শুল্কের ছায়া থেকে সমঝোতার আলো

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যের নতুন হিসাবনিকাশ

বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এক বছর আগে আমরা শুল্ক-সংকটের মুখে আবেদনকারীর অবস্থানে ছিলাম; আজ আমরা একটি আইনি বাণিজ্য চুক্তির অংশীদার—যা অসম হলেও অধিকতর পূর্বানুমানযোগ্য। এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, চাপের মুখেও সে আলোচনার টেবিল ত্যাগ করে না

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত ৩৭ শতাংশ শুল্কের ধাক্কায় বাংলাদেশের রফতানি অর্থনীতি গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। ওই সময় অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন যে দেশের প্রধান রফতানি বাজারে প্রবেশাধিকার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেই সংকট একটি আইনি বাধ্যবাধকতাসম্পন্ন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিতে রূপ নেয়। এখন প্রশ্ন হলো, এই চুক্তি কি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি ও নতুন বাণিজ্য-সুযোগের দ্বার উন্মোচন করবে, নাকি নতুন ধরনের দায়বদ্ধতা ও ঝুঁকির ভিত্তি তৈরি করবে? এই প্রশ্নের উত্তরেই নিহিত রয়েছে আগামী দশকে বাংলাদেশের রফতানি অর্থনীতির গতিপথ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অবস্থান।

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ ‘পারস্পরিক’ (রিসিপ্রোকাল) শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি ছিল, বাংলাদেশ কার্যত মার্কিন পণ্যের ওপর ৭৪ শতাংশ সমপরিমাণ শুল্ক ও বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা বজায় রেখেছে। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের বৃহত্তম রফতানি বাজারকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।

পরবর্তী দশ মাসের কূটনৈতিক আলোচনা ও দর-কষাকষির পর শুল্ক ৩৫ শতাংশ, পরে ২০ শতাংশে নামানো হয়। অবশেষে চলতি বছর ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির (এআরটি) মাধ্যমে এ শুল্ক ১৯ শতাংশে স্থির হয়। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের বাণিজ্য কূটনীতির সাফল্যের পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোর প্রতি তার নীতিগত ভঙ্গুরতাও উন্মোচিত করে।

এই ঘটনাগুলোকে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের চালু করা ‘রেসিপ্রোকাল’ শুল্ক ব্যবস্থা যুদ্ধ-পরবর্তী বহুপাক্ষিক বাণিজ্য কাঠামোর মৌলিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ’ নীতির পরিবর্তে গুরুত্ব পাচ্ছে দ্বিপাক্ষিক, লেনদেনভিত্তিক দর-কষাকষি, যেখানে প্রতিটি দেশকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনায় বসতে হচ্ছে। এই নতুন বাস্তবতায় ক্ষুদ্র ও রফতানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোই সবচেয়ে ঝুঁকিতে। কারণ বাজারে প্রবেশাধিকার এখন আর কেবল আইনি অধিকার নয়; বরং আলোচনার অর্জন। তাই বাংলাদেশের এই চুক্তি শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক দলিল নয়, পরিবর্তিত বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় টিকে থাকার সক্ষমতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

পরিসংখ্যান কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?

শুধু পরিসংখ্যানই ঝুঁকির প্রকৃত মাত্রা তুলে ধরে। ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ আনুমানিক ১৮০ কোটি ডলারে পৌঁছায়; এর মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি ৯৫০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি মাত্র ২৩০ কোটি ডলার। ফলে বাংলাদেশের অনুকূলে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ৭১০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। এই ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতিই ওয়াশিংটনের অসন্তোষের প্রধান কারণ এবং ‘পারস্পরিক’ শুল্ক নীতির রাজনৈতিক প্রেরণা।

এই রফতানি আয়ের প্রায় পুরোটাই একক একটি খাত—তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮২০ কোটি ডলারে পৌঁছায়, ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ৯ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশে উন্নীত হয়। অর্থাৎ কঠোর শুল্কের চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশ বাজারে পিছিয়ে পড়েনি; বরং অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। তবে এই স্থিতিস্থাপকতা যেমন আশাব্যঞ্জক, তেমনি উদ্বেগজনকও। কারণ এটি একটিমাত্র পণ্য ও একটিমাত্র বাজারের ওপর বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অতিনির্ভরশীলতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে।

প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক বাজারের প্রেক্ষাপটে এই অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত রফতানি কাঠামোর ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকবাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী—ভিয়েতনাম, ভারত ও চীন—প্রত্যেকেই নিজ নিজ বাণিজ্যিক ও শুল্ক-সুবিধাভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে শুল্কহার বা বাণিজ্যিক সুবিধার ক্ষেত্রে যদি সামান্যতম ব্যবধানও কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের অনুকূলে চলে যায়, তবে বাংলাদেশের প্রধান ক্রেতারা—যারা মূলত মূল্য-সংবেদনশীল গণভোক্তা বাজারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পোশাক সংগ্রহ করেন—খুব দ্রুত বিকল্প সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন। সমস্যাটি আরও গভীর, কারণ বাংলাদেশের রফতানি ঝুড়ি এখনো তুলনামূলকভাবে স্বল্প মূল্যসংযোজিত পোশাকপণ্যের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা সীমিত; আমরা মূলত মূল্য গ্রহণকারী বা মূল্য নির্ধারণকারী নই। এই কাঠামোগত দুর্বলতার কারণেই ২০২৫ সালের শুল্কসংকট বাংলাদেশের রফতানি খাতের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়, যা বাজার বহুমুখীকরণ, উচ্চ মূল্যসংযোজিত পণ্য উৎপাদন এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধির অপরিহার্যতা নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

বাণিজ্য চুক্তির অন্তর্নিহিত অসমতা

ঢাকায় অনেকেই ফেব্রুয়ারির চুক্তিটিকে একটি কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উদযাপন করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। চুক্তির খসড়ায় ‘বাংলাদেশ করবে’—এ ধরনের বাধ্যবাধকতামূলক বাক্যাংশ ১৩১ বার ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে ‘যুক্তরাষ্ট্র করবে’ বাক্যাংশটি এসেছে মাত্র ছয়বার। এই বৈষম্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি দুই অসম অর্থনীতির মধ্যে দর-কষাকষির ক্ষমতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলসহ সব ক্ষেত্রে শ্রমিকদের সংগঠন করার স্বাধীনতা ও যৌথ দর-কষাকষির অধিকার নিশ্চিত করা, ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনার একটি কার্যকর ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং শ্রম আইনের কঠোর প্রয়োগ।

এর বিনিময়ে বাংলাদেশ মার্কিন শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য নিজস্ব বাজার আরও উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। এর আওতায় রয়েছে রাসায়নিক, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, মোটরযান ও যন্ত্রাংশ, আইসিটি সরঞ্জাম, জ্বালানি, সয়াবিন, দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস এবং পোল্ট্রি। এই বাণিজ্যিক অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা) এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি পণ্য কিনবে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বাংলাদেশি পোশাক শুল্কমুক্তভাবে আমদানির সুযোগ দেবে; তবে সেই পরিমাণ নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ কত পরিমাণ মার্কিন পণ্য আমদানি করছে, তার ওপর।

এখানেই মূল প্রশ্ন: এই বিনিময় কি সত্যিই ভারসাম্যপূর্ণ? তুলা বা এলএনজি আমদানি করা বাংলাদেশের জন্য স্বভাবতই ক্ষতিকর নয়। পোশাকশিল্পের জন্য তুলা যেমন অপরিহার্য, তেমনি বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় জ্বালানিরও প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু যখন শুল্কমুক্ত বাজারে প্রবেশাধিকারকে নির্দিষ্ট পরিমাণ আমদানির শর্তের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তখন বাংলাদেশের রফতানির ভবিষ্যৎ কার্যত তার নিজস্ব ক্রয়ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অর্থাৎ এটি প্রকৃত অর্থে মুক্ত বাণিজ্য নয়; বরং এক ধরনের ‘নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য’, যা মুক্ত বাণিজ্যের মৌলিক আদর্শ থেকে অনেকটাই বিচ্যুত।

চুক্তিটি শুধু শুল্কের বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়। এর ছয়টি মূল অধ্যায়ে শুল্ক, অশুল্ক বাধা, ডিজিটাল বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা, বিনিয়োগ এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশেষ করে ডিজিটাল বাণিজ্য ও বিনিয়োগবিষয়ক বিধানগুলো ভবিষ্যতে ডেটা স্থানীয়করণ নীতি, আন্তঃসীমান্ত ডেটা প্রবাহ এবং ডিজিটাল করব্যবস্থায় বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে—যে ক্ষেত্রগুলোতে দেশের নীতিগত কাঠামো এখনও বিকাশমান। তাই এই চুক্তির তাৎপর্য কেবল স্বাক্ষরে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর প্রতিটি ধাপের বাস্তবায়নে বিচক্ষণ ও সতর্ক আলোচনা প্রয়োজন। সেখানেই বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও কৌশলগত দক্ষতার প্রকৃত পরীক্ষা হবে।

ঝুঁকির মধ্যেই নতুন সম্ভাবনা

তথাপি, এই চুক্তিকে কেবল আত্মসমর্পণের দলিল হিসেবে দেখাও একপেশে হবে। একটি আইনি ও পূর্বানুমানযোগ্য বাণিজ্য কাঠামো বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশকে আরও নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরে। অনিশ্চয়তার পরিবর্তে নিয়মভিত্তিক সম্পর্ক সবসময়ই অধিকতর গ্রহণযোগ্য, যেখানে শুল্কহার কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক ঘোষণার ওপর নির্ভরশীল নয়। ১৭৫ মিলিয়ন মানুষের বৃহৎ ভোক্তা বাজার নিয়ে বাংলাদেশ মার্কিন প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষি-প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি সম্ভাবনাময় অংশীদার হতে পারে। একই সঙ্গে, যদি এই চুক্তির আওতায় শ্রমমান, পরিবেশগত সম্মতি এবং সুশাসনের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়, তবে বাংলাদেশ স্বল্প ব্যয়ের ‘সস্তা কারখানা’র ভাবমূর্তি অতিক্রম করে উচ্চ মূল্যসংযোজিত ও দায়িত্বশীল উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটিই—আমরা এই কাঠামোকে কেবল একটি বোঝা হিসেবে দেখব, নাকি এটিকেই অর্থনৈতিক রূপান্তরের চালিকাশক্তিতে পরিণত করব।

সামনের পথ করণীয়

প্রথমত, রফতানি ও বাজার বহুমুখীকরণকে কৌশলপত্রের অলঙ্কার হিসেবে নয়, জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যখন মোট রপ্তানির ৮৫ শতাংশের বেশি একটিমাত্র পণ্যের ওপর নির্ভরশীল, তখন একটি শুল্কের ধাক্কাই পুরো অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিতে পারে। তাই চামড়া, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, হালকা প্রকৌশল এবং কৃষি-প্রক্রিয়াজাত পণ্যের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা অপরিহার্য।

দ্বিতীয়ত, সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় কমাতে হবে, যা বর্তমানে জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ—প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। বন্দরের যানজট, বিদ্যুৎ ঘাটতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা না গেলে, যেকোনো শুল্ক-সুবিধার ইতিবাচক প্রভাব সরবরাহ শৃঙ্খলেই হারিয়ে যাবে।

তৃতীয়ত, চুক্তির শ্রমসংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিগুলোকে বোঝা নয়, সংস্কারের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। শ্রমিকের অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত পূরণের বিষয় নয়; এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি-প্লাস সুবিধা অর্জনেরও অন্যতম পূর্বশর্ত। অর্থাৎ, একটি সংস্কার, দুটি বাজার।

চতুর্থত, দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) আলোচনার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। এলডিসি-পরবর্তী বিশ্বে অগ্রাধিকারমূলক বাজার-সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলবে না; তা দক্ষ আলোচনার মাধ্যমে অর্জন করতে হবে। ‘১৩১ বনাম ৬’-এর অসামঞ্জস্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অপ্রস্তুতির মূল্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

পঞ্চমত, মার্কিন কৃষি ও জ্বালানি পণ্য আমদানির অঙ্গীকারকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগাতে হবে। সাশ্রয়ী মূল্যের তুলা ও এলএনজি যেন শুধু বাণিজ্য ঘাটতি সমন্বয়ের উপকরণ না হয়ে, বরং পোশাক ও বিদ্যুৎ খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যম হয়ে ওঠে।

ষষ্ঠত, প্রাতিষ্ঠানিক দর-কষাকষির সক্ষমতায় বিনিয়োগ অপরিহার্য। চুক্তির ১৩১টি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন তদারকি, ডিজিটাল বাণিজ্য ও বিনিয়োগবিষয়ক বিধানের ব্যাখ্যা এবং ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা প্রক্রিয়ায় কার্যকর অংশগ্রহণের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর সমন্বয়ে একটি স্থায়ী, বিশেষজ্ঞ-নেতৃত্বাধীন বাণিজ্য-কূটনীতি সেল গঠন করা প্রয়োজন। উন্নত অর্থনীতিগুলো যেখানে শত শত প্রশিক্ষিত আলোচক নিয়োগ করে, সেখানে বাংলাদেশের সক্ষমতা এখনও উদ্বেগজনকভাবে সীমিত। মেধা, তথ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার এই ঘাটতি পূরণ না হলে ভবিষ্যতের প্রতিটি বাণিজ্য চুক্তিতেই একই ধরনের অসামঞ্জস্যের ঝুঁকি থেকে যাবে।

বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এক বছর আগে আমরা শুল্ক-সংকটের মুখে আবেদনকারীর অবস্থানে ছিলাম; আজ আমরা একটি আইনি বাণিজ্য চুক্তির অংশীদার—যা অসম হলেও অধিকতর পূর্বানুমানযোগ্য। এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, চাপের মুখেও সে আলোচনার টেবিল ত্যাগ করে না। তবে প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে আলোচনার টেবিলের বাইরে—আমাদের কারখানার উৎপাদনশীলতায়, বন্দরের দক্ষতায় এবং নীতিনির্ধারকদের সংস্কারমুখী সাহসিকতায়। দর-কষাকষির মাধ্যমে শুল্কহার কমানো সম্ভব, কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা গড়ে তুলতে হয় নিজস্ব অর্থনীতির ভেতরেই। আগামী দশকে টিকে থাকবে সেই দেশ, যে শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নয়, বরং বহুমুখীকরণ, দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তিতে রফতানি সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারবে। তাই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: আমরা কি এই চুক্তির সাময়িক স্বস্তিতে আত্মতুষ্ট হব, নাকি এটিকেই অর্থনৈতিক সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জনের সোপানে পরিণত করব?

মোহাম্মদ কবির হাসান: যুক্তরাষ্ট্রের এলএসইউ–নিউ অরলিন্সের ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ও মফেট চেয়ার; ইসলামিক ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্সে ২০১৬ সালের ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পুরস্কারপ্রাপ্ত; এএওআইএফআই এথিকস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য এবং এডুকেশন বোর্ডের চেয়ারম্যান

আরও