বৈশ্বিক আবহাওয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঘটনা—এল নিনো ও লা নিনা। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা পরিবর্তনের দুটি বিপরীত প্রাকৃতিক চক্র। এর মধ্যে এল নিনো সমুদ্রের পানিকে উষ্ণ করে তোলে, আর লা নিনা করে ঠান্ডা। এগুলোকে আবার একত্রে ইএনএসও এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন চক্রও বলা হয়।
এখন প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে অবস্থিত নয়; আমাদের অবস্থান বঙ্গোপসাগরের উপকূলে, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। সবচেয়ে কাছের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল—দক্ষিণ চীন সাগর বা থাই উপসাগরও বাংলাদেশ থেকে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে। তাহলে প্রশান্ত মহাসাগরের পানির উষ্ণতা বা শীতলতা নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ কেন?
একদিকে এল নিনোর সময় বৃষ্টির ঘাটতি ও খরার আশঙ্কা, অন্যদিকে লা নিনার সময় অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি। অর্থাৎ আমাদের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য সমস্যা শুধু পানি কমে যাওয়াই নয়, বেড়ে যাওয়াও সমান সংকট
এর উত্তর অবশ্য লুকিয়ে আছে বৈশ্বিক আবহাওয়া ব্যবস্থার পারস্পরিক সংযোগে। পৃথিবীর এক প্রান্তের সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তার প্রভাব শুধু ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সমুদ্রের তাপমাত্রা পরিবর্তনের সঙ্গে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ, জলীয়বাষ্প ও বৃষ্টিপাতের বৈশ্বিক ব্যবস্থারও পরিবর্তন ঘটে। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের অঞ্চল পর্যন্ত। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া এল নিনো বা লা নিনার মতো ঘটনা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আবহাওয়া ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশও সেই বৃহৎ আবহাওয়াগত ব্যবস্থার অংশ।
বাঁকা কথা এড়িয়ে সোজা কথায় বলতে গেলে বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বিস্তীর্ণ নিম্নভূমি, ঘনবসতি এবং কৃষিনির্ভর অর্থনীতির কারণে জলবায়ুগত পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও এর প্রভাব পড়ে মানুষের জীবনযাত্রায়। বৃষ্টিপাত কমে গেলে কৃষি ও পানিসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার অতিবৃষ্টি হলে দেখা দেয় বন্যা ও জলাবদ্ধতা। ফলে এল নিনো ও লা নিনার মতো বৈশ্বিক জলবায়ুগত ঘটনা বাংলাদেশের জন্য দূরের কোনো সমুদ্রের গল্প নয়; এগুলো দেশের কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, পানি, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিষয়টিকে আরো সহজ করতে এবার এক গবেষণাপত্রে চোখ বোলানো যাক। ‘দ্য ইমপ্যাক্ট অব এল নিনো অ্যান্ড লা নিনা ওয়েদার প্যাটার্নস অ্যান্ড দ্য কনসিকোয়েন্সেস অব ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি করেছেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশের দুই শিক্ষার্থী গবেষক। এটি গত বছর মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত তৃতীয় ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন অ্যাডভান্সমেন্ট অব লাইফ সায়েন্সেসে উপস্থাপিত হয়।
বাংলাদেশের আবহাওয়া-সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে পরিচালিত গবেষণাটিতে ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল এল নিনোর সময় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া ও বর্ষা বিলম্বিত হওয়ার মতো পরিস্থিতির প্রভাব মূল্যায়ন করা। একইসঙ্গে লা নিনার সময় অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে খাদ্যনিরাপত্তা ও মানুষের জীবিকায় কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়, তাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণার তথ্যানুযায়ী, গত দুই দশকে বাংলাদেশে বার্ষিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে এল নিনোর বছরগুলোয় তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি বেড়েছে। ২০১৫ ও ২০২৩ সালে এ প্রবণতা ছিল উল্লেখযোগ্য। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, দুই দশকে তাপমাত্রা প্রায় ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে ২০২৩ সালে গড় ২৯ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে।
এ তাপমাত্রা বৃদ্ধি শুধু একটি সংখ্যা নয়। এর অর্থ হলো, গরমের তীব্রতা বাড়ার ঝুঁকি, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় চাপ। গবেষণায় বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা তাপপ্রবাহ, খরা ও অন্যান্য চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে; যা কৃষি, পানিসম্পদ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়। কেননা অতিরিক্ত তাপমাত্রা কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে, পানির চাহিদা বাড়াতে পারে এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের মানুষ প্রশান্ত মহাসাগরের পানির উষ্ণতা সরাসরি অনুভব না করলেও এর সঙ্গে যুক্ত বৃহৎ বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তনের ফল হিসেবে দেশের আবহাওয়ায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। আমাদের জন্য এল নিনোর সবচেয়ে আলোচিত সম্ভাব্য প্রভাবগুলোর একটি হলো বৃষ্টিপাতের ঘাটতি। দেশের কৃষির একটি বড় অংশ এখনো মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টিপাত কমে গেলে সেচের প্রয়োজন বাড়ে। ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের পানির ওপর চাপ তৈরি হয়। ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
গবেষণায় ১৯৯৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বৃষ্টিপাতের তথ্য বিশ্লেষণ করে উল্লেখ করা হয়েছে, এল নিনোর বছরগুলোয় স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে। ১৯৯৭ সালে বৃষ্টিপাতের বিচ্যুতি ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ কম। ২০২৩ সালে তা ৬৭ শতাংশ কম ছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বৃষ্টিপাতের এ ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি করতে পারে খরার মতো পরিস্থিতি।
বাংলাদেশের কৃষির জন্য এ পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন নির্দিষ্ট সময়ে পর্যাপ্ত পানি পাওয়ার ওপর নির্ভর করে। বর্ষা বিলম্বিত হলে অথবা মৌসুমে প্রয়োজনীয় বৃষ্টি না হলে চাষাবাদের সময়সূচি পরিবর্তিত হতে পারে। কৃষকের সেচ খরচ বাড়তে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
শুধু কৃষিই নয়, কম বৃষ্টিপাতের প্রভাব পড়ে পানিসম্পদের ওপরও। নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ে পানির পরিমাণ কমে যেতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা আরো কঠিন হয়ে ওঠে। ফলে এল নিনোর সঙ্গে সম্পর্কিত বৃষ্টির ঘাটতি বাংলাদেশের জন্য একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।
এল নিনোর বিপরীত ধাপ লা নিনা। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, নিরক্ষরেখার কাছাকাছি মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পানির পৃষ্ঠ স্বাভাবিকের তুলনায় শীতল থাকার সঙ্গে লা নিনা সম্পর্কিত। এ পরিবর্তনের কারণেও বৈশ্বিক আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আসে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো অঞ্চলে বেড়ে যেতে পারে বৃষ্টিপাত।
বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক ও নিম্নভূমির দেশের জন্য অতিবৃষ্টি আবার আশীর্বাদ নয়। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হলে নদীর পানি বাড়ে, জলাবদ্ধতা তৈরি হয় এবং বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় লা নিনার বছরগুলোয় অতিবৃষ্টির প্রবণতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১০ সালে স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাতের বিচ্যুতি ৩৫ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ২৫ শতাংশ বেশি ছিল বলে গবেষণায় বলা হয়। এ ধরনের অতিবৃষ্টি বন্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং কৃষি, অবকাঠামো ও মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
এখানেই বাংলাদেশের বড় দ্বন্দ্ব। একদিকে এল নিনোর সময় বৃষ্টির ঘাটতি ও খরার আশঙ্কা, অন্যদিকে লা নিনার সময় অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি। অর্থাৎ আমাদের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য সমস্যা শুধু পানি কমে যাওয়াই নয়, বেড়ে যাওয়াও সমান সংকট।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক এখনো অত্যন্ত গভীর। ফলে আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তনও কৃষির ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্যনিরাপত্তার ওপর গিয়ে পড়ে। আবার ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জনস্বাস্থ্য। তীব্র গরম মানুষের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাপপ্রবাহ চললে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং বাইরে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ে।
ফলে বাংলাদেশের জন্য এল নিনো ও লা নিনা নিয়ে আলোচনা শুধু আবহাওয়াবিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য, কাজের পরিবেশ, কৃষি উৎপাদন এবং জীবনযাত্রার নিরাপত্তাও জড়িয়ে আছে। তবে বাংলাদেশের মূল উদ্বেগ প্রশান্ত মহাসাগর থেকে সরাসরি কোনো ঢেউ এসে আঘাত করবে কি না, তা নয়। বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশে নতুন করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাত।
তাই এ ধরনের বহুমাত্রিক ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু দুর্যোগ হওয়ার পর ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেয়ার পরিবর্তে আগাম প্রস্তুতি, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, উন্নত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী জলবায়ু নীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অভিযোজন সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ওবায়দুল্লাহ সনি: প্রধান সহসম্পাদক, বণিক বার্তা