কেননা অনিরাপদ খাদ্য খাওয়ার ফলে জনস্বাস্থ্যের বিপর্যয়ের ঝুঁকি, এমনকি প্রাণহানির আশঙ্কাও থাকে। এ আশঙ্কা বড় ধরনের উদ্বেগে পরিণত হয় যখন বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ না হওয়ার অভিযোগ ওঠে। কারণ এটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতি গঠনের প্রধান অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে। যদিও বাস্তবতা এটিই যে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলার বিদ্যালয়ে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ এবং তা খেয়ে শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হওয়ার ঘটনা বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বাগেরহাটের শরণখোলায় স্কুল ফিডিংয়ের সেদ্ধ ডিম খেয়ে একাধিক শিক্ষার্থীর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে মেহেরপুরে পচা ডিম ও ছত্রাক ধরা পাউরুটি দেয়া, মাদারীপুরে খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া, গোপালগঞ্জে কম ওজন ও নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহ—এসব অভিযোগ মূলত একধরনের ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। মাঠপর্যায়ে খাদ্যের মান, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিতরণ ব্যবস্থায় গুরুতর দুর্বলতা রয়েছে। আরো উদ্বেগের বিষয়, শিক্ষক ও অভিভাবকদের অভিযোগের পরও অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
বিদ্যালয়ে খাবার সরবরাহ কর্মসূচি কোনো দাতব্য উদ্যোগ নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। এর লক্ষ্য শিশুদের ক্ষুধা দূর করা, পুষ্টির ঘাটতি কমানো, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ঝরে পড়া রোধ করা। দেশে প্রায় ৩০ লাখ প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে এবং আগামী দিনে এর আওতা বিস্তৃত করার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকারের উদ্যোগ ও উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু একটি শিশুর জন্য বিদ্যালয়ের খাবার যদি পুষ্টি নিশ্চিত করার পরিবর্তে অসুস্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে এ প্রকল্প যে হিতে বিপরীত হয়ে উঠছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনিতেও প্রতি বছর দেশে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ ভেজাল খাদ্য খাওয়ার কারণে মারা যাচ্ছে এবং প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত হয় বলে জনস্বাস্থ্যবিদরা সতর্ক করে আসছেন। অর্থাৎ দেশের সর্বত্র যে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের জন্য নিয়মিত তদারকি ও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে, স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে নিম্নমানের খাবার দেয়া সেটিকেই নির্দেশ করছে। অথচ নিরাপদ ও মানসম্পন্ন খাদ্য দেয়ার মাধ্যমে ক্ষুধা ও পুষ্টির চাহিদা পূরণ করাই ছিল এ কর্মসূচির প্রথম ও প্রধান শর্ত।
দেশে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির বড় একটি দুর্বলতা হলো সরবরাহ ব্যবস্থা। স্থানীয় পর্যায়ে ঠিকাদার ও তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে খাদ্য সংগ্রহ ও বিতরণ হওয়ায় মান নিয়ন্ত্রণের একাধিক ফাঁক তৈরি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী যে মানের খাবার সরবরাহ করার কথা, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তার চেয়ে কম মানের খাদ্য কেনা হচ্ছে। কোথাও ওজনে কম, কোথাও নিম্নমানের, কোথাও আবার সংরক্ষণের অভাবে খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি নয়; এটি পুরো ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রতিফলন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখলে বোঝা যায়, সফল স্কুল ফিডিং কর্মসূচির ভিত্তি শুধু বড় বাজেট নয়; বরং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি ও স্থানীয় অংশগ্রহণ। ভারতের স্কুল ফিডিং কর্মসূচি আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সফল কর্মসূচিগুলোর একটি। যদিও ২০১৩ সালে দেশটির বিহার রাজ্যের এক বিদ্যালয়ে এ কর্মসূচির আওতায় দেয়া অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে ২০-এর অধিক শিশু মারা যায়। পরবর্তী সময়ে কঠোর তদারকির মাধ্যমে দেশটি এ কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে গেছে। বিদ্যালয়ে খাবার পরিবেশনের আগে শিক্ষক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্বাদ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়, রান্নাঘরের স্বাস্থ্যবিধি কঠোর করা হয়, নিয়মিত পরিদর্শন ও সামাজিক নিরীক্ষা চালু হয় এবং আধুনিক কেন্দ্রীয় রান্নাঘরের মাধ্যমে নিরাপদ খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হয়। অর্থাৎ একটি দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা পুরো কর্মসূচিকে একটি দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়ে আসে। এদিকে এরই মধ্যে দেশে বিদ্যালয়ে দেয়া অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে শিশুদের হাসাপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। এ পরিস্থিতি একটি প্রশ্ন সামনে আনে, তবে কী দেশেও স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা হবে একের পর এক শিশু মারা গেলে?
মিড ডে মিল কর্মসূচির আওতায় সরবরাহ করা খাবার ঘিরে ক্রমেই অভিযোগ বাড়তে থাকলে বিদ্যালয় পর্যায়ে মায়েদের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ‘গার্ডিয়ান কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি একটি বিদ্যালয়ে এ কমিটির তৎপরতায় নিম্নমানের ডিম বদলে দেয়া হয়। এটা ইতিবাচক হলেও সব বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারছে না, যার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত বাগেরহাটের শরণখোলার এক বিদ্যালয়ে সরবরাহ করা খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হয়ে পড়া। সুতরাং খাদ্য সরবরাহের প্রাথমিক উৎস থেকেই সেটি নিরাপদ কিনা তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। মানসম্মত পরিবেশে যেন খাবার তৈরি করা হয়, সেটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, বিদ্যালয়ে সরবরাহ করা খাবার কেবল খাদ্য সহায়তা নয়, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তাই বৈজ্ঞানিক পুষ্টিমানের ভিত্তিতে খাদ্যতালিকা তৈরি, নিয়মিত মান পরীক্ষা, স্বাস্থ্যবিধির কঠোর অনুসরণ এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জবাবদিহির মাধ্যমে মিড ডে মিল কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন আবশ্যক।