বাংলাদেশে পণ্ডিতের অভাব নেই, তবে সংখ্যার দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি ‘বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত’ দেখা যায় প্রশাসন বিষয়ে। শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, রাজনীতিক থেকে শুরু করে ফুটপাতে বসে অলস আড্ডা দেয়া ব্যক্তিটিও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেন; এমনকি নিজের অক্ষমতার দায়ও প্রশাসনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি পান।
আমি পণ্ডিত নই, হওয়ার চেষ্টাও করিনি। নিজের সীমাবদ্ধতা নিয়ে সর্বদা সচেতন থাকলেও আমার শিক্ষক, সহকর্মী ও দেশী-বিদেশী বন্ধুদের এক বিরাট অংশ মনে করেন আমি জনপ্রশাসন বিষয়টি কিছুটা ভালো বুঝি। বস্তুত জনপ্রশাসন বোঝার জন্য কেবল ‘লোকপ্রশাসন’ পাঠই যথেষ্ট নয়। এর জন্য দেশীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, সামাজিক মনোবিজ্ঞান এবং সমাজের ক্ষমতাকাঠামো সম্পর্কে স্বচ্ছ জ্ঞান ও গভীর অন্তর্দৃষ্টি থাকা প্রয়োজন। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কিছু সত্য বলা জরুরি মনে করছি।
আমলাতন্ত্র: ক্রীড়কের ফুটবল নাকি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড?
পৃথিবীর সব দেশেই আমলারা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রতিবাদ করতে পারেন না। তারা অনেকটা ফুটবলের মতো—বাইশ জন খেলোয়াড় একটি সীমাবদ্ধ মাঠে বলটিকে লাথি মারতে থাকে এবং বলটি বিনা প্রতিবাদে সেই আঘাত সহ্য করে। আমলাদেরও তেমনি সব দোষ আর অপবাদের দায় মাথায় নিয়ে নীরবে কাজ (কিংবা অকাজ) করে যেতে হয়।
সম্প্রতি সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সব ব্যর্থতার দায় আমলাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের দায়মুক্তির এক অদ্ভুত প্রয়াস চালাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন হতো না, যদি না একজন উপদেষ্টা সচিবালয়ে ‘বিমান বিধ্বস্ত’ হওয়ার মতো ভয়াবহ বাসনা প্রকাশ করতেন। একজন প্রাক্তন আমলা হয়েও তার এ মন্তব্য প্রমাণ করে আমলাতন্ত্রের প্রতি তার ব্যক্তিগত শত্রুভাবাপন্নতা কতটা প্রবল। নিজের ক্ষোভকে গণমাধ্যমে প্রকাশ করে তিনি আমলাতন্ত্রকে জনগণের শত্রু হিসেবে দাঁড় করানোর যে প্রয়াস নিয়েছেন, তা রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য চরম উদ্বেগজনক।
তাত্ত্বিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
আমলাতন্ত্র কেন ‘ধীর’ বা কেন এটি নির্দিষ্ট ছকে চলে—তা বুঝতে হলে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বোঝা জরুরি:
১. ম্যাক্স ওয়েবার ও যৌক্তিক কাঠামো: আমলাতন্ত্রের জনক ম্যাক্স ওয়েবার একে আধুনিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে যৌক্তিক উপায় বলেছেন। আমলারা আবেগ বা হুজুগে নয়, বরং ‘রুল অব ল’-এর অধীনে কাজ করে। যা আমরা ‘ধীরগতি’ বলি, তা আসলে একটি নিরপেক্ষ ও ত্রুটিমুক্ত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করার বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।
২. কার্ল মার্ক্স ও সংহতি: মার্ক্স আমলাতন্ত্রকে শাসকশ্রেণীর হাতিয়ার বললেও একে রাষ্ট্রের ‘অপরিহার্য অঙ্গ’ হিসেবে স্বীকার করেছেন। যখনই কোনো সংকট হয়, রাজনীতিবিদরা আমলাদের ‘বলির পাঁঠা’ বানান, অথচ এ কাঠামোই রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে।
৩. অ্যাডহক উইজডম বনাম প্রাতিষ্ঠানিকতা: আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনদের সাধারণ প্রবণতা হলো তাৎক্ষণিক পরিবর্তন ঘটানো। কিন্তু রাষ্ট্র কখনো অ্যাডহক উইজডম (Adhoc wisdom) বা তাৎক্ষণিক খেয়ালিপনা দিয়ে চলতে পারে না। আমলারা যখন আইনকানুন ও বিধিবিধানের দোহাই দিয়ে কোনো হঠকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন, রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ তখন তা পছন্দ করেন না। অথচ একটি রাষ্ট্র যখন বিধিবদ্ধ নিয়মের বাইরে কেবল ‘তৎক্ষণাৎ প্রজ্ঞা’ বা ইচ্ছামাফিক সিদ্ধান্তে চলে, তখন সেই রাষ্ট্রের পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে।
পৃথিবীর কোনো সফল রাষ্ট্রই হুটহাট সিদ্ধান্তে চলেনি। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যন্ত সর্বত্র আমলাতন্ত্র একটি ‘ফিল্টার’ হিসেবে কাজ করে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন তার ‘দ্য স্টাডি অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এ স্পষ্ট করেছেন যে রাজনীতি ও প্রশাসন দুটি ভিন্ন মেরু। রাজনীতি স্বপ্ন দেখায়, আর প্রশাসন সেই স্বপ্নকে বাস্তবতার কঠিন আইন ও বাজেটের তুলাদণ্ডে বিচার করে। এ বিচার করতে গিয়ে যে সময় ব্যয় হয়, তাকে ‘অদক্ষতা’ বলা ভুল।
বৈশ্বিক উদাহরণ ও বাস্তবতা
সিঙ্গাপুর, ইউকে, ফ্রান্স বা আমেরিকার মতো স্থিতিশীল দেশগুলোর আমলাতন্ত্র আমাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। পিরামিড থেকে তাজমহল—পৃথিবীর সব বিস্ময়কর স্থাপনার পেছনে ছিল এক সুসংগঠিত আমলাতন্ত্র। উন্নত দেশগুলোতে সেবা খাত বেসরকারি হওয়ায় সেখানে গতি বেশি, কিন্তু সেই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ, আমলারা নয়। আমাদের দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার প্রধান কারণ হলো আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক অনুগত দাসে পরিণত করা।
পৃথিবীর যেকোনো বড় সংগঠন নির্দিষ্ট নিয়মকানুন রীতিনীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। যেকোনো কাজ সম্পাদন করার ক্ষেত্রে তারা দাড়ি-কমাও মেনে চলে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, জাতিসংঘ ও এর অধীন সব সংস্থা কঠোরভাবে তাদের নিজস্ব আইন ও পদ্ধতি মেনে কাজ করে। সেটাই আদর্শ ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত। অথচ বাংলাদেশে আমলারা আইন, বিধি, রীতি, পদ্ধতির প্রসঙ্গ তুললেই সবাই তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এটা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাগরিকের কাজ হওয়া উচিত নয়।
গত ১৭-১৮ বছর ধরে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ দক্ষতা ও সততার পরিবর্তে আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয়ায় এ কাঠামো প্রায় ধ্বংসের মুখে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের যে মহোৎসব চলেছে, তার প্রধান দায় নীতিনির্ধারকদের এবং তাদের অধীন দুর্বল আমলাতন্ত্রের। রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ যদি এমন একটি ভঙ্গুর আমলাতন্ত্রকে পরিচালনা করতে না পারে, তবে তারা জনগণের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা পূরণ করবে কীভাবে?
উপসংহার
যারা আমলাতন্ত্রের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছেন, তারা আসলে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শনই বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। মাথাব্যথার চিকিৎসা দরকার, কিন্তু তা মাথা কেটে নয়। আমলাতন্ত্র কোনো ত্রুটিমুক্ত ব্যবস্থা নয়, তবে এর পথ ‘ধ্বংস’ নয়, বরং ‘সংস্কার’। আমলাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং যেকোনো বিচ্যুতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
জনপ্রিয়তা পাওয়ার সস্তা আশায় রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে জনশত্রু হিসেবে দাঁড় করানোর এ অপচেষ্টা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সব পক্ষ থেকে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
শামীম আল মামুন: সাবেক সরকারি কর্মচারী