ডলারের বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

অস্বাভাবিক পরিস্থিতির উদ্ভব যাতে না হয় সেদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত পূরণের অংশ হিসেবে ডলারের দর বাজারভিত্তিক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে মার্কিন ব্যাংক ও গ্রাহকের আলোচনার ভিত্তিতে ডলারের ক্রয়-বিক্রয়মূল্য নির্ধারিত হবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত পূরণের অংশ হিসেবে ডলারের দর বাজারভিত্তিক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে মার্কিন ব্যাংক ও গ্রাহকের আলোচনার ভিত্তিতে ডলারের ক্রয়-বিক্রয়মূল্য নির্ধারিত হবে। ডলারের দর যাতে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে না যায়, সেজন্য কঠোর নজরদারিও থাকবে। পাশাপাশি অতি জরুরি প্রয়োজনে ডলারের চাহিদা মেটাতে রিজার্ভ থেকে ৫০ কোটি ডলার দিয়ে একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। গত বুধবার দুবাই থেকে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। বর্তমানে প্রবাসী আয় ও রিজার্ভ প্রবৃদ্ধির ধারায় রয়েছে। এছাড়া আর্থিক হিসাব ঘাটতি থেকে উদ্বৃত্তে পৌঁছেছে, কমে এসেছে চলতি হিসাবের ঘাটতি। যেহেতু বৈদেশিক মুদ্রা ও রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় স্বস্তিতে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, তাই ডলারের দর বাজারভিত্তিক করার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক ফল দিতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে ডলারের দর নির্ধারিত হবে বিধায় কালো বাজারের প্রভাব কমবে। এছাড়া আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে ডলারের লেনদেন বাড়বে এবং অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে লেনদেন কমে আসবে।

ডলারের দর বাজারভিত্তিক করার সিদ্ধান্ত দেশের আর্থিক নীতিতে একটি বড় পরিবর্তন। তবে সরকারের এ পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। হঠাৎ করে ডলারের দর দ্রুত ওঠানামা করলে আমদানিকারক, রফতানিকারক এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হতে পারে। ডলারের দর অনেক বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরো বাড়বে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান বিদেশী মুদ্রায় ঋণ গ্রহণ করেছে, তারা বিপাকে পড়বে। যদি ডলারের বাজার সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারে, তাহলে এটি বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট তৈরি করবে, যা পুঁজিপ্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ডলারের দর বাজারভিত্তিক করতে হলে একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ মুদ্রাবাজার থাকা জরুরি। তাছাড়া বাজারে আকস্মিক চাপ মোকাবেলায় পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকা দরকার। তাই রফতানি আয়, প্রবাসী আয় ও বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে। বাজারভিত্তিক বিনিময় হার বাস্তবায়নের সময় মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য চাপ মোকাবেলায় শক্তিশালী ও সুনির্দিষ্ট মুদ্রানীতি প্রয়োগ ঘটাতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও মুদ্রাবাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানো প্রয়োজন। যদিও ডলারের দর বাজারভিত্তিক হওয়া একটি টেকসই অর্থনীতির জন্য উপযোগী ব্যবস্থা।

বিগত সরকার ডলারের সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়ন না ঘটিয়ে অতিমূল্যায়িত করে টাকাকে শক্তিশালী দেখাতে চেয়েছিল। কিন্তু ২০২২ সাল-পরবর্তী সময়ে টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকানো যায়নি। ডলারের চাপ তৈরি হওয়ার পর পরই যদি বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হতো, এতদিনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যেত। সরকারের ভুল নীতির কারণে আমদানি ব্যয়সহ আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলারের চাহিদা মেটাতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে পরিস্থিতি সামাল দেয়া হয়েছিল। ফলে টাকার রেকর্ড অবমূল্যায়নের পাশাপাশি রিজার্ভও দুর্বল করে ফেলা হয়েছিল।

দেশে ডলারের বাজারে অস্থিরতা চলছে প্রায় চার বছর ধরে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারিতেও দেশে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৫ টাকা। এর পর থেকেই ডলারের বাজারে অস্থিরতা চরমে ওঠে। মাত্র এক বছর পর ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১০৩ টাকায় ঠেকে। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি ডলারের দর উঠে যায় ১১০ টাকায়। জুনে এসে বিনিময় হার নির্ধারণে ক্রলিং পেগ নীতি গ্রহণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতি ডলারের বিপরীতে বর্তমানে ১১৯ টাকা দামের সঙ্গে ২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত দর বাড়তে ও কমতে পারে। এর সঙ্গে সর্বোচ্চ ১ টাকা ব্যবধানে ডলার বিক্রি করা যায়। ফলে ডলারের দর এখন সর্বোচ্চ ১২৩ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হওয়ার কথা। তবে এর চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এখন আইএমএফের ঋণের শর্ত মেটাতে ডলারের দর বাজারভিত্তিক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ নিয়ে গত বুধবার জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এখন থেকে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের অনুমোদিত ব্যাংক শাখাগুলো (এডি ব্রাঞ্চ) তাদের গ্রাহক ও ডিলারদের কাছে নিজেরা আলোচনার মাধ্যমে বিনিময় হার নির্ধারণ করতে পারবে।

ডলারের সরবরাহ মূলত বাংলাদেশে আসে রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স থেকে। আর চাহিদা তৈরি হয় আমদানি এবং অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে। পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই চাহিদা ও জোগান তথা বাজারদরের ওপর ভিত্তি করে মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ডলার ও টাকার বিনিময় হার অনেক বছর ধরেই সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। তবে সেটার সঙ্গে বাজার দ্বারা নির্ধারিত হারের যে অনেক পার্থক্য ছিল, তা নয়। বাজার নির্ধারিত মূল্য ও সরকার–নির্ধারিত মূল্যের এ পার্থক্য বোঝা যায় যখন ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ থেকে ডলার ক্রয় করা হয়। বাংলাদেশে সাধারণত এ দামের পার্থক্য ২-৩ টাকার বেশি ছিল না।

বাংলাদেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের একটি বড় অংশ আমদানি থেকে আসে। তাই ডলারের বিনিময় হার বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যায়। আর আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে সেই পণ্য স্বাভাবিকভাবেই বাজারে চড়া মূল্যে বিক্রি হয়। ফলে বিক্রিও কম হয়। এতে ব্যবসায়ী, ভোক্তা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ ভাবনা আপাতদৃষ্টে বেশ যৌক্তিক মনে হলেও বিষয়টি এত সরল নয়। ডলারের দর কম রাখতে গিয়ে সরকারকে রিজার্ভ থেকে বাজারে ডলার সরবরাহ করতে হয়েছিল। কিন্তু সরকারের হাতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্থাৎ ডলারের রিজার্ভ দ্রুত কমে আসছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগে (২০২১ সালের আগস্টে) যেখানে রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল, দুই বছর পর সেটি প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি চলে আসে। এ কারণে সরকারি রেটে সরবরাহ করার মতো পর্যাপ্ত ডলার সরকারের কাছে ছিল না। তাই ব্যাংকগুলোর কাছেও ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়। তাদের ডলার সংগ্রহ করতে হয় উঁচু রেটে বাজার থেকে, কিন্তু বিক্রি করতে হয় সরকারি রেটে। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকগুলো এ ক্ষতির শিকার হতে চায়নি। ফলে আমদানিতে সরাসরি প্রভাব পড়ে। আমদানি কমে যাওয়ায় তৈরি হয় পণ্যের ঘাটতি। এতে নিত্যপণ্যসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যায়।

অন্যদিকে ডলারের বিপরীতে টাকার দর পড়ে গেলে রফতানিকারকদের সুবিধা। কারণ তখন একই পরিমাণ ডলারের বিপরীতে বেশি টাকা উপার্জিত হয়। কিন্তু সরকার যদি কৃত্রিমভাবে ডলারের দর কমিয়ে রাখে, তখন রফতানিকারক সেই উপার্জন করতে পারেন না। তখন অনেক রফতানিকারক ডলার আর সরকারি চ্যানেল দিয়ে আনেন না। কেউ কেউ ডলার বিদেশের ব্যাংকে রেখে দেন। অথবা হুন্ডির মাধ্যমে আনেন। এর পুনরাবৃত্তি দেখা যায় প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও। সরকারি চ্যানেলে পাঠানো রেট কম থাকায় অনেক প্রবাসী তাদের আয় হুন্ডির মাধ্যমে পাঠান। রফতানি আয় আর প্রবাসী আয় দুটিই বৈদেশিক আয়ের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু সেগুলো আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে না এসে হুন্ডির মাধ্যমে দেশে আসে। ফলে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে ডলারের সরবরাহ কম থাকে। তাই এত দিন ধরে টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকিয়ে রেখে রফতানি আর বৈদেশিক আয় দুটিকেই মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছে। এটি একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে ফেলেছে। কিন্তু ডলারের দর বাজারভিত্তিক করায় আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে ডলারের প্রবাহ বাড়বে।

ডলারের বিনিময় হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ায় সাময়িকভাবে ডলারের দর বাড়তে পারে। কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতির উদ্ভব না হয় সেদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। অবৈধ কালোবাজারিরা যাতে ডলারের দরকে অস্থিতিশীল করতে না পারে সেজন্য সরকারকেও সতর্ক থাকতে হবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা গেলে পরবর্তী সময়ে ডলারের দর স্থিতিশীলতায় আসবে। কিন্তু যদি ডলার ও টাকার বিনিময় হার কৃত্রিম উপায়ে স্থির করে রাখা হয় তাহলে বাজার নির্ধারিত হারের সঙ্গে আরো ব্যবধান বেড়ে যায়। তখন অবৈধ প্রক্রিয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনও বৃদ্ধি পায়। ডলারের দর বাজারভিত্তিক করায় অবৈধ প্রক্রিয়ায় লেনদেন বন্ধ হবে। আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে ডলারের প্রবাহ বাড়বে।

আরও