এ পরিসংখ্যানের সবচেয়ে আলোচিত দিক মোট ঋণের প্রায় ৬২ শতাংশ এখনো সহজ শর্তে প্রাপ্ত ঋণ। তবে এর অন্তর্নিহিত বাস্তবতা আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। অর্ধশতাব্দী ধরে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অর্থায়নে তুলনামূলক কম খরচের সরকারি ঋণের ওপর নির্ভর করে এসেছে। কারণ দেশে এমন একটি শক্তিশালী ও কার্যকর অর্থায়ন বাজার কাঠামো এখনো পর্যাপ্তভাবে বিকশিত হয়নি, যেখানে নিজস্ব ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং ঝুঁকির যথাযথ মূল্যনির্ধারণের সক্ষমতা তৈরি হতে পারে। সে সহজ সুযোগের দরজাও ক্রমেই বন্ধ হয়ে আসছে। মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জনের ফলে এরই মধ্যে সহজ শর্তের অর্থায়নের পরিসর সংকুচিত হয়েছে। এলডিসি উত্তরণ ঘটলে তা আরো সংকুচিত হবে। ফলে বাংলাদেশ এখন উপলব্ধি করছে, পরিবর্তিত এ বাস্তবতা মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ পুঁজিবাজার কাঠামো এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
ঘাটতিটি শেয়ারবাজারে নয়, প্রকৃত ঘাটতি রয়েছে বন্ডবাজারে যেখানে মানুষের সঞ্চয়কে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে রূপান্তরের নীরব কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশে এ বাজারের উপস্থিতি এখনো প্রায় অনুপস্থিত। দেশের সামগ্রিক পুঁজিবাজারের আকার জিডিপির মাত্র প্রায় ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। করপোরেট বন্ডের অংশ এতই ক্ষুদ্র যে তা প্রায় পরিসংখ্যানগত ত্রুটির পর্যায়ে। জিডিপির মাত্র প্রায় দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। এর বড় অংশই ব্যাংকগুলোর মূলধন কাঠামোর প্রয়োজন মেটাতে ইস্যু করা অধস্তন ঋণ। একটি আধুনিক অর্থনীতি কেবল ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে শিল্পায়নের দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা পূরণ করতে পারে না। অথচ বাংলাদেশে বাস্তবে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকেই এমন প্রত্যাশা করা হচ্ছে—স্বল্পমেয়াদি আমানতের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো ও শিল্প প্রকল্পে অর্থায়ন করতে, যেখানে আমানতকারীরা চাইলে যেকোনো সময় তাদের অর্থ তুলে নিতে পারেন। এ মেয়াদি অসামঞ্জস্যই ব্যাংক খাতের ধারাবাহিক চাপ ও সংকটের অন্যতম নীরব উৎস।
বন্ডবাজার কেন কখনো কাঙ্ক্ষিতভাবে বিকশিত হতে পারেনি? সহজ উত্তর এর প্রয়োজনীয় ভিত্তিগুলোই কখনো শক্তভাবে নির্মিত হয়নি। একটি কার্যকর বন্ডবাজারের জন্য মূলত তিনটি অপরিহার্য উপাদান প্রয়োজন—একটি নির্ভরযোগ্য বেঞ্চমার্ক, একটি সক্রিয় সেকেন্ডারি মার্কেট এবং একটি স্বচ্ছ ও দক্ষ ইস্যু প্রক্রিয়া। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে এ তিন ক্ষেত্রেই এখনো বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রথমেই বেঞ্চমার্কের বিষয়টি বিবেচনা করা যাক। সরকার ৯১ দিন থেকে শুরু করে ২০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের ট্রেজারি বিল ও বন্ড ইস্যু করে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত একটি সুদহার রেখা প্রকাশ করে। কিন্তু এ সুদহার রেখা প্রকৃত অর্থে একটি জীবন্ত বাজারমূল্য প্রতিফলিত করে না। কারণ অধিকাংশ সরকারি সিকিউরিটি ব্যাংকগুলো তাদের বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণের প্রয়োজন মেটাতে ক্রয় করে এবং সাধারণত মেয়াদপূর্তি পর্যন্ত ধরে রাখে; সক্রিয়ভাবে কেনাবেচা করে না। ফলে যে সুদহার রেখার ওপর ভিত্তি করে বাজারে বাস্তব লেনদেনই হয় না, সেটি মূলত একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র, কার্যকর বাজার সংকেত নয়, একটি নির্ভরযোগ্য ঝুঁকিমুক্ত বেঞ্চমার্ক ছাড়া কোনো বিনিয়োগকারী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করপোরেট বন্ড, অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পেনশন দায়ের প্রকৃত মূল্যনির্ধারণ করতে পারে না। তখন বাজারের মূল্যায়ন ব্যবস্থা বাস্তব তথ্যের পরিবর্তে অনুমাননির্ভর হয়ে পড়ে।
সেকেন্ডারি মার্কেট হলো বন্ডবাজারের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুপস্থিত ভিত্তি। সরকারি বন্ডের লেনদেন যদি কিছুটা হয়ও, তা মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব সেটলমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ক্ষেত্র, স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার কাঠামো থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন। অন্যদিকে করপোরেট বন্ডের লেনদেন প্রায় নেই বললেই চলে; কোনো লেনদেন হলে তা সাধারণত ব্যক্তিগত সমঝোতার ভিত্তিতে ওভার-দ্য-কাউন্টার (ওটিসি) পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়। যে বন্ড সহজে কেনাবেচা করা যায় না, অধিকাংশ বিনিয়োগকারী স্বাভাবিকভাবেই তাতে আগ্রহ হারায়। ফলে নতুন বন্ড ইস্যুর আগ্রহ কমে যায়, বাজারে তারল্য সৃষ্টি হয় না এবং তারল্য সংকটের চক্রটি ক্রমাগত চলতে থাকে।
তৃতীয় বাধাটিই সবচেয়ে সহজে সমাধানযোগ্য, অথচ সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে—করপোরেট বন্ড ইস্যু প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। বাংলাদেশে একটি করপোরেট বন্ডবাজারে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেতে ১৮-২৪ মাস পর্যন্ত লেগে যায়। অথচ একই অর্থায়নের জন্য একটি সিন্ডিকেটেড ব্যাংক ঋণ পেতে সময় লাগে মাত্র তিন-চার মাস। দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় কোনো কোম্পানির প্রস্তাবিত কুপন হার বা সুদের কাঠামো বাজারের বিদ্যমান পরিস্থিতির সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না, ফলে পুরো উদ্যোগের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে। যখন একটি প্রতিষ্ঠানের সামনে দ্রুত প্রাপ্ত ব্যাংক ঋণ এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়াসাপেক্ষ বন্ড অর্থায়নের মধ্যে বেছে নেয়ার সুযোগ থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই অধিকাংশ সচেতন আর্থিক ব্যবস্থাপক দ্রুততর বিকল্পটিই বেছে নেন। ফলে বন্ডবাজারের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন ইস্যু, বিনিয়োগকারী আস্থা ও বাজারের গভীরতা তৈরি হয় না। কারণ বাজারে প্রবেশের পথটিই এখনো যথেষ্ট সহজ ও কার্যকর হয়ে ওঠেনি।
এ চ্যালেঞ্জগুলো শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই অনন্য নয়, বিশ্বের অনেক উদীয়মান অর্থনীতিই বন্ডবাজার গড়ে তোলার পথে একই ধরনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু যেসব দেশ সফলভাবে শক্তিশালী বন্ডবাজার তৈরি করতে পেরেছে, তারা মূলত একটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে—বাজারের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো আগে তৈরি করা। এর মধ্যে ছিল কার্যকর ক্লিয়ারিং ও সেটলমেন্ট ব্যবস্থা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য সুসংগঠিত সোয়াপ বাজার, নির্ভরযোগ্য বেঞ্চমার্ক সিকিউরিটির ধারাবাহিক সরবরাহ এবং দ্রুত ও স্বচ্ছ ডকুমেন্টেশন প্রক্রিয়া। অর্থাৎ অবকাঠামো তৈরির পরই বাজারের বিকাশ ঘটেছে; বাজার তৈরি হওয়ার অপেক্ষায় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা প্রয়োজনীয় বাজার অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি দীর্ঘদিন পিছিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে এখন প্রশ্ন উঠছে কেন একটি শক্তিশালী বন্ডবাজার তৈরি হচ্ছে না, অথচ এর ভিত্তি তৈরির কাজটিই এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
এ বাজার তৈরি করতে হলে কী করতে হবে? সমাধানগুলো আসলে নতুন বা অজানা কিছু নয়; প্রয়োজন শুধু বাস্তবায়নে দৃঢ়তা ও ধারাবাহিকতা। এক্ষেত্রে চারটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।
প্রথমত, সরকারি সিকিউরিটিজের লেনদেনকে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব সেটলমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। প্রকৃত লেনদেন নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্টক এক্সচেঞ্জভিত্তিক ট্রেডিং কাঠামো গড়ে তুলতে হবে এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে মার্কেট মেকার হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ দিতে হবে, যাতে তারা নিয়মিত দ্বিমুখী মূল্য প্রদান করে বাজারে তারল্য সৃষ্টি করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বন্ড ইস্যুর অনুমোদন প্রক্রিয়ার সময়সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে। কোনো বন্ড অনুমোদনে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়ের চেয়েও বেশি সময় লাগে, তাহলে সেটি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পরিবর্তে বাজার বিকাশের পথে একটি প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হয়।
তৃতীয়ত, নতুন বন্ড ইস্যুকারীদের জন্য বাজারে প্রবেশ সহজ করতে প্রয়োজনীয় সহায়ক কাঠামো তৈরি করতে হবে। খেলাপি ঝুঁকির বিপরীতে আংশিক সুরক্ষা দিতে পারে এমন একটি বন্ড গ্যারান্টি তহবিল প্রতিষ্ঠা করা হলে তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে এবং নতুন ইস্যুকারীদের জন্য ক্রেতা খুঁজে পাওয়া সহজ করবে।
চতুর্থত, বন্ডবাজার উন্নয়নকে বিচ্ছিন্ন বা মাঝে মাঝে নেয়া কোনো উদ্যোগ হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় আর্থিক কৌশলের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। একটি পূর্বনির্ধারিত ও নিয়মিত সরকারি ইস্যু ক্যালেন্ডার বাজারে আস্থা, স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আরেকটি সম্ভাবনাময় পথ রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ প্রথমটির পাশাপাশি একটি বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। আশ্চর্যের বিষয় সম্ভাবনাটি এতদিন অনেকটাই আড়ালে ছিল। সেটি হলো দেশের সার্বভৌম সুকুক কর্মসূচি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে চালু হওয়া এ শরিয়াহসম্মত আর্থিক উপকরণটি নিয়মিতভাবে প্রত্যাশার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বিনিয়োগ আবেদন আকর্ষণ করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত সরকারি সিকিউরিটিজের তুলনায় কম ব্যয়ে অর্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দেয়, শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহী বিপুল পরিমাণ সঞ্চয় একটি উপযুক্ত ও নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যমের অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত বিকল্পের অভাবে সে অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে না। ইসলামী ব্যাংকগুলো দেশের ব্যাংক খাতের মোট সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ধারণ করে এবং তাদের কাছে দীর্ঘমেয়াদি অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে, যা প্রচলিত সুদভিত্তিক সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়। অতএব, চাহিদার অভাব এখানে মূল সমস্যা নয়, বরং মূল সমস্যা পর্যাপ্ত সরবরাহের ঘাটতি। এ সরবরাহ সীমিত থাকার পেছনে রয়েছে বাজার কাঠামো, নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা ও উপযুক্ত উপকরণের দীর্ঘদিনের ঘাটতি।
বাংলাদেশের সুকুক কাঠামো মূলত বিক্রয় ও পুনরায় লিজ পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এ ব্যবস্থায় সরকার একটি বিদ্যমান সরকারি সম্পদ একটি বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিষ্ঠানের (এসপিভি) কাছে হস্তান্তর করে, পরবর্তী সময়ে সেটি লিজ নেয় এবং নির্ধারিত মেয়াদ শেষে পুনরায় সম্পদটি অধিগ্রহণ করে। ফলে এটি মূলত সম্পদভিত্তিক, সম্পদ-সমর্থিত নয়। অর্থাৎ এটি নতুন কোনো প্রকল্প বা উৎপাদনশীল বিনিয়োগে সরাসরি অর্থায়নের পরিবর্তে প্রচলিত বন্ডের বিকল্প কাঠামো হিসেবে কাজ করে। তবে এ ব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ এটি পুনর্ব্যবহারের জন্য বিদ্যমান সরকারি সম্পদের একটি নির্দিষ্ট মজুদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে নিয়মিত ও বৃহৎ পরিসরে ইস্যুর মাধ্যমে একটি গভীর ও সক্রিয় বাজার তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের সুকুক স্বল্পমেয়াদে বাজেট ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার বা অর্থায়নের নতুন পথ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে না।
এর সমাধান মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির মধ্যে নিহিত। প্রতিটি প্রকল্পে আলাদাভাবে বিক্রয় ও ইজারা কাঠামো তৈরির পরিবর্তে বাংলাদেশের উচিত একটি স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক ইস্যুকারী সংস্থা গড়ে তোলা—যেমন একটি সার্বভৌম অর্থায়ন করপোরেশন, যা আয়-উৎপাদনকারী সরকারি সম্পদ এবং ধারাবাহিক নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের একটি সুসংগঠিত পোর্টফোলিওর ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। এ ধরনের কাঠামোর মাধ্যমে সরকার মুরাবাহা, ইজারা ও ইস্তিসনার মতো স্বীকৃত ইসলামী অর্থায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন করতে পারবে। পাশাপাশি একটি পূর্বনির্ধারিত ও নিয়মিত ইস্যু পরিকল্পনার আওতায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুকুক বাজারে আনা সম্ভব হবে। নিয়মিত ও পুনরাবৃত্ত ইস্যুর মাধ্যমে একটি নির্ভরযোগ্য বেঞ্চমার্ক সুকুক কার্ভ তৈরি হতে পারে—যেভাবে ধারাবাহিক সরকারি বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে প্রচলিত বাজারে গিল্ট কার্ভ গড়ে ওঠে। এ ধারণা কোনো নতুন বা পরীক্ষামূলক বিষয় নয়; বরং এটি উন্নত অর্থনীতির সার্বভৌম ঋণ ব্যবস্থাপনার নীতির একটি ইসলামী অর্থায়ন উপযোগী রূপান্তর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার কাঠামো থেকে শুরু করে মিসর ও জর্ডানের মতো দেশের সুকুক উদ্যোগ পর্যন্ত—এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক মডেলের বিভিন্ন রূপ নিয়ে কাজ করা হয়েছে।
এ দুটি পথ (প্রচলিত বন্ডবাজার ও সুকুক বাজার) একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একই বৃহত্তর আর্থিক সংস্কারের দুটি পরিপূরক অংশ। একটি কার্যকর প্রচলিত বেঞ্চমার্ক কার্ভ এবং একটি কার্যকর সুকুক বেঞ্চমার্ক কার্ভ—উভয়ই যদি প্রকৃত অর্থে লেনদেনযোগ্য হয়, তাহলে তা দেশের ব্যাংক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ তহবিলগুলোকে ঝুঁকির যথাযথ মূল্যনির্ধারণে একটি নির্ভরযোগ্য নির্দেশক প্রদান করবে। এ নির্ভরযোগ্য মূল্য সংকেতের অভাবই বর্তমানে দেশের আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা। এ ধরনের কাঠামো তৈরি করা হয়তো নতুন কোনো বিদেশী বন্ড ইস্যুর তুলনায় ধীর, কম দৃশ্যমান এবং তাৎক্ষণিকভাবে আকর্ষণীয় নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই অর্থায়নে এটাই সেই মৌলিক ভিত্তি, যার ওপর একটি আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে থাকে। একটি শক্তিশালী বন্ডবাজারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধির সবচেয়ে কঠিন সময় হলো তখন, যখন সহজ শর্তের অর্থায়নের সুযোগ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসে এবং বিকল্প অর্থায়নের প্রয়োজন অনিবার্য হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের জন্য সে বাস্তবতা আর কেবল ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাবনা নয়; বরং এর আগমনের সময় এরই মধ্যে নির্ধারণ হয়ে গেছে।
মোহাম্মদ কবির হাসান: ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ও মফেট চেয়ার, ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্স; ২০১৬ সালের ইসলামিক ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্সে আইএসডিবি পুরস্কার বিজয়ী