নির্বাচনী প্রতিক্রিয়া

ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি বিজয়ীদের দায়িত্ব

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি ‘ফাউন্ডেশনাল মোমেন্ট’ বা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হবে। এর চারটি কারণ রয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি ‘ফাউন্ডেশনাল মোমেন্ট’ বা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হবে। এর চারটি কারণ রয়েছে।

ক. নাগরিকরা এবার শুধু সরকার নির্বাচন করছেন না, বরং একই সঙ্গে ‘জুলাই সনদ’-এর ওপর গণভোটে অংশ নিচ্ছেন। এটি নির্বাহী বিভাগের একক আধিপত্য খর্ব করে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো কাঠামোগত সংস্কারের একটি শক্তিশালী জনদাবি বা ম্যান্ডেট তৈরি করবে। খ. দীর্ঘদিনের দ্বিমেরুকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ এখন একটি বহুমুখী প্রতিযোগিতার যুগে প্রবেশ করেছে। একদিকে প্রথাগত ধারার বিএনপি, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) মতো তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন শক্তির উত্থান রাজনীতির ব্যাকরণ বদলে দিয়েছে। গ. প্রথমবারের মতো একটি বিশালসংখ্যক তরুণ ভোটার ব্যালট বাক্সে রায় দিচ্ছেন এমন এক পরিবেশে, যেখানে ফলাফল আগে থেকে নির্ধারিত নয়। অনেক আসনে জেন-জি প্রজন্মের প্রতিনিধিরা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিশ্বরাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত। ঘ. এবার পুরুষদের তুলনায় ভোটার তালিকায় নারীদের হার বেশি। যদিও নারী প্রার্থীর সংখ্যা কাঙ্ক্ষিত নয়, তবু এ ‘সাইলেন্ট ভোটার’ বা নারী ভোটাররাই মূলত জয়-পরাজয়ের তফাত হতে পারে।

নির্বাচনের দিন ব্যাপক সহিংসতার যে শঙ্কা/অপপ্রচার ছিল, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় ভোট দেয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি—পরিবার-পরিজন, নারী ও বয়োজ্যেষ্ঠদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি জনমানসে আস্থার বহিঃপ্রকাশ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। তারা ভোটারের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করেছে, প্রভাব বিস্তারে নয়। পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবার পোলিং এজেন্টদের আচরণ ছিল অনেক বেশি পেশাদার। প্রায় ৯০ শতাংশ কেন্দ্রে সিসিটিভি এবং দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বডি ক্যামেরা ব্যবহার জাল ভোট বা কেন্দ্র দখলের মতো অপতৎপরতা বন্ধে কার্যকর ‘ডিটারেন্ট’ বা প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করেছে। তবে এ তিনটি বিষয় বিবেচনায় সার্বিক ভোটার অংশগ্রহণ আরো বেশি আশা করছিলাম।

পরাজিত হলে আমাদের যে ফলাফল মেনে না নেয়ার সংস্কৃতি ছিল, আমি সতর্কভাবে আশাবাদী, এবার আমরা সে ‘প্রত্যাখ্যানের সংস্কৃতি’ থেকে বেরিয়ে আসতে পারব। এর পেছনে তিনটি প্রভাবক কাজ করছে:

ক. নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বড় দলগুলো জাতীয় সংস্কারের একটি যৌথ অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেছে। নির্বাচনী ফলাফল মেনে নেয়া হবে সে অঙ্গীকারের প্রতিফলন। খ. জুলাই বিপ্লবের অংশীজন (কোটি কোটি তরুণ ভোটার) এখন অনেক বেশি সজাগ। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে তারা পুনরায় সংগঠিত হতে দ্বিধা করবে না। ভয়টি রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে একটি নৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। গ. পুরো প্রচারণার সময়ে আমরা দেখেছি বিভিন্ন মতের প্রার্থীরা তর্কে লিপ্ত হলেও শেষ পর্যন্ত সংলাপের পথ খোলা রেখেছেন। এ পরিপক্বতা ‘বাংলাদেশ ২.০’-এর নতুন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়।

নির্বাচনের পর জয়ী ও বিরোধী উভয় দলেরই দায়িত্ব রয়েছে। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘নির্বাচনী প্রচারণা মোড’ থেকে ‘রাষ্ট্র গঠন মোড’-এ ফিরে আসতে হবে। বিরোধীদের দায়িত্ব/ভূমিকা হতে হবে একটি ‘গঠনমূলক ওয়াচডগ’ বা অতন্দ্র প্রহরীর মতো। জুলাই সনদ ও গণভোটের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে সরকারকে সহযোগিতার পাশাপাশি সংসদকে কার্যকর করতে হবে।

বিজয়ীদের দায়িত্ব হবে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি নিশ্চিত করা। সংসদীয় কমিটিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় বিরোধীদের জায়গা দেয়া এবং জুলাই বিপ্লবের অঙ্গীকার অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়নে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলাই হবে বড় পরীক্ষা। সংসদের হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধারই হওয়া উচিত তাদের প্রধান লক্ষ্য।

বিজয়ীদের জন্য প্রথম সপ্তাহটি হবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। আমার চোখে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো চারটি। এক. স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা: পরাজিত পক্ষের ওপর কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক হামলা বা বিদেশের মদতে কোনো নাশকতা যেন না ঘটে, তা নিশ্চিত করা। পেশিশক্তি নয়, বরং আইনের শাসন দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দুই. প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়: অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা বুঝে নেয়ার সময় সিভিল প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে দ্রুত একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা। তিন. অন্তর্কলহ রোধ: মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে দল বা জোটের ভেতর নানা স্বার্থগোষ্ঠীর চাপ ও কোন্দল সামলানো। শুরুতেই বড় কোনো বিতর্কে জড়ালে তা সংস্কারবাদী ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করবে। চার. নতুন মেরুকরণ পরিহার: যদি প্রথম সপ্তাহেই বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন শুরু হয়, তবে সংবিধান সংশোধনের ১৮০ দিনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চরম বাধার সৃষ্টি হবে। তাই শুরু থেকেই সংখ্যাতত্ত্বের জোর নয়, বরং সংলাপ ও সহযোগিতার বার্তা দিতে হবে।

ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ: ভিজিটিং প্রফেসর, ইউনিভার্সিটি অব রিডিং

আরও