ন্যায্যতার সহজপাঠ-২

গণতান্ত্রিক সমাজে ন্যায্যতার উপযুক্ত নৈতিক ধারণা প্রসঙ্গে

জন রলস (১৯২১-২০০২) বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দার্শনিক। তার সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ আ থিওরি অব জাস্টিস (ন্যায্যতার তত্ত্ব) প্রকাশিত হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বছর—১৯৭১ সালে। জ্ঞানতত্ত্ব ও দর্শনশাস্ত্রে জার্মান ভাষাকে অন্যতম বিবেচনা করা হয়। কারণ পাশ্চাত্য দর্শনের প্রায় সব দার্শনিকের গ্রন্থ জার্মান ভাষায় লেখা। রলসের ন্যায্যতার তত্ত্ব গ্রন্থটি জার্মানসহ প্রায় ২৭টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন পর্যন্ত রলসের বাংলা অনুবাদ হয়নি।

জন রলস (১৯২১-২০০২) বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দার্শনিক। তার সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ থিওরি অব জাস্টিস (ন্যায্যতার তত্ত্ব) প্রকাশিত হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বছর১৯৭১ সালে। জ্ঞানতত্ত্ব দর্শনশাস্ত্রে জার্মান ভাষাকে অন্যতম বিবেচনা করা হয়। কারণ পাশ্চাত্য দর্শনের প্রায় সব দার্শনিকের গ্রন্থ জার্মান ভাষায় লেখা। রলসের ন্যায্যতার তত্ত্ব গ্রন্থটি জার্মানসহ প্রায় ২৭টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন পর্যন্ত রলসের বাংলা অনুবাদ হয়নি।

রলসের ন্যায্যতার অনুসন্ধান মূলত একটি প্রশ্নকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। প্রশ্নটি হলো, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে ন্যায্যতার সবচেয়ে উপযুক্ত নৈতিক ধারণা কী হবে? প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার ন্যায্যতার তত্ত্ব গ্রন্থটিতে তিনি প্রশ্নটির উত্তর সন্ধান করেছেন। প্রশ্নটি রলসের সাধারণ জিজ্ঞাসার অংশ হলেও তা সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিতে মানব প্রকৃতি বৈশিষ্ট্যগুলো কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ, এটি তিনি যাচাই করে দেখতে চেয়েছিলেন। পথে রলস যতই অগ্রসর হয়েছেন ততই বড় বড় বাধা এসেছে, যেগুলো অতিক্রম করতে তাকে যথেষ্ট শ্রম দিতে হয়েছে। সামাজিক ন্যায্যতার ক্ষেত্রটিতে আগে থেকেই তৃপ্তিযোগবাদ (উপযোগবাদ, ইউটিলিটেরিয়ানিজম) প্রাতিষ্ঠনিকতাবাদ আধুনিক নীতি দর্শনে বেশ শক্তভাবে অনেকখানি জায়গা দখল করে ছিল। চিন্তার নতুন রাস্তা তথা সামাজিক ন্যায্যতার পথ প্রশস্তের জন্য তিনি তৃপ্তিযোগবাদের বিকল্প রসদের দিকে হাত বাড়ান। রলস এজন্য সামাজিক চুক্তি বা সোস্যাল কনট্রাক্ট-সংক্রান্ত সনাতন চিন্তাধারার বিপুল ভাণ্ডার থেকে রসদ সংগ্রহ করেন, যার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায্যতাও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল। সনাতনী চিন্তাধারার সামাজিক চুক্তির সঙ্গে রলসের নীতিদর্শনের সামাজিক ন্যায্যতা যুক্ত হওয়ার ফলে যে নতুন প্রশস্ত পথ তৈরি হলো, সেটি কিন্তু পদ্ধতিগতভাবে কান্টীয় চিন্তা ঘরানার।

অষ্টাদশ শতকের দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট ছিলেন আলোকায়ন যুগ বা এনলাইটেনটমেন্টের একজন কেন্দ্রীয় চিন্তক। তিনি জ্ঞানতত্ত্বের দুটি ভিন্ন পদ্ধতিকে সমন্বিত করে নতুন জ্ঞানের তত্ত্ব নির্মাণ করেছিলেন। চিন্তার ইতিহাসে কান্টের আগে এম্প্রিসিজম বা অভিজ্ঞতাবাদী ধারার চিন্তকরা মনে করতেন একমাত্র অভিজ্ঞতা থেকেই জ্ঞানের সৃষ্টি। উদাহরণস্বরূপ, আমরা দার্শনিক ডেভিড হিউমের কথা বলতে পারি। অন্যদিকে মেথড বা পদ্ধতি নিয়ে ভাবুকরা প্রমাণ করেন অভিজ্ঞতার পথ ছাড়াও আমরা মেথডের মাধ্যমে জ্ঞান লাভ করি। কান্টের বিখ্যাত উক্তি: যোগ সমান সমান ১২ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অর্থাৎ ১২ যদি হয় নতুন জ্ঞান, তবে তা পেতে একজনকে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়নি; বরং সে যোগের পদ্ধতিটি ব্যবহার করে নতুন জ্ঞান লাভ করল। দার্শনিক রেনে ডেকার্ত গণিতবিদ বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন পদ্ধতিগত চিন্তার উল্লেখযোগ্য দুজন ভাবুক। পরবর্তী সময়ে দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট পরস্পর খারিজ করা দুটি ধারাকে সিনথেসিস বা সমন্বয় করেন। কান্ট দেখান যে মানবজাতি যুগপত্ভাবে অভিজ্ঞতা মেথড দুটি ধারার সমন্বয় থেকেই নতুন জ্ঞান লাভ করে, যার নাম তিনি দেন ক্রিটিক্যাল থিওরি।

রলসের লক্ষ্য ছিল সামাজিক ন্যায্যতার সবচেয়ে উপযুক্ত কার্যকর এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ন্যায্যতার তত্ত্বায়ন, যার মাধ্যমে সমাজে বসবাসকারী সব ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী পেশার মানুষ ভারসাম্যপূর্ণভাবে জীবন-যাপন করতে পারেন। রলস কান্টীয় সমন্বিত ভাবধারায় সনাতনী সামাজিক চুক্তি, নীতিশাস্ত্র সামাজিক চয়ন (সোস্যাল চয়েস) তত্ত্বের মধ্যে সমন্বয় করে একটি সর্বশ্রেষ্ঠান্বেষী প্রাতিষ্ঠানিকতাবাদী ন্যায্যতার তত্ত্ব নির্মাণ করেছেন। রলসের সমন্বিত চিন্তাধারার মতে, ন্যায্যতার জন্য প্রাথমিক দ্রব্যসামগ্রী (বেসিক সোস্যাল গুডস) প্রয়োজন, যেগুলো সমাজের সদস্যদের মধ্যে সমতার ভিত্তিতে বিতরণ হবে। রলস প্রাথমিক দ্রব্যসামগ্রীর একটি তালিকাও দিয়েছেন। সেগুলো হলো স্বাধীনতা (লিবার্টি), কাজ পাওয়ার সুযোগ, আয়, সম্পদ, মানবিক মর্যাদা। আমাদের আশেপাশে নানা ধরনের যেসব অন্যায়, শোষণ অসমতা রয়েছে, সেগুলো এই চলমান করোনা মহামারীতে আরো প্রকট হয়েছে। ফলে রলস প্রবর্তিত প্রাথমিক দ্রব্যের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়। ন্যায্যতার পথে প্রাথমিক দ্রব্যের অন্তর্ভুক্তি কেবল মানবিক কারণেই গুরুত্ব বহন করে না, বরং তা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকদের বেঁচে থাকা ন্যায্যতার দাবির পথকে অনেকখানি সুগম করবে বলে আমার বিশ্বাস।

একদিকে দরিদ্রদের প্রাথমিক দ্রব্যের বঞ্চনা এই ন্যূনতম দ্রব্যের বাইরে জীবনের অন্যান্য প্রয়োজনের পরিসরে বৈষম্যকে কীভাবে কমানো যাবে আকাঙ্ক্ষাই ন্যায্যতার সবচেয়ে কার্যকর পথ পদ্ধতি অনুসন্ধানে আমাদের উদ্বুদ্ধ করে। কারণেই ন্যায্যতাকে বাস্তবে প্রয়োগ করা যায় এমন ধারণাগুলোকে পরিচ্ছন্নভাবে বুঝতে পারা একটি জরুরি কাজ। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ন্যায্যতার প্রাথমিক ধারণার জন্য সমাজে মানুষ পরস্পরকে কীভাবে সহযোগিতা করছে। অর্থাৎ সমাজের মৌলিক কাঠামোর ভেতরেই ন্যায্যতার ক্রিয়াকলাপকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। মানুষে মানুষে সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে ন্যায্যতাকে বুঝতে গেলে এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। রলস ন্যায্যতাকে দেখেছেন সমদর্শিতার ভিত্তিতে। রলস ইংরেজিতে একে বলেছেন জাস্টিস অ্যাজ ফেয়ারনেস অর্থাৎ মৌলিকভাবে ন্যায্যতাকে বুঝতে হবে সমদর্শিতার দৃষ্টিকোণ থেকে। ফেয়ারনেস শব্দের চমত্কার বাংলা অনুবাদ সমদর্শিতা আমি ধার করেছি অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের নীতি ন্যায্যতা গ্রন্থ থেকে। রলসের ন্যায্যতা চিন্তার একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে জাস্টিস অ্যাজ ফেয়ারনেস বা সমদর্শিতার ভিত্তিতে ন্যায্যতা বোঝার দৃষ্টিভঙ্গি। রলসের ন্যায্যতা তত্ত্বটি দাঁড়িয়ে আছে সমদর্শিতার ভিত্তিতে; যা ন্যায্যতার তত্ত্বায়নের একটি সর্বজনীন বিমূর্ত ধারণা। সর্বজনীন এই অর্থে যে পৃথিবীর সব সমাজ জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায্যতার দাবির মূল ভিত্তি হতে হবে সমদর্শিতা। কিন্তু সমদর্শিতার তত্ত্বটি একই সঙ্গে বিমূর্ত। কারণ বিভিন্ন মানুষের বাস্তব অবস্থায় যেসব অসমতা, শোষণ বঞ্চনা লক্ষ করা যায়, তার প্রকৃতি বৈশিষ্ট্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। এসব সমস্যার সমাধান ন্যায্যতার ভিত্তিতে করতে গেলে ন্যূনতম মৌলিক ভিত্তি হবে সমদর্শিতা। আবার কখনো কখনো ন্যায্যতার জন্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য (নারী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু ইত্যাদি) সংরক্ষণের প্রয়োজন পড়ে। কারণ দেখা যাচ্ছে যে ঐতিহাসিকভাবে সেই নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠী। অথবা বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জের (শারীরিক কিংবা মানসিক) সম্মুখীন ব্যক্তির জন্য অথবা অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য হয়তো কিছুটা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বরাদ্দের প্রয়োজন পড়ে। কোনো একটি বিশেষ মুহূর্তে তিন ক্ষেত্রেই হয়তো সমদর্শিতা রক্ষা করা যাচ্ছে না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সমদর্শিতার কারণেই এগুলো করতে হচ্ছে।

পারস্পরিক শর্ত বা চুক্তির ভিত্তিতে আদিতে যে সমাজ গড়ে উঠেছিল তা শুরুর সময়ের পরিস্থিতি থেকে বর্তমান অবস্থার পারিপার্শ্বিকতায় বহু ধরনের পরিবর্তন ঘটে গেছে। রলসের মতে, ন্যায্যতার মূলনীতিগুলোর ভিত্তিতে আদি অবস্থায় যে চুক্তি হয়েছিল, পরে সময়ের বিবর্তনে সেসব অবস্থা আমূল পাল্টে গেছে। ফলে আদি অবস্থায় যেসব ভিন্নতাকে আমলে নিয়ে সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে সমাজটা শুরু হয়েছিল, তা বর্তমানের ভিন্নতাকে ধারণ করতে হলে ন্যায্যতার নতুন চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে। রলস ন্যায্যতার ধ্রুপদী তৃপ্তিযোগবাদী ধারা প্রাতিষ্ঠানভিত্তিক ন্যায্যতার চিন্তা দুই ধারাকে বিশ্লেষণ করে এদের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যগুলো নির্ণয় করেছেন। ন্যায্যতা চিন্তার দুই ধারার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণেও রলস সমদর্শিতাই ন্যায্যতা দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিভূমিতে দাঁড়িয়েই পর্যালোচনা করেছেন।

তবে সমদর্শিতার বিমূর্ত ধারণা পরিষ্কার করতে এবং একে পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য মৌলিক ধারণার উৎস হিসেবে রলস সামাজিক চুক্তি সনাতনী ধারার সঙ্গে এটিকে যুক্ত করেছেন। কারণ তিনি তৃপ্তিযোগবাদের (উপযোগবাদ, ইউটিলিটেরিয়ানিজম) বিকল্প ন্যায্যতার তত্ত্ব নির্মাণ করে দেখিয়েছেন সামাজিক চুক্তি চিন্তার ধারাবাহিকতায় সমদর্শিতাই ন্যায্যতা তত্ত্বের কার্যকারিতা ফল উভয়ই তৃপ্তিযোগবাদের ফলের চেয়ে বেশি। তাছাড়া তৃপ্তিযোগবাদী চিন্তার ত্রুটি-বিচ্যুতি বিকল্প তত্ত্বে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন রলস। পরে অবশ্য অধ্যাপক অমর্ত্য সেন আমাদের দেখাবেন যে রলসের চিন্তাও সব সমস্যামুক্ত নয়। কিছু সীমাবদ্ধতা এটিরও রয়েছে। এর চেয়েও উচ্চতর ন্যায্যতার তত্ত্ব অমর্ত্য সেন নির্মাণ করেছেন। সব শেষে, এই আমি দেখাতে চেষ্টা করব কেন অমর্ত্য সেনের ক্রমবর্ধমান (ইনক্রিমেন্টাল) ন্যায্যতার তত্ত্বের কিছু একপেশে বিষয় রয়েছে এবং বিশ্বন্যায্যতার জন্য একটি সমন্বিত নতুন ন্যায্যতা তত্ত্বের (জ্ঞানগত পারিসরিক ন্যায্যতা) প্রয়োজন রয়েছে।  

 

আহমেদ জাভেদ: দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি

 

আরও