বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫-২৬ বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেট পেশ করবেন। একটি নির্বাচিত সরকারের বার্ষিক বাজেট সরকারের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার (যেমন পাঁচসালা পরিকল্পনা) মধ্যে প্রোথিত থাকে। সুতরাং সেই বাজেট একটি দীর্ঘ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কাজ করে এবং বাজেটের লক্ষ্যগুলো দীর্ঘমেয়াদি সেই পরিকল্পনা থেকেই উদ্ভূত হয়। একটি অন্তর্বর্তী সরকারের বাজেটের ক্ষেত্রে এ প্রেক্ষিত ও প্রক্রিয়া—কোনোটাই প্রাসঙ্গিক ও প্রযোজ্য নয়। এ বাস্তবতা এবং দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে আসন্ন বাজেটের উচিত হবে স্বল্পমেয়াদি নীতিলক্ষ্যের প্রতি মনোযোগ দেয়া। আমার মতে, এ বাজেট হওয়া উচিত অবস্থা ঠিক করার বাজেট, একটি দিকদর্শনের বাজেট নয়।
উপর্যুক্ত চালচিত্রের প্রেক্ষাপটে আমার প্রত্যাশা, বাংলাদেশের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের নীতি-নির্দেশনা নিম্নোক্ত পাঁচটি লক্ষ্যের ওপর গুরুত্ব দেবে। প্রথমত, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতাবস্থা নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনার দৃশ্যমানতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা; তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতি হ্রাস এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ; চতুর্থত, চলমান প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার প্রদান এবং মর্যাদামূলক বিশাল প্রকল্প গ্রহণ না করা; এবং পঞ্চমত, ঋণ পরিশোধ ও ভর্তুকি বিষয় দুটির মোকাবেলা করা।
আমার মতে, বাজেটে সংস্কার তালিকায় কাঠামোগত পরিবর্তন নয়, বরং স্বল্পমেয়াদি, সম্ভবপর, বাস্তবসম্মত সংস্কার বিষয়গুলোর অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। যেমন বাজেটের পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোয় যতগুলো কর্মসূচি রয়েছে, সেগুলোকে কমিয়ে ১০০টিতে নামিয়ে নিয়ে আসা হবে, যদিও সেসব কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে। এ প্রস্তাবটি বাস্তবায়নযোগ্য এবং বাজেটের সময়সীমার মধ্যেই এ সংস্কার করা যাবে। একইভাবে প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয়ভার সংকোচন, প্রকল্পে দুর্নীতি এবং অসংগতি হ্রাস এ-জাতীয় প্রস্তাবিত ব্যবস্থাদিও বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার, যা আগামী বাজেট করতে পারে। আমার মতে, আসন্ন বাজেট উচ্চাভিলাষী না হয়ে বরং বাস্তবসম্মত হলে ভালো হয়।
রাজস্ব আহরণ ও সরকারি ব্যয় ব্যবস্থায় যদি সত্যিকারের সংস্কার করতে হয়, তাহলে করনীতি এবং প্রশাসন, করবহির্ভূত বিষয়াবলি, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থা সব কিছুরই কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। এ-জাতীয় সংস্কার একটি বার্ষিক বাজেটের কার্যপরিধির মধ্যে পড়ে না। করনীতি এবং কর প্রশাসন বিষয়ের বহু দিকই বর্তমান জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিলুপ্ত করে যে দুটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে তাদের কাজের আওতায় আসবে। যেমন করনীতি প্রণয়নের জন্য যে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করবে, তারা বাংলাদেশ অর্থনীতির কর কাঠামো এবং কর হারের সংস্কার করবে। সম্পদ আহরণের জন্য বাংলাদেশ অর্থনীতি কি প্রত্যক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভর করবে, প্রত্যক্ষ করের পরিধি কতখানি হবে? কর প্রশাসনের জন্য যে প্রতিষ্ঠান কাজ করবে, তারা কর ব্যবস্থা কাঠামোকে ঢেলে সাজাবে যাতে এ কাঠামো দক্ষ ও কার্যকর হয়।
এরই মধ্যে সংবাদ বেরিয়েছে যে এ বছরের এপ্রিলের শেষ নাগাদ, সরকারি আয় আহরণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৮ শতাংশ কম হয়েছে। ঋণ পরিশোধ এবং ভর্তুকির ব্যয়ভারও হবে বিপুল। সেই সঙ্গে প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে সম্পদ আহরণের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রাভাণ্ডারের চাপও অব্যাহত থাকবে। সুতরাং আসন্ন বাজেটের সময়কালে স্বল্পমেয়াদে উপর্যুক্ত বিষয়গুলোর চাহিদা মেটাতে সরকারকে অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ করতে হবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে তার সুযোগ কম। যেহেতু বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে এবং যেহেতু হাতে সময় কম, তাই সরকার সম্পদ আহরণের জন্যে মূল্য সংযোগ কর বা আবগারি শুল্কের মতো অপ্রত্যক্ষ করের ওপর নির্ভরতার বর্তমান প্রবণতাকে অনুসরণ করবে। সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে নানা চাহিদার মধ্যে একটা ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। ব্যয়ভার মেটাতে গিয়ে সরকারকে হয়তো শেষ পর্যন্ত ঋণ গ্রহণ করতে কিংবা টাকা ছাপাতে হতে পারে। সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় এখানে ওখানে টুকিটাকি কাজ সারার মধ্যেই প্রয়োজনীয় কার্যাবলি সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
আমি মনে করি, ২০২৫-২৬ বাংলাদেশ বাজেটের অগ্রাধিকার নিম্নোক্ত পাঁচটি বিষয়গুলোর দিকে নিবদ্ধ থাকতে পারে—অর্থনৈতিক স্থিতাবস্থা নিশ্চিত করা; মূল্যস্ফীতি হ্রাস এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, কর্মনিয়োজন বৃদ্ধি; কৃষি খাতে মনোযোগ দেয়া এবং সামাজিক খাতের ব্যয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বাজেটের অন্যান্য লক্ষ্য, যেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণের জন্য অর্থনৈতিক স্থিতাবস্থা খুবই জরুরি। এটা আন্তর্জাতিক মুদ্রাভাণ্ডারের একটি শর্তও বটে। বেশ কিছুদিন ধরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি জনজীবনের অন্যতম সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতি অর্থনীতি এবং জনকুশলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্থনৈতিক স্থিতাবস্থা, মানব উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি হ্রাসের অন্যতম চাবিকাঠি। কৃষি খাত শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা মূল্যস্ফীতির জন্যই দরকারি নয়, কর্মনিয়োজনেও এ খাতের একটি বিরাট ভূমিকা আছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ২৭ লাখ কর্মহীন। আগামী বাজেটে তাই কর্মসৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে ব্যয় বরাদ্দকে সুরক্ষিত করা প্রয়োজন। কারণ সামাজিক খাতের ব্যয় দারিদ্র্য ও অসমতা দূর করতে সাহায্য করে।
বাজেটে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যয় বরাদ্দের বিষয়ে কখনো অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে একটিকে রেখে অন্যটিকে বেছে নিতে হয়। যেমন প্রবৃদ্ধি বনাম মূল্যস্ফীতি; ভৌত কাঠামোয় বিনিয়োগ বনাম সামাজিক খাতে বিনিয়োগ; কৃষি বনাম শিল্প। প্রথম উদাহরণটিই নেয়া যাক। অনেক সময়ই মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হয়। এর ফলে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একইভাবে বাজেটে প্রস্তাবিত উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে দেখা যায় যে পরিবহন ও যোগাযোগের মতো ভৌত কাঠামোয় মোট উন্নয়নের ২৬ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়েছে। অথচ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মিলিয়ে সামাজিক অবকাঠামোয় উন্নয়ন ব্যয় বরাদ্দের মাত্র ২০ শতাংশ হয়েছে। এর মানে হচ্ছে যে ভৌত কাঠামোকে মানব উন্নয়নের তুলনায় অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এছাড়া এ বছরের বাজেটে শিক্ষায় উন্নয়ন বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় ৯ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে ১৮ শতাংশ কেটে দেয়া হয়েছে। ভৌত কাঠামোয় কিছুটা কাটছাঁট করতে হলেও মানব উন্নয়ন ব্যয়কে সুরক্ষিত করা প্রয়োজন। একইভাবে অন্যান্য বছরের মতো এবারো কৃষি খাতকে উপেক্ষা করা হয়েছে। শুধু যে উন্নয়ন ব্যয়ের ৫ শতাংশেরও কম কৃষিতে বরাদ্দ করা হয়েছে, তা-ই নয়, গত বছরের তুলনায় আসন্ন বাজেটে কৃষি খাতের অর্থ বরাদ্দ ১৮ শতাংশ কেটে দেয়া হয়েছে। কৃষিতে উন্নয়ন বরাদ্দ পর্যাপ্ত পরিমাণে হওয়া উচিত এবং শিল্পে প্রণোদনা দিতে গিয়ে কৃষিকে উপেক্ষা করা উচিত নয়।
চূড়ান্ত বিচারে, আমি মনে করি যে আসন্ন বাজেটের উন্নয়ন দর্শনটি পরিষ্কার করে বলে দেয়া উচিত। এ বাজেট প্রবৃদ্ধি অভিমুখীন হবে নাকি মানব অভিমুখীন হবে?
সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র