রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৬৪,৪০৬ কোটি টাকা

ব্যাংক বাঁচাতে পুনর্মূলধনীকরণ করলেও একীভূত বা অবসায়নের দিকে হাঁটতে হবে

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যাংককে পুনর্মূলধনীকরণের মাধ্যমে নানা সহায়তা দেয়া হয়। কিন্তু কোনোবারই ব্যাংকগুলো তাদের নাজুক অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটটির মধ্যে জনতা ব্যাংকেই তা ৬৪ হাজার ৪০৬ কোটি টাকায় এসে ঠেকেছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে সম্প্রতি জনতা ব্যাংকের ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর নতুন করে ব্যাংকগুলোর বাস্তব অবস্থা আলোচনায় এসেছে। ব্যাসেল-৩ নীতির আলোকে ব্যাংকটিকে ১২ হাজার ৯১৮ কোটি টাকার মূলধন সংরক্ষণ করতে হলেও বাস্তবে ব্যাংকটির প্রকৃত মূলধন ঘাটতি ৬৪ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট লোকসান ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকার বেশি। ব্যাংকটির বিপর্যয় আরো তীব্র, কারণ এটির বিতরণকৃত ১ লাখ ৫ হাজার ১১৯ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৫০ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা পাওনা মাত্র পাঁচটি ব্যবসায়িক গ্রুপের কাছে। এ বিপুল পাওনার সবটুকু এখন খেলাপি। ব্যাংকটি কার্যত সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদ আয়ের ওপর ভর করে বেঁচে আছে। টানা রাজনৈতিক নিয়োগ, দলীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ঋণ বিতরণ এবং জবাবদিহিহীন পর্ষদ পরিচালনাই এ বিপর্যয়ের মূল কারণ। এদিকে দেশের ৬১ ব্যাংকের মধ্যে ২৪টি ন্যূনতম মূলধন ধরে রাখতে পারছে না। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফেরাতে জিডিপির কমপক্ষে ১০ শতাংশ পুনর্মূলধনীকরণের প্রয়োজন। কিন্তু অর্থনৈতিক টানাপড়েনের বাস্তবতায় দুর্বল ব্যাংককে পুনর্মূলধনীকরণের মাধ্যমে স্থিতিশীল অবস্থায় ফেরানো সম্ভব হবে কিনা, সেটি বড় প্রশ্ন।

দেশে এ পর্যন্ত মূলধন জোগান দিয়ে কোনো বিপর্যস্ত ব্যাংককে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এর আগে বেসিক ব্যাংককে রক্ষায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা সরকারি তহবিল ঢালা হয়। তবু ব্যাংকটি আজ ৮ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়ে কোনোমতে টিকে আছে। বেসরকারি মালিকানাধীন পদ্মা ব্যাংককে বাঁচাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ৭১৫ কোটি টাকা মূলধন দেয়া হলেও ফল শূন্য। শরিয়াহ্‌ভিত্তিক দুর্বল ব্যাংকগুলোকে হাজার হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেয়া হয়েছে, কিন্তু সেগুলোও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ব্যর্থতার পথে একীভূতকরণের সিদ্ধান্তও। জনতা ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই পথে হাঁটলে সমাধান হবে—এমনটি প্রত্যাশিত নয়। কারণ কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া কেবল মূলধন ঢেলে দিলে কার্যত জনগণের করের অর্থেরই অপচয় হবে। এ কথাটি অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে স্বয়ং বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ সদস্যদের স্বীকারোক্তিতেও এসেছে। তবে অতীতের ব্যর্থতা থেকে একটি শিক্ষা পাওয়া যায়—আর্থিক খাতে শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হয় না। কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে নীতিমালা বাস্তবায়নের পথ সুগম রাখা দরকার। দেশে দুর্বল ও আর্থিক ঝুঁকিতে থাকা ব্যাংকগুলোকে স্থিতিশীল করার জন্য তাই কাঠামোগত সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার নীতিগত উদ্যোগ জরুরি।

শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক নয়, দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও একই সংস্কার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সংস্কার অনেক ক্ষেত্রে অজনপ্রিয় হলেও তা বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা রাখা জরুরি। বিশেষত অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন দেশে এতগুলো ব্যাংক প্রয়োজন নেই। এমনকি রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে ব্যাংক একীভূত বা বন্ধ করে দেয়া—এসব বিষয়ে এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। এজন্যই কোন ব্যাংকগুলো অর্থনীতি ও আমানতকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় বাঁচানো জরুরি তা নির্ধারণের আগে একটি স্পষ্ট মানদণ্ড তৈরি করতে হবে। শুধু বড় কিংবা সরকারি হলেই তাকে টিকিয়ে রাখা কোনো মানদণ্ড হতে পারে না। যেসব ব্যাংক কাঠামোগত অক্ষমতায় বিপর্যস্ত, সেগুলোর ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত অবসায়ন বা একীভূতকরণ বিবেচনায় আনতে হবে। সিদ্ধান্তটি কঠিন হলেও এর বিকল্প আরো কঠিন। কারণ বারবার মূলধন ঢেলে একই ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি জাতীয় সম্পদের অপচয়। ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ যেন বিষফোঁড়া। এজন্য খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। অর্থ আদালতগুলো বছরের পর বছর একই মামলা চালিয়ে গেলেও বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করার বিকল্প পাওয়া যায়নি। বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। আধুনিকায়ন জরুরি দেউলিয়া আইনের। তাতে জামানতের সম্পদ নিলামে বিক্রির ব্যবস্থা সহজ হবে। যেহেতু বর্তমানে জামানতের সম্পদ বিক্রির ক্রেতা মিলছে না, তাই এ ব্যাপারে বিশেষ নজর দিতে হবে। জামানত নিবন্ধন ব্যবস্থারও সংস্কার করতে হবে। একই সম্পদ একাধিক ব্যাংকে বন্ধক রাখার সুযোগ বন্ধ না হলে ঋণ আদায় কখনই কার্যকর হবে না। ভূমি রেকর্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র, বিনিয়োগ নিবন্ধন এবং ক্রেডিট তথ্যসহ অন্যান্য বিষয়কে ডিজিটাল প্লাটফর্মে সংযুক্ত করলে ঋণের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

কোনো ব্যাংককে বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হলে কঠোর শর্তের ভিত্তিতে পুনর্মূলধনীকরণ করতে হবে। এজন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা জরুরি। ব্যাংকগুলোর প্রতি অর্থবছরের কর্মক্ষমতা যাচাই করে মূলধন ছাড় দেয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। নমনীয় শর্তে মূলধন জোগানের সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার সাহসিকতা না রাখলে ব্যাংকগুলো বারবার ব্যর্থই হবে। ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি কমানোর জন্য সরকারের অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতাও কমানো জরুরি। রাষ্ট্রই যদি ব্যাংকের মূলধনের বড় ঋণগ্রাহক হয় তাহলে বেসরকারি খাত ও উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়। এ সংকট নিরসনে বন্ড বাজারের বিকাশ, রাজস্ব আয় বাড়ানো ও সরকারি ব্যয়ের কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর কর কাঠামো যৌক্তিক করতে হবে। বর্তমানে ব্যাংকের করহার ৩৭ দশমিক ৫ থেকে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত। এটিকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হারে আনলে ব্যাংকগুলো পুঁজি পুনর্নির্মাণে আরো সক্ষম হবে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশনে পূর্ণ কর রেয়াত দিলে ব্যাংকগুলো অনাদায়ী দাবি লুকানোর বদলে স্বচ্ছভাবে তা প্রকাশে উৎসাহিত হবে। এগুলো আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে অবদান রাখবে।

ব্যাংক খাত সংস্কারের পেছনে ক্ষমতা পুনর্বণ্টনের প্রশ্ন থাকায় এসব বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সাহস অনেক জরুরি। এজন্য আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনতা দেয়া বেশি জরুরি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি নিয়মিতভাবে রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে, তাহলে যতই কঠোর নীতিমালা তৈরি হোক তা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম। ব্যাংক ব্যবস্থার সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ সহজ নয়, তবে পথ আছে। এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রীও সংসদ অধিবেশনে জানিয়েছেন সরকারকে ব্যাংকের বিষয়ে কিছু অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। এটি একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। তবে তা যেন বলায় সীমাবদ্ধ না থাকে বরং বাস্তবায়নের পথে হাঁটে সেটিই প্রত্যাশিত।

আরও