বিশ্ব মশা দিবস

প্রান্তিক পর্যায়ে ক্রমবর্ধমান ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জও বাড়াচ্ছে

শহরে গুরুতর রোগীকে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তরের সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলে দূরত্ব, পরিবহন ব্যবস্থা, রোগ শনাক্তকরণে বিলম্ব এবং চিকিৎসা সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে জটিল রোগীর ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। তাই গ্রামীণ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

২০ আগস্ট বিশ্ব মশা দিবস। মশাবাহিত রোগের বিরুদ্ধে বৈজ্ঞানিক লড়াইয়ের ইতিহাস স্মরণ করার দিনটি এবার বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন বাস্তবতার কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে। ডেঙ্গু আর শুধু ঢাকা কিংবা বড় শহরের রোগ নয়। দেশের বিভিন্ন জেলা শহর, উপজেলা সদর এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ার খবর এখন পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের ডেঙ্গুর ভৌগোলিক বিস্তার বদলাচ্ছে এবং শহরের বাইরে সংক্রমণ ক্রমেই বাড়ছে।

একসময় ডেঙ্গুর কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠত ঢাকা শহরের চিত্র, ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকা, বহুতল ভবন, নির্মাণাধীন স্থাপনা, জলাবদ্ধতা আর অসংখ্য কৃত্রিম পাত্রে জমে থাকা পানি। কিন্তু সেই চিত্র এখন আর পুরো বাংলাদেশের ডেঙ্গু বাস্তবতাকে ধারণ করে না। ডেঙ্গু ধীরে ধীরে শহরের সীমানা অতিক্রম করে জেলা, উপজেলা এবং গ্রামীণ জনপদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

এটি শুধু রোগীর ভৌগোলিক বিস্তার নয়; এর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জও। শহরের জন্য তৈরি করা মশা নিয়ন্ত্রণের কৌশল গ্রামে একইভাবে কার্যকর হবে, এমন ধারণা এখন নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি।

হাসপাতালে চিকিৎসারত ডেঙ্গু রোগী ছবি: ফাইল/নিজস্ব আলোকচিত্রী

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস মূলত নগরকেন্দ্রিক। বিশেষ করে ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে দেশের ডেঙ্গু সংক্রমণের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ও ভৌগোলিক বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় ২০১৯-২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তারে বড় ধরনের ভৌগোলিক পরিবর্তন ঘটেছে; কিছু গ্রামীণ এলাকায় সংক্রমণের হার প্রধান শহরগুলোর সমান বা তার চেয়েও বেশি হয়েছে। একই গবেষণায় বছরের প্রথমার্ধে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রবণতাও উঠে এসেছে।

অন্য একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার এবং জলবায়ুগত প্রভাব বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে যে রোগটির ভৌগোলিক পরিধি আগের তুলনায় পরিবর্তিত হচ্ছে। অর্থাৎ ডেঙ্গুকে এখন আর শুধু ‘ঢাকার রোগ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেশের যেকোনো অঞ্চলেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় মানুষের চলাচল বেশি, নগরায়ণ দ্রুত হচ্ছে এবং এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, সেখানে ঝুঁকি দ্রুত বাড়তে পারে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় ভুল হবে শহরের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে হুবহু গ্রামে প্রয়োগ করা। শহরে যেখানে বহুতল ভবন, বেজমেন্ট, নির্মাণাধীন ভবন ও ঘনবসতি গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থল হতে পারে, সেখানে গ্রামীণ এলাকায় পানির সংরক্ষণ পাত্র, বাড়ির আশপাশের পাত্র, পরিত্যক্ত সামগ্রী, ছোট জলাধার এবং অন্যান্য স্থানীয় পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রতিটি এলাকার জন্য স্থানীয় মশা ও পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে পৃথক নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা প্রয়োজন

ডেঙ্গুর গ্রামমুখী বিস্তারের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, মানুষের চলাচল। ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহর থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও গ্রামে যাতায়াত করেন। কোনো ব্যক্তি ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তাকে কামড়ানো এডিস মশা পরবর্তী সময়ে অন্য মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। এভাবেই ভাইরাস একটি নতুন এলাকায় প্রবেশের সুযোগ পায়।

দ্বিতীয়ত, মশার বিস্তার। এডিস ইজিপ্টাই মানুষের বসতির সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে বসবাস করতে পারে। আগে আমরা এ মশাকে মূলত শহুরে পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করতাম। কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন, নির্মাণকাজের বিস্তার, প্লাস্টিকের পাত্রের ব্যবহার, পানির সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে গ্রাম ও ছোট শহরেও এ মশার জন্য উপযোগী প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে।

তৃতীয়ত, জলবায়ুর পরিবর্তন। তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতার পরিবর্তন মশার জীবন চক্র এবং ভাইরাসের সংক্রমণ সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের মতো উষ্ণ ও আর্দ্র দেশে এসব পরিবেশগত পরিবর্তন ডেঙ্গু ঝুঁকির ভৌগোলিক বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায়ও তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ডেঙ্গু সংক্রমণের সম্পর্কের পরিবর্তন লক্ষ করা হয়েছে।

ডেঙ্গুর শহর থেকে গ্রামে বিস্তারের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো; যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে নগর ডেঙ্গু মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হয়েছে, সেটি এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলের নতুন চাপ সামলানোর জন্যও প্রস্তুত হতে হবে।

একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যদি একসঙ্গে অনেক ডেঙ্গু রোগী আসে, তখন প্রশ্ন শুধু চিকিৎসার নয়। সেখানে পর্যাপ্ত ডেঙ্গু শনাক্তকরণ পরীক্ষা আছে কিনা, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও নার্স আছেন কিনা, পর্যবেক্ষণ ও রেফারেল ব্যবস্থা কার্যকর কিনা—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

শহরে গুরুতর রোগীকে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তরের সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলে দূরত্ব, পরিবহন ব্যবস্থা, রোগ শনাক্তকরণে বিলম্ব এবং চিকিৎসা সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে জটিল রোগীর ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। তাই গ্রামীণ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটি সমস্যা হলো রোগের নজরদারি। শহরের বড় হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী সহজে শনাক্ত হলেও গ্রামের অনেক রোগী স্থানীয় চিকিৎসক, ফার্মেসি বা ছোট স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে পারেন। ফলে সরকারি নজরদারি ব্যবস্থায় প্রকৃত রোগীর সংখ্যা কম প্রতিফলিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। গ্রামীণ পর্যায়ে ডেঙ্গুর প্রকৃত চিত্র জানতে হলে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোকে নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে আরো শক্তভাবে যুক্ত করতে হবে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় ভুল হবে শহরের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে হুবহু গ্রামে প্রয়োগ করা। শহরে যেখানে বহুতল ভবন, বেজমেন্ট, নির্মাণাধীন ভবন ও ঘনবসতি গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থল হতে পারে, সেখানে গ্রামীণ এলাকায় পানির সংরক্ষণ পাত্র, বাড়ির আশপাশের পাত্র, পরিত্যক্ত সামগ্রী, ছোট জলাধার এবং অন্যান্য স্থানীয় পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রতিটি এলাকার জন্য স্থানীয় মশা ও পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে পৃথক নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা প্রয়োজন।

প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিয়মিত এডিস নজরদারি। কোন উপজেলায় মশার ঘনত্ব বাড়ছে, কোন ইউনিয়নে প্রজননস্থল বেশি, কোন ধরনের পাত্রে লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে, এসব তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। শুধু রোগী শনাক্ত হওয়ার পর অভিযান শুরু করলে চলবে না; মশার ঘনত্ব বৃদ্ধির আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি, পানির পাত্র, পরিত্যক্ত পাত্র ও অন্যান্য সম্ভাব্য প্রজনন স্থল নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে। তবে এ কাজকে শুধু সরকারি কর্মীদের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে হবে না। গ্রামের মানুষকে সম্পৃক্ত করে মশার প্রজনন স্থল ধ্বংসের কার্যক্রম গড়ে তুলতে হবে।

তৃতীয়ত, কীটনাশক ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে। একটি এলাকায় কোন কীটনাশক কার্যকর, মশা তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধী কিনা এসব তথ্য ছাড়া নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহার করলে অর্থের অপচয় হতে পারে এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা আরো বাড়তে পারে। তাই নিয়মিত কীটনাশক কার্যকরিতা পরীক্ষা চালিয়ে ফলাফলের ভিত্তিতে কীটনাশক নির্বাচন করতে হবে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ফগিং একটি বহুল পরিচিত পদ্ধতি। কিন্তু ফগিংকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রধান বা একমাত্র পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা বৈজ্ঞানিকভাবে যথেষ্ট নয়। কারণ ফগিং মূলত উড়ন্ত প্রাপ্তবয়স্ক মশার ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়; মশার প্রজননস্থল ধ্বংস না করলে নতুন মশা আবার তৈরি হবে। তাই প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, প্রজননস্থল ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং জনগণের অংশগ্রহণ, সবকিছুকে একত্র করতে হবে। অর্থাৎ প্রয়োজন সমন্বিত বাহক ব্যবস্থাপনা (আইভিএম)।

এ সমন্বিত ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন প্রযুক্তিও স্থানীয় বাস্তবতায় মূল্যায়ন করা যেতে পারে। আকর্ষণভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ ফাঁদ, অটো-ডিসেমিনেশন প্রযুক্তি, জৈব লার্ভিসাইড এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে ওলবাচিয়াভিত্তিক পদ্ধতির মতো উদ্ভাবনী উদ্যোগ বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের মাধ্যমে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে কোনো প্রযুক্তিই সব এলাকার জন্য একইভাবে কার্যকর ধরে নেয়া উচিত নয়। স্থানীয় পরিবেশ, মশার প্রজাতি, জনগোষ্ঠী এবং কার্যকারিতা প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ডেঙ্গুর শহর থেকে গ্রামে বিস্তার শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় না; এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবারের অর্থনৈতিক চাপও। একজন গ্রামীণ পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আক্রান্ত হলে চিকিৎসার পাশাপাশি কর্মদিবস হারানোর ক্ষতি হয়। গুরুতর রোগীকে জেলা বা বিভাগীয় শহরে স্থানান্তর করতে হলে যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয় আরো বাড়ে। অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে রোগীর চাপ বাড়লে অন্যান্য রোগের চিকিৎসাতেও প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ডেঙ্গুর গ্রামমুখী বিস্তারকে শুধু মশাবাহিত রোগের বিস্তার হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্যও একটি নতুন চ্যালেঞ্জ।

ডেঙ্গুর পরিবর্তিত ভূগোল আমাদের নীতিতেও পরিবর্তন দাবি করছে। এতদিন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা মূলত বড় শহরকেন্দ্রিক ছিল। এখন জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ডেঙ্গু সার্ভিল্যান্স এবং রেস্পন্স সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে।

প্রতিটি উপজেলায় মশার নজরদারি ও ডেঙ্গু রোগের তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা থাকতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কৃষি ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং গবেষণা সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের ডেঙ্গু শনাক্তকরণ, ঝুঁকির লক্ষণ এবং দ্রুত রেফারেলের বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কারণ রোগী শহরে পৌঁছানোর আগেই যদি উপজেলা পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়, তাহলে জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রোগীর তথ্য এবং মশার তথ্যকে একই ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা। কোথায় রোগী বাড়ছে এবং একই এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব কেমন, এ দুই তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা অনেক আগেই শনাক্ত করা সম্ভব।

বিশ্ব মশা দিবসে আমাদের সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হওয়া উচিত—ডেঙ্গুর বাংলাদেশ বদলে যাচ্ছে। এটি আর শুধু ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা অন্যান্য বড় শহরের রোগ নয়। উপজেলা শহর ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ডেঙ্গুর বিস্তার আমাদের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। গবেষণাতেও শহরের বাইরে ডেঙ্গুর বিস্তার এবং কিছু গ্রামীণ অঞ্চলে সংক্রমণের মাত্রা বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তাই এখনই যদি আমরা ডেঙ্গুকে শুধু শহরের সমস্যা হিসেবে দেখি, তাহলে ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবেলায় আমরা পিছিয়ে পড়ব। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনাকে শহরের সীমানা পেরিয়ে গ্রাম পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে।

মশা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নকে ডেঙ্গু নজরদারি ব্যবস্থার আওতায় আনা; স্থানীয় পরিবেশ অনুযায়ী মশা নিয়ন্ত্রণের কৌশল তৈরি করা; নিয়মিত মশার ঘনত্ব ও কীটনাশক প্রতিরোধ পর্যবেক্ষণ করা; উপজেলা পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো এবং সর্বোপরি জনগণকে এ কর্মসূচির সক্রিয় অংশীদার করা। ডেঙ্গু শহর থেকে গ্রামে পৌঁছে গেছে; এখন আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও শহর থেকে গ্রামে পৌঁছে দিতে হবে। এটাই হতে পারে এবারের বিশ্ব মশা দিবসে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

ড. কবিরুল বাশার: কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও