শুরুতে আমি কিছু প্রশ্ন করব, তারপর কিছু উত্তর দেব। প্রশ্নটা হলো—ঢাকার যে এলাকাকে ড্যাপ (ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান) এলাকা বলি, সেখানে শুধু এ শহর নয়, নারায়ণগঞ্জসহ আরো কিছু এলাকা আছে। এর জনসংখ্যা কত? আমরা এ এলাকার আয়তন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানি। কিন্তু জনসংখ্যা কত, সেটা এখনো কেউ নিশ্চিতভাবে জানি না। কেউ বলে দুই কোটি, কেউ বলে তিন কোটি। তাহলে প্রকৃত জনসংখ্যা কত? এ এলাকায় কত জনসংখ্যার বসবাসের সুযোগ রয়েছে বা যাদের নিয়ে পরিকল্পনা করব, সেই সংখ্যা কত কোটি?
প্রতিদিনই শুনি, ঢাকায় মানুষ আসছে এবং তারা বস্তি করে বসবাস করছে। এখন ঢাকা শহরে যদি মানুষের স্রোত না ঠেকাই, তাহলে কী বস্তি ঠেকাতে পারবেন? আইন দিয়ে বস্তি ঠেকাতে পারবেন? সুতরাং এ দেশের বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতেই পরিকল্পনা করতে হবে। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার আধুনিক মডেল এখানে হুবহু প্রয়োগ করতে পারবেন না। কারণ কী? কারণ তাদের পর্যাপ্ত জমি আছে। তাদের মানুষ শিক্ষিত। তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা আছে। আমার দেশে কি আছে?
আলোচকদের অনেকের কথায় এটা উঠে এসেছে—আমরা এখন থেকে যদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করি তাহলে ভবিষ্যতে তার ইতিবাচক ফল পাব। আমি ‘স্মার্ট’-এর একটা ভালো বাংলা শব্দ খুঁজছিলাম। এখানে বসে গুগলে দেখলাম, ‘চৌকস’ হলো সবচেয়ে ভালো অর্থ। কিন্তু ঢাকা শহরকে আসলে কীভাবে চৌকস বানানো যাবে, সেই ফর্মুলাটা আমি বলব। আমি বরং বলতে চাই, আমরা একটা বাসযোগ্য ঢাকা তৈরি করতে চাই, যেখানে আমরা অন্তত ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বাস করতে পারব। সেটা কীভাবে সম্ভব তা নিয়ে সবাইকেই কাজ করতে হবে।
অনেকের কথা শুনে মাঝেমধ্যে আমাকে ঢাকার রাজা, জমিদার মনে হয়। যেন সব ক্ষমতা রাজউকের। কিন্তু বাস্তবতা কী? বাস্তবতা হলো, আপনারাই বলছেন—একটা স্মার্ট সিটির সঙ্গে এর যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা—সবকিছু জড়িত। গণপরিবহনের ব্যবস্থা—সেগুলো কী রাজউকের (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) অধীনে আছে? এগুলো কী রাজউক ব্যবস্থাপনা করে? এগুলোর কোনো অথরিটি কী রাজউক? এগুলো পুরোপুরি আলাদা অথরিটি, আলাদা মন্ত্রণালয়, আলাদা ডিপার্টমেন্টের অধীনে। তাহলে রাজউক মূলত কী করে?
রাজউকের একটা কাজ আছে—আমরা প্ল্যান দিই, ড্যাপ দিই। এটা কিন্তু আপনাদের স্বীকার করতে হবে, কাগজে-কলমে ড্যাপ একটি ভালো পরিকল্পনা। কিন্তু বাস্তবে তো সেই ‘কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’ অবস্থা। কারণ দেখা যাচ্ছে, ড্যাপের মধ্যে যে জায়গাটা জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত, সেখানে এখন অননুমোদিত একটি ১০ তলা ভবন দাঁড়িয়ে গেছে। এটা বাস্তবতা এবং এটা দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আসছে। আমরা সবাই আজকে এই চাই, সেই চাই। কিন্তু বাস্তবতাটা কী? এটা রাজউক চেয়ারম্যান হিসেবে আমাকে বাস্তবভাবে অনুধাবন করতে হয়। এ বিষয়গুলোকে আমরা যদি ইন্টিগ্রেটেড করতে না পারি, তাহলে কোনোদিনই আমরা এ সমস্যার সমাধান করতে পারব না। ব্যবস্থাগুলোকে একটা ইন্টিগ্রেটেড ব্যবস্থার মধ্যে আনতে পারলেই আমরা সমাধান শুরু করতে পারব।
আজকের যে ভিডিও প্রেজেন্টেশন ছিল, সেখানে শুরুই হয়েছে জাপানের টোকিও দিয়ে। আমি ২০২৫ সালের মে মাসে তাদের টিওডি (ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট)—অর্থাৎ টোকিও সিটি আজকে যে ভিত্তির ওপর গড়ে উঠেছে, সেটার ওপর একটি প্রশিক্ষণে গিয়েছিলাম, চেয়ারম্যান হওয়ার পর পরই। তারা এ পরিকল্পনা শুরু করেছে ১৯৫০ সালে। এখনো তারা এটি শেষ করতে পারেনি। গোটা জাপানেই তারা করছে। এমনকি টোকিওতেও এ প্রকল্প এখনো শেষ হয়নি। বিষয়টা কী? তারা বলে, তোমাদের সমস্যা হলো তোমরা পরিকল্পনা করো পাঁচ বছরের জন্য, আর এটা বাস্তবায়ন করো ২৫-৩০ বছর ধরে। আর তারা পরিকল্পনা করে ২০ বছরের জন্য, কিন্তু সেটা পাঁচ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করে। এটাই পার্থক্য।
আমরা টিওডি শুরু করছি—দুটি জায়গায়; গাবতলী ও উত্তরায়। কাজেই একটা জিনিস বলব, আমরা সবাই যেন আমাদের দেশের বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তা করি। আপনারা অনেকেই বললেন ঢাকা বিশ্বের ভালো ৫০০ শহরের তালিকায় নেই, খারাপ শহরের তালিকায় নিচের তিনটির একটি। ঢাকার এ অধঃপতনের কারণ অনেক। এর অন্যতম আমাদের আইন না মানার প্রবণতা। আমরা কেউ আইন মানতে চাই না।
রাজউকের চেয়ারম্যান হিসেবে বিরল সব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাই। আমার কাছে অনেক অনুরোধ আসে। যখন আমি আমার ডেভেলপমেন্ট কন্ট্রোলকে দিয়ে কোনো ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাই, তখন আমার পরিচিতরা বলে, ‘ভাই, আমারটা একটু আলাদা দেইখেন, আশপাশের সব গুঁড়িয়ে দেন। অত্যন্ত শিক্ষিত, ইঞ্জিনিয়ার, মেধাবী, টাকা-পয়সাওয়ালা অনেকেই চান, তাদের বাড়ি তৈরিতে ডেভিয়েশনটা (আইনের ব্যত্যয়)যেন অ্যালাও করি। এ রকম অনেক অভিযোগ আমি পেয়েছি—‘অমুকের বিল্ডিংয়ে ডেভিয়েশন আছে, ভাই, একটা ব্যবস্থা নেন।’ আমি যখন ব্যবস্থা নিতে পাঠাই, আগে তার বাড়িতে পাঠাই। গিয়ে দেখি, তার নিজের বাড়িতে ডেভিয়েশন আরো বেশি। এটাই বাস্তবতা।
এখন আসেন, আমি কিছু সমাধানের কথা বলি। এতক্ষণ তো হতাশার কথা বললাম। আমরা অনেক কিছুই এরই মধ্যে শুরু করে দিয়েছি। মন্ত্রী মহোদয় প্রতি সপ্তাহে আমাদের সবাইকে নিয়ে বসছেন। ঢাকার লেকগুলোর ব্যবস্থা কী হবে, ময়লা কীভাবে দূর হবে, কীভাবে যানজট দূর হবে, কীভাবে অবৈধ ফুটপাত উচ্ছেদ হবে—প্রতি সপ্তাহের মিটিংয়ে এ বিষয়গুলো উঠে আসছে।
একজন আলোচককে বলতে শুনলাম, ঢাকা শহরে একটা বাড়ি থাকলে সে জমিদার। কিন্তু কেন? বিনয়ের সঙ্গে আমি বলব এর জন্য আমাদের ডেভেলপার ভাইদের দায় অনেক বেশি। আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগেও ল্যান্ড ওনারের সঙ্গে ডেভেলপারের পার্টনারশিপ থাকত। ডেভেলপারের ছিল ৬০ শতাংশ। আমি যে ভাষায় বলি, আমি যে ফ্ল্যাট কিনছি, সেখানেও এ রেশিওতে আমি কিনছি। কিন্তু তার পরে কী হলো?
৬০ শতাংশ ভূমি মালিকদের, সঙ্গে আবার সাইনিং মানি। এখন অবশ্য এটা ৫০-৫০ আসছে। আমি আসলে মনে করি, এটা ডেভেলপারের হওয়া উচিত ৬০ শতাংশ এবং ভূমি মালিকদের ৪০ শতাংশ। আপনারা বারবার বলছেন, আপনাদের ব্যবসা হতে হবে কিন্তু সেটা কীভাবে করবেন?
আরেকটা জিনিস না বললেই নয়। সবাই বলে যে রাজউকের মনিটরিংটা ঠিক হয় না। এখানে রাজউকের জনবলের হিসাবটা আপনাদের জানা উচিত। কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে পিয়ন-দারোয়ান পর্যন্ত আমাদের জনবল সর্বসাকুল্যে ১ হাজার ২০০ জন। আর ঢাকা শহরে বাসিন্দা কত, বাড়ি কত—আপনারা চিন্তা করেন। পর্যাপ্ত মনিটরিং কীভাবে সম্ভব? রাজউকের ইন্সপেক্টর সংখ্যা মাত্র ১০০ জন। তাছাড়া পৃথিবীর কোথাও পুলিশিং করে বাড়িঘর কন্ট্রোল করা হয় না। আইন ও বিধি মানার সংস্কৃতি থাকতে হয়।
আপনি রাজউক থেকে একটা প্ল্যান নেবেন। সবাই বলে, প্ল্যান তো রাজউক দিয়েছে।’রাজউক প্ল্যান দেয় না। রাজউক প্ল্যান অনুমোদন দেয়। প্ল্যানটা আপনি আপনার আর্কিটেক্ট, ইঞ্জিনিয়ারকে দিয়ে করান। আমরা শুধু অনুমোদন দিই এবং আপনি কমিটেড যে আপনি যে প্ল্যানটা সাবমিট করছেন, সেইভাবে বাড়ি করবেন। আপনি কি সেভাবে বাড়ি করেন? আমার ডেভেলপার ভাইয়েরাও কিন্তু করে না। আর ব্যক্তি মালিক তো করেই না। এটা যার যার দায়িত্ব, তাকে করতে হবে। একটা সার্বিক তদারকি লাগবেই, সেটা রাজউক করতে পারে। কাজেই এই যে বললাম, আইন মানার প্রবণতা—আপনারা এ আইনটা মানেন, দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।
ডেভেলপার ভাইরা খুশি হবেন, যদি গ্রিন বিল্ডিং করেন, ইনসেন্টিভ কিন্তু আমরা দিচ্ছি। আমরা এখন সোলারকে আমাদের প্ল্যানের অন্তর্ভুক্ত করছি। সোলার না দিলে আপনি প্ল্যান পাবেন না। আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি তবে আপনাদের সহযোগিতা লাগবে। শুধু সরকার বা রাজউক বা এনএইচএ বা অন্য কোনো ডিপার্টমেন্টের একার পক্ষে এটা সম্ভব না।
আমরা এখন সরকারি বিল্ডিংগুলোতে ইটের ব্যবহার একদম কমিয়ে ব্লক নিয়ে আসছি। আমরা ডেভেলপারদের ওপরও কিন্তু এটা করব। আপনাদের পুরনো ইট বাদ দিয়ে ব্লকে যেতে হবে। এখন ভালো ভালো ব্লক তৈরি হচ্ছে। এগুলোর জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন যে ব্লকের রেট কম হতে হবে। পিডব্লিউডিকে নির্দেশ দিয়েছেন, ইটের থেকে ব্লকের রেট শিডিউলে কম থাকতে হবে। তারা এটা নিয়ে কাজ করছে।
ভূমিকম্প নিয়ে একটা কথা এসেছে। বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সেফটি অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট করা হয়েছে। এর কৃতিত্ব মন্ত্রী পাবেন। কিন্তু ইনস্টিটিউটের জায়গাটা এবং বিল্ডিংটা আমরা ফ্রি দিয়ে দিয়েছি। তাদেরকে ৫ কোটি টাকার প্রাথমিক ফান্ড দিয়েছে রাজউক। আমরা যে ডিটেইলড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট করি, এটার চার্জ কিন্তু বুয়েটে অনেক বেশি। হ্যাঁ, এটা আপনাদের কমাতে হবে। আমরা এমএসটি করে মূলত আপনারা করেন, আমরাও করব। তখন কিন্তু এটা কম্পিটিশনে চলে আসবে।
কারণটা হলো, আমরা কিন্তু একটা কথা না বললেই নয়। সেটা হলো, এখন আগে শুধু একটা আর্কিটেকচার প্ল্যান দিয়ে প্ল্যান পাস হয়ে যেত। এখন আমরা ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার, ডিজাইন লাগছে। এ ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার ও আর্কিটেক্ট—এরা যেহেতু আইএবির রিকগনাইজড—আমরা বলছি, তারা রেসপন্সিবল থাকবে।
প্রথম সার্টিফিকেটটা তারা দেবে যে, হ্যাঁ, বিল্ডিংটা আমি যেভাবে ডিজাইন করেছি, সেভাবেই কাজটা হয়েছে। তার পরে রাজউক এটার ওপর একটু ভিজিট করে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট দেবে। তাহলে জিনিসটা সহজ হয়ে যাবে। কার দায়িত্বটা কার উপরে পড়ছে তা ভাগ হয়ে গেল।
আগে কী হতো? সবাই জানেন, একজন একটা প্ল্যান করা হয় সেখানে আর্কিটেক্ট সই করেন। তারপর ইচ্ছামতো বাড়ি বানিয়ে ফেলা হয়। লোকজন বাড়ি করছে, আর তারা দেখেও না। তারা একটার পর একটা প্ল্যানে সই করছে। এ নিয়ে অনেক অনেক কাহিনী আছে। একেকজন ডিজাইনার, আর্কিটেক্ট মাসে শত শত প্ল্যান ডিজাইন দিচ্ছে। এটা চলবে না।
পরিকল্পিত ও স্মার্ট সিটি গড়তে সবাইকে একসঙ্গে আন্তরিকভাবে কাজ করার অনুরোধ রেখে শেষ করছি।
ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম: চেয়ারম্যান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)
[বণিক বার্তা আয়োজিত স্মার্ট সিটি কনক্লেভ ২০২৬-এ সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে]