে অর্থাৎ কেন্দ্র থেকে উপরিভিত্তিকভাবে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ধারা চালু রয়েছে। এ কাঠামোয় প্রকল্প নির্বাচনের সময় অনেক ক্ষেত্রে জনগণের প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনায় নেয়া হয় না। ফলে দেখা যায় কেন্দ্র থেকে রাস্তা, সেতু বা অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেয়া হলেও যেসব এলাকায় প্রকৃত উন্নয়ন প্রয়োজন সেগুলো উপেক্ষিত থেকে যায়।
উদাহরণস্বরূপ কোনো রাস্তা সংস্কার করা হলেও মাঝখানে ড্রেন থাকে, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই বা পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নেয়া হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর দেখা যায়—কাজটি টেকসই হয়নি বা অল্পদিনেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, কোথাও সড়ক নির্মাণের পূর্ণ সুফল পেতে ৩০ কিলোমিটারের সড়ক নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বাস্তবে হয়তো করা হয়েছে মাত্র ৬ কিলোমিটার।
এ কাঠামোগত সমস্যার মূল কারণ স্থানীয় সরকারের সক্রিয়তা ও ক্ষমতার ঘাটতি। প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতায়ন ছাড়া বাজেটের দক্ষ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। কারণ স্থানীয় পর্যায়ের মানুষই সবচেয়ে ভালো জানে তাদের এলাকার কী প্রয়োজন, কী জরুরি। এজন্য প্রকল্প চিহ্নিতকরণ, বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সরকারের হাতকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী, আমাদের দেশে স্থানীয় সরকারকে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকার এখনো বাজেট পরিকল্পনা ও প্রকল্প অনুমোদনের পূর্ণ কর্তৃত্ব রাখছে, এমনকি কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তর-পরিদপ্তর স্থানীয় সরকারকে প্রায় অন্ধকারে রেখে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে হলে প্রয়োজন স্থায়ীভাবে রাজস্ব ভাগাভাগির একটি কাঠামো, যাতে কেন্দ্রীয় বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয় সরকার পায়। স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্ব থেকে প্রাপ্ত গ্র্যান্ট এবং তার নিজস্ব আয়কে ব্যবহার করে স্থানীয় বাস্তবতা ও প্রয়োজনীয়তাকে বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ, প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে পারে। অন্যথায় বাজেট কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আমাদের সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় শাসনের কথা বলা আছে। স্বল্পমেয়াদে সম্ভব না হলেও মধ্যমেয়াদে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনয়নের মাধ্যমে ‘স্থানীয় শাসন’-কে ‘স্থানীয় সরকার’-এ উন্নীত করতে হবে।
আমরা বারবার প্রকল্প গ্রহণ করছি অথচ বাস্তবায়নের কাঠামো দুর্বল। যতদিন প্রকল্প পরিকল্পনার সঙ্গে সুশাসন, সক্ষমতা ও স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করা হবে ততদিন কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।