স্বাধীনতার পর বহু আন্দোলন, সংগ্রাম ও অভ্যুত্থান প্রত্যক্ষ করেছে দেশের মানুষ। তবে কোনোবারই আমানতকারীরা আন্দোলন করছেন এটি সম্ভবত বিরল। ব্যাংকে যোগদানের শুরুতে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের সময় প্রশিক্ষক ব্যাংকারের একটি কথা মনে পড়ছে। তিনি বলেছিলেন, ভুলেও যেন ব্যাংকের কোনো দুর্বল দিক নিয়ে গ্রাহকের সামনে আলোচনা করা না হয়। এই যেমন কোনো ব্যবস্থাপক হতাশ হয়ে কোনো এক গ্রাহকের উপস্থিতিতে বলে ফেললেন, ‘এ মাসে সবার বেতন পাব কিনা নিশ্চিত নই।’ এ ধরনের মন্তব্য শোনার পর গ্রাহক দুর্ভাবনায় পড়ে যেতে পারেন। তখন ওই ব্যাংকে আমানত রাখা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল কিনা এ নিয়ে তার মনে সংশয় দেখা দিতে পারে। ব্যবস্থাপকের মনেই যদি বেতন প্রাপ্তি নিয়ে সন্দেহ থাকে, তাহলে গ্রাহকের কাছে সার্বিকভাবে ব্যাংকের অবস্থা দুর্বল বলেই প্রতীয়মান হবে। ওই ব্যাংকে আমানত রাখা নিরাপদ না ভেবে তিনি নিজ সঞ্চিত অর্থ উত্তোলন করে নেবেন। পাশাপাশি তার নিকটজনদেরও সে তথ্য দেবেন। এভাবে আস্তে আস্তে সারা দেশেই ওই ব্যাংকের বিষয়ে এমন মতামত ছড়িয়ে পড়তে পারে, ওই ব্যাংকে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত নয়। শেষে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও অনেকের মনে ছড়িয়ে যেতে পারে।
যেকোনো অভিজ্ঞ ব্যাংকারই তাই ব্যাংকের গোপনীয়তা সম্পর্কে সতর্ক থাকেন। শুধু থাকলেন না দেশের সব ব্যাংকের অভিভাবক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর। তিনি দায়িত্ব নিয়েই কোন ব্যাংক সবুজ আর কোন ব্যাংক হলুদ এভাবে ব্যাংকগুলোকে চিহ্নিত করতে শুরু করেন। আমানতকারীরা তা দেখে ধাক্কা খেলেন। অনেকে আমানত সরিয়ে নিতে শুরু করলেন। এর পরও গভর্নর মিডিয়ায় ঘন ঘন এসে বলতে লাগলেন ‘অমুক অমুক ব্যাংক দুর্বল। এদের থেকে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক নিয়ে একটি সরকারি ব্যাংক করা হবে। তবে কিছুদিন পর তাদের আবার বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হবে।’ আমানতকারীরা আরো ভীত হলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এরই মধ্যে ওই পাঁচটি ব্যাংককে প্রয়োজনীয় তারল্য সহায়তা দেয়া এক প্রকার বন্ধ করে দেয়। ফলে চরম তারল্য সংকটে পড়ে যায় এ পাঁচ ব্যাংক। যুক্তি এল, ‘এ ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের টাকা দিতে পারছে না। তাই মার্জিং ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।’ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহায়তা না দিলে কোনো ব্যাংক টিকে থাকতে পারে না। এ ব্যাংকগুলো টিকে থাকার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সহায়তা চেয়ে বিফল হয়েছেন। তাই মনে করা হচ্ছে মার্জিং বাস্তবায়নের জন্যই কি ব্যাংকগুলোকে সহায়তা দেয়া বন্ধ করা হয়েছিল? অনেকটা ইরাক-আমেরিকা যুদ্ধের মতো। দীর্ঘদিন ইরাককে অর্থনৈতিক অবরোধে ফেলে ইরাকের অর্থনীতি যখন দুর্বল হয়ে পড়ল, ঠিক তখনই আমেরিকা ইরাক আক্রমণ করতে শুরু করল।
এটা স্বতঃসিদ্ধ কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পরে যদি ডেপুটেশনে কোনো ব্যক্তিকে এনে প্রতিষ্ঠান চালানোর দায়িত্ব দেয়া হয়, তাহলে ওই প্রতিষ্ঠান সুচারুরূপে চলে না। সরকারি প্রতিষ্ঠান কিছুটা চললেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে ভালোভাবে চলার নজির নেই। বেসরকারি ব্যাংকের এমডি ও চেয়ারম্যানের মধ্যে ব্যবসা বাড়ানো, মুনাফা বাড়ানো, গ্রাহক সেবা বাড়ানোর যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব থাকে, তাদের স্থানে যদি কোনো অতিথি বা সরকারি কর্মকর্তাদের বসিয়ে দেয়া হয়, তাদের মধ্যে ওই ব্যবসাবান্ধব প্রতিযোগিতা থাকার কথা নয়। কারণ তিনি জানেন আগের অবস্থানেই ফিরে যাবেন। বাড়তি ঝুঁকি সে নিতে চাইবে না। সম্মিলিত পাঁচটি ব্যাংকে প্রশাসক বসানোর প্রায় ছয় মাস হয়ে গেল। এ ছয় মাসে ব্যাংকগুলোর শাখা থেকে যে পরিমাণ অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট প্রপোজাল ও রিশিডিউলিং প্রস্তাব প্রধান কার্যালয়ে অনুমোদনে পাঠানো হয়েছে, সেগুলো অনুমোদন পারফরম্যান্স হতাশাব্যঞ্জক। অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট প্রপোজাল মানে ঋণের একটা অংশ মওকুফ করে দিয়ে বাদবাকি অংশ পরিশোধের অনুমোদন দেয়া। তবে ডেপুটেশনে আসা ব্যক্তি সচরাচর আদায়ের চেয়ে জবাবদিহিতায় বেশি জোর দিয়ে থাকেন। তিনি ভবিষ্যতের জবাবদিহিতার গন্ধ খুঁজবেন। জবাবদিহিতা মানে, কেন দুই আনা মাফ করা হলো, কেন তা আদায়ের জন্য আইনি ব্যবস্থা নেয়া হলো না ইত্যাদি। এভাবেই সম্মিলিত ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এক ব্যক্তির সঞ্চয়ী হিসাবে ৫০ লাখ টাকা জমা আছে। তাকে ২ লাখ টাকা দিয়ে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা রইল। বাকি অর্থ গ্রাহক কবে পাবেন তার নিশ্চয়তা না দিয়ে ব্যাংক একীভূতকরণের সফলতা প্রত্যাশা করা যায় কীভাবে? কারো ২ লাখ টাকার এফডিআর আছে। তাকে ১ টাকাও ফেরত দেয়া হলো না। আবার যার ২ লাখ টাকা সঞ্চয়ী আছে তাকে পুরো টাকা দিয়ে তাতেও এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। অনেকে দীর্ঘদিন আগে দ্বিগুণ মুনাফা স্কিমে বিনিয়োগ করেছিলেন, যাতে মেয়াদান্তে ওই অর্থ তুলে হজে যাবেন বা সন্তানের বিয়ে দেবেন কি বাড়ি নির্মাণ করবেন বলে। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর এ অর্থ কবে মিলবে তার নিশ্চয়তা না দিয়েও এ উদ্যোগের সফলতা পাওয়ার কথা নয়।
সরকার ব্যাপারটি অনুধাবন করেছে এবং ভালোভাবেই করেছে বলে প্রতীয়মান হয়। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা নিজে অর্থনীতিবিদ। দায়িত্বে থাকার সময় প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর এত ভোগান্তির কথা জানালেন, সেটি প্রধান উপদেষ্টা জানতে পারেননি? আমানতকারীদের আন্দোলন চলাকালে প্রধান উপদেষ্টার মুখ থেকে আমানতকারীদের স্বার্থের ব্যাপারে একটি শব্দও উচ্চারিত হলো না। অর্থ উপদেষ্টাও এড়িয়ে গেলেন বিষয়টাকে। সাবেক গভর্নরও সাধারণ আমানতকারী কিংবা ছোট বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে বিন্দু পরিমাণ কুণ্ঠাবোধ করেননি। লাখ লাখ বিনিয়োগকারী ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, ওই ব্যাংকগুলোয় তারা যে শেয়ারে বিনিয়োগ করেছেন তা এক নির্দেশে হারিয়ে গেল। ৭৫ লাখ আমানতকারী এ সরকারের কাছে তাদের ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার আমানতের সুরক্ষা চায়। পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণের প্রক্রিয়া যে অসার ও অকার্যকর তা এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়ে গেছে। জনগণের আস্থা ফেরানো তো দূরে থাক, বরং নেতিবাচক হয়েছে দিনকে দিন। তবে নির্বাচিত সরকার বিকল্প উপায় বের করেছে। যে ব্যবস্থা কার্যকর নয় তা জিইয়ে না রেখে নতুন ব্যবস্থায় যাওয়াই যুক্তিযুক্ত।
সম্মিলিত পাঁচটি ব্যাংকসহ অন্যান্য সংকটাপন্ন ব্যাংককে ক্লিন ইমেজের উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হলে ব্যাংকগুলোয় সহসা জনগণের আস্থা ফিরে আসবে। শেয়ারে বিনিয়োগকৃত অর্থ ফিরিয়ে দেয়া উচিত। ব্যাংকগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আমানতকারীদের সহযোগিতা চাইলে এ সহযোগিতা তারা না দেয়ার কারণ নেই। আমানতকারীদের স্বার্থে আঘাত না করে (হেয়ার-কাট), আর তাদের অত্যাবশ্যকীয় উত্তোলন নিশ্চিত করে এ সহযোগিতা চাইলে আমানতকারীরা অবশ্যই সহযোগিতা করবেন। তবে প্রত্যেক ব্যাংকের আমানতকারীদের (যারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন) সঙ্গে বসে একটি সমঝোতায় গেলে ব্যাপারটা আরো বেশি গঠনমূলক হবে। রিকভারি ও রিশিডিউলিং প্রপোজালে যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের শর্ত শতভাগ পরিপালন করা না যায়, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমোদন দানের ব্যবস্থা করা হলে রিকভারি ত্বরান্বিত হবে এবং শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ কমে আসবে। ফলে এ ব্যাংকগুলো সহসা ঘুড়ে দাঁড়াতে পারবে।
ড. এসএম আবু জাকের: সাবেক ব্যাংকার ও ভাইস প্রেসিডেন্ট, অর্থনীতি সমিতি-চট্টগ্রাম চ্যাপ্টার