অভিমত

আমার দেখা ঢাকা

এবার শুনুন তার বয়ান। মিরপুর রোডের দুই ধারে ফুটপাতে বেশুমার মানুষ শুয়ে আছে লাইন ধরে। কেউ মাত্র ঘুম থেকে উঠে দেয়ালের মুখোমুখি হয়ে প্রাকৃতিক কাজকর্ম সারছেন, কেউ বদনা থেকে পানি ঢেলে হাতমুখ ধুচ্ছেন, কেউ ছাই দিয়ে আঙুল ঘষে ঘষে দাঁত মাজছেন। কেউ তখনো ঘুমোচ্ছেন গভীর আরামের ঘুম! কে জানে কেউ হয়তো ঘুমের মাঝে মধুর মধুর স্বপ্নে

এবার শুনুন তার বয়ান। মিরপুর রোডের দুই ধারে ফুটপাতে বেশুমার মানুষ শুয়ে আছে লাইন ধরে। কেউ মাত্র ঘুম থেকে উঠে দেয়ালের মুখোমুখি হয়ে প্রাকৃতিক কাজকর্ম সারছেন, কেউ বদনা থেকে পানি ঢেলে হাতমুখ ধুচ্ছেন, কেউ ছাই দিয়ে আঙুল ঘষে ঘষে দাঁত মাজছেন। কেউ তখনো ঘুমোচ্ছেন গভীর আরামের ঘুম! কে জানে কেউ হয়তো ঘুমের মাঝে মধুর মধুর স্বপ্নে বিভোর! কারো গায়ে পাতলা চাদর, কারো গায়ে গেঞ্জি, কেউ খালি গায়েই নিদ্রামগ্ন। দিনে বা রাতের প্রথম দিকে যতই গরম থাকুক, শেষ রাতে খোলা আকাশের নিচে ফুটপাতে নির্মল শীতল বাতাস বিনা বাধায় এলোমেলো বয়ে চলে। তাই ক্লান্ত শরীর নিয়ে খেটে খাওয়া মানুষগুলো নিশ্চিন্ত মনে কী আরামেই না ঘুমোচ্ছে! অথচ তিনতলা বিল্ডিংয়ের নরম বিছানায় গরমে আমি সারা রাত ছটফট করেছি! ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, মানুষের ফাঁকে ফাঁকে দু-একটি কুকুরও সামনের পা দুখানি ছড়িয়ে দিয়ে আরামসে ঘুমোচ্ছে। জন্তু-জানোয়ারের মধ্যে কুকুরই যে সবার আগে মানুষের পোষ মেনেছিল, তার প্রমাণ সেদিন চোখের সামনেই দেখতে পেলাম। সূর্য তখনো ওঠেনি। রাস্তায় গাড়ি চলাচল নেই বললেই চলে। দু-একজন রিকশাওয়ালা দেখলাম গুঁটিসুুটি মেরে নিজের রিকশাতেই আধাশোয়া আধাবসা অবস্থায় ঘুমোচ্ছেন, না ঝিমোচ্ছেন বোঝার উপায় নেই।

পুুরো রাস্তা তখন ধাঙড়দের দখলেচলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। যতদূর চোখ যায় মিরপুর আজিমপুরদুদিকে তাকিয়ে দেখলাম কয়েক ডজন মেথর রাস্তা ঝাড়ু দিচ্ছেন এবং ময়লা ধুলোবালি সাফসুতরা করছেন। দুচোখ ভরে দেখলাম মেথরদের হূদয় নিংড়ানো ভালোবাসার পরশে রাস্তা পরিষ্কার হচ্ছে, দেখে শ্রদ্ধায় ভালোবাসায় তাদের প্রতি আমার মনটা নড়েচড়ে উঠল। বলতে ইচ্ছে হলো, কে বলে অশুচি তুমি অস্পৃশ্য-শুচিতা ফিরিছে সদা তোমার পেছনে! এরই মধ্যে রাস্তার পরিষ্কার অংশ ঝকঝক তকতক করছে। এত পরিষ্কার রাস্তা আগে কখনো চোখে পড়েনি এবং এত লোক যে ঢাকার রাস্তা সাফ করতে প্রতিদিন ভোরে এভাবে বেরিয়ে আসে, সেটাও ছিল আমার ধারণার অতীত।

গল্পের এখানেই শেষ নয়। সকালবেলা নগরের রাস্তা সাফ করতে শুধু যে মেথররা একাই আসেন তা নয়, আসার সময় তারা সঙ্গে করে নিয়ে আসেন তাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েকেও। দেখলাম মা-বাবারা রাস্তা ঝাড়ু দিচ্ছেন, আর সন্তানরা ফুটপাতে বসেই খেলছে, খাওয়াদাওয়া করছে, মারামারি করছে, কান্নাকাটি করছে এবং তারা যা করার তা- করছে। কেউ ফুটপাতে রাখা মুড়ি কুড়িয়ে কুড়িয়ে খাচ্ছে, কেউ কুকি বিস্কুট কামড়াচ্ছে, কেউ কলা খাচ্ছে আর চারদিকে মাছি ভনভন করছে। কেউ প্রস্রাব করে তার ওপরই হামাগুড়ি দিচ্ছে। রাস্তা সাফ করতে করতে মা হয়তোবা চলে গেছেন অনেক দূর! সন্তান পড়ে গেছে দৃষ্টিসীমার আড়ালে। নাগরিকদের পথ চলার সুবিধার জন্য নিষ্পাপ শিশুরা যে মূল্য দিচ্ছিল, সেকথা ভেবে ভেবে সেদিন কোনো কূলকিনারা পাইনি! ফুটপাতে তখনো কেনাকাটা কিংবা পথচারীদের আনাগোনা শুরু হয়নি, দোকানপাট খোলারও সময় হয়নি।

একটু উত্তরে টিচার্স ট্রেনিং কলেজের উল্টো দিকে রাস্তার পুব পাশে ছিল চিটাগাঙ হোটেল সে যুগে রেস্তোরাঁকে হোটেল এবং বুক স্টোরকে লাইব্রেরি বলার রেওয়াজ ছিল বাংলাদেশের সর্বত্র। এখনো আছে কিনা, আল্লাহ মালুম। সেখানে নাশতা খেতে গিয়ে দেখি রেস্টুরেন্ট তখনো বন্ধ। ফিরে এলাম রাস্তার ওপর পারে। এমন সময় একটি মুড়ির টিন বাস সাভার নয়ার হাট, সাভার নয়ার হাট বলে এসে থামল ঠিক আমার সামনে। লাফ দিয়ে আমি বাসে উঠে বসলাম। বাসভাড়া গুনতে গিয়ে দেখি, চিটাগাঙ রেস্টুরেন্ট বন্ধ ছিলভালোই ছিল, তখন নগদ পয়সায় নাশতা খেলে বাসভাড়া আর দিতে হতো না। যাই হোক, রাস্তা খালি ছিল বলে খুব তাড়াতাড়ি চলে এলাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। সেদিনকার মতো ঢাকার ভেতরের ঢাকার গল্প এখানেই শেষ। গল্প অনেক বছরের পুরনো।

এবার বলছি আরো ৩০ বছর পরের আরেক গল্প। সর্বশেষ আমি ঢাকা গিয়েছি ২০০৮ সালে। তার আগে গিয়েছি ১৯৯৯-তে। নয় বছরেও ঢাকার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আমি ঢাকায় গেলে যাই গরমের সময় যখন আমার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকে। উঠি আমার শ্বশুরবাড়ি মোহাম্মদপুরে স্যার সৈয়দ রোডে। বৃষ্টিবাদল না হলে ঢাকায় থাকাকালীন আমি ভোরে চন্দ্রিমা উদ্যানে হাঁটতে যাই। এবার বলছি ১৯৯৯-তে কী দেখলাম এবং নয় বছর পরে গিয়ে কী পরিবর্তন দেখলাম তার হালহকিকত। ১৯৯৯-তে যখন চন্দ্রিমা উদ্যানে যেতাম তখন দেখতাম হাজার হাজার লোক নারী-পুরুষ নির্বিশেষে  সব বয়সের মানুষই ছুটে আসতেন প্রাতঃভ্রমণে। কারো মাথায় টুুপি, হাতে লাঠি, বগলে ছাতা। দলে দলে সবাই হাঁটছেন, কথা বলছেন, ঘামছেন। কেউ পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছছেন, কেউ ঝরাচ্ছেন তো ঝরাচ্ছেন, কেউ  বিড়ি-সিগারেট খাচ্ছেন, কেউ কাশছেন, থুতু ফেলছেন ইত্যাদি। কেউ লেকের পারে একটুখানি বসে জিরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ বসে রসিয়ে রসিয়ে চা খাচ্ছেন। কেউ দাঁড়িয়ে খালি পেটে গলগল করে দুধের মাঠা (ঘোল) গিলছেন, কেউ শরবত খাচ্ছেন। মাঝে মাঝে অনেক দিনের পুরনো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে ওখানে দেখা হয়ে যেত। কোনো কোনো সময় শিক্ষকদের সঙ্গেও। আবার এমনও হয়েছে, ওখান থেকে কোনো আত্মীয়স্বজন ধরে নিয়ে গেছেন তার বাসায়।

২০০৮- আমি ঢাকায় মাত্র তিন কি চার রাত ছিলাম। তার মধ্যে একদিন মাত্র হাঁটতে গিয়েছিলাম চন্দ্রিমায়। নয় বছর আগের সঙ্গে তুলনা করে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনও লক্ষ করলাম। দুটো বিষয় আমাকে বেশ নাড়া দিয়েছে। প্রথমত, আমার চোখে ধরা পড়ল, ঢাকার লোকজন সংঘবদ্ধভাবে মর্নিং ওয়ার্ক শরীরচর্চা করতে শুরু করেছেন এবং মনে হলো শরীরচর্চার সঙ্গে তারা প্রাচীন গ্রিসের অ্যাথেন্সবাসীর মতো আরো কিছু এজেন্ডা যোগ করেছেন। কথায় আবার ফিরে আসব, তার আগে দিয়ে নেই তেজারতির বয়ান। মিরপুর রোড পার হওয়ার পর পরই উদ্যানে যাওয়ার পথে ফুটপাতে দেখলাম বসেছে বিরাট জমজমাট হাট। অফিস-আদালতে যাওয়ার আগে সকালে হাঁটতে এসে অনেক মানুষ দরকারি কাঁচাবাজারের কাজটি সেরে ফেলছেন ওইখানে। মাছ-তরকারি রাস্তা থেকে কিনে নিচ্ছেন। দেখলাম, ভোরের ফুটপাতের বাজার হরেক রকম তাজা মাছ এবং তরিতরকারিতে ভরা। তাজা মাছ বিশেষ করে বড় বড় জ্যান্ত কৈ দেখে আমার ভীষণ লোভ লাগছিল, সেদিন ওয়ালেট সঙ্গে থাকলে আমি কিছু জিয়ল মাছ কিনে নিতে পারতাম। সকালে মর্নিং ওয়াক করতে গিয়ে মানুষ ঘরে গ্রোসারি করে ফিরে, এমন ঘটনা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে হয় বলে আমার জানা নেই।

ফিরে আসি শরীরচর্চার কথায়। যখন আরেকটু সামনের দিকে এগোলাম তখন ক্রিসেন্ট লেকের উল্টো দিকে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়ার মাজারের পাশে দেখলাম একটি বড় কাপড়ের ব্যানার গাছের সঙ্গে টানানো। সাদা কাপড়ের ব্যানারে বড় বড় হরফে লেখা, ভোরের শিশির ফিটনেস ক্লাব তার সামনে ১০-১২ জন মাঝবয়সী লোক মিলিটারি কায়দায় ড্রিল করছেন। একজন লেফট-রাইট কমান্ড দিচ্ছেন আর বাকি সবাই তাকে অনুসরণ করে অত্যন্ত সিরিয়াসলি শরীরচর্চার নানা কসরত করে যাচ্ছেন। ফিরে আসার সময় লেকের পারে পাকা দেয়ালে বসে দেখলাম একদল মানুষ মিটিং করছে। মনে হলো, তারা হাঁটা কিংবা এক্সারসাইজ শেষ করে একসঙ্গে বসে অন্য কিছু করছেন। দেখলাম, একজন বই থেকে কী যেন পড়ছেন, অন্যরা সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। তারপর গ্রুপ লিডার একে একে সবাইকে প্রশ্ন করছেন, আর তারা উত্তর দিচ্ছেন। আমার ইচ্ছে ছিল পাশে দাঁড়িয়ে তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু কী তা শোনার, কিন্তু সময়ের টানাটানিতে সে বিষয় শোনা হয়নি। আমার কাছে মনে হয়েছে এরা কোনো রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক সংগঠনের লোক।

এই যে কেনাবেচা, শরীর মনের চর্চা, সামাজিক বা রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা, আড্ডা দেয়া, কথা বলা, নতুন দিনের নতুন সকালটা উপভোগ করা সবকিছু যেন ঢাকার ভেতরের ঢাকার চালচিত্র। কলকাতার শ্যামবাজারের পাঁচমাথার মোড়ে দাঁড়িয়ে কবি শ্রীজাত যে কবিতা লেখেন, তা যদি বাংলা সাহিত্যে উঠে আসতে পারে তাহলে প্রতিদিনকার ভোরের চন্দ্রিমা উদ্যানে ব্যস্ত নগরজীবন নিয়েও তো সৃষ্টি হতে পারে উন্নত মানের সাহিত্যকর্ম। আশা করি ঢাকার কবি-সাহিত্যিকরা ভোরের চন্দ্রিমা উদ্যানে বেড়াতে যাবেন এবং আমাদের উপহার দেবেন সুন্দর সুন্দর গল্প-কবিতা।

পুনশ্চ: অতি সাম্প্রতিককালে ভোরের ঢাকা দেখতে কেমন, কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশের স্বনামধন্য লেখক, গবেষক স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ . তোফায়েল আহমেদ চমত্কারভাবে সংক্ষেপে যা বলতে চেয়েছেন, তা এখন আমার মতো করে লিখছিএখন দৃশ্যপটে কিছু নতুন সংযোজন হয়েছে। ভোরে রাস্তায় বের হলে দেখতে পাবেন নারী পোশাক শ্রমিকদের দীর্ঘ মিছিল। কারওয়ান বাজারে গেলে দেখা পাবেন সারি সারি মিনতি বাজারের ঝুড়িতে বসা অবস্থায় ঘুমিয়ে আছে। দিনের আলো ফোটার আগে থেকেই পাইকারি মাছ বাজারে শত শত বেপারির অনাগোনা। শেষ রাত থেকে সবজি, মাছ, মুরগি, ডিম ইত্যাদি বোঝাই শত শত ট্রাক কুমিল্লা, যশোর, বগুড়া, জয়পুরহাট, রাজশাহী প্রভৃতি জেলা থেকে এসে ঢাকা শহরে ঢুকছে। আরো দেখতে পাবেন কর্মচঞ্চল হয়ে উঠছে শাহবাগের ফুলের দোকান, কাঁটাবনের পোষা পশুপাখির ব্যবসা এবং অলিতে-গলিতে প্রাইভেট কলেজ, স্কুল বিশ্ববিদ্যালয়। (শেষ)

 

আবু এন এম ওয়াহিদ: অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি

এডিটর, জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াজ

আরও