বিশ্ব উন্নয়ন তথ্য দিবস

উন্নয়নের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হতে হবে ব্যক্তির মঙ্গলের জন্য টেকসই উন্নতি ঘটানো

দুর্ভাগ্যবশত বিশ্বের লাখ লাখ মানুষের জীবনযাত্রার মান এখনো করুণভাবে অনেক নিম্নগামী। তারা এখনো প্রায়ই অপুষ্টির শিকার, অশিক্ষিত, বেকার এবং অনেক মৌলিক সুযোগ-সুবিধা পেতে চায়। তা সত্ত্বেও বর্তমান হতাশাকে অবশ্যই উন্নয়ন লক্ষ্যের পথে বাধা হতে দেয়া যাবে না।

১৯৭২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৪ অক্টোবরকে জাতিসংঘ দিবসের সঙ্গে মিল রেখে বিশ্ব উন্নয়ন তথ্য দিবস প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেয়। সাধারণ পরিষদ কর্তৃক প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন সংক্রান্ত সমস্যা এবং এর সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে এটি করা হয়।

উল্লেখ্য বিশ্বব্যাপী অস্ত্র সংঘাতের ভয়াবহতা ও বেদনাময় স্মৃতির প্রেক্ষাপটে পৃথিবীর মানুষের ঐক্যবদ্ধ সংকল্পের প্রতীক হিসেবে ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতিসংঘ, যা ‘লীগ অব নেশনস’-এর উত্তরসূরি। ১৯৪৫ সালের ২৫ এপ্রিল মাত্র ৫০টি দেশ ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকোতে একটি সম্মেলনের জন্য একত্রিত হয়। দেশগুলো একত্রে বসে জাতিসংঘের সনদের খসড়া প্রস্তুত করে, যা ১৯৪৫ সালের ২৫ জুন গৃহীত হয়। চার্টারটি ২৪ অক্টোবর ১৯৪৫ তারিখে কার্যকর হয় এবং জাতিসংঘের কার্যক্রম শুরু হয়। জাতিসংঘের সনদের উদ্দেশ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, মানবাধিকার রক্ষা করা, মানবিক সহায়তা প্রদান করা, টেকসই উন্নয়নের প্রচার করা এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখা। প্রতিষ্ঠাকালে জাতিসংঘের ৫০টি সদস্য রাষ্ট্র ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের হিসাবে এখন পর্যন্ত ১৯৩টি সার্বভৌম রাষ্ট্র যুক্ত হয়েছে। এ দেশগুলোয় বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে জাতিসংঘ প্রতি বছর ৩ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি তহবিল জুগিয়ে থাকে। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের জন্য জাতিসংঘের বেশির ভাগ কাজ উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। কেননা এসব দেশের মানুষ অভাব-অনটন, ক্ষুধা, অশিক্ষা, রোগ-শোক ইত্যাদি ঝামেলার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে। জন্মলগ্ন থেকেই জাতিসংঘ তার সনদের ৫৫ ধারার অর্থাৎ উচ্চমানের জীবনযাপন নিশ্চিত করা, বেকার সমস্যা দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে।

১৯৬০ সাল থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাহায্যে নেয়া বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও কার্যক্রম তুলে ধরার জন্য সাধারণ পরিষদ পর পর চারটি জাতিসংঘ উন্নয়ন দশকের কথা ঘোষণা করে। জাতিসংঘের ঘোষিত প্রথম উন্নয়ন দশক ছিল ১৯৬১-৭০। ষাটের দশকের শুরু থেকে ভারসাম্যপূর্ণ ও সুষম উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ উন্নয়ন প্রসারের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে। এ উন্নয়ন প্রয়াস আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিফলিত হয় ১৯৬৯ সালে, সমাজের প্রগতি ও উন্নয়ন প্রসঙ্গে দেয়া সাধারণ পরিষদের ঘোষণার মধ্য দিয়ে। এ ঘোষণায় বলা হয়, সবার জন্য কাজ করার অধিকার নিশ্চিত করা, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও সম্মিলিতভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উৎপাদনশীল কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করা, বেকার সমস্যা দূরীকরণ ও চাকরির মানোন্নয়ন, সবার জন্য কাজের সুস্থ পরিবেশ সৃষ্টি করা, স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন করা ও নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করা। এমনকি কোনো ধরনের ভেদাভেদ ছাড়া শ্রমের ন্যায়সংগত পারিশ্রমিক নিশ্চিত করাও ছিল অন‍্যতম উদ্দেশ্য। দ্বিতীয় দশক ঘোষণা করা হয় ১৯৭০-৮০। দ্বিতীয় দশকের উন্নয়ন পরিকল্পনা ছিল ন্যায়পরায়ণতা ও সমতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিমূল সমতা, সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, অভিন্ন স্বার্থ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা নির্বিশেষে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে সহযোগিতা।

১৯৭০ সালে দ্বিতীয় উন্নয়ন দশক পালনের শুরুতে আন্তর্জাতিক উন্নয়নের কৌশল গৃহীত হওয়ার তারিখ হিসেবে ২৪ অক্টোবর দিনটিকে আরো গুরুত্ব দেয়া হয়। ১৯৭২ সালের ১৭ মে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সম্মেলনে (আঙ্কটাড) তথ্য প্রচার ও বাণিজ্য বিকাশের সমস্যার সঙ্গে জনমতকে জড়িত করার পদক্ষেপ নেয়া হয়, যা রেজল্যুশন ৩০৩৮ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৯ ডিসেম্বর, ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এটি পাস হয়। ওই সম্মেলনে বিশ্ব উন্নয়ন তথ্য দিবস সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে বোঝানো ও উন্নয়নের সমস্যাগুলোর সমাধানের উপায় খুঁজে পেতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরো জোরদার করা কেন প্রয়োজন সে বিষয়ে ব‍্যাপক আলোচনা হয়। ওই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল যে বিশ্ব উন্নয়ন তথ্য দিবস জাতিসংঘ দিবসের সঙ্গে মিলিত হওয়া উচিত। বিশ্ব তথ্য দিবসটি সর্বপ্রথম ১৯৭৪ সালের ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং তার পর থেকে প্রতি বছর এ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়।

উন্নয়নসংক্রান্ত কাজের একটি অপরিহার্য অংশ হলো নির্ধারিত উদ্দেশ্য এবং নীতির সমর্থনে উন্নয়নশীল ও উন্নত উভয় দেশে জনমতের সংহতি। আর উন্নত দেশগুলোর সরকারের অবশ্যই উন্নয়ন প্রচেষ্টার আন্তঃনির্ভর প্রকৃতি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে সহায়তার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনসাধারণের বোঝাপড়ার জন্য তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। একইভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারকে অবশ্যই সব স্তরের জনগণকে জড়িত সুবিধা এবং ত্যাগ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি উন্নয়ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে তাদের পূর্ণ অংশগ্রহণ তালিকাভুক্ত করতে হবে। জনমত গড়ে তোলার দায়িত্ব প্রধানত জাতীয় সংস্থার হতে হবে। সরকারগুলো নতুন জাতীয় সংস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য বিবেচনা করতে পারে বা জনমতকে একত্রিত করার জন্য পরিকল্পিত বিদ্যমান সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা হিসেবে শিক্ষা পাঠ্যক্রমকে ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের সঙ্গে একই অভিমুখ করতে পারে। জনমত গঠনে নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে এ বিবেচনায়, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের দ্বারা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য প্রণয়ন অপরিহার্য।

দুর্ভাগ্যবশত বিশ্বের লাখ লাখ মানুষের জীবনযাত্রার মান এখনো করুণভাবে অনেক নিম্নগামী। তারা এখনো প্রায়ই অপুষ্টির শিকার, অশিক্ষিত, বেকার এবং অনেক মৌলিক সুযোগ-সুবিধা পেতে চায়। তা সত্ত্বেও বর্তমান হতাশাকে অবশ্যই উন্নয়ন লক্ষ্যের পথে বাধা হতে দেয়া যাবে না। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সাফল্য ব্যাপকভাবে সাধারণ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উন্নতির ওপর নির্ভর করে যার জন্য সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি প্রয়োজন, বিশেষ করে সমাজের সব সদস্যের জন্য সমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সুনিশ্চিত করা।

উন্নয়নের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হতে হবে ব্যক্তির মঙ্গলের টেকসই উন্নতি ঘটানো এবং সবাইকে সুবিধা প্রদান করা। অযৌক্তিক সুযোগ-সুবিধা, সম্পদের চরম আধিপত্য ও সামাজিক অনাচার অব্যাহত থাকলে উন্নয়ন তার অপরিহার্য উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি দ্বারা প্রদত্ত অভূতপূর্ব সুযোগের বর্তমান যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে, যাতে সেগুলো সব দেশ সমানভাবে ভাগ করে নিতে পারে এবং ফলস্বরূপ সারা বিশ্বে ত্বরান্বিত অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে গবেষণা ও উন্নয়নে তাদের ব্যয় বাড়াতে হবে। তাদের অবশ্যই সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। উন্নত দেশগুলো থেকে যথাযথ সহায়তা নিয়ে, উন্নয়নের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগে তাদের সক্ষমতা প্রসারিত করতে হবে, যাতে প্রযুক্তিগত ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব হয়।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন সমাধান খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রতিযোগিতা, তথ্য ও জ্ঞানে প্রবেশগম্যতা, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। এছাড়া বৈশ্বিক অর্থনীতি সব দেশ, বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর একীভূতকরণকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করতে পারে। তদুপরি এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সত্য যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে। উন্নয়নশীল দেশগুলো নতুন প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে যে প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলোর মুখোমুখি হয় তা মোকাবেলা করার জন্য জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজন শক্ত অবকাঠামো, শিক্ষা, ক্ষমতা, বিনিয়োগ ও সংযোগ। এ বিষয়ে আমরা উন্নয়নশীল দেশগুলোয় পারস্পরিক সম্মত শর্তে পর্যাপ্ত সম্পদ, বর্ধিত ক্ষমতা-নির্মাণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রদানের জন্য সব স্টেকহোল্ডারের প্রতি আহ্বান জানাতে পারি। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের প্রধানতম পদক্ষেপ হচ্ছে সবার জন্য একটি ভালো এবং টেকসই ভবিষ্যৎ অর্জনের নীলনকশা। যাতে তারা দারিদ্র্য, অসমতা, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত অবনতি, শান্তি ও ন্যায়বিচারসহ জনগণ যে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হচ্ছে তার মোকাবেলা করতে পারে।

মো. রফিকুজ্জামান: সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও রেজিস্ট্রার, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি

আরও