সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও জার্মান উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেডরিখ এবার্ট স্টিফটাংয়ের (ইবিএস) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৪৬ শতাংশ বেসরকারি নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান তাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ লোকবল খুঁজে পায় না। অন্যদিকে কোনো কোনো নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মতে অদক্ষতার এ হার আরো অনেক বেশি। তাদের অভিমত, একান্ত নিরুপায় হয়ে শেষ পর্যন্ত দক্ষ-অদক্ষ মিলিয়ে এরূপ জনবল দিয়েই কোনো রকমে তারা প্রতিষ্ঠান চালিয়ে নিচ্ছেন বটে কিন্তু তাতে প্রতিষ্ঠানের মান ও উত্পাদনশীলতা দুই-ই হ্রাস পাচ্ছে এবং এ আপস প্রক্রিয়ায় জনবল নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান চালাতে গিয়ে বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় তারা মান ও মূল্য দুই বিবেচনা থেকেই ক্রমে পিছিয়ে পড়ছেন। আর এসবের চূড়ান্ত ফল হিসেবে মুনাফার হারেও কমতি থাকছে, যা শেষ বিচারে মালিক ও কর্মী উভয়ের স্বার্থকেই ক্ষুণ্ন করছে।
সিপিডি ও ইবিএসের উল্লিখিত গবেষণার ফলাফল এবং সেই সূত্রে প্রাপ্ত অন্য উদ্যোক্তাদের মতামত কার্যত এ নির্দেশনাই প্রদান করে যে দেশের বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থা কিছুতেই কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত ও দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারছে না। আর সে কারণেই আলোচনার স্তর পেরিয়ে এটি এখন স্বীকৃত বাস্তবতা যে দেশে বর্তমানে কয়েক লাখ শিক্ষিত বেকার কাজের খোঁজে নানা স্থানে হন্যে হয়ে ঘুরতে থাকা সত্ত্বেও দেশের বৃহত্ শিল্প-কারখানা ও অন্যান্য চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান কাজের জন্য উপযুক্ত লোক না পেয়ে এরই মধ্যে ১০ লাখেরও অধিক বিদেশীকে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি অংকের মোটা বেতনে নিয়োগদান করতে বাধ্য হয়েছে। ১০ লাখেরও বেশি বিদেশীকে এ দেশে এভাবে কাজ করতে দেখে দেশের শিক্ষিত বেকারদের হতাশাভরা চোখ যতই ছানাবড়া হয়ে উঠুক না কেন, বাস্তবতা এটাই যে চলতি মানের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতা দিয়ে কর্মবাজারের চাহিদা পূরণ তাদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। আর এটা শুধু যে চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষেত্রেই সত্য তা নয়। একইভাবে তা সত্য উদ্যোক্তাবৃত্তির ক্ষেত্রেও। বস্তুত, উপযুক্ত মানের শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাবে বাংলাদেশে নতুন উদ্যোক্তা গড়ে ওঠার ধারাটিও বহুলাংশে বিঘ্নিত হচ্ছে, যা নিয়ে এখানে খানিকটা আলোকপাত করার চেষ্টা করা হলো।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন ব্যাপকভাবে সেবা খাত ও ব্যবসানির্ভর (ট্রেডিং বেজড)। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিবেচনায় এটি কতটা টেকসই হয়ে উঠতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ বা ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। এ অবস্থায় এ ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে চাইলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন হচ্ছে উত্পাদনমুখী (ম্যানুফ্যাকচারিং) শিল্পের প্রতি মনোযোগী হওয়া, যে মনোযোগ বর্তমানে প্রায় নেই বললেই চলে। আর এই না থাকাটা রাষ্ট্রের শ্রেণীস্বার্থতাড়িত নীতি কৌশলগত ত্রুটির কারণে যেমন ঘটছে, তেমনি তা ঘটছে এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সংখ্যায় শিক্ষিত উদ্যোক্তার অংশগ্রহণের আগ্রহের অভাবেও। কেউ হয়তো বলবেন, রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় উত্পাদনমুখী শিল্পের প্রতি যথেষ্ট মাত্রায় উত্সাহ ও প্রণোদনা না থাকার কারণেই এমনটি ঘটছে। তাদের এ বক্তব্য অনেকাংশে সত্য বটে। পাশাপাশি এটাও সত্য, উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী ব্যক্তিদের মধ্যে উপযুক্ত মানসম্পন্ন শিক্ষা না থাকাটাও এজন্য বহুলাংশে দায়ী। মৌলিক যন্ত্রপাতি ও পণ্য উত্পাদনসংশ্লিষ্ট একটি শিল্প-কারখানা দাঁড় করানোর জন্য যে ধরনের শিক্ষাগত পটভূমিসম্পন্ন উদ্যোক্তার প্রয়োজন, সত্যি কথা বলতে কি, বাংলাদেশে সে ধরনের উদ্যোক্তার নিয়মিত অন্তর্ভুক্তির হার বর্তমানে খুবই কম।
বাংলাদেশে বর্তমানে যারা নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে আসছেন, তাদের অধিকাংশই মূলত স্থানীয় বাজারভিত্তিক বা আমদানি-রফতানি পর্যায়ের বেচাকেনাজাতীয় স্বল্প ঝুঁকির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি। এমনটি ঘটার মূল কারণ হচ্ছে, উত্পাদনের চেয়ে বেচাকেনামূলক কার্যক্রম শুধু স্বল্প ঝুঁকিরই নয়, অনেকটা সহজও, যা মামুলি প্রকৃতির সাধারণ লেখাপড়াধারীদের পক্ষেও করা সম্ভব। কিন্তু যে ধরনের উত্পাদনমূলক জটিল কার্যক্রমে উচ্চতর কারিগরি দক্ষতা ও মানসম্মত শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন পটভূমি থাকা প্রয়োজন, সে ধরনের কার্যক্রমে নতুন উদ্যোক্তা বলতে গেলে পাওয়াই যাচ্ছে না। ফলে মানহীন শিক্ষাগত পটভূমি থেকে এসেও করা সম্ভব এরূপ ট্রেডিংসর্বস্ব কর্মকাণ্ডকে মূল ক্ষেত্র ধরে নিয়েই দেশের অর্থনীতি বিকশিত হচ্ছে। কিন্তু একটি টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি নির্মাণে তা কতটুকু সহায়ক হতে পারছে, এটি একটি গুরুতর প্রশ্ন বৈকি। আর এরূপ প্রশ্নের মুখে প্রথম কর্তব্যই হবে উপযুক্ত মানসম্পন্ন শিক্ষাধারী তরুণদের উদ্যোক্তাবৃত্তিতে টেনে আনা; যারা নিজেদের মেধা, যোগ্যতা ও সামর্থ্য দিয়ে উত্পাদনমূলক শিল্প কার্যক্রমকে সৃষ্টিশীলতার পর্যায়ে উন্নীত করতে সক্ষম হবেন।
দেশে বর্তমানে শিল্পের মৌলিক যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম, সংযোজন শিল্পের যন্ত্রাংশ ও মেরামত উপকরণ, বিপুলসংখ্যক ও পরিমাণের ভোগ্যপণ্য ইত্যাদির প্রায় সবই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। স্থানীয় উত্পাদনের মাধ্যমে এগুলোর আমদানি প্রতিস্থাপন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে তাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ঘাটতিই শুধু হ্রাস পেত না, শিল্প ও অর্থনীতির একটি দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী ভিত্তিও গড়ে উঠতে পারত। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট অভ্যন্তরীণ উত্পাদনে (জিডিপি) শিল্প খাতের অবদান মাত্র ২৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২১), যা
ভারতের ক্ষেত্রে ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ। মাথাপিছু আয়ে ভারতের চেয়ে এগিয়ে থেকেও শিল্পের অবদানে পিছিয়ে থাকাটা স্পষ্টতই বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি মৌলিক দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে (বাংলাদেশ ও ভারতের মাথাপিছু আয় যথাক্রমে ২৫৯১ মার্কিন ডলার ও ২৩৪২ মার্কিন ডলার)।
মানসম্মত শিক্ষার অভাবে দেশের উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রম কীভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে, তার একটি উদাহরণ দিই। দেশে বর্তমানে অ্যারেটর ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মত্স্য চাষের ব্যাপক সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বিষয়টিতে আগ্রহী ও উদ্যমী হয়ে ওঠার জন্য যে গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা একজন তরুণ বা যুবকের থাকা প্রয়োজন, তা আমাদের এ শ্রেণীর অধিকাংশ সদস্যের মধ্যে নেই বললেই চলে। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ চাষের সুযোগটি এ দেশে এখনো পরিপূর্ণ মাত্রায় ব্যবহূত হতে পারছে না। অথচ এটি করতে পারলে বাংলাদেশের পক্ষে মাছ উত্পাদনে বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করা খুবই সম্ভব। আর এক্ষেত্রে উত্পাদন বাড়লে এ সূত্র ধরে স্বভাবতই এর রফতানির পরিমাণও বহুলাংশে বৃদ্ধি করা সম্ভব। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাব অনুযায়ী মাছ উত্পাদনে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান হচ্ছে পঞ্চম।
উল্লিখিত এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই উত্পাদন কার্যক্রমে যুক্ত হতে হবে, এক্ষেত্রে প্রয়োজন মানসম্পন্ন শিক্ষার পটভূমিসম্পন্ন নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণীর অংশগ্রহণ। কিন্তু এ শ্রেণীর শিক্ষিত দক্ষ তরুণকে চাকরির বাজারে যেমন পাওয়া যাচ্ছে না, তেমনি তা পাওয়া যাচ্ছে না উদ্যোক্তাবৃত্তিতেও। ফলে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশ ও উন্নয়ন মূলত সেবা খাত ও ক্রয়-বিক্রয়ের হাত ধরে এগোবে বলেই মনে হচ্ছে, যেখানে উত্পাদন খাত বস্তুত অকর্ষিতই থেকে যাচ্ছে। বিষয়টি বাংলাদেশের শিল্প খাতের ভবিষ্যতের জন্যই শুধু দুঃসংবাদ নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা কতটুকু টেকসই হবে, সে প্রশ্নকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।
এ অবস্থায় উল্লিখিত ঝুঁকি মোকাবেলায় শিক্ষা ব্যবস্থার মান ঘাটতির বিষয়টিকে কীভাবে মোকাবেলা করা হবে, তা নিয়ে উদ্যোক্তা উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ, বিশেষত শিল্প মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। নইলে মানহীন এ শিক্ষা নিয়ে দেশের তরুণরা বেকারত্বের সারিই শুধু দীর্ঘ করবে না, একই সঙ্গে দেশের উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রমকেও স্থবিরতার মুখে ঠেলে দেবে। আর এ দ্বিবিধ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশের কর্মবাজারে বিদেশীদের সংখ্যা ও প্রভাব যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি শিক্ষিত স্থানীয় বিনিয়োগকারীর অভাবে দেশের স্বার্থবিরোধী উদ্যোগে বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রভাব ও পরিমাণও দিন দিন বাড়তে থাকবে, যা আখেরে দেশকে বড় রকমের পরনির্ভরশীলতার ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে দেশের উদ্যোক্তা উন্নয়নসংশ্লিষ্ট নীতি ও পরিকল্পনা ঢেলে সাজানো যেমন জরুরি, তেমনি বা তার চেয়েও বেশি জরুরি হচ্ছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে মানসম্মত আঙ্গিকে গড়ে তোলার লক্ষ্যে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আর তা করতে না পারলে শিক্ষিত তরুণদের প্রতি মুখে যতই আহ্বান জানানো হোক না কেন যে চাকরি না খুঁজে উদ্যোক্তা হোন, বাস্তবে সে আহ্বান কোনোই কাজে আসবে না এবং তা আসছেও না। আর তা আসছে না বলেই উদ্যোক্তা উন্নয়নসংক্রান্ত কার্যক্রমের বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ১৩৭ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৩২ এবং সে অবস্থান আফগানিস্তানেরও পরে। ফলে এ থেকে নিজেদের অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে চাইলে শিক্ষা ব্যবস্থার মানগত উন্নয়নের কোনোই বিকল্প নেই। কেননা অপ্রিয় হলেও সত্য, দেশের উদ্যোক্তা উন্নয়নসংক্রান্ত কার্যক্রমগুলো ধীরলয়ে হলেও যেটুকু এগোচ্ছে, সেটুকুও অকার্যকর করে দিচ্ছে দেশের মানহীন শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষা ব্যবস্থা যদি গুণগত মান রক্ষা করে তরুণদের কর্মোপযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে না পারে, তাহলে চাকরি কিংবা উদ্যোক্তাবৃত্তি কোনোটিই সঠিক পথে এগোতে পারবে না। আর শিক্ষিত তরুণ শ্রেণীকে অকার্যকর রেখে দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে সঠিক পথে এগোবে—যুক্তির বিচারে এ ধারণাও গ্রহণযোগ্য নয়। অতএব, টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে বস্তুত সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, গতিশীল ও দেশের স্বার্থানুকূল একটি অর্থনীতি ও তার আওতাধীন উদ্যোক্তা উন্নয়ন চর্চাই কাম্য।
আবু তাহের খান: সাবেক পরিচালক
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা (বিসিক), শিল্প
মন্ত্রণালয়