ড. মুস্তফা কে মুজেরী, ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ। তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ও সিরডাপের গবেষণা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশের সার্বিক অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরকারের ঋণনির্ভরতা ও ব্যাংক খাতসহ অর্থনীতির নানা ইস্যুতে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দিদারুল হক
এগারো মাস পার হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের। এ সময়ে বিগত সরকারের খাদের কিনারায় রেখে যাওয়া অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনতে পেরেছে বর্তমান সরকার?
বিগত সরকারের উন্নয়নের চিত্রটা একটা মেকি চিত্র। আমাদের উন্নয়নের সফলতাগুলোকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়ে একটা কল্পিত উন্নয়নচিত্র তৈরি করা হয়েছিল। অর্থাৎ বলা চলে অর্থনীতির যে বিভিন্ন পরিসংখ্যান, তথ্য-উপাত্ত সবই ছিল বানোয়াট। একটা অবাস্তব পরিকল্পিত চিত্র দেখানোর জন্য বাস্তবতাকে এড়িয়ে উন্নয়নের জোয়ারের একটা চিত্র তৈরি করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতাগ্রহণের এক বছরের কাছাকাছি হচ্ছে। এ সময়ের মধ্যে পরিষ্কার বোঝা যায় যে সরকার যখন ক্ষমতাগ্রহণ করে তখন ছিল প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত একটা অর্থনীতি। আর্থিক খাত অনেকটাই খাদের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। প্রকৃত খাতে বা রিয়েল সেক্টরে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি, অপশাসন—সবকিছু মিলিয়ে নাজুক অবস্থা ছিল। অর্থাৎ আমাদের উন্নয়নকে একটা অবাস্তব চিত্রের মাধ্যমে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে। এখন এই যে চ্যালেঞ্জগুলো ছিল সেই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে গত ১১ মাসের চিত্রটা যদি আমরা দেখি তাহলে সেখানে সফলতা বেশকিছুটা কমই দেখা যায়। এ সরকার বিগত সরকারের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ইনহেরিট করে। কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি দুই-তিন বছর ধরেই বিরাজ করছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতাগ্রহণ করার পর বিভিন্ন নীতি নেয়ার গ্রহণের ফলেও কিন্তু এখনো আমাদের মূল্যস্ফীতি কমেনি, যা এখনো ৯-১০ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। এটাকে কমানোর ক্ষেত্রে তেমন কোনো সফলতা অর্জিত হয়নি।
দেশের ব্যাংক খাতের অবস্থা এখনো বেশ নাজুক। খেলাপি ঋণ, দুর্নীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণের কারণে এ খাতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়ে এ খাতকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তাদের পদক্ষেপ কতটুকু ফল বয়ে আনতে পেরেছে বলে মনে করেন?
আর্থিক খাত মোটামুটি ব্যাংকনির্ভর খাত বলা চলে। শেয়ারবাজার ও ব্যাংক খাত দুটোই চরম দুর্দশাগ্রস্ত ছিল। তা এখনো কিন্তু দুর্দশাগ্রস্তই রয়ে গেছে। এখন ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। যদিও বলা হচ্ছে, বিগত সময়গুলোয় ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখানো হয়েছে। এখন খেলাপি ঋণের সঠিক চিত্র বেরিয়ে আসছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ উদ্ধারে আমরা কতটুকু সফলতা অর্জন করেছি সেটাও কিন্তু দৃশ্যমান নয়। অতএব ব্যাংকগুলো তাদের ভগ্নস্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি সাধন করেছে—তেমন কোনো কাঙ্ক্ষিত চিত্র দৃশ্যমান হয়নি।
সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে নেয়া অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মসূচিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
শুধু ব্যাংক নয়, অন্যান্য খাতের দিকে তাকালেও একই চিত্র দেখা যায়। যেমন প্রবৃদ্ধির দিকে তাকালে দেখা যাবে, সরকারি হিসাবে বিগত বছরে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে। একমাত্র কভিডের সময় এক বছর ছাড়া গত দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি। এ প্রবৃদ্ধির ধারা ঊর্ধ্বগতি হওয়ার কিন্তু তেমন কোনো প্রবণতা এখনো চোখে পড়ে না। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদেশী বা দেশীয় বিনিয়োগের কোনো বান্ধব পরিবেশ পাচ্ছে না বলে বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন। ফলে তারা কিন্তু নতুন বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছেন না। মূলধনি পণ্য আমদানির চিত্রটা দেখলে বুঝা যাবে সেটাও ইতিবাচক নয়। কাজেই সব কিছু মিলিয়ে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সফলতা অর্জিত হয়নি। এখন বিনিয়োগ যদি না হয় তাহলে কর্মসংস্থান বাড়বে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টির মৌলিক চাবিকাঠিটি হচ্ছে বেসরকারি বিনিয়োগ। বিনিয়োগ না বাড়ার কারণে আমাদের কর্মসংস্থানও বাড়ছে না। বেকারত্বের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে শিক্ষিত এবং যুব বেকারত্বের সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের বাজার সংকুচিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে প্রায় ৩০ লাখ লোক নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে অর্থাৎ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে যাবে।
এদিকে কৃষির ক্ষেত্রে প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ কৃষক কৃষিকাজ করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না। অর্থাৎ লোকসানে বিনিয়োগ করছেন। কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। অর্থনীতির ক্ষেত্রে গত এক বছরে খুব একটা দৃশ্যমান কোনো সফলতা দেখা যায়নি। সংস্কারের ক্ষেত্রেও তেমন কোনো বাস্তব এবং অগ্রাধিকার মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়নি।
আর্থিক খাত সংস্কারে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রমে অগ্রগতি কেমন?
অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে গতি নেই বললেই চলে বা তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সংস্কার এখন পর্যন্ত সরকার বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়নি। এখন সার্বিকভাবে বলা যায়, বর্তমান সরকার গত এক বছরে অর্থনীতির প্রাপ্ত যে একটা ভগ্নদশা বিগত সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল, সেই চিত্রটা পরিবর্তন করার জন্য প্রচেষ্টা এবং সফলতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। বিশেষ করে দরিদ্র বা নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী এখন চরম দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় পতিত হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়িয়েছিল সরকার। সুদের হার বাড়ালেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। তাহলে মূল্যস্ফীতির জন্য কোন বিষয়গুলো দায়ী বলে মনে করছেন?
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম কাজই হচ্ছে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাড়াতে সহায়তা করা। তবে যেকোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কাজ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করেছে। এর মূল্য উদ্দেশ্য হচ্ছে চাহিদাকে সংকুচিত করার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা। বাস্তবতা হচ্ছে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বাংলাদেশের মতো দেশে শুধু চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। নীতি সুদহার বেড়েছে কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে ৯-১০ শতাংশের নিচে নামানো যায়নি। বেশির ভাগ সময়ই আমাদের মতো দেশে নীতি সুদহার বাড়িয়ে চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব হয় না। শুধু চাহিদাকে সংকুচিত করলে হবে না, একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থায় যে বাধাবিঘ্ন আছে সেগুলোকে দূর করা প্রয়োজন যাতে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে। সরবরাহের কারণে যাতে মূল্যস্ফীতিতে কোনো প্রভাব না পড়ে সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে।
মূল্যস্ফীতির চালিকাশক্তি দুইভাবে সৃষ্টি হতে পারে—অতিরিক্ত চাহিদা চালিত (ডিমান্ড-পুল) এবং ব্যয়-বৃদ্ধি (কস্ট-পুশ) চালিত। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে সাধারণত মূল্যস্ফীতি এ দুটি কারণের সংমিশ্রণে হয়ে থাকে। যখন মূল্যস্ফীতি অতিরিক্ত চাহিদাজনিত কারণে হয়ে থাকে তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহার বৃদ্ধি অধিকতর কার্যকর হয়। কিন্তু যখন মূল্যস্ফীতির মূল কারণ দ্বিতীয়টি, তখন কিন্তু শুধু নীতি সুদহার বৃদ্ধি খুব একটা সুফল বয়ে আনে না। আমাদের বর্তমান সময়ের যে মূল্যস্ফীতি তা কিন্তু অনেকটাই সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যেমন বাজার ব্যবস্থায় দুর্বলতা, সংঘবদ্ধ চক্র যাকে আমরা সিন্ডিকেট বলে থাকি, মূল্য-চক্র (ভ্যালু-চেইন), অসাধু মুনাফাখোরদের চক্রান্ত ইত্যাদি নানা কারণ।
এখন চালের ভরা মৌসুম। এবার বোরো ধানের উৎপাদন ভালো হয়েছে। তার পরও সরকার কিছু পরিমাণ চাল আমদানিও করেছে, বেসরকারি খাতেও কিছু চাল আমদানি হয়েছে। এর পরও চালের বাজার অস্থির। চালের দাম গত দুই-তিন সপ্তাহে কেজিপ্রতি ৮-১০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এর বড় কারণ হচ্ছে বাজার অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও অপ্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা। আমদানীকৃত পণ্য ও দেশীয় উৎপাদনকৃত পণ্য—বেশির ভাগ পণ্যের ক্ষেত্রেই সরবরাহকে একটি ইন্টারেস্ট গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে। পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে তারা বাজারের সরবরাহে সংকট সৃষ্টি করে। যেহেতু আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থা প্রতিযোগিতামূলক নয়। অদক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে অতিরিক্ত মুনাফা পেতে সক্ষম হয়। মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে শুধু চাহিদাকে সংকুচিত করলেই হবে না, বাজার ব্যবস্থাপনায়ও গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের সমন্বিত একটা ব্যবস্থা নিতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব নীতি বা অন্যান্য যে নীতি আছে তা একই লাইনে নিয়ে আসা এবং সমন্বিতভাবে এ ব্যবস্থাগুলোকে কার্যকর করা দরকার যাতে আমরা মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারি। এটা নিয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না, ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়িয়ে রেখেছে বিগত মাসগুলোয়। এর প্রত্যাশিত ফলাফল তেমন একটা চোখে পড়ে না। বাস্তবতা বলছে, আমাদের কেবল নীতি সুদহারের ওপর নির্ভর করলে হবে না। অন্য নীতিগুলোকেও একই তালে আনতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রেখেও আর্থিক সংকটে থাকা ১২টি ব্যাংককে প্রায় ৫২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দুর্বল ব্যাংককে আর্থিক সহায়তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
দুর্বল ব্যাংকগুলোকে যদি বন্ধ না করে দেন, কঠোর পদক্ষেপ যদি না নেন, তাহলে তাদেরকে ঋণ সহায়তা দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হবে। কারণ এখানে গ্রাহক বা কাস্টমার বা আমানতকারীদের স্বার্থ যদি বিবেচনা না করা হয় তাহলে ব্যাংক খাত পুরোটাই ধসে পড়বে। দুর্বল ব্যাংকগুলো যদি আমানতকারীদের টাকা ফেরত না দিতে পারে তাহলে তো ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে জনগণের আস্থাটা চলে যাবে। সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার দুর্বল ব্যাংকের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ফলে তাদেরকে ঋণ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে। কিন্তু এভাবে কতদিন বাঁচিয়ে রাখা যাবে?
দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একত্র করে একটা ব্যাংক করা যেতে পারে। তবে পাঁচটি ব্যাংককে একটি ব্যাংক করা হলেও দুর্বলই থেকে যাবে, যদি না মূল সমস্যাকে দূর না করা হয়। ব্যাংক খাতে মূল সমস্যা দুটি। প্রথমত, খেলাপি ঋণের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি; দ্বিতীয়ত, পরিচালনা পর্ষদসহ সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিভিন্ন দুর্নীতি। দুর্বল ব্যাংককে সবল করতে হলে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায় করতে হবে এবং দুর্নীতি-অনিয়ম দূর করতে হবে। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে পারছে না। খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলো তাদের মূলধন ঘাটতিতে পড়ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা পূরণ করা হবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। এটি কি বেসরকারি বিনিয়োগে কোনো প্রভাব ফেলবে?
অভ্যন্তরীণ খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের উৎস দুটি—সেভিংস সার্টিফিকেট (বন্ড) ও ব্যাংক খাত। সেভিংস সার্টিফিকেট থেকে এখন সরকারের ঋণ পাওয়া কঠিন। কারণ মানুষ এখন সেভিংস সার্টিফিকেট কিনছে কম, ভাঙছে বেশি। ফলে এ খাত থেকে সরকারের ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। সরকারের ঘাটতি বাজেট পূরণ করতে হলে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। তবে রাজস্ব আয়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা কতটুকু অর্জন হবে সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়। এ বছর আবার খরচের খাত বেশি। যেমন নির্বাচন হলে এ খাতে প্রচুর ব্যয় হবে। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে খরচ বাড়বে। কাজেই সব কিছু মিলিয়ে সরকারকে তখন ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণের ওপর বেশি নির্ভর হতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়া হবে সেই ব্যাংক ব্যবস্থাই তো পুরোপুরি দুর্বল। সরকার যদি ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যাবে। যদিও বেসরকারি খাতে আগের চেয়ে ঋণের প্রবাহ কমে গেছে।
এখন বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ যদি না বাড়ে তাহলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে না। প্রবৃদ্ধি বাড়াতেও সহায়ক হবে না। কাজেই সরকার যদি ব্যাংক থেকে বেশি বেশি ঋণ নেয় তাহলে বেসরকারি খাতে একটি সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। এখন হয়তো সমস্যা তৈরি হবে না, কারণ এখন বেসরকারি খাতের ঋণের চাহিদা কম। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে গেছে, উৎপাদনও খুব একটা বাড়ছে না। সব কিছু মিলিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম। তবে আগামী অর্থবছরে বেসরকারি খাতকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে তখন ঋণের চাহিদা বাড়বে। কারণ বেসরকারি খাত ঘুরে না দাঁড়ালে আমাদের কর্মসংস্থান বাড়বে না, দারিদ্র্যও কমবে না। আমাদের অর্থনীতি বেসরকারি খাতচালিত অর্থনীতি। এ খাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে হবে। আগামীতে এ খাতকে চাঙা করতে হলে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে হবে।
সংস্কার ইস্যুতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। এটা রাজস্ব আহরণে কোনো প্রভাব ফেলবে?
এখন এনবিআরের যে পরিস্থিতি তাতে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কতটুকু আন্তরিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে রাজস্ব আদায় করবেন সেটি একটি প্রশ্ন। পরিস্থিতি টালমাটাল হয়ে গেছে। সংস্কার ইস্যুতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সুপ্ত অসন্তোষ আছে। তারা মাঝখানে আন্দোলন করলেন। সরকার কঠোরতা অবলম্বন করে তাদেরকে কাজে যোগদান করতে বাধ্য করল। শুধু কাজে গেলেই হবে না, আন্তরিকতার সঙ্গে কর-রাজস্ব আদায়ের কাজটি করতে হবে। তারা যদি কর-রাজস্ব আদায়ের কাজটি না করেন তাহলে সেটি আদায় করা কঠিন হবে। এ পরিস্থিতিতে বা মানসিক অবস্থায় তারা কতটুকু দায়িত্ব পালন করবেন সেটিই দেখার বিষয়। বিগত বছরগুলোয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। কাজেই সব কিছু মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না—এমন আশঙ্কা করাটা অমূলক নয়। তাছাড়া লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার জন্য যে ধরনের নীতি ও পদক্ষেপ নেয়ার দরকার সেটা এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়।